পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

'আগামী প্রজন্মের জন্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে করণীয়'

দৈনিক আজাদী                                        উপসম্পাদকীয়                                           কাল আজ কাল
১৩ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১২ রবিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
দেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একটি শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অন্যটি বিপক্ষে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই আজ নতুন করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটছে।

শুরুতেই আসুন সাম্প্রদায়িকতা কী, এ বিষয়ে একটি ধারণা গ্রহণের চেষ্টা করি। জাতি আর সম্প্রদায় এক কথা নয়।
এক অর্থও বোঝায় না। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠে একটি জাতিসত্তা। এর পেছনে কাজ করে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ও অন্যান্য উপাদান। আর সম্প্রদায় সৃষ্টি হয় প্রধানত ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে জাতি হিসেবে বাঙালি হলেও এখানে ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ইত্যাদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। সম্প্রদায় পরিবর্তনযোগ্য, জাতিত্ব নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরবরা একটি জাতি। তবে তারা মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যে মিসকিন হিসেবে পরিচিত। মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তারা আরব হতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আলাদা মর্যাদাও লাভ করে না। যতটুকু লাভ করে একজন শিক্ষিত অমুসলিম ভারতীয়। বেরাদানে মুসলিম বলা হলেও একটি পর্যায়ে যে যার জাতির পরিচয়েই বিবেচিত হয়। তেমনি করে বাঙালি খ্রিস্টানরা ইংল্যান্ডে মাইগ্রেট করার পর ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারেন, ইংরেজ জাতি নন। অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তন করে সম্প্রদায় পরিবর্তন করা যায় বটে, জাতিত্ব যায় না। এর আরেকটি রূপ দাঁড়াল বিভিন্ন জাতির মধ্যে আবার একই সম্প্রদায়ের লোক থাকতে পারে। যেমন বৌদ্ধ, খ্রিস্টান,মুসলিম সম্প্রদায় বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যেও বিদ্যমান।

একটি সম্প্রদায় তার ধর্ম পালন করবে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করবে, এতে কোনো দোষ নেই, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই; কারণ তা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িকতা নয়। সাম্প্রদায়িক আচরণ বা সাম্প্রদায়িকতা তখনই বলা হয়ে থাকে যখন তারা ধর্মীয় বিবেচনা থেকে অন্য ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ আচরণ করে, তাদের ক্ষতিসাধন করে। ধর্মের এই উগ্র, গোঁড়া ও অসহিষ্ণু রূপটিই সাম্প্রদায়িকতা। যখন কেউ নিজ ধর্ম বা সম্প্রদায়কে অন্য ধর্ম বা সম্প্রদায়ের চেয়ে শ্রেয়তর মনে করেন এবং জোরপূর্বক তার প্রাধান্য অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তখন তাও সাম্প্রদায়িক। আর এ ক্ষেত্রে বিপদের কারণ উগ্র সম্প্রদায়টি যদি লোকসংখ্যা, জনবল,রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিকভাবে অন্য সম্প্রদায়ের চেয়ে শক্তিশালী ও সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। এ রকম সম্প্রদায়গত এই উন্নাসিক আচরণই হলো সাম্প্রদায়িকতা। শুধু বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে নয়, যেখানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার আছে সেখানেই কোনো না কোনোভাবে সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান।

আমি আগেই বলেছি বাংলাদেশে বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতা প্রকটভাবে বিদ্যমান। শুধু তাই নয় বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্প্রদায়িকতা একটি মূল সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় ঐক্যও বিভক্ত হচ্ছে এই একটি প্রশ্নে। একটি পক্ষ অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে আর তার বিপরীত অংশটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সুবিধার কথাই বলে থাকেন, সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তার সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অবস্থানের কথা ভাবেন। বলাবাহুল্য তা তারা চায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। আর এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হীনস্বার্থে ও ক্ষমতার মোহে রাজনৈতিক দলগুলো অধিকাংশ সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষ অবলম্বন করে থাকে অনৈতিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে। ভোটের রাজনীতিতে সাময়িকভাবে তারা লাভবান হলেও তাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে সমাজ জীবনের স্থিতি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করেছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতা লোপ পেতে বসেছে।

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ব্রিটিশ শাসনামলে। তার আগে মোঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করেছে খুব সতর্কতার সাথে। তারা এ দেশীয়দের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে আঘাত করার চেষ্টা করেনি। চেষ্টা করেনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে ধর্মকে চাপিয়ে দিতে। তারা সবসময় সমন্বয়ের চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন ধর্মের জনগোষ্ঠীর সাথে বিবাহবন্ধন বা সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ধর্ম দ্বীন-এ-এলাহীও ওই কৌশল বা সমন্বয় করে চলার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশরাই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চেতনা উসকে দেওয়ার কাজ করেছে। ’ঊণশধঢণ টভঢ ৗলফণ’ ব্রিটিশদেরই প্রবর্তিত শাসন ও শোষণ কৌশল। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বলে রাখি, টাকা-উপঢৌকন ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে রাজনীতিক বা প্রভাবশালীদের বেচাকেনার সংস্কৃতিও শুরু করেছিল ব্রিটিশরা। ১৭৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভ অর্থ ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের দলে ভিড়িয়েছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও প্রভাবশালী আমাত্য রাজা রায় বল্লভদের মতো ব্যক্তিদের। তারপর থেকে বেচাকেনার সংস্কৃতি যে শুরু হল তা থেকে এখনও রেহাই পায়নি ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশের রাজনীতি।

সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত ভাগ এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতা দৃঢ়মূল হওয়ার কারণ। উপমহাদেশের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি রাষ্ট্র। আর এ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে পাঞ্জাব ও বাংলাদেশকে।

এই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। গোড়া থেকেই এই রাষ্ট্র অমুসলিম তথা হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম ঘৃণা ও উপেক্ষা লালন করেছে। দেশত্যাগী হিন্দুদের বিষয়-সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি আখ্যা দিয়ে দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছেন তাদের হিন্দুস্তানের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চলেছে। এমনকি আমাদের যে মহান ভাষা আন্দোলন, মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ের আন্দোলন, সে আন্দোলনকেও ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে কারণ সেদিন অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে একজন হিন্দুও যদি মারা যেত তাহলে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মোড়টাই তারা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। এই আন্দোলন হিন্দুদের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করার সুযোগ পেত।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষা রক্ষার আন্দোলন নয়। আপাতদৃষ্টিতে সে রকম মনে হলেও তা ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ভাষার সাথে সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবোধ রক্ষারও আন্দোলন। তাই সঙ্গত কারণে ওই আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছে এবং সূক্ষ্মভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালির স্বাধীন সত্তা বা স্বরাজের অংকুরোদগমও ঘটেছে। অর্থাৎ বাঙালির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারে এই সাহসী স্বপ্নের প্রণোদনা যুগিয়েছে বায়ান্নের সফল ভাষা আন্দোলন। ফলে এই আন্দোলনের মাত্র ১৮ বছর পরে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে এমন একটি দলের বিজয় লাভ সম্ভব হয়েছেন যারা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। সে দলের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করল সেই রাষ্ট্রের চার মূল স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্ম নিরপেক্ষতাকেও গ্রহণ করল তারা। শুধু তাই নয় নতুন রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ হলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি।

এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে একটি মুসলিম দেশ থেকে আলদা হলো তা-ই নয়, সে দেশ পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো নব্য স্বাধীন এই দেশের শতকরা ৮৮ ভাগ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত হলো। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মধ্যরাতে শহীদমিনারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো এবং শহীদদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানোও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বিপদের শুরুও সেখান থেকে। কারণ শুরু থেকে বাংলাদেশের একটি বিরুদ্ধ শক্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে আখ্যায়িত করল ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা নামে। আর শহীদমিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকে শিরিক-গুনাহর সাথে তুলনা শুরু করল। তারপরও ৭৫ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গন্তব্য ঠিকই ছিল, কিন্তু ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে ও জেলখানায় তাজউদ্দিনসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা তাদের শাসন-শোষণের পথ মসৃণ করার লক্ষ্যে ক্রমে ক্রমে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানি দিয়েছে, হীনস্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল অনুষ্ঠানের ইসলামীকরণ করেছেন। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করেছেন। একাত্তরে পাকিস্তানিদের সহযোগী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর মতো চরম উগ্র দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন, অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম এবং সাপ্তাহিক ছুটি রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার করে সাধারণ মুসলমানদের ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করা হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীতে ক্বেরাত প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বেতার-টেলিভিশনে আজান প্রচার করে সমাজে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি ৯০ দশকের শেষের দিকে সরকারি ছত্রছায়ায় হিন্দুদের মন্দিরে হামলা চালানোর মতো অপকর্মও করা হয়েছে। এই প্রবণতা ও ধারা ১৯৯৬ পর্যন্ত বজায় ছিল। ওই বছরই অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এলেও এ ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন সাধন তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী লীগ যেহেতু একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল এবং তাদের হাতেই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেহেতু স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে ৭৫-এর পর সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংগঠনগুলোর আক্রমণের শিকারে পরিণত হয় তারা। ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেহেতু ধর্মহীনতা ও নাস্তিকতা বলে প্রচার করা হয়েছে সেহেতু তারা এই অপবাদ (?) ঘোচাতে বেশি বেশি ধর্মচর্চা শুরু করেন।

মসজিদ-মাদ্রাসায় বেশি বেশি অর্থ বরাদ্দ আর হজ করে ইসলামি লেবাজ ধারনের প্রতিযোগিতায় নামেন। এমনকি খেলাফত মজলিশের মতো সংগঠনের সাথেও তারা নির্বাচনী মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নেন। অবশ্য দেশের প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর চাপে পরে তারা সে সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।

সামাজিক কারণসমূহ

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা। সমাজে দুর্নীতি ও অসততাও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতি ঢেকে রাখতে ও নিজেকে ধার্মিক-পরহেজগাররূপে উপস্থাপন করতে ধর্মকে অবলম্বন করে অনেকে। এর সাথে যুক্ত হয় মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী প্রবাসীদের অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতা। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান ইত্যাদি আরব দেশে বসবাসকারীরা নিজ দেশে তাদের স্ত্রী কন্যাদের ওসব দেশের মহিলাদের মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য করে। ফলে এরা বাঙালি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ক্রমে এদের জীবনযাপনও অতি রক্ষণশীলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিবারের পুত্র-কন্যাদের মধ্যে অনেককে মাদ্রাসা শিক্ষায় উৎসাহী করে তোলা হয়। আধুনিক শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষ ছড়ান হয়।

একসময় সমাজে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা হতো। এক সময় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় ছিল যারা বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। খেলাঘর, কচি কাঁচার আসর, চাঁদের হাট, শাপলা কুঁড়ির আসরের মতো শিশুসংগঠন ছিল, যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে সাথে শিশুকে অন্যান্য মানবিক গুণাবলীর শিক্ষা দেওয়া হত। ছেলে-মেয়ে একসাথে বেড়ে ওঠার কারণে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক তৈরি হত। প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মকা-, বিতর্ক, নাটক, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ইত্যাদি পালন করা হত। এখন শিশু-সংগঠনগুলো অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় আর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা হয় না বললেই চলে। যাত্রাপালা, জারি-সারি, কবিগান তথা দেশি ও লোকজ সংস্কৃতিচর্চাও লোপ পেয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। সেসব স্থান দখল করেছে আকাশ সংস্কৃতি,ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা। এখন ছয় বছরের কন্যাসন্তানকেও বোরকায় আবৃত করে ফেলা হচ্ছে!

বাংলাদেশে অনেক ধর্মের লোক বাস করে। অন্যতম প্রধান চারটি ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান,বৌদ্ধ ধর্মের লোক ছাড়াও নানা ধারার প্রকৃতি পুজারী ক্ষুদ্র ধর্মাবলম্বী লোকের বাস বাংলাদেশে। ধর্মীয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে পূর্ণ আমাদের দেশ। বছরজুড়ে লেগে থাকে কোনো না কোনো ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান। এই বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারত আমাদের দেশ। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য রক্ত দিয়েছে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রদায়িক আচরণের কারণে দেশ বিভাগের সময় যেখানে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ শতাংশে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হিন্দুদের দেশত্যাগের ধারা রোধ করা যায়নি। মনে করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবেন। কিন্তু দিন দিন সে আশা গুড়েবালিতে পরিণত হচ্ছে। এখন তো প্রতিটি নির্বাচনের পরে কিছু হিন্দুর দেশত্যাগ নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠছে। আর স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো বিচার না হওয়ায় এ প্রবণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু এর মাধ্যমে দেশ একটি বিপজ্জনক পরিণতির দিকে যাচ্ছে। দেশ সংঘ্যালঘু শূন্য হলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের সাথে সাথে এর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক ধর্মের দেশে পরিণত হলে মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো কট্টর ধর্মীয় দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ।

এবার ফিরে আসি নির্ধারিত বিষয়ে। আগামী প্রজন্মের জন্য অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের করণীয় কী ? বা আমাদের কী কী করতে হবে। এককথায় যদি এর উত্তর দিতে চাই, তা হল, এতক্ষণ দেশে সাম্প্রদায়িকতা উত্থানের যে কারণগুলো তুলে ধরলাম তা প্রতিহত বা দূর করতে হবে। তবেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর বিস্তারিত বললে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রথমে প্রয়োজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য ও সদিচ্ছা। সংবিধান থেকে সাম্প্রদায়িক বিষয়গুলো বাদ দেওয়া, রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ করা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, সমাজে অপসংস্কৃতি দূর করার লক্ষ্যে সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখা,মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা, শিক্ষায় সমতা আনা, পাঠ্যসূচিতে মানবিক বিকাশ ঘটে এমন পরিবর্তন আনা, দুর্নীতি রোধ করা, কোনো ধর্মের প্রতি আলাদাভাবে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব না থাকা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সমাজের সর্বস্তরে মানবিক গুণের বিকাশে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরায় জেগে-ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আমি মনে করি দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে কিংবা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ওই চেতনার কাছেই ফিরে যেতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাটি প্রকৃতই একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। অর্থাৎ জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি কিন্তু সম্প্রদায়গতভাবে আমরা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান। বাঙালি জাতির এই হাজার বছরের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ আবার ফিরিয়ে আনার মধ্যেই নিহিত আছে শান্তি।

তবে জাতীয়তাবোধ নিয়েও বিপত্তি হতে পারে। গত শতকের ৪০ দশকে জার্মানরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি দাবি করে হিটলার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নির্মূল করতে চেয়েছিলেন সিমেটিক ইহুদিদের। ‘সবাইকে বাঙালি হয়ে যেতে হবে’ বলেও একটা ভুল আমরা করে ফেলেছিলাম। পাকিস্তানিরা আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করেছিল আমার তো মনে হয় সেরূপ আচরণ আমরা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে করছি। অথচ আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। সেখানে শুধু ধর্মীয় নয় ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসনও চালাচ্ছি আমরা।

এ রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। এর ব্যত্যয় হলে এর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এ দেশকে একটি উগ্র-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করা হলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা যাবে না।

তাই আগামী প্রজন্মের জন্য তো বটেই বাংলাদেশের জন্যও একে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগর আয়োজিত সেমিনারে পঠিত। (সংক্ষেপিত)

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ