পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩

* বাঁশি বাজে ঐ দূরে, চেনা কি অচেনা সুরে---

দৈনিক আজাদী                                            উপসম্পাদকীয়                                    কাল আজ কাল 
২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১৪ চৈত্র ১৪১৯ সাল ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি 



মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য এখন ‘টপ অব দ্য কান্ট্রি’। গত রোববার বগুড়ার মাটিডালি মোড়ে এক শোক সমাবেশে খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখছিলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীরও দেশের প্রতি কর্তব্য আছে। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। মানুষ খুন করবে আর তারা চেয়ে চেয়ে দেখবে? কাজেই সেনাবাহিনী সময়মতো তাদের দায়িত্ব পালন করবে।” তিনি আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী জাতিসংঘ মিশনে যায় কাজ করে, শান্তি রক্ষার জন্য তারা বিদেশে যায়। যে দেশের সেনাবাহিনী বিদেশে শান্তি রক্ষার জন্য কাজ করে, সে দেশে যদি শান্তি না থাকে তাহলে বিদেশিরা বলবে, তারা কীভাবে শান্তি রক্ষায় কাজ করবে।’
পাঠকরা নিশ্চয়ই ভোলেননি, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল বগুড়ায়। চাঁদে সাইদীকে দেখা গেছে বলে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে জামায়াত-শিবিরকর্মী-সমর্থকরা নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়েছিল বগুড়ায়। ট্রেনের বগি, সরকারি অফিস, আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি, থানাসহ অসংখ্য দোকান, বাড়িঘর ও যানবাহন পুড়িয়ে দিয়েছিল তারা। এমন একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন একটি থানাকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে ঘণ্টা দেড়েক সেনা টহলও দেয়া হয়েছিল সেদিন।
বগুড়া এমনিতেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেদিনের ঘটনায় বিএনপির প্রত্যক্ষ মদতে বগুড়ায় যা ঘটনা হয়েছিল এক কথায় তা বর্বরতার শেষ সীমা। ব্যাপকতা ও নৃশংসতায় নজিরবিহীন। একটি স্বাধীন দেশে কোন রাজনৈতিক দল কোন দাবি (তা স্বাধীনতা বা স্বাধীকারের নয়) আদায়ের লক্ষ্যে এমন নিষ্ঠুর ধ্বংস যজ্ঞ চালাতে পারে তা বগুড়ার দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি, দেশ ও জনগণের জান-মালের প্রতি এতটুকু মমতা থাকলে কোন রাজনৈতিক দল এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে না। সেদিনের নৃশংসতা একাত্তরকেও হার মানিয়েছে।
মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী তাঁর জনসভায় জামায়াত-শিবিরের এমন জঘন্য কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছুই বললেন না, পক্ষান্তরে এই ঘটনার পর থেকেই বিশেষ করে সিঙ্গাপুর থেকে এসে জামায়াতের অরাজক কর্মকাণ্ড দমনে পুলিশের ভূমিকাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। মূলত খালেদা জিয়া বর্তমানের ঘটনাকে গণহত্যা বলে একাত্তরে সংঘটিত বিশ্বের অন্যতম নিষ্ঠুর গণহত্যার ব্যাপকতা ও গুরুত্বকে খাটো করার চেষ্টা করছেন।
ইতিমধ্যেই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিএনপির অবস্থান অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অধিকতর স্পষ্ট। তবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে তিনি যেদিন সেনাবাহিনীকে উস্কানী দিয়ে বক্তব্য রেখে ছিলেন সেদিনের তারিখটি ছিল ২৪ মার্চ। মনে পড়ছে ১৯৮২ সালের এই দিনেই অর্থাৎ ২৪ মার্চ তৎকালীন বিএনপি সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান এইচ.এম এরশাদ। ক্ষমতা দখল করে সেদিনই তিনি সামরিক আইন জারি করেছিলেন। যদিও এরশাদ বহুবার তাঁর বক্তব্যে বলেছেন সেদিন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে বিচারপতি সাত্তার তাঁকে ক্ষমতাগ্রহণে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে খালেদা জিয়া কি আবার সেনা বাহিনীকে ক্ষমতাগ্রহণের এক প্রকার আহবান জানালেন। তার মানে এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে তিনি কি তাকে স্বাগত জানাবেন? তাঁর এ বক্তব্য শোনার পর ৩৮ বছর আগে উচ্চারিত একটি ভাষণের বক্তব্য মনে পড়লো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন গত শতকের মীর জাফর খন্দকার মোশতাক। বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে মোশতাকের বেতার ভাষণ নিয়ে যা লিখেছিলেন তা পাঠকদের সামনে হুবহু তুলে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে তিনি শেখ মুজিবের সমালোচনা করেন এবং সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু প্রতারণামূলক কথা উচ্চারণ করেন। তিনি এই হত্যা আর অভ্যুত্থানকে ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনে’ করা হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সকলেই এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছিল। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন সম্ভব ছিল না বলেই সরকার পরিবর্তনে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। সেনাবাহিনী জনগণের জন্য সুযোগের স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছে।’
বর্তমানে দেশে কী এমন পরিবর্তন চান বেগম খালেদা জিয়া যে তার জন্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে। বলতে হচ্ছে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে রাখা না রাখা নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জিয়ার সম্পৃক্ততা বিএনপি বরাবরই অস্বীকার করে। সেদিন ভোরে অর্থাৎ- ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালে যেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় সেদিনের সকালে জিয়া কী অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা কেমন ছিল সে বিষয়েও অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের উদ্ধৃতি দিতে চাই, ‘রশিদ চলে যাওয়ার পর জেনারেল শফিউল্লাহ আবারও জামিলকে টেলিফোন করলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে জেনারেল তাকে জানান যে, শেখ মুজিব আর ইহজগতে নেই। তাঁকে ওরা খুন করে ফেলেছে। সেনাবাহিনীর প্রধান স্পষ্টতই সাংঘাতিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সে কারণে তিনি জামিলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশটি পর্যন্ত দিতে পারলেন না। সুতরাং ঝটপট তার উর্দি গায়ে জড়িয়ে-জামিল জিয়ার বাসভবনে হেঁটে গিয়ে উপস্থিত হন। জামিল গিয়ে দেখেন জেনারেল জিয়া (তৎকালীন উপসেনা প্রধান) তখন সেভ করছেন। রশিদের কথা আর জেনারেল শফিউল্লাহর টেলিফোনের বর্ণনা দিয়ে জামিল জিয়াকে বললেন, ‘স্যার প্রেসিডেন্টকে খুন করা হয়েছে। এখন আমাদের করণীয় দিক নির্দেশ করুন।’
জেনারেল জিয়াকে অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছিলো। স্পষ্টতই তিনি ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত বলে মনে হচ্ছিল। জিয়া উত্তর করলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যদি বেঁচে না থাকেন, ভাইস প্রেসিডেন্টতো আছে। তোমরা হেড কোয়ার্টারে যাও এবং পরবর্তী নিদের্শের জন্য অপেক্ষা কর।’
প্রিয় পাঠক কিছু কি অনুধাবন করতে পেরেছেন? একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি আবার জাতির জনক নিহত হয়েছেন, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই উপসেনা-প্রধান বেশ খোশমেজাজে দাড়ি কামাচ্ছেন। এই দৃশ্য ও বাস্তবতা কী প্রমাণ করে? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জেনারেল জিয়া সত্যিই কিছু জানতেন না?
আজ ৩৫ বছর পরে এই জেনারেলের স্ত্রীর বক্তব্যের ভাষা বা সুর খুব চেনা চেনা লাগছে- একই সুরইতো বাজিয়েছিলেন মোশতাক ৩৫ বছর আগে সেনা অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার লক্ষ্যে।
অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে এখন নানারকম ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর উত্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভালই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ একটি অদ্ভুত দেশ। সবকিছু বলেই পার পেয়ে যাবেন’।
গত পাঁচ মাসে ৪০০ বাস-ট্রাকে আগুন দেয়া হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ৩০০০ যানবাহন। ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব চৌদ্দ কোটি তেত্রিশ লক্ষ চুয়ান্ন হাজার টাকা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় রেলে নাশকতার সংখ্যা ৯২টি, ক্ষয়ক্ষতি নয় কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পোড়ানো হয়েছে চারটি। এ ছাড়া সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন টাকার অংকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিশ্বের কোন পরাধীন জাতিও বোধহয় স্বাধীনতা বা স্বাধীকারের জন্য এত নৃশংস রাজনৈতিক(?) কর্মসূচি পালন করেনি। এই উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে। এই দেশে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন হয়েছে কিন্তু এভাবে দেশের ও জনগণের সম্পদ নষ্ট করতে দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে জামায়াত-শিবিরের বর্তমান কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তে মহাসড়ক বা রেলপথে যারা অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাবে তাদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া হরতালের সময় যারা ভাঙচুর করবে, গাড়ি পোড়াবে, রেল লাইন উপড়ে ফেলবে শুধু তাদেরই নয়, যারা হরতাল ডেকেছে এবং যারা এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে মদদ দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হবে।
প্রিয় পাঠক, আপনার কী ধারণা। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে? না কি মাসের পর মাস আপনাকে হরতাল পালনে বাধ্য করে আপনার মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে।
গণজাগরণ মঞ্চের অহিংস আন্দোলনও দেখলাম। সরকারের এই সিদ্ধান্তে মনে হলো, ‘যেমনি বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুলের দরকার।’

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৩

* সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং বিপন্ন মানবতা

দৈনিক আজাদী                                   উপসম্পাদকীয়                                       কাল আজ কাল 
২১ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ৭ চৈত্র ১৪১৯ সাল ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি 



সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং বিপন্ন মানবতা
আমার বন্ধুভাগ্য ভাল। আমার বন্ধুর তালিকায় কোন চাঁদাবাজ, অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও সাম্প্রদায়িক এমন কেউ নেই। তেমন একজন বন্ধু, যিনি যতটা হিন্দু তার চেয়ে বেশি একজন পরিপূর্ণ মানুষ, যিনি একটি শহীদ পরিবারের সন্তান, তিনি কয়েকদিন আগে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘দেশের সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা করা হোক। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হোক’। তার কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘কোন না কোন উসিলায় হিন্দুদের নির্যাতন করা কেন? তারা ভোট দেয় বলে তো। এবং স্পষ্ট করে বললে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয় বলে। এখন তাদের যদি ভোট দেয়ার ক্ষমতাই না থাকে। তারা যদি ভোটই না দেয় তাহলে আর নির্যাতনের প্রশ্নটি হয়ত আসবে না’। এর বাইরে আমাকে বেশ ক’জন বলেছেন, বাবা আমরা ভোটও দিতে চাই না নির্যাতনের শিকারও হতে চাই না। তবুও যেন একটু শান্তিতে বাপ-দাদার ভিটায় পূজা অর্চনা করে জীবন কাটাতে পারি।
এই প্রস্তাব হয়ত গৃহীত হবে না। হলে তো আমাদের নেতানেত্রী সমাজপতিদের মুখোশ একেবারে ল্যাংটা হয়ে যাবে। তবে আমার মতে প্রস্তাবটি মন্দ নয়। কারণ এই লেখাটি যখন লিখছি তখনও দেশের কোথাও না কোথাও মন্দির ভাঙা হচ্ছে। হিন্দুরা নিগৃহীত হচ্ছে। দু’তিন দিন আগে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে খালেদ মহিউদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎকার দেখছিলাম দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দায় নিয়ে বললেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশের অভিযান যৌক্তিক ছিল এবং তার অনুমতি বা নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন। আমি গত সপ্তাহের কলামে লিখেছিলাম কোন দলের কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশি অভিযান নজিরবিহীন নয়। এই কাজটি বিএনপিও করেছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে তাদের শাসনামলে। আমি এজন্যে সেদিনের পুলিশি অভিযানকে নজিরবিহীন না বলে খারাপ নজির হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম। তা যাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশি অভিযানের বাহবা নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাঁশখালীতে শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের প্রতিরোধের মুখে এক প্রকার পালিয়ে এসেছে পুলিশ। এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় কী বলবেন? দেশের যেসব অঞ্চলে জামায়াত-শিবির- বিএনপি তাণ্ডব চালিয়েছিল সেসব এলাকায় দু’চার- পাঁচ দশজনের নামের বাইরে হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত আসামি ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে আর মাঝখানে মামলা বাণিজ্য করতে গিয়ে পুলিশ কিছু নিরীহ মানুষকে হয়রানি করছে। এর ফলে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল না হয়ে বিরক্ত হচ্ছে এই দলের প্রতি, অভিশম্পাত দিচ্ছে আওয়ামী লীগের চৌদ্দ গোষ্ঠীকে। এর দ্বারা বিচার ব্যাহত হবে। প্রকৃত দোষীরা টাকা পয়সা বা আত্মীয়তার জোরে পার পেয়ে যাবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। যেমন বিগত ৪২ বছর হয় নি। স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে ’৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পরে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দিন দিন পত্রপল্লবে তার বিস্তৃতি ঘটেছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তার একটিরও সুষ্ঠু বিচার হওয়াতো দূরের কথা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত পর্যন্ত করা হয় নি। এবারও হবে বলে আমি মনে করি না।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের পরপরই দোষীদের নিয়ে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের খেলা চলে দেশে। এই দল বলে ঐ দলের লোকেরা করেছে, ঐ দল বলে এই দল করে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। অথচ যারা নির্যাতিত, যাদের ঘর-মন্দির ভাঙা হয়েছে তাদের কথা কেউ শুনছে না। তারা কাকে দায়ী করছে তার প্রতি কেউ কর্ণপাত করছে না। এবারও যেমন। সাঈদীর রায় ঘোষণার পরপরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জামায়াত- শিবিরের ক্যাডাররা। তারা নির্মমভাবে হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়েছে। মন্দির ভাঙচুর ও তাতে অগ্নি সংযোগ করেছে। থানা আক্রমণ করেছে, পুলিশ হত্যা করেছে। ট্রেন জ্বালিয়েছে। রেল স্টেশন পুড়িয়েছে। বাস-ট্রাক তথা যানবাহন ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দিয়েছে, এক কথায় নারকীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পরপরই জামায়াত-শিবির এবং তাদের সাথে গলা মিলিয়ে বিএনপি এবং তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলছেন এই কাজ করেছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা। অথচ বাঁশখালীর ঘটনার পরপর দলের গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তি দেয়ার ৪৮ ঘন্টায় আল্টিমেটাম দিয়ে জামায়াতের নেতা শামসুল ইসলাম বলেছেন, না হলে বাকলিয়াকে বাঁশখালীর পরিণাম ভোগ করতে হবে। বাঁশখালীর হিন্দুরা বলছে তাদের বাড়িতে কারা কারা আগুন দিয়েছে, জামায়াতের নেতা বাঁশখালীর দায় নিয়ে বলছেন বাকলিয়াকে বাঁশখালীতে পরিণত করা হবে তখনও মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ তাঁর অনুসারীরা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন এই কাজ আওয়ামী লীগের বলে।
আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে বলতে চাই এইসব কাজ জামায়াত-শিবির-বিএনপি-আওয়ামী লীগ যেই করে থাকুক মুসলমানরা করেছে তো! তাহলে প্রশ্ন হলো দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমরা এই কাজ করলো কিভাবে। এবং আস্তিকতার সার্টিফিকেট প্রদানকারী মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী এই বিষয়ে কি বলবেন। বা দেশের আলেম সমাজরা কি জবাব দেবেন। এই দায় তো দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমদের। না কি আবার এও শুনতে হবে এই আগুন ভাঙচুর হিন্দুরা নিজেরা নিজেরা করে মুসলিমদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে।
আমি পুনরাবৃত্তি করে বলছি, যে দলই করুক তা কোন না কোন মুসলিমের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে তো। তাহলে দেশের আলেম-মাশায়েখদের কাছে বিনীতভাবে প্রশ্ন রাখতে চাই এই কাজ একজন মুসলিম করতে পারে কি না? করলে তার সাজা হওয়া উচিৎ কি না? সাজা হওয়া উচিৎ হলে এত বছর কারো সাজা হলো না কেন? শুনেছি পুলিশ বাঁশখালীতে মাত্র ২০ জনের নামে চার্জশীট দিয়েছে। তাহলে এত বড় একটি উপজেলায় মাত্র ২০ জনই এমন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছিল? এরশাদ তাঁর শাসনের শেষ দিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত-ক্ষমতায় এসে নির্মমভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। সে সব ঘটনাতো ধামা চাপা পড়ে গেছে কত আগে। এরপরে বর্তমান সরকারের আমলেই শুধু চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, নন্দির হাট, রামু, পটিয়া ও অনেক স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে তার খবর কি, সে মামলাগুলো এখন কি অবস্থায় আছে তাও তো আমরা জানি না। আমারতো মনে হয় সময়ের সাথে সাথে বর্তমানে সংঘটিত ঘটনাগুলোও তলিয়ে যাবে অন্যকোন ডামাডোলে।
এ দেশের মুসলিমরা যখন অন্যকোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করে তখন কি তারা একটুও ভাবে না অন্যদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলা হলে বা যখন হামলা চলে বা মুসলিমরা নিগৃহিত হয় সে সময়ের পরিস্থিতির কথা। যারা নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে না তারা অন্যদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে মুসলিমদের নিগ্রহের বিরুদ্ধে বলার নৈতিক শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেন। একথা কে কাকে বোঝাবে?
আমার অনেক হিন্দু বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বন্ধু আছেন। যাঁদের সামনে দাঁড়াতে আমি কুক্তিত হই এখন। তাঁদের স্ত্রী-সন্তানের সামনে আমার মাথা হেট হয়ে যায়। আমার সন্তানতুল্য ওদের সামনে আমার নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। যখন আমি ভাবি আমি কিংবা আমার মতই কেউ না কেউ ওদের বিশ্বাসের ঘর, পুজোর ঘর, প্রতিমার ঘর, উপাসনালয় ভেঙেছি, আগুন দিয়েছি এবং কোথাও কোথাও নিষ্পাপ নারীদের শরীরে হাত দিয়েছি।
মানুষ হিসেবে তখন প্রচণ্ড বিপন্ন বোধ করি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০১৩

* জনকল্যাণের রাজনীতি কতদূর?

কামরুল হাসান বাদল

হরতাল একটি গুজরাটি শব্দ। এর কাছাকাছি শব্দ ধর্মঘট, বন্‌ধ ইত্যাদি। মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। হরতাল হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সর্বাত্মক ও সম্মিলিত আন্দোলন। হরতালের সময় সকল কর্মক্ষেত্র, দোকান, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

দুঃখিত আমি পাঠকদের হরতালের সংজ্ঞা দেওয়ার স্পর্ধা করেচি। কারণ হরতাল কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী তা বাংলাদেশের জনগণের চেয়ে বেশি বুঝি আর কেউ জানে না। ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তান গেছে এমনকি বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রও গেছে কিন্তু হরতাল এ জাতির পিছু ছাড়েনি। যে হরতাল একটি সময় জনগণের প্রতিবাদের ভাষা ছিল, অস্ত্র ছিল সে হরতাল আজ জনগণের জন্য অভিশাপ হিসেবে আর্ভিূত হয়েছে। এ দেশের সিংহভাগ জনগণ হরতাল চায় না। কিন্তু তার পরও এখানে হরতাল হয়। জনগণ হরতাল পালন করে না, তারপরও হরতাল আহ্বানকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভবে হরতাল পালনের জন্য জনগণকে ধন্যবাদ দেয়। বিষয়টি কম্বল ছাড়তে চাইলেও কম্বল ছাড়ে না অবস্থা। হরতালের একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ পিকেটিং। একটু আগে বললাম জনগণ সাড়া দিক বা না দিক, জনগণ চায় বা না চায় এ দেশে জনগণকে হরতাল গিলতে হয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালনের জন্য সন্ধ্যায় যে জনগণকে ধন্যবাদ দেয়া হবে সেই জনগণকে হরতাল পালনে সশস্ত্র অবস্থায় বাধ্য করার নাম পিকেটিং।

তবে হরতাল বা পিকেটিংয়ের নামে সম্প্রতি সংঘটিত সহিংসতা অতীতে সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। একাত্তরের-মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও বিচারাধীন জামায়াত নেতাদের বিচার ঠেকানোর নামে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ডকে কোনভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বলার উপায় নেই। পুলিশের ওপর আক্রমণ ও নির্মম হত্যা, জনগণের জানমালের ক্ষতিসাধন, সংখ্যালঘুদের ওপর একাত্তরের মতো নির্যাতন এবং অবাধে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা দেখে জনগণ মনে করে এসব কোন স্বাধীন দেশের নাগরিকের আচরণ হতে পারে না।

আমাদের ধারণা দেশের জনগণ আর হরতালের নামে নৈরাজ্য পছন্দ করছেন না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সম্পূর্ণ অহিংস আন্দোলন দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিকে প্রভাবিত করবে সন্দেহ নেই। হরতালের নামে জ্বালাও-পোড়াও সংস্কৃতিক থেকে দেশের জনগণ বেরিয়ে আসতে চায়। এই বাস্তবতা এখন দেশের সকল রাজনৈতিক দলকেই অনুধাবস করতে হবে। পরাধীন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে। কারণ দেশের লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক আর লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে তৈরি দেশের অর্থনৈতিক ভিত নষ্ট করার অধিকার জনঘন আর রাজনীতিবিদদের দেবে কি-না তা ভাবার সময় এসেছে। তাই বাস্তবতা যত দ্রুত অনুধাবন করবেন রাজনীতিবিদরা ততই দেশের মঙ্গল।

এই চ্যালেঞ্জটা রাজনীতিবিদরা নিতে পারেন। আগামীতে যে কোন দল হরতাল ডাকুক, আর রাজপথ থাকুক পিকেটিং মুক্ত। এরপরে দেখা যাক জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে কি-না। এই চ্যালেঞ্জ রাজনীতিবিদরা নেবেন কি-না জানিনা। কিন্তু জনগণ ভাবছে স্বাধীনতার সুফল কবে তাদের সামনে দৃশ্যমান হবে, কবে রাজনীতিবিদদের হুঁশ আসবে, কবে তারা জ্বালাও পোড়াও বাদ দিয়ে জনগণের জন্য রাজননীতি করবেন? জনকল্যাণের রাজনীতি কতদূর?



লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০১৩

* নজিরবিহীন নয় খারাপ নজির, বিভক্ত নয় বিভ্রান্ত

দৈনিক আজাদী                     উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ৩০ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

ছাত্র শিবিরের এক নেতার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গত ১১ মার্চ ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ ছিলশান্তিপূর্ণ। পুলিশের অবস্থান ছিল বেশ খানিকটা দূরে। ৫টার পরপর প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঠিক এ সময় সমাবেশের বেশ কাছাকাছিতে সাতআটটি ককটেল বিস্ফোরিত হলো আর সাথে সাথে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল সমাবেশ। কেউ কিছু বোঝার আগেকারা কী ফাটালো তা জানার আগে সেই বক্তৃতা থেকে মির্জা ফখরুল ঘোষণা দিলেন আগামীকাল হরতাল। ইতিমধ্যে নয়াপল্টন জুড়ে বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট নেতা-কর্মীদের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালানো হয়েছে। নেতা কর্মীরা খণ্ড খণ্ড ভাবে মিছিল করছেনস্লোগান দিচ্ছেন শুধু হরতাল হরতাল বলে। এ সময় তাদের অনেক কর্মী সমর্থক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের দিকে ইট পাটকেল ছুঁড়ছে। পুলিশ নির্বিকার।
আমি সরাসরি সম্প্রচার দেখছিলাম চ্যানেল বদল করে একাত্তর ও দিগন্ত টেলিভিশনে। এরই ফাঁকে আরো কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হলো ১৮ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের ভীড়ের মধ্যে। তবে বিস্ময়করভাবে তাতে কেউ আহত হয়নি। প্রায় ৩০ মিনিট পুলিশ ছিল নির্বিকার দর্শক। এরপরে শুরু হয় তাদের অ্যাকশন। বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে অভিযান ককটেল উদ্ধার ও কেন্দ্রীয় নেতাসহ অনেককে আটক করা হয়। পুলিশ এ সময় মহাসচিবের কক্ষের দরজাও ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় পুলিশ ফিরে যায় তার পুরোনো চেহারায়।
সেদিন বিকেল ৫.৩৫ এর পরে পুলিশ যা করেছে অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকে নেতাদের গ্রেপ্তার করাসমীচিন হয়নি। বিষয়টি নিন্দনীয় সন্দেহ নেই। এর পরে দেশের সকল মিডিয়ায় রাজনৈতিক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক এই ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টির নিন্দা জানাই। এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ যেন পুলিশ কখনোই গ্রহণ না করে তার দাবি জানাই। তবে এই ঘটনার নিন্দা জানাতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও ১৮ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ বলেছেন এই ঘটনা নজির বিহীন। আমি তাদের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমি সবিনয়ে তাঁদের বলতে চাই এমন ঘটনা নজিরবিহীন নয়।
এর আগে আজ যারা পুলিশের হাতে হেনস্থা হয়েছেন বলে দাবি করছেন তাদের শাসনামলেই পুলিশ বঙ্গবন্ধু এ্যাভেনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের গ্রিল ভেঙ্গে অনেককে গণগ্রেপ্তার করেছিল। ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার গাড়ি আটকে দেয়া হয়েছিল।
জাতির জনকের ছবি দেয়াল থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিলনেতা-কর্মীদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। কাজেই পুলিশের ওই আচরণ নজিরবিহীন বলার সুযোগ নেই। যেহেতু আমরা একটি সভ্য সমাজ ও দেশে বাস করছি তাই এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করি না বলে এই ঘটনাকে নজিরবিহীন না বলে খারাপ নজির হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। ২০০৪ সালের ১ মার্চের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল গত ১১ মার্চ। তবুও বলি এমন ঘটনা এটিই হোক সর্বশেষ।
ভুলে গেলে চলবে না আজকের বিরোধীদল যখন ক্ষমতায় ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের মত ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছিল তারাই। ‘ইটটি দিলে পাটকেলটি খেতে হয়’ পুরোনো বচন হলেও কার্যকারিতা হারায়নি।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকে বিএনপি-জামাত ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী বলে আসছে যেএতে জাতি বিভক্ত হচ্ছে। হায় সেলুকাসকী বিচিত্র এদেশইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা ধর্ষণঅগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের বিচার হবে তাতে না কি জাতি বিভক্ত হবে। জঘন্য অপরাধের সাজা যে বা যারা চায় না তারা এ জাতির কত অংশতবে বিএনপি কেন কথায় কথায় বলে আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই। তারা তা না বলে বললেই পারে ওই বিচার চাই না কারণ তাতে জাতি বিভক্ত হবে। জাতি যদি বিভিক্তই হবে তবে কেন তারা এখনও বলছে ক্ষমতায় গেলে আমরাই যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবো,স্বচ্ছভাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কারণ বিএনপিও জানে জাতি যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়। এবং তাতে জাতি বিভক্ত নয়। তবে বিভ্রান্ত।
এখন প্রশ্ন হতে পারে এ বিভ্রান্তিটা কেন এবং কাদের নিয়ে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি। এদের মধ্যমণি জেনারেল জিয়া যিনি এদেশে রাজাকারদের প্রথম মন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনঃপ্রচলন করেছিলেন। তাঁর আমলেই নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী গোলাম আজম এদেশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং পরে তাঁরা অবাধ রাজনীতি ও পরবর্তীতে খালেদার মন্ত্রীসভায় মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে বিভ্রান্তির শুরুটা জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই। দুর্ভাগ্য হোক আর সৌভাগ্যই হোক জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেনছিলেন সেক্টর কমান্ডারজেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং বহুল আলোচিত বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারীদের অন্যতম একজন। তিনি ও তাঁর দল সুবিধামত মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করেছেন আবার অন্যদিকে ক্ষমতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলিই দেননি তার গোড়ায় চরম কুঠারাঘাত করেছেন। স্বাধীনতার পরপর আওয়ামী লীগযুবলীগ ও ছাত্রলীগের ভুল ত্রুটির কারণে যারা ক্রমে আওয়ামী বিরোধী হয়ে উঠছিলেন তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার দলে যোগ দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে একই দলের রাজনীতি করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছেন।
৭৫ এর পরে যে প্রজন্ম বড় হয়েছে মাঝখানের কয়েকটি বছর ছাড়া তারা একটি ভুল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। এদের ভেতর মুক্তিযুদ্ধজাতির জনক,জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে একটি অর্ধসত্য কখনো মিথ্যা ও বিভ্রান্ত একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। এরা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানশহীদ মিনারজাতীয় স্মৃতিসৌধ ও বই মেলায় কখনো ফ্যাশন হিসেবে যায় কখনো বা যেতে হয় বলে যায়। এসবের চেতনাকে ধারণ করে যায় না। এদের কাছে এসবের চেতনাও পরিষ্কার নয়। এদের কাছে বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস অজানা বা অবহেলিত। এদের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস মানে একজন মেজরের বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এরা বিস্তারিত জানে না কিংবা জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। কারণ তাদের রাজনীতি তাতে সায় দেয় না।
৭০ দশকের শেষের দিকে ইসলামী ছাত্র শিবিরের একটিস্লোগান দেখতাম দেওয়ালে, “পুঁজিবাদ সে তো অভিশাপ সমাজতন্ত্র আত্মার বন্দীশালাহে মানুষ বাঁচতে চাও কি আল কোরআন তোমায় হাতছানী দিয়ে ডাকছে।” সে সময় থেকে তারা দেশের কোমলমতি তরুণদের দলে ভিড়িয়েছে আল কোরআনের কথা বলে। আর দলে ভিড়িয়ে শিক্ষা দিয়েছে সহকর্মী বা সহপাঠীদের হাত পায়ের রগ কীভাবে কাটতে হয়। এই দেশে প্রথম ছাত্রনেতা হত্যা শুরু হয়েছিল বর্তমান ১৮ দলীয় জোট নেতা শফিউল আলম প্রধানের মাধ্যমে আর সারাদেশে প্রতিপক্ষকে হত্যাজখম তথা হাত-পা কাটার রাজনীতি শুরু করেছিল ইসলামী ছাত্র শিবির।
এই দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ধর্মের কথা বলে এমনভাবে মগজ ধোলাই করা হয়েছে যেতারা সহজেই চাঁদের বুকে সাঈদীর চেহারা দেখতে পায়। এরা নির্মমভাবে ধ্বংস ও হত্যার উৎসব করতে পারে নির্দ্বিধায় এই তরুণরা জানেও না তারা কোন উদ্দেশ্যেকার লাভের জন্যে নিজের জীবনসহ অনেকের জীবনকে তুচ্ছ করে তুলছে।
আজ এভাবেই জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। অনর্গল অবিরাম মিথ্যা বলে,অর্ধসত্য বলে জাতিকে অশান্ত করে তোলা হয়েছে। আজ গোয়েবল্‌স বেঁচে থাকলে বিএনপি-জামাত ও তাদের সমর্থকদের এমন নির্জলা মিথ্যা দেখে রাগেদুঃখে হয়ত আত্মহত্যাই করতেন।
এই গোষ্ঠীর আরেকটি মিথ্যা অপপ্রচার দেখে স্তম্ভিত হলাম গত মঙ্গলবার। এ দিন ছিল জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন। চট্টগ্রামস্থ দেশের অনেকস্থানে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এই ঔষধ ভারত থেকে আমদানি করা নিম্নমানের।
তাই এই ঔষধ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে শিশুরা মৃত্যুবরণ করছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে গত মঙ্গলবার মৃত (?) শিশুর সংখ্যা ১০ হাজারের কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা!
এই ঘটনায় পাকিস্তানের তালেবানদের কথা মনে পড়লো। তালেবানরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পোলিও টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি। যার কারণে ঐ এলাকায় শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের সর্বশেষ পাকিস্তানী জঙ্গি ফর্মুলা এটি। যারা শিশুদের নিয়ে এমন মিথ্যা অপপ্রচার চালাতে পারে তাদের হৃদয়ে মানবতার কতটুকু অবশিষ্ট আছে তা ভাবার বিষয় বৈকি।
যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্নে জাতি বিভক্ত নয়। একটি দলের দোদুল্যমানতাএকটি দলের অন্ধ সমর্থন আর জামায়াত-শিবিরের হাজার কোটি টাকায় দেশে বিদেশে সৃষ্ট নির্জলা মিথ্যায় বিভ্রান্ত হচ্ছে দেশের কিছু মানুষ। ওই বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য ধর্ম থেকে শিশু কিছুই বাদ যাচ্ছে না তাদের অস্ত্র হিসেবে। ওরা যে সত্যকে ভয় পায় ওরা যে অহিংসাকে ভয় পায়ওরা যে দেশ প্রেমকে ভয় পায় ওরা যে তরুণদের জাগরণকে ভয় পায় তা স্পষ্ট হল তাদের শাহবাগ চত্বরের প্রজন্মের তারুণ্যের জাগরণকে ভয় পাওয়া দেখে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

* সাম্প্রদায়িকতা এবং রাসূল (সা.) এর একটি হাদিস

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                       কাল আজ কাল
৭ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৩ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল


হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) এর একটি বিখ্যাত হাদিস, ‘যে তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে (নিজেখায়সে আমার উম্মত নহে।’ মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করেন রাসূল (সা.) এর উম্মত হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া সম্ভব নয়বেহেস্তও তাদের জন্যে নয়।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিন মুসলমান হওয়ার একটি শর্ত বেঁধে দিয়েছেন। শর্তটি হচ্ছে প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া। তার সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া এবং তাকে দারিদ্র্যে অভুক্ত রেখে নিজে না খাওয়া। এই হাদিসের দুটো অসাধারণ রূপ আছে। যার মাধ্যমে নবীয়ে করিম (সা.) এর দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি আদর্শের সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়।
একটি হচ্ছে সাম্য। সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন। একেবারে আমাদের দেশীয় স্লোগানের ভাষায় বলতে হয় ‘কেউ খাবে কেউ খাবে নাতা হবে না তা হবে না’।
অর্থাৎ সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যেন তেন প্রকারে অঢেল সম্পদের মালিক হবে আর অন্য শ্রেণির মানুষগুলো অভাব দারিদ্র্যে মানবেতর জীবন পার করবে তা প্রকৃত ইসলামমৌলিক ইসলাম অনুমোদন করে না। সাম্যবাদী এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইসলাম ধর্মে যাকাত ফরজ করা হয়েছে। দান খয়রাতকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এমন নীতিগত কারণে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পক্ষপাত থাকার কথা ছিল সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের সাথে কিন্তু দুঃখজনকভাবে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলো বরাবরই তাবেদারি করেছে সাম্রাজ্যবাদের। এমনকি অধুনা ইসলামের নামে শহীদ হতে রাজি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পর্যন্ত।
এই হাদিসের দ্বিতীয় দিকটি হলো অসাম্প্রদায়িকতা। এই হাদিসটি যখন প্রথম বিবৃত হলো তখন আরবে মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু। অর্থাৎ দুটি মুসলিম পরিবারের আশেপাশে বেশ কিছু অমুসলিমদের বসত। এই পরিস্থিতিতে যখন মুসলিম প্রতিবেশী না বলে শুধু প্রতিবেশী বলা হয় তখন তা ভুল করে বলা হয় নি। সঠিক অর্থেদায়িত্ব নিয়ে বলা হয়েছে যে প্রতিবেশী এখন যাই-ই হোক,মুসলিম বা অন্য কিছু। তাকেও অভুক্ত রাখা যাবে না। আর যে প্রতিবেশীকে অভুক্ত না রাখার শর্ত আছে তার ঘরে আগুন দেয়া,তার উপাসনালয় ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়াতার বাড়ি ও সম্পদ লুট করা এবং সেই প্রতিবেশীর নারীদের সম্ভ্রমহানি করা কতটা মুসলমানিত্বের মধ্যে পড়ে তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
অথচ পরধর্ম সহিষ্ণুতা বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ . . . তোমাদের ধর্ম তোমাদেরআমার ধর্ম আমার’। ১০৯ সূরা কাফিরুন
তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বিশ্বাস করতো। তাহলে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?- ১০ সূরা ইউনুস-৯৯
হে মানুষ। আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছিপরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো’। ৪৯,সূরা হুজুরাত ১৩।
অতএব বাংলাদেশে কেউ যদি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলেঅসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেযার যার ধর্ম পালনের স্বাধীনতার কথা বলেবৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে সে তখন ইসলাম বিরোধী কিছু বলে না। বরঞ্চ ইসলামের মূল স্পিরিটের কথা বলে। মওদুদ বা জামায়াত শিবিরের ইসলাম প্রকৃত ইসলাম নয়। প্রকৃত ইসলামের সাথে এই দল বা এই দলের অনুসারীদের দূরতম সম্পর্কও নেই।
ইসলাম প্রচারের জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কখনো কোন ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন নি। বরং স্বীয় মেধাশ্রম,সততামানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে ধর্ম প্রচার করেছেন। বাধ্য হয়ে যুদ্ধে রত হয়েছিলেন। কিন্তু আজকে জামায়াত শিবির ইসলামের যুদ্ধংদেহী রূপটিকে বেশি প্রচার করে এর মানবীয় সমস্ত গুণাবলীকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে। তাদের আদর্শিক সংগঠন আল কায়েদা বা বিশ্বব্যাপী ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোর মতো। যে ধর্মের প্রচারক ধর্ম প্রচারের জন্যে নিজে কোনদিন কোন ধরনের কুদরতির আশ্রয় নেননিসেই ধর্মের একজন নগণ্য অনুসারি বলে দাবিদারযিনি প্রকৃত মুসলমান কিনা তা নিয়েই আলেমদের মধ্যে সন্দেহ আছে তাঁকে চাঁদে দেখা যাওয়ার মতো মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে যারা মানুষ হত্যার পথ প্রশস্ত করেন তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। তিনি এবং তাঁর অনুসারি দলটি প্রকৃত ইসলামি দল নয় বলেই ইতোমধ্যে অনেক আলেম বুজুর্গরা মতবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা বাস-ট্রাক বা যানবাহনের মতো। আন্দোলনকারীরা যেমন কারণে অকারণে এদেশে গাড়ি ভাঙচুরঅগ্নিসংযোগ করে গাড়িতেতেমনিভাবে ইদানিং যে কোন আন্দোলন বা নির্বাচনী সহিংসতার বলি হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে সামষ্টিক বা বিক্ষিপ্তভাবে এ পর্যন্ত অনেকবার সংখ্যালঘুরা যে কোন অজুহাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে আজ পর্যন্ত এমন হামলাকারী বা এমন দুষ্কৃতকারীদের কারো বিচার হয় নি। এমন কি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে চিহ্নিত পর্যন্ত করা হয় নি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি এমন কোন সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই স্বাধীন দেশেই গত ৪২ বছরে হিন্দুরা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেনির্যাতিত হয়েছে। কখনো রাষ্ট্রীয় মদদেকখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়।
বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংখ্যালঘুদের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই। দেশের কোটি কোটি মুসলিমদের সাথে তারাও হয়ত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার দাবি করেছিল।
বিচার দাবি করাটাও অযৌক্তিক নয়। কারণ তাদের চেয়ে নিগৃহীত আর কারা হয়েছিল বেশি। অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর আন্দোলনকারীদের প্রথম আক্রোশের শিকার হয়েছে সংখ্যালঘুরা। এর দায় জামায়াত শিবির ও তাদের সহযোগী বিএনপির যেমন তেমন ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। কারণ রাষ্ট্র এবারও সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় কিছুটা আওয়ামী লীগকেও নিতে হবে কারণ সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অন্যতম কারণ তারা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। দুর্যোগে সংকটে মিত্রদের পাশে দাঁড়াতে না পারার ব্যর্থতার দায় থেকে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী শক্তিগুলোও মুক্ত নয়।
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে একজন মানুষ হিসেবে শুধু ধর্মের কারণে এক শ্রেণির মানুষকে সংখ্যালঘুুতে বিভাজন করে তাদের নির্যাতনে আমি বিপন্ন বোধ করছি। অপমানিত বোধ করছি। আমার ধারণা যে কোন বিবেকবান মানুষকে এই ঘটনা অপমানিত না করে পারে না।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা পাহাড়সম উচ্চতায় উঠেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ’৭৫-এ তাঁকে হত্যার মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে জামায়াতসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে। সৃষ্টি করা হয়েছে বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার ধারক বৃহত্তর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে হজম করতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে নতুন প্রজন্মের তরুণদের দ্বারা গড়ে উঠা সম্পূর্ণ অহিংস ও ধর্ম নিরপেক্ষ আন্দোলনকেও গলা টিপে হত্যা করতে উদ্যত দেশের সেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং তাদের ‘নৈতিক’ ‘অনৈতিক’ ও সার্বিক সহযোগিতা দানকারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার রাজনৈতিক দলটি।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ