পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩

* বাঁশি বাজে ঐ দূরে, চেনা কি অচেনা সুরে---

দৈনিক আজাদী                                            উপসম্পাদকীয়                                    কাল আজ কাল 
২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১৪ চৈত্র ১৪১৯ সাল ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি 



মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য এখন ‘টপ অব দ্য কান্ট্রি’। গত রোববার বগুড়ার মাটিডালি মোড়ে এক শোক সমাবেশে খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখছিলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীরও দেশের প্রতি কর্তব্য আছে। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। মানুষ খুন করবে আর তারা চেয়ে চেয়ে দেখবে? কাজেই সেনাবাহিনী সময়মতো তাদের দায়িত্ব পালন করবে।” তিনি আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী জাতিসংঘ মিশনে যায় কাজ করে, শান্তি রক্ষার জন্য তারা বিদেশে যায়। যে দেশের সেনাবাহিনী বিদেশে শান্তি রক্ষার জন্য কাজ করে, সে দেশে যদি শান্তি না থাকে তাহলে বিদেশিরা বলবে, তারা কীভাবে শান্তি রক্ষায় কাজ করবে।’
পাঠকরা নিশ্চয়ই ভোলেননি, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল বগুড়ায়। চাঁদে সাইদীকে দেখা গেছে বলে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে জামায়াত-শিবিরকর্মী-সমর্থকরা নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়েছিল বগুড়ায়। ট্রেনের বগি, সরকারি অফিস, আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি, থানাসহ অসংখ্য দোকান, বাড়িঘর ও যানবাহন পুড়িয়ে দিয়েছিল তারা। এমন একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন একটি থানাকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে ঘণ্টা দেড়েক সেনা টহলও দেয়া হয়েছিল সেদিন।
বগুড়া এমনিতেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেদিনের ঘটনায় বিএনপির প্রত্যক্ষ মদতে বগুড়ায় যা ঘটনা হয়েছিল এক কথায় তা বর্বরতার শেষ সীমা। ব্যাপকতা ও নৃশংসতায় নজিরবিহীন। একটি স্বাধীন দেশে কোন রাজনৈতিক দল কোন দাবি (তা স্বাধীনতা বা স্বাধীকারের নয়) আদায়ের লক্ষ্যে এমন নিষ্ঠুর ধ্বংস যজ্ঞ চালাতে পারে তা বগুড়ার দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি, দেশ ও জনগণের জান-মালের প্রতি এতটুকু মমতা থাকলে কোন রাজনৈতিক দল এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে না। সেদিনের নৃশংসতা একাত্তরকেও হার মানিয়েছে।
মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী তাঁর জনসভায় জামায়াত-শিবিরের এমন জঘন্য কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছুই বললেন না, পক্ষান্তরে এই ঘটনার পর থেকেই বিশেষ করে সিঙ্গাপুর থেকে এসে জামায়াতের অরাজক কর্মকাণ্ড দমনে পুলিশের ভূমিকাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। মূলত খালেদা জিয়া বর্তমানের ঘটনাকে গণহত্যা বলে একাত্তরে সংঘটিত বিশ্বের অন্যতম নিষ্ঠুর গণহত্যার ব্যাপকতা ও গুরুত্বকে খাটো করার চেষ্টা করছেন।
ইতিমধ্যেই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিএনপির অবস্থান অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অধিকতর স্পষ্ট। তবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে তিনি যেদিন সেনাবাহিনীকে উস্কানী দিয়ে বক্তব্য রেখে ছিলেন সেদিনের তারিখটি ছিল ২৪ মার্চ। মনে পড়ছে ১৯৮২ সালের এই দিনেই অর্থাৎ ২৪ মার্চ তৎকালীন বিএনপি সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান এইচ.এম এরশাদ। ক্ষমতা দখল করে সেদিনই তিনি সামরিক আইন জারি করেছিলেন। যদিও এরশাদ বহুবার তাঁর বক্তব্যে বলেছেন সেদিন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে বিচারপতি সাত্তার তাঁকে ক্ষমতাগ্রহণে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে খালেদা জিয়া কি আবার সেনা বাহিনীকে ক্ষমতাগ্রহণের এক প্রকার আহবান জানালেন। তার মানে এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে তিনি কি তাকে স্বাগত জানাবেন? তাঁর এ বক্তব্য শোনার পর ৩৮ বছর আগে উচ্চারিত একটি ভাষণের বক্তব্য মনে পড়লো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন গত শতকের মীর জাফর খন্দকার মোশতাক। বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে মোশতাকের বেতার ভাষণ নিয়ে যা লিখেছিলেন তা পাঠকদের সামনে হুবহু তুলে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে তিনি শেখ মুজিবের সমালোচনা করেন এবং সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু প্রতারণামূলক কথা উচ্চারণ করেন। তিনি এই হত্যা আর অভ্যুত্থানকে ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনে’ করা হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সকলেই এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছিল। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন সম্ভব ছিল না বলেই সরকার পরিবর্তনে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল। সেনাবাহিনী জনগণের জন্য সুযোগের স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছে।’
বর্তমানে দেশে কী এমন পরিবর্তন চান বেগম খালেদা জিয়া যে তার জন্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে। বলতে হচ্ছে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে রাখা না রাখা নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জিয়ার সম্পৃক্ততা বিএনপি বরাবরই অস্বীকার করে। সেদিন ভোরে অর্থাৎ- ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালে যেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় সেদিনের সকালে জিয়া কী অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা কেমন ছিল সে বিষয়েও অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের উদ্ধৃতি দিতে চাই, ‘রশিদ চলে যাওয়ার পর জেনারেল শফিউল্লাহ আবারও জামিলকে টেলিফোন করলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে জেনারেল তাকে জানান যে, শেখ মুজিব আর ইহজগতে নেই। তাঁকে ওরা খুন করে ফেলেছে। সেনাবাহিনীর প্রধান স্পষ্টতই সাংঘাতিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সে কারণে তিনি জামিলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশটি পর্যন্ত দিতে পারলেন না। সুতরাং ঝটপট তার উর্দি গায়ে জড়িয়ে-জামিল জিয়ার বাসভবনে হেঁটে গিয়ে উপস্থিত হন। জামিল গিয়ে দেখেন জেনারেল জিয়া (তৎকালীন উপসেনা প্রধান) তখন সেভ করছেন। রশিদের কথা আর জেনারেল শফিউল্লাহর টেলিফোনের বর্ণনা দিয়ে জামিল জিয়াকে বললেন, ‘স্যার প্রেসিডেন্টকে খুন করা হয়েছে। এখন আমাদের করণীয় দিক নির্দেশ করুন।’
জেনারেল জিয়াকে অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছিলো। স্পষ্টতই তিনি ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত বলে মনে হচ্ছিল। জিয়া উত্তর করলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যদি বেঁচে না থাকেন, ভাইস প্রেসিডেন্টতো আছে। তোমরা হেড কোয়ার্টারে যাও এবং পরবর্তী নিদের্শের জন্য অপেক্ষা কর।’
প্রিয় পাঠক কিছু কি অনুধাবন করতে পেরেছেন? একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি আবার জাতির জনক নিহত হয়েছেন, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই উপসেনা-প্রধান বেশ খোশমেজাজে দাড়ি কামাচ্ছেন। এই দৃশ্য ও বাস্তবতা কী প্রমাণ করে? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জেনারেল জিয়া সত্যিই কিছু জানতেন না?
আজ ৩৫ বছর পরে এই জেনারেলের স্ত্রীর বক্তব্যের ভাষা বা সুর খুব চেনা চেনা লাগছে- একই সুরইতো বাজিয়েছিলেন মোশতাক ৩৫ বছর আগে সেনা অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার লক্ষ্যে।
অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে এখন নানারকম ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর উত্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভালই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ একটি অদ্ভুত দেশ। সবকিছু বলেই পার পেয়ে যাবেন’।
গত পাঁচ মাসে ৪০০ বাস-ট্রাকে আগুন দেয়া হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ৩০০০ যানবাহন। ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব চৌদ্দ কোটি তেত্রিশ লক্ষ চুয়ান্ন হাজার টাকা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় রেলে নাশকতার সংখ্যা ৯২টি, ক্ষয়ক্ষতি নয় কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পোড়ানো হয়েছে চারটি। এ ছাড়া সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন টাকার অংকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বিশ্বের কোন পরাধীন জাতিও বোধহয় স্বাধীনতা বা স্বাধীকারের জন্য এত নৃশংস রাজনৈতিক(?) কর্মসূচি পালন করেনি। এই উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে। এই দেশে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন হয়েছে কিন্তু এভাবে দেশের ও জনগণের সম্পদ নষ্ট করতে দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে জামায়াত-শিবিরের বর্তমান কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তে মহাসড়ক বা রেলপথে যারা অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাবে তাদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া হরতালের সময় যারা ভাঙচুর করবে, গাড়ি পোড়াবে, রেল লাইন উপড়ে ফেলবে শুধু তাদেরই নয়, যারা হরতাল ডেকেছে এবং যারা এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে মদদ দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হবে।
প্রিয় পাঠক, আপনার কী ধারণা। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে? না কি মাসের পর মাস আপনাকে হরতাল পালনে বাধ্য করে আপনার মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে।
গণজাগরণ মঞ্চের অহিংস আন্দোলনও দেখলাম। সরকারের এই সিদ্ধান্তে মনে হলো, ‘যেমনি বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুলের দরকার।’

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ