পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০১৩

* নজিরবিহীন নয় খারাপ নজির, বিভক্ত নয় বিভ্রান্ত

দৈনিক আজাদী                     উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ৩০ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

ছাত্র শিবিরের এক নেতার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গত ১১ মার্চ ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ ছিলশান্তিপূর্ণ। পুলিশের অবস্থান ছিল বেশ খানিকটা দূরে। ৫টার পরপর প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঠিক এ সময় সমাবেশের বেশ কাছাকাছিতে সাতআটটি ককটেল বিস্ফোরিত হলো আর সাথে সাথে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল সমাবেশ। কেউ কিছু বোঝার আগেকারা কী ফাটালো তা জানার আগে সেই বক্তৃতা থেকে মির্জা ফখরুল ঘোষণা দিলেন আগামীকাল হরতাল। ইতিমধ্যে নয়াপল্টন জুড়ে বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট নেতা-কর্মীদের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালানো হয়েছে। নেতা কর্মীরা খণ্ড খণ্ড ভাবে মিছিল করছেনস্লোগান দিচ্ছেন শুধু হরতাল হরতাল বলে। এ সময় তাদের অনেক কর্মী সমর্থক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের দিকে ইট পাটকেল ছুঁড়ছে। পুলিশ নির্বিকার।
আমি সরাসরি সম্প্রচার দেখছিলাম চ্যানেল বদল করে একাত্তর ও দিগন্ত টেলিভিশনে। এরই ফাঁকে আরো কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হলো ১৮ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের ভীড়ের মধ্যে। তবে বিস্ময়করভাবে তাতে কেউ আহত হয়নি। প্রায় ৩০ মিনিট পুলিশ ছিল নির্বিকার দর্শক। এরপরে শুরু হয় তাদের অ্যাকশন। বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে অভিযান ককটেল উদ্ধার ও কেন্দ্রীয় নেতাসহ অনেককে আটক করা হয়। পুলিশ এ সময় মহাসচিবের কক্ষের দরজাও ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় পুলিশ ফিরে যায় তার পুরোনো চেহারায়।
সেদিন বিকেল ৫.৩৫ এর পরে পুলিশ যা করেছে অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকে নেতাদের গ্রেপ্তার করাসমীচিন হয়নি। বিষয়টি নিন্দনীয় সন্দেহ নেই। এর পরে দেশের সকল মিডিয়ায় রাজনৈতিক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক এই ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টির নিন্দা জানাই। এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পদক্ষেপ যেন পুলিশ কখনোই গ্রহণ না করে তার দাবি জানাই। তবে এই ঘটনার নিন্দা জানাতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও ১৮ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ বলেছেন এই ঘটনা নজির বিহীন। আমি তাদের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমি সবিনয়ে তাঁদের বলতে চাই এমন ঘটনা নজিরবিহীন নয়।
এর আগে আজ যারা পুলিশের হাতে হেনস্থা হয়েছেন বলে দাবি করছেন তাদের শাসনামলেই পুলিশ বঙ্গবন্ধু এ্যাভেনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের গ্রিল ভেঙ্গে অনেককে গণগ্রেপ্তার করেছিল। ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার গাড়ি আটকে দেয়া হয়েছিল।
জাতির জনকের ছবি দেয়াল থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিলনেতা-কর্মীদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। কাজেই পুলিশের ওই আচরণ নজিরবিহীন বলার সুযোগ নেই। যেহেতু আমরা একটি সভ্য সমাজ ও দেশে বাস করছি তাই এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করি না বলে এই ঘটনাকে নজিরবিহীন না বলে খারাপ নজির হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। ২০০৪ সালের ১ মার্চের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল গত ১১ মার্চ। তবুও বলি এমন ঘটনা এটিই হোক সর্বশেষ।
ভুলে গেলে চলবে না আজকের বিরোধীদল যখন ক্ষমতায় ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের মত ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছিল তারাই। ‘ইটটি দিলে পাটকেলটি খেতে হয়’ পুরোনো বচন হলেও কার্যকারিতা হারায়নি।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকে বিএনপি-জামাত ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী বলে আসছে যেএতে জাতি বিভক্ত হচ্ছে। হায় সেলুকাসকী বিচিত্র এদেশইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা ধর্ষণঅগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের বিচার হবে তাতে না কি জাতি বিভক্ত হবে। জঘন্য অপরাধের সাজা যে বা যারা চায় না তারা এ জাতির কত অংশতবে বিএনপি কেন কথায় কথায় বলে আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই। তারা তা না বলে বললেই পারে ওই বিচার চাই না কারণ তাতে জাতি বিভক্ত হবে। জাতি যদি বিভিক্তই হবে তবে কেন তারা এখনও বলছে ক্ষমতায় গেলে আমরাই যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবো,স্বচ্ছভাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কারণ বিএনপিও জানে জাতি যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়। এবং তাতে জাতি বিভক্ত নয়। তবে বিভ্রান্ত।
এখন প্রশ্ন হতে পারে এ বিভ্রান্তিটা কেন এবং কাদের নিয়ে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি। এদের মধ্যমণি জেনারেল জিয়া যিনি এদেশে রাজাকারদের প্রথম মন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনঃপ্রচলন করেছিলেন। তাঁর আমলেই নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী গোলাম আজম এদেশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং পরে তাঁরা অবাধ রাজনীতি ও পরবর্তীতে খালেদার মন্ত্রীসভায় মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে বিভ্রান্তির শুরুটা জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই। দুর্ভাগ্য হোক আর সৌভাগ্যই হোক জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেনছিলেন সেক্টর কমান্ডারজেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং বহুল আলোচিত বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারীদের অন্যতম একজন। তিনি ও তাঁর দল সুবিধামত মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করেছেন আবার অন্যদিকে ক্ষমতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে জলাঞ্জলিই দেননি তার গোড়ায় চরম কুঠারাঘাত করেছেন। স্বাধীনতার পরপর আওয়ামী লীগযুবলীগ ও ছাত্রলীগের ভুল ত্রুটির কারণে যারা ক্রমে আওয়ামী বিরোধী হয়ে উঠছিলেন তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার দলে যোগ দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে একই দলের রাজনীতি করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছেন।
৭৫ এর পরে যে প্রজন্ম বড় হয়েছে মাঝখানের কয়েকটি বছর ছাড়া তারা একটি ভুল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। এদের ভেতর মুক্তিযুদ্ধজাতির জনক,জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে একটি অর্ধসত্য কখনো মিথ্যা ও বিভ্রান্ত একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। এরা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানশহীদ মিনারজাতীয় স্মৃতিসৌধ ও বই মেলায় কখনো ফ্যাশন হিসেবে যায় কখনো বা যেতে হয় বলে যায়। এসবের চেতনাকে ধারণ করে যায় না। এদের কাছে এসবের চেতনাও পরিষ্কার নয়। এদের কাছে বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস অজানা বা অবহেলিত। এদের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস মানে একজন মেজরের বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এরা বিস্তারিত জানে না কিংবা জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। কারণ তাদের রাজনীতি তাতে সায় দেয় না।
৭০ দশকের শেষের দিকে ইসলামী ছাত্র শিবিরের একটিস্লোগান দেখতাম দেওয়ালে, “পুঁজিবাদ সে তো অভিশাপ সমাজতন্ত্র আত্মার বন্দীশালাহে মানুষ বাঁচতে চাও কি আল কোরআন তোমায় হাতছানী দিয়ে ডাকছে।” সে সময় থেকে তারা দেশের কোমলমতি তরুণদের দলে ভিড়িয়েছে আল কোরআনের কথা বলে। আর দলে ভিড়িয়ে শিক্ষা দিয়েছে সহকর্মী বা সহপাঠীদের হাত পায়ের রগ কীভাবে কাটতে হয়। এই দেশে প্রথম ছাত্রনেতা হত্যা শুরু হয়েছিল বর্তমান ১৮ দলীয় জোট নেতা শফিউল আলম প্রধানের মাধ্যমে আর সারাদেশে প্রতিপক্ষকে হত্যাজখম তথা হাত-পা কাটার রাজনীতি শুরু করেছিল ইসলামী ছাত্র শিবির।
এই দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ধর্মের কথা বলে এমনভাবে মগজ ধোলাই করা হয়েছে যেতারা সহজেই চাঁদের বুকে সাঈদীর চেহারা দেখতে পায়। এরা নির্মমভাবে ধ্বংস ও হত্যার উৎসব করতে পারে নির্দ্বিধায় এই তরুণরা জানেও না তারা কোন উদ্দেশ্যেকার লাভের জন্যে নিজের জীবনসহ অনেকের জীবনকে তুচ্ছ করে তুলছে।
আজ এভাবেই জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। অনর্গল অবিরাম মিথ্যা বলে,অর্ধসত্য বলে জাতিকে অশান্ত করে তোলা হয়েছে। আজ গোয়েবল্‌স বেঁচে থাকলে বিএনপি-জামাত ও তাদের সমর্থকদের এমন নির্জলা মিথ্যা দেখে রাগেদুঃখে হয়ত আত্মহত্যাই করতেন।
এই গোষ্ঠীর আরেকটি মিথ্যা অপপ্রচার দেখে স্তম্ভিত হলাম গত মঙ্গলবার। এ দিন ছিল জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন। চট্টগ্রামস্থ দেশের অনেকস্থানে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এই ঔষধ ভারত থেকে আমদানি করা নিম্নমানের।
তাই এই ঔষধ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে শিশুরা মৃত্যুবরণ করছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে গত মঙ্গলবার মৃত (?) শিশুর সংখ্যা ১০ হাজারের কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা!
এই ঘটনায় পাকিস্তানের তালেবানদের কথা মনে পড়লো। তালেবানরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পোলিও টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি। যার কারণে ঐ এলাকায় শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের সর্বশেষ পাকিস্তানী জঙ্গি ফর্মুলা এটি। যারা শিশুদের নিয়ে এমন মিথ্যা অপপ্রচার চালাতে পারে তাদের হৃদয়ে মানবতার কতটুকু অবশিষ্ট আছে তা ভাবার বিষয় বৈকি।
যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্নে জাতি বিভক্ত নয়। একটি দলের দোদুল্যমানতাএকটি দলের অন্ধ সমর্থন আর জামায়াত-শিবিরের হাজার কোটি টাকায় দেশে বিদেশে সৃষ্ট নির্জলা মিথ্যায় বিভ্রান্ত হচ্ছে দেশের কিছু মানুষ। ওই বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য ধর্ম থেকে শিশু কিছুই বাদ যাচ্ছে না তাদের অস্ত্র হিসেবে। ওরা যে সত্যকে ভয় পায় ওরা যে অহিংসাকে ভয় পায়ওরা যে দেশ প্রেমকে ভয় পায় ওরা যে তরুণদের জাগরণকে ভয় পায় তা স্পষ্ট হল তাদের শাহবাগ চত্বরের প্রজন্মের তারুণ্যের জাগরণকে ভয় পাওয়া দেখে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ