পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

'ড. অনুপম সেন এমন বিনয়ী দেখিনি'

দৈনিক আজাদী                                     উপসম্পাদকীয়                                          কাল আজ কাল
২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ৮ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপ শ্রেণীকক্ষে বসে বাইরের আবহাওয়া আন্দাজ করা যায় না। মেয়েটি ক্লাস শেষ
করে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে দেখল অঝোর বৃষ্টি ঝড়ছে। রাস্তায় রিকশা-টেক্সিও কম। বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে অনেকে বিল্ডিংয়ের নিচে গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছে। অগত্যা মেয়েটিও মিশে গেল সেখানে। প্রতীক্ষা একটি রিকশার। বৃষ্টির ছাঁট লেগে অনেকের মতো তার পোশাক ভিজে একশা। এরই মধ্যে মেয়েটি হঠাৎ দেখতে পেল একটি গাড়ি প্রায় তার সামনে এসে দাঁড়াল। পিছনের জানালার গ্লাস নেমে একজন বললেন, ‘এসো মা তোমাকে আমি নামিয়ে দিচ্ছি। এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তো গাড়ি পাবে না।’ মেয়েটি চমকে গেল, আরে এঁযে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। মেয়েটি লজ্জা ও দ্বিধা নিয়ে বলল, না থাক স্যার, আমি যেতে পারব। মেয়েটির আড়ষ্টতা দেখে স্যার হয়ত ভাবলেন মেয়েটি তাঁর সাথে পেছনের সিটে বসতে লজ্জা পাচ্ছে। এবার তিনি দরজা খুলে মেয়েটিকে বললেন, মা তুমি পেছনে বসো, আমি সামনে বসলাম। তিনি সামনের সিটে বসলেন, এই করতে গিয়ে তাঁকেও ভিজতে হলো খানিকটা অগত্যা মেয়েটিকে উঠতে হলো গাড়িতে। মেয়েটির গন্তব্য পৌঁছে দেওয়া হলো সেদিন।

মাফ করবেন এটি কোনো গল্পের অংশ বিশেষ নয়। ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আমিও যাই। যাই মূলত উপাচার্য স্যারের কাছে। তাঁর বাসায়ও যাই। তবে যেখানে যাই শুধু সাদরে গ্রহণ করে পরম আন্তরিকতায় আতিথেয়তা করেন তা নয় ফিরে আসার সময়ে দরজাকে পর্যন্ত খুলে বলবেন, ভালো থাকুন বাদল। এ অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়। আমাদের অনেকের।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম-প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য তিনি- ড. অনুপম সেন, আমি এমন বিনয়ী মানুষ দেখিনি। স্যারকে অনেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতি হতে হয়। এভাবে তাঁকে আমাদের অনুষ্ঠানেও আসতে হয়েছে। এর জন্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু স্যারকে টেলিফোনেই বলেছি, তিনি সানন্দে সম্মতি দিয়েছেন। অথচ এই শহরেই অনেককে অতিথি, প্রধান অতিথি বা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করার অনুরোধ জানাতে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করতে হয়, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে অপমানও করেন। এই ধরণের তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের সকল সংস্কৃতিকর্মীদেরই আছে। মনে পড়ছে তিন/ চার বছর আগে আমি আর নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে চরমভাবে অপমানিত হয়েছিলাম স্বঘোষিত ওস্তাদ বলে এক বংশিবাদকের কাছে। ড. সেন স্যারকে অনুষ্ঠানে অতিথি করতে গিয়ে আয়োজকরা তাঁর কাছ থেকে অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদাও নিয়ে আসেন। প্রায় অনুষ্ঠানের জন্য তাঁর কমপক্ষে বরাদ্দ থাকে একটি কড়কড়ে পাঁচ শ টাকার নোট। অনুরোধ-উপরোধে তা বাড়তে থাকে। বলছিলাম যে, তাঁকে প্রায়ই টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানাই। তো তেমন কোনো একদিন তিনি টেলিফোন রিসিভ করতে না পারলে পরে কল-ব্যাক করেন। জানতে চান কেন ফোন করেছিলাম। এই নিয়মের ব্যত্যয় কখনো হয়নি। স্যারের দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে আমি তাঁর একজন ছাত্র হওয়ারও যোগ্য নই তবুও তিনি এই ক্ষুদ্র মানুষটির প্রতি যে সৌজন্য ও বিনয় প্রদর্শন করেন তা দেখে আমি কখনো কুক্তিত কখনো বিস্মিত হই। এই ‘হামবড়া’ সমাজে, মেকি ও হিপোক্র্যাট সমাজে ড. অনুপম সেন একজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। শুনেছি তিনি যখন তাঁর গ্রামের বাড়িতে যান তখন তাঁর গ্রাম থেকে অনেক দূরে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। খুব সাদাসিদে ও সাধারণভাবে মিশতে চান গ্রামের মানুষের সাথে। বিলাসবহুল গাড়িটি যেন এর মধ্যে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায় সে জন্যই এই ব্যবস্থা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। পড়ে লন্ডনে পিএইচডি করে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের কাল ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ’৭০-’৭১ এর সে উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ যাত্রাপথের তিনি অন্যতম সারথি। ’৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে চট্টগ্রাম শহরে অধ্যাপক আবুল ফজল, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ডা. কামাল-এ-খান প্রমুখের সাথে তিনিও ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল ও স্লোগানে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ড. আসিুজ্জামানসহ ভারতে পাড়ি জমান এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের জনগণের বিশেষ করে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন আদায়ে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। এরপর থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা, জেলের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছে তার বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন অবিচল ভাবে। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা একজন অভিভাবকের মতো। চট্টগ্রামে সামাজিক-সাম্প্রদায়িক-রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান এখন একজন অভিভাবকের ন্যায়। তাঁর সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ বাগ্মিতা তাঁকে চট্টগ্রামের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে ও অনুষ্ঠানে অপরিহার্য করে তুলেছে। তিনি স্বয়ং আলোকিত মানুষ। তাঁর উপস্থিতিও আলোকিত করে রাখে চারপাশ।

তিনি পিএইচডি করেছেন লন্ডনে। তাঁর গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল লন্ডনের একটি নামী প্রকাশনা সংস্থা ১৯৮২ সালে The state, industrialization and class formation in India. গবেষণা গ্রন্থটি তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও সম্মান। তিনি স্বীকৃত হয়েছেন একজন আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে। স্যার একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, বইটির দাম বড্ড বেশি, বাংলাদেশে তা পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁর সংগ্রহেও আছে মনে হয় একটি মাত্র কপি। দুঃখজনক হলেও সত্যি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটি নিয়ে আলোচনা ও বইটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশে তেমনভাবে বইটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমার ধারণা অনেকে হয়ত এই তথ্যটিও জানেন না। এর পরে তাঁর আরও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধ,কবিতা ও অনুবাদ। সমাজ রাজনীতি অর্থনীতির মতো গভীর চিন্তামনষ্ক গ্রন্থ যেমন লিখেছেন তেমনি লিখেছেন আবেগধর্মী কবিতাও। তাঁর লেখা, পাণ্ডিত্য, প্রজ্ঞা মনন ও সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কিছু লেখার যোগ্যতাও আমার নেই। ওসব নিয়ে অন্যকোনো গবেষক, জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তি হয়ত লিখবেন। আমি শুধু তাঁর সারল্য, মানবতাবোধ, মার্জিত ও আন্তরিক-আচরণ নিয়েই বলতে চাই কারণ আমাদের সমাজে দুকলম লিখেই অনেকে নিজেদের পণ্ডিত-জ্ঞানী ও বড় লেখক বলে দাবি করেন।

দেশে আরও পণ্ডিত ব্যক্তি আছেন। বহুমাত্রিক গুণের ব্যক্তিত্বও আছেন; কিন্তু তাঁরা নিজেদের নিয়ে,নিজের অহমিকা নিয়ে এতই মগ্ন থাকেন যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তাঁদের কাছে ঘেঁষতে পারি না। আর এ জায়গাতেই ড. অনুপম সেন অনন্য। তিনি ছোট বড়, পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথেই কথা বলেন, মেশেন আন্তরিকতার সাথে। আহবানে সাড়া দেন ভনিতা ও অহংকারহীনভাবে। দেশের কিংবা বিশ্বের যে কোনো বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করা যায়- তাঁর কাছ থেকে শেখা যায়। জানার এবং তা ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করার পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতা সবার থাকে না, যা ড.অনুপম সেনের কাছে পাওয়া যায়।

এ বছর একুশের পদক পেয়েছেন ড. অনুপম সেন। আমি মনে করি, এ পদক বা সম্মান আরও আগে প্রাপ্য ছিল তাঁর। তবুও বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে কিছু পদক বা স্বীকৃতি নিজেই ধন্য হয় যোগ্য ব্যক্তির করস্পর্শে। রাষ্ট্রীয় এই সম্মানপ্রাপ্তিতে স্যারকে আমাদের অভিনন্দন। যদিও চট্টগ্রামবাসী এর চেয়েও বড় সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁকে অনেক আগেই প্রদান করেছে হৃদয়ের অর্ঘ্য দিয়ে।

ড. সেন স্যারকে দেখলে মাঝে মাঝে আমার বিশ্বকবির একটি গানের কলি মনে পড়ে। বাঙালির অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ সন্তান যা সৃষ্টি করে গেছেন তা এক বিশাল ও অফুরন্ত সম্পদ। বাঙালির প্রাত্যহিকতায় অনিবার্য রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করা এক কথায় দুঃসাধ্য। সেই বিশ্ববরেণ্য কবি তাঁর একটি বিখ্যাত গানে লিখেছেন, ‘আমার জনম গেল বৃথা কাজে/ আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে/বৃথাই তুমি শক্তি দিলে শক্তিদাতা... পণ্ডিত ড. অনুপম সেনের বিনয় এভাবেই আমার ও আমাদের কাছে তাঁকে পুজনীয় করে রেখেছে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ