পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৪

'ক্ষমতার উত্তাপ ও সিদ্দিকীর বাতচিৎ'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ১৭ আশ্বিন ১৪২১ সাল ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল 
অমার্জিত, অশালীন ও বেহুদা কথাবার্তা বলা ক্ষমতাসীনদের একটি ক্রনিক রোগে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কথা বলছি না শুধু; প্রায় প্রতিটি সরকারের এমন কিছু মন্ত্রী-এমপি থাকেন যারা বেফাঁস ও বেহুদা কথাবার্তা বলে নিজের সাথে দলও সরকারের বারটা বাজিয়ে থাকেন। অবশ্য এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয় পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তানেরও একই অবস্থা। ভারতের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীতো ধর্ষণের সাথে শিল্পের তুলনা করে রীতিমত হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। এবং ধর্ষণের জন্যে নারীদের দায়ী করেও বক্তব্য দিয়েছিলেন।

তবে বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি প্রবলভাবে বিদ্যমান। আমরা প্রায়ই মন্ত্রী এমপিদের বিতর্কিত কাজ ও কথাবার্তার সংবাদ পাই। শুধু মন্ত্রী-এমপি নন অন্যান্য জনপ্রতিনিধি যেমন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, কাউন্সিলররাও এমন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন না। শুধু জনপ্রতিনিধি নন ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ বলে অভিহিত সরকারি কর্মকর্তাদের বেলায়তো আছেই এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যাদের কাছে জনগণ যায় বিচারের প্রত্যাশায় তাদের বেলায়তো পরিস্থিতি মারাত্মক।

এ সমস্যাটি তৈরি হয় একটি মানসিক স্তর থেকে, আর ওই মানসিক স্তরটি তৈরি হয় ক্ষমতার প্রতাপ বা উত্তাপ থেকে। আর যে সমাজ বা রাষ্ট্রে একজন ক্ষমতাবানের কোনো জবাবদিহি থাকে না, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তেমন সমাজ বা রাষ্ট্রে এ প্রবণতা বেশি। ক্ষমতার উত্তাপ অনেককে দুর্বিনীত, উদ্ধত ও অমার্জিত করে তোলে। এ উত্তাপ সহ্য করা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করার সুযোগ সংবরণ করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এতসব বেহুদা পেঁচাল বয়ান করতে হলো বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর কিছু মন্তব্য নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় রবিবার বিকেলে আমেরিকা প্রবাসী টাঙ্গাইলবাসীদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মন্ত্রী সাহেব এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা নিয়ে সারাদেশেতো বটে, দেশের বাইরে বাঙালি কমিউনিটিগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হাজার হাজার পোস্ট ও কমেন্ট করা হচ্ছে। লতিফ সিদ্দিকী কী বলেছেন তা আর তুলে ধরার প্রয়োজন হচ্ছে না, কারণ গণমাধ্যমের কল্যাণে ইতিমধ্যে পাঠকরা তা জেনে গেছেন।

তার এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। ক্ষমতার উত্তাপজনিত ভাইরাসে তিনি আক্রান্ত হয়েছে বেশ আগে। গত সরকারের আমলে পাটমন্ত্রী থাকাকালে তিনি একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিয়ে বেশ আপত্তিজনক মন্তব্য করেছিলেন। সে অনুষ্ঠানে মুহিত সাহেব প্রধান অতিথি, তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাকে বিশেষ অতিথি করার ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে মুহিত সাহেবকেও তিনি আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তার প্রায় অর্ধশতাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য আছে তা আজকের আলোচনার বিষয় নয়। শুধু নিউইয়র্কের বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত রাখব আজ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তাই আমি মনে করি একজন মানুষের যেমন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা আছে ঠিক তেমনি ধর্ম পালন না করারও স্বাধীনতা আছে। একজন অপরজনের ওপর যেমন জোর করে তার ধর্ম বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারেন না তেমনি কেউ অন্যের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর আঘাতও করতে পারেন না, অপমান করতে পারেন না। এটি একজন সভ্য, ভব্য ও আধুনিক মনস্ক মানুষের জীবনবোধ, আচরণ। যার যা ইচ্ছা তা বলা বাক স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করি না। আর এ ক্ষেত্রে বক্তা যদি হন বিশিষ্ট কেউ, তাহলে তাকে আরও সতর্ক থাকতে হবে মন্তব্য করার সময়ে। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রী থাকা অবস্থায় যা করেন, বলেন- তার দায়-যে সরকার বা তার দলকেও বহন করতে হবে-এ সাধারণ জ্ঞানটুকু লতিফ সাহেবের নেই তা- কষ্ট কল্পনা। নিউ ইয়র্কের সে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বিনা কারণে হজ ও বিশ্ব এজতেমা নিয়ে বিষোদগার করেছেন। বিষোদগারই শুধু নয় হজ সম্পর্কে ভুল ও বানোয়াট তথ্য দিয়েছেন। এবং একজন ধর্ম প্রচারক লতিফ সাহেব নিজেই যাঁর ধর্মের অনুসারী এবং মুসলমানদের কাছে আল্লাহর পরে যাঁর স্থান তাঁর নামটিও ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে উচ্চারণ করেছেন। কাণ্ডজ্ঞানহীন লতিফ সাহেব ভুলে গিয়েছিলেন বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মানুষ সে ধর্মের অনুসারী। তাদের কাছে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর স্থান অত্যন্ত পবিত্রতম উচ্চতায়। কয়েক বছর আগে লতিফ সাহেব একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলেছেন। এর সুবাদে হয়ত কিছু লেখক-বুদ্ধিজীবীর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাতেই বোধহয় তিনি নিজেকে একজন বোদ্ধা ভাবতে শুরু করেছেন। তাঁর যে জ্ঞান সীমিত তার প্রমাণ হচ্ছে হজ সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্যি নয়। প্রকৃত তথ্যটি তিনি জানেন না। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে জ্ঞান দিতে গেলে যা হয়।

হজ মূলত প্রাক ইসলামী একটি আচার। বলা যেতে পারে এটি ইসলাম ধর্ম ‘অ্যাডপ্ট’ করেছে। হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ইসলাম প্রচারের আগেও এ কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে হজ বা হজের মতোই একটি মেলা বা অনুষ্ঠান হতো। আরবের অনেক স্থান থেকে মানুষ একটি নির্দিষ্ট দিনে এখানে জড়ো হতো। ইসলাম ধর্ম মতে প্রথম হযরত ইব্রাহিম (আ.) হজের কথা বলেন এবং প্রচলন করেন সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে। হজের সময় সাফা-মারওয়া দু’পাহাড়ের মধ্যে যে হাজিদের হাঁটতে হয় তা ইব্রাহিম (আ.) এর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও তাঁর সন্তান ইসমাইল (আ.) কে সম্মান ও স্মরণ করে। কারণ হজের সময় হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে মক্কার একটু দূরে রেখে এসেছিলেন, আর এ সময় নিরুপায় বিবি হাজেরা সাহায্যের আশায় এ দুটি পাহাড়ের মধ্যে ছোটাছুটি করেছিলেন। হাজিরা যে আরাফাতের ময়দানে যান তার কারণ হলো পৃথিবীতে পাঠানোর পর আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) এই আরাফাতের ময়দানে মিলিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে প্রাক ইসলামী যুগের যে বিষয়গুলো কে ধারণ ও গ্রহণ করে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে হজ অন্যতম। হজ মুসলমানদের পাঁচ ফরজের একটি। কাজেই লতিফ সাহেবের কথা মতো ‘আবদুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ (তার ভাষায়) ভাইব্বা দেখলেন এই আরবরা চলব কেমনে তাই তিনি হজ চালু করেন যাতে বিদেশিরা সেইখানে যায় আর আরবিগো ইনকামের রাস্তা হয় (হুবহু নয়) সত্য নয়। এ তথ্য তার অজ্ঞান প্রসূত।

সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েও তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। একজন সিনিয়র মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কি তিনি জানেন না যে, জয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কি প্রধানমন্ত্রী নিয়োজিত উপদেষ্টাকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে চান? তিনি, অর্থাৎ লতিফ সাহেব এমন একটি সময়ে এ ধরনের মন্তব্য করলেন যখন প্রধানমন্ত্রী আমেরিকায় তাঁর এবং তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন এবং যেখানে তিনি একজন দক্ষ রাজনীতিক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কর্ম তৎপরতা চালাচ্ছিলেন এবং এ বিষয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মি. নরেন্দ্র মোদির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নেতাদের প্রশংসাও অর্জন করছিলেন। শেখ হাসিনা যে একজন দক্ষ রাজনীতিক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক তা ইতিমধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত ও স্বীকার্ষ। পরস্পর বিরোধী শক্তি চীন-জাপান-ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করে ইতিমধ্যেই তিনি যে কূটনৈতিক সফলতার পরিচয় দিয়েছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমরা সন্দেহ পোষণ করি শেখ হাসিনার সকল প্রচেষ্টাই ব্যাহত হবে যদি না তিনি তাঁর সরকারের বাকচটুল, ধূর্ত, অসৎ ও বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় নেতাদের চিহ্নিত না করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন।

একই অনুষ্ঠানে লতিফ সাহেব সাংবাদিক ও টেলিভিশনের টক শোতে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ঢালাও ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন যা অত্যন্ত গর্হিত, নিন্দনীয় ও আপত্তিকর। মন্ত্রী মহোদয় ভুলে যান কেন যে, টক শোতে শুধু সরকার বিরোধীরা যায় না, সরকারের সমর্থকরাও গিয়ে থাকেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকার সূত্রে শুধু যে বঙ্গবন্ধুর দলের হাল ধরেছেন তা-ই নয়, উত্তরাধীকার সূত্রে খন্দকার লতিফ সিদ্দিকীদেরও পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আশ্চর্যতম উচ্চতায়। তাই তিনি তাঁর দলের চাটুকারদের ব্যাপারে নির্দ্ধিদায় বলতে পারতেন, ‘মানুষ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ ‘চাটার দল সব চেটেপুটে খেয়ে ফেলছে’ ইত্যাদি। আওয়ামী লীগে এমন ব্যক্তির কমতি নেই। যারা নিজেরাই দলকে ডুবিয়ে দিতে যথেষ্ট। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে দেখেছি এই দলটির ক্ষতি সাধনের জন্যে অন্য দলের প্রয়োজন হয়নি, নিজেরাই যা করার করে দিয়েছে। কাজেই শেখ হাসিনার উচিত হবে এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। যে ব্যক্তি প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করেছেন। গত পাঁচ ও বর্তমান পৌনে এক বছর মন্ত্রী থাকাকালীন অন্তত অর্ধ শতাধিক অনিয়ম করেছেন, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু লতিফ সিদ্দিকী নন, তাঁর মতো বা সমাজ কল্যাণমন্ত্রী মহসীন আলীদের মতো ক্ষমতার উত্তাপজনিত রোগে আক্রান্তদের শুধু সতর্ক নয়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

বাধ্য হয়ে পুনরুল্লেখ করতে চাই যে, শুধু এবং শুধুমাত্র সুশাসনই শেখ হাসিনার বর্তমান শাসনকালকে পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

' ১৯৭১ ভেতরে বাইরে- একটি ব্যবচ্ছেদ' - ২য় পর্ব

দৈনিক আজাদী                                উপসম্পাদকীয়                                   কাল আজ কাল
১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ৩ আশ্বিন ১৪২১ সাল ২২ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
জনাব এ. কে. খন্দকার তাঁর বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) গ্রেপ্তারের কথা জানতে পেরে আমার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় যে, বঙ্গবন্ধু কেন এই রকমের ভুল করলেন, যা তিনি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে এই কথাটি আমাকে খুব পীড়া দিত যে, এই ভুল না হলে মুক্তিযুদ্ধে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। হয়ত অনেক মানুষকে জীবন দিতে হতো না বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতো না। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন অথচ গ্রেপ্তারের আগে কোনো আদেশ নির্দেশ বা উপদেশ দেন নি এবং পরিষ্কারভাবে আমাদের ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে কিছু বলেন নি। তাঁর আদেশ বা নির্দেশের অভাবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আমি মনে করি, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং গোপনে থেকে তিনি যুদ্ধে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। জাতির জনকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে খন্দকার সাহেব চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন বলে অন্তত আমার কাছে মনে হয়। কারণ তাঁর বইয়ের বিশাল একটি অঙ্গ জুড়ে তিনি বার বার এই একটি ব্যাপারকেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করার চেষ্টা করেছেন যে, রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতা- পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর কারণে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বারবার রাজনীতিবিদদের খাটো করার অপচেষ্টা করেছেন। তিনি অনেক স্থানে উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। অথচ তিনিই মুজিব বাহিনীর বিষয়ে লিখতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বা কোনো মাধ্যম দিয়ে আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর একটা যোগাযোগ হয়েছিল বলে মনে হয়। এ কথাটি এজন্য বলছি যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হওয়া ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগেই মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেতে শুরু করে। জুলাই মাস থেকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ শেষে সীমান্ত এলাকায় বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। এই খন্দকার সাহেবই তার বইয়ের ৫২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, অসহযোগ আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতারা মোটামুটি সফল হয়েছিলেন বটে কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় দূরদৃষ্টি দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। যার জন্য আমাদের অনেক উচ্চমূল্য দিতে হয়েছিল।’ কী বৈপরীত্য!

নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে খন্দকার সাহেব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি এই বই লিখতে গিয়ে বার বার ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি একটি জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছিল রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বেই। রাজনৈতিক নেতাদের কৃপা, সুপারিশ ও আগ্রহ না থাকলে, তিনি ভারতে প্রবেশ করাতো দূরের কথা মুক্তিযুদ্ধেই অংশ নিতে পারতেন না। কারণ ভারত জেনারেল ওসমানি, খন্দকার, জিয়া, খালেদ মোশাররফ, তাহেরদের মতো সামরিক বাহিনীর লোকদের বিশ্বাস করেছে, আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার বিষয়টি মেনে নিয়েছে তৎকালীন প্রবাসী সরকারের অনুমোদনে যে সরকার ছিল বেসামরিক ও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। আমি ভীষণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি সমগ্র বই জুড়ে তিনি সামরিক বেসামরিক প্রায় সকলের সমালোচনা করেছেন একমাত্র নিজেরও মরহুম তাজউদ্দিন সাহেব ছাড়া। এমনকি খন্দকার সাহেব যুদ্ধকালীন জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা নিয়ে যেভাবে লিখেছেন তাতে যে কারও মনে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানি ছিলেন অকর্মণ্য, অযোগ্য। পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে খন্দকার সাহেবের একক যোগ্যতা ও প্রচেষ্টায়।

যে ব্যক্তিটি জনগণের মুক্তির জন্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো জেলে কাটিয়েছেন, একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভেঙে, যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেই লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান োগানে সোচ্চার ছিলেন, একটি উদার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। যিনি প্রথম একটি মুসলিম প্রধান দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছিলেন যিনি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যিনি একটি ভাষা ও জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খন্দকার সাহেব তাঁকেই,তাঁর নেতৃত্বকেই বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে। নইলে কেন তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করবেন। ৭ মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দুটোই ঐতিহাসিক ও সংবিধান এমনকি বিশ্ব স্বীকৃত বিষয়। তিনি কেন ও কোন উদ্দেশ্যে এই দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি এমন সময়ে এই কুবিতর্ক উসকে দিলেন যখন তারেক জিয়া লন্ডনে অবস্থান করে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত ও মৌলিক বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই বই লেখা এবং তা এই সময়ে প্রকাশ কি শুধু কাকতালীয় বিষয় না কি এতে কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে। সে উদ্দেশ্যটি কী?

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সুশীল শ্রেণি ও সামরিক বাহিনীর একটি অংশ রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। অনেকে নিজের পত্রিকায় তা নিয়ে স্বনামে কলামও লিখেছিলেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আমার ধারণা ওই শক্তি বা গোষ্ঠীটিই এবার মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের অবদানকে মাইনাস করার নতুন আরেকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন এবং তার অংশ হিসেবেই ওই বইয়ের পরতে পরতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার ও রাজনীতিকগণের ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

খন্দকার সাহেব লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু পালিয়ে যেতেন-’ স্বাধীনতার পরে দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদানকালে বঙ্গবন্ধু সে রাতে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বহুবার বলেছেন তিনি যদি পালিয়ে যেতেন তাহলে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তারের অজুহাতে অসংখ্য জায়গায় গণহত্যা চালাত এবং বঙ্গবন্ধুকে পেলে তাঁকে হত্যা করে ‘পালিয়ে যাওয়ার সময়ে ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে প্রচার করার সুযোগ পেত। আমি মনে করি সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু পালাতেন তবে তা-ই ঘটতো এবং শুধু তাই নয় এই খন্দকার সাহেবদের মতোই অনেকে বলতেন যে, জাতিকে নিরস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তানিদের মুখে ফেলে রেখে তিনি ভীতু কাপুরুষের মতো পালিয়েছেন। তাঁরাই বলত মাত্র এক কোটি মানুষইতো ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বাকি সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে তিনি ভারতে আশ্রয় নিলেন কী করে। পালানোর মতো নেতা যে বঙ্গবন্ধু নন তার একটি প্রমাণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরছিণ্ড ১৯৩৮ সালে গোপালগঞ্জ শহরে হিন্দু মুসলিম দাঙা হয়েছিল। দু’পক্ষেই বেশ হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে থানায় মামলা হলে পুলিশ তখন অনেককে গ্রেপ্তার করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন যা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে- সকাল নটায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেপ্তার করে ফেলেছে আমাদের বাড়িতে কি করে আসবে থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল। প্রায় দশটার সময় টাউন হল মাঠের ভিতরে দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হল আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই, মাদারিপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো, সে আমাকে বলে, মিয়া ভাই পাশের বাসায় একটু সরে যাও না’। বললাম, যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। এই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। আর ২৫ মার্চের বঙ্গবন্ধুর না পালানোর বিষয়ে ফিরিস্তি দিচ্ছেন একজন বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা যিনি জীবনে কখনো বঙ্গবন্ধুর সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা জানি না। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট স্টেনগান তাক করা অবস্থায়ও সামান্য বিচলিত হন নি। হাত কাঁপে নি, চিরাচরিত অভ্যাসমতো হাতে পাইপধরা অবস্থায় ঘাতকদের ধমক দিয়েছেন যাঁকে ঘাতকরা পিঠে গুলি করতে পারে নি- তাঁর দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙক্ষা নিয়ে খন্দকার সাহেব প্রশ্ন ও বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। জয় পাকিস্তান তত্ত্বের উদ্ভাবক জনাব এ কে খন্দকার সামরিক উর্দি পরা হয়ে গণমানুষের ভাবাবেগ, ভালোবাসা আর তাদের নেতৃত্ব নিয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। তাই তিনি নয় মাস শুধু বেসামরিক সরকার তথা প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টা করেছেন।

খন্দকার সাহেব যে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়েই অজ্ঞ ছিলেন তা নয়, মুক্তিযুদ্ধের উপঅধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতির কোনো খবরও জানতেন না বলে মনে হয়। তাঁর বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় তিনি যুদ্ধে ভারত সরকারের সমালোচনা করে লিখেছেন, বিএসএফ পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ না করার কারণ তাদের হয়ত অস্ত্র ছিল না অথবা তারা সরকারের অনুমতি পায় নি। আমার মনে হয়েছিল ভারতীয়রা প্রথমদিকে যুদ্ধটি শুধু টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কোনো কিছু অর্জন করতে চায় নি। তখন পর্যন্ত ভারতীয়দের সহযোগিতার কথা বলতে গেলে বলব, তারা সীমান্তে কতগুলো সামরিক ঘাঁটি তৈরি, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু লজিস্টিক সহায়তা ও কিছু হালকা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার অতিরিক্ত বিশেষ কিছু করে নি।’ মুক্তিযুদ্ধের সামান্যতম ইতিহাস যারা জানেন তাদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার থাকলেও উপ-সেনাপতির কাছে বিষয়টির কোনো ব্যাখ্যা নেই আসলে বাস্তবতাটি ছিল সেদিন। ভারতে তখন শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের খাওয়া, পরা, আশ্রয়, চিকিৎসা, ওষুধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ আর প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে নানাবিধ সাহায্য প্রদান ওসময়ে ভারতের অর্থনীতির ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া ছিল বিশ্ব রাজনীতির চাপ। পূর্বের সকল দৃষ্টান্ত পাল্টে দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির দুই মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশের প্রভাবশালী দেশ, মধ্যপ্রাচ্য তখন পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল। ওই সময়ে ভারতের জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল অত্যন্ত জরুরি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব জনমত তৈরির জন্যে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন এবং একটি পর্যায়ে অর্থাৎ জুনের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এ কথাগুলো খন্দকার সাহেবের গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে আসা উচিত ছিল এবং এই যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদানের কথা একটু কৃতজ্ঞতার সাথে উচ্চারণের প্রয়োজন ছিল।

তিনি তাঁর বইতে আগাগোড়া রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অনেকের ত্রুটির কথা উল্লেখ করলেও নিজের কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে বলে মনে করেন নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নই। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, প্রবাসী সরকারের ভূমিকা, মুজিব বাহিনী ইত্যাদি নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যারা জড়িত ছিলেন তাঁরা তার অসংলগ্নতা বা তাঁর লেখায় অনিয়ম ও বিকৃতি কিছু থাকলে তা তারা প্রতিবাদ করবেন আমি শুধু তাঁর বইতে পরস্পর বিরোধী ও জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিকৃতির বিরুদ্ধে বলেছি এবং তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেছি। একজন উপ সেনাপতি হিসেবে তাঁর এ গ্রন্থ অন্যভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে, কারণ তাঁর মতো এত কাছে থেকে দেখা অন্য কারোর কোনো গ্রন্থ আমরা এখনও পাই নি। এই বইয়ের সত্যমিথ্যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা সমালোচনা হবে। আমিও লেখাটি শেষ করব তাঁরই বইয়ের বর্ণনা তুলে দিয়ে। কারণ সারা বইতে তিনি অন্যদের অর্থাৎ বেসামরিক ও প্রবাসী সরকারের সমালোচনা করেছেন কিন্তু তাঁরা দু’সেনাপতি সামরিক বাহিনীর অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের কাজের নমুনা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা ও শৃঙ্খলার একটি নমুনা তুলে ধরছি।

তার বইয়ে দেওয়া তথ্যসূত্রে ৬ ডিসেম্বর সকালে ভুটান ও বিকেলে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। . . . ৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মানিক যুদ্ধবিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে একটি আবেদন করেন। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। . . . ১৪ ডিসেম্বর বিকেল চারটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী গভর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন) অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের সভায় আক্রমণ করে। গভর্নর মালিক ভীত হয়ে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে গিয়ে রেডক্রসের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ উদ্ধৃতিগুলো খন্দকার সাহেবের। তার মানে তাঁর লেখার মধ্যেও আমরা পাঠকরা আন্দাজ করতে পারি যে, বিজয় আমাদের আসন্ন। কারণ এরই মধ্যে মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে। এ ধরনের টান টান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আমাদের দু’সেনাপতি- প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি. ওসমানি ও উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার কেমন তৎপর, বিচক্ষণ, কর্তব্যনিষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল ছিলেন তার একটি নমুনা খন্দকার সাহেবের বই থেকেই তুলে দিচ্ছি। খন্দকার সাহেব তার বইতে যেখানে রাজনৈতিক নেতা তাদের যুদ্ধ পরিচালনা, সরকার ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়ে বারংবার সমালোচনা করেছেন সেখানে তাঁরা দু’জন সামরিক বাহিনী সুশৃঙ্খল অফিসার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কী করেছেন দেখুন- তাঁর লেখনীতে- ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লিয়াজোঁ অফিসার কর্নেল পি দাস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব ফারুক আজিম খানের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানির খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন যে, কর্নেল ওসমানির মুক্ত এলাকা পরিদর্শনে সিলেটে গেছেন। এ হচ্ছে প্রধান সেনাপতির কাণ্ড। এবার উপপ্রধান কী করছেন দেখুন কর্নেল ওসমানির অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকেল চারটায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমি বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করব। এ সময় আমি সম্ভবত কমল সিদ্দিকীসহ কয়েকজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখার জন্য গিয়েছিলাম, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ড. ফারুক আজিজ খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি লিয়াজোঁ অফিসার মেজর নুরুল ইসলাম আমাকে চারদিকে খুঁজতে শুরু করেন’। ‘. . . সে সময় আমার পরনে বেসামরিক পোশাক, অর্থাৎ একটি শার্ট আর সোয়েটার ছিল। আমি এগুলো বদলে সামরিক পোশাক পরারও সময় পেলাম না। তাঁরা আমাকে বিমান বন্দরে পৌঁছে দেন সেখানে গিয়ে দেখি যে, একটি সামরিক যাত্রীবাহী বিমান দাঁড়ানো আছে’।

যখন বাংলাদেশের অনেক এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে যখন পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ শুধু সময়ের ব্যাপার তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও উপপ্রধান সেনাপতির ভূমিকা দেখে এবং বর্তমানে জনাব এ কে খন্দকারের অবস্থান দেখে ভাবছি বাংলায় সেনাপতি পলাশী থেকে রেসকোর্স নামে আরও একটি লেখা লিখতে হবে আমাকে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

'১৯৭১ ভেতরে বাইরে একটি ব্যবচ্ছেদ' - ১ম পর্ব

দৈনিক আজাদী                                    উপসম্পাদকীয়                                  কাল আজ কাল
১১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৭ ভাদ্র ১৪২১ সাল ১৫ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত কয়েকদিন ধরে দেশ জুড়ে আলোচিত-সমালোচিত ও নন্দিত-নিন্দিত হচ্ছে একটি বই। মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়কবিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান, সাবেক মন্ত্রী ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে তা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত সবখানে আলোচনার বিষয় এখন একে খন্দকার ও তার বিতর্কিত বইটি।

এ কে খন্দকার বেশ ভদ্র সজ্জন। মিতবাস এবং কর্মঠও বটে। কারণ ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ক্যাডেট পাইলট হিসেবে চাকরিতে ঢোকার দীর্ঘ বছর পর এ বছরের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার অধীনে নতুন সরকার গঠিত হলে সেখানে তাঁর ঠাঁই না হওয়ায় প্রথম বার চাকরিবিহীন, বেকার অথবা অবসর গ্রহণ করলেন। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদানের পর দীর্ঘ ১৮ বছর পর ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সহ-অধিনায়ক স্বাধীনতার পর বিমান বাহিনীর প্রধান, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোস্তাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদান। পরে চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁর বইতে তিনি লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন বা পদত্যাগে বাধ্য হয়ে সে সরকারের অধীনে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে ভারতের রাষ্ট্রদূত, তারপরে এরশাদের পতন হওয়া পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রীসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং তার পরে আওয়ামীলীগের সাংসদ, পরে পরিকল্পনা মন্ত্রী। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকারের আমলেই তিনি ক্ষমতা ও তার সুফল ভোগ করেছেন। যে লোকটি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ দেশে থাকেননি। যিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, এমনকি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানও ভালো করে দেখেননি বা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। যিনি বাঙালির এই দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করেননি অংশগ্রহণ করেননি এমনকি পত্র-পত্রিকায়ও ভালো করে পড়েননি (তিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের কথা লেখা হতো না বলে এদেশের অনেক কিছুই তাঁর পক্ষে জানা তখন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি) তিনি যখন মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ এবং তার নায়কদের বিষয়ে লিখতে যান তখন তা খন্ডিত, বিকৃত আরোপিত ও ভ্রান্ত হতে বাধ্য। তা-না হলে নির্বাচন থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এবং তার লেখায় বহুবার উল্লেখিত সে সময় নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গে যে আপত্তিকর বিভ্রান্তিমূলক ও অপমানজনক মন্তব্য করেছেন তা উদ্ভাবিত হতো না। ১৯৫১ থেকে যাঁর জীবন কেটেছে সশস্ত্র বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি কীভাবে গণমানুষের রাজনীতি তাদের আবেগ-উত্তেজনা তাদের নেতাদের প্রতি অকৃত্রিম ও বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসার মূল্যায়ন করবেন। তিনি সামরিক বাহিনীর লোক কাজেই বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ও তার পথ পরিক্রমায় একজন সামরিক ব্যক্তির দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে বারবার আন্দোলন সংগ্রামকে এক প্রকার সামঞ্জস্যহীন, অগোছানো, শৃঙ্খলাহীন ও নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা হিসেবে দেখেছেন এবং তাঁর বইতে তা বারবার উল্লেখ করেছেন।

বাঙালি হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একটি উল্লেখযোগ্য ও গৌরবের কাল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠদলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার । অন্যদিকে ১৯৪৭ সালের পর প্রথমবারের মতো বাঙালির অবিসংবাদিত নেতাকে তাঁর ৬ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ না দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি তথা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নানাবিধ ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু তখন একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রধান। নির্বাচনে বিজয়ী এক নেতা। নিয়ম অনুসারে প্রেসিডেন্ট তাঁর দলকেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে ডাকবেন। তখন তিনি কোনো বিপ্লবী দলের প্রধান নন এবং দেশে বিপ্লবের মাধ্যমেও সরকার বদল হচ্ছে না। সে কারণে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সংসদ অধিবেশন আহবান না করা পর্যন্ত কার্যত বঙ্গবন্ধু কোনো কিছুই করতে পারেন না। শেষে ২৫ তারিখ অধিবেশন ডাকা হবে বলে ইয়াহিয়া আলোচনার আহবান জানালেন। একজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত নেতা হিসেবে সে আলোচনার আহবানকে উপেক্ষা করে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত হতেন এবং যে কারণে বাংলাদেশের সে যুদ্ধে বিশ্ব জনমত এমনকি ভারতের সমর্থন আদায়ও সম্ভব হয়ে উঠতো না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করছে বলে এই যুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারত পাকিস্তান। যে কারণে পাকিস্তানিদের দ্বারা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা না করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং ইতিহাস সাক্ষী তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন। কিছু মাথামোটা ও হঠকারী ছাত্র যুব ও আওয়ামীলীগ নেতার উস্কানি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে সময়কে মোকাবেলা করেছিলেন। সম্ভবত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক ছিলেন তিনি।

আন্দোলন সংগ্রামে অভিজ্ঞতাহীন ও জনগণের সাথে সম্পর্কহীন বাহিনীর ছাউনিতে বসবাসকারী একে খন্দকার সে সময়ে রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতাকে সমালোচনা করে লিখেছেন ‘আমি পাকিস্তানিদের তটস্ত রাখা ও তাদের পদ্ধতি ব্যাহত করার পরিকল্পনাগুলো উইং কমান্ডার এম আর মীর্জাকে জানিয়েছিলাম। আমার এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই দিনের আন্দোলনে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। বিজয়ের জন্য যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের উচিত ছিল, পাকিস্তানিরা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই ছোট ছোট আঘাত আর খোঁচার মাধ্যমে তাদের নাজেহাল করা।’ আরেক জায়গায় লিখেছেন সারাদেশে এ ধরনের ছোট ছোট তৎপরতা চালিয়ে পাকিস্তানিদের দৌড়ের ওপর রাখা যেত। কী বালখিল্য মূল্যায়ন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের তারিখ থাকা এবং তা নিয়ে আলোচনাকালে এমন তৎপরতা ও আক্রমণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অন্তর্ঘাতমূলক হতো না তখন। রাজনৈতিক এই বিচক্ষনতা তাঁর মতো একজন পাকিস্তানের ‘মোস্ট অবিডিয়েন্ট’ এর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। তিনি তাঁর লেখায় বারবার বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেছেন স্বাধীনতা ঘোষণা, তার পূর্ব প্রস্তুতি ইত্যাদি না নেওয়ার জন্য। অথচ তাঁর বইতেই তিনি লিখেছেন আতাউল গণি ওসমানিকে ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।’ যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি যদি বঙ্গবন্ধু নাই বা নিতেন তাহলে সেখানে ওসমানিকে সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন কেন? কেন বঙ্গবন্ধু ফেব্রুয়ারি মাসে ড. কামাল হোসেনকে স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ কর্মকর্তা যাঁর চাকরির অধিকাংশ সময় পশ্চিম পাকিস্তানে কাটিয়েছেন তিনি কীভাবে জানবেন যে, ১৯৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগের একটি অংশ নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি ‘নিউক্লিয়ার্স’ গঠন করা হয়েছিল। তিনি কীভাবে জানবেন ১৯৬৯ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণ সভায় বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেছিলেন এবং ভারতের সাথে যোগাযোগের জন্য তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুভারকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। খন্দকার সাহেব কী করে ভাবলেন যে পূর্ব কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা ছাড়াই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে ভারত সরকার যাচাই-বাছাই না করেই আশ্রয় দেবেন।

তিনি বারবার বলতে চেয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর অনেক বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল শুধু রাজনৈতিক নির্দেশনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি? প্রশ্ন ওঠে তাঁর বেলায় কী ঘটেছিল? তিনিও কি বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, না কি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রতি অনুগত থাকার? তার বক্তব্য পাঠকরা অনুমান করুন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশনে এক ভাষণে এই জঘন্য অপরাধের দায়ভার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি এই ভাষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশংসা ও শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করেন।’ তিনি তাই বইতে সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নে দোদুল্যমান বলে বঙ্গবন্ধুকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন সেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের ভাষায় বঙ্গবন্ধু ‘দেশদ্রোহী’। যেখানে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইটে প্রথমে পিলখানা, রাজারবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে; সেখানে কয়েকদিন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর সকল বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা হয়েছিল এবং সে রাতেই অধিকাংশ বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তখনও তিনি পাকিস্তানি সরকারের অনুগত হয়ে চাকরি করে যাচ্ছিলেন। যেখানে বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও সামরিক ব্যক্তিদের পেলেই হত্যা কিংবা গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল সেখানে তিনি দিবিব রয়ে গেলেন কীভাবে একজন শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও? তাঁর ভাষায়, ২৬ মার্চ সারাদিন কারফিউ ছিল। ২৭ মার্চ সকালে অল্পক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তাই ২৭ মার্চ সকালে তাদের নিয়ে আসার জন্য নিজেই জিপ চালিয়ে আজিমপুরে যাই। পথে রাস্তার দু’পাশে ভয়ংকর ও বীভৎস দৃশ্য দেখি। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। কালো পিচের রাস্তা রক্তে লাল হয়ে গেছে। ভাবলাম এর পরতো এই হত্যাকারীদের সঙ্গে যাবার প্রশ্নই উঠে না। কয়েকদিনের মধ্যেই সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে আমরা পুনরায় আজিমপুরে স্ত্রীর বোনের বাসায় উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।’ এরপরে তিনি লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ভাবলাম এয়ারফোর্স অফিসার মেসে গিয়ে দেখি মেসের কী অবস্থা। মেসে গিয়ে দেখলাম, কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন, লক্ষ্য করলাম একটি সেনা ভর্তি ট্রাক অফিসার মেসে প্রবেশ করল। সৈনিকদের অনেকের হাতে অগ্নিবর্ষক অস্ত্র দেখলাম। সৈনিকেরা গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অফিসার মেসের একটু পেছনেই ছিল নাখালপাড়া গ্রাম। নাখালপাড়া গ্রামটি ছিল গরিব। রিক্সাওয়ালা ও খেটে খাওয়া মানুষের বাসস্থান। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল এই গরিব মানুষগুলো আসল শত্রু, কারণ এরাই সব আন্দোলনের পুরোভাগে থাকে। অগ্নিবর্ষক অস্ত্রগুলো দিয়ে এদের বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখায় পুরো এলাকা লাল হয়ে গেল। ঢাকায় কারফিউ থাকার কারণে নাখালপাড়ার বাসিন্দারা বাসায় আবদ্ধ ছিল। সব ঘর বাড়িতে দারুণভাবে আগুন জ্বলে উঠল। তাদের তখন ঘর থেকে বের হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। যখন তারা ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হওয়া শুরু করে তখন এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করা শুরু করল। আমার পাশে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর কয়েকজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদেরই একজন আমার সামনেই বলে উঠলেন, ‘দিস ইজ দ্য ওয়ে টু ডিল উইথ দ্য বাস্টার্ডস।’ এই কথাটা আমি জীবনে ভুলব না। নিজ চোখের সামনে এই ঘটনা দেখে আমি স্থির করলাম, এদের সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না।’ এতক্ষণে অরিন্দম! যিনি পুরো মার্চ মাস জুড়ে উথালপাতাল করেছেন পাক আর্মিদের দৌঁড়ের ওপর রাখতে তিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের সঙ্গে আর না। প্রশ্ন উঠে যে পাকিস্তানিদের কাছে ওই গরিব বস্তিবাসী বাস্টার্ড এবং মৃত্যুই তাদের প্রাপ্য, এমন খুনীদের কাছে বিমান বাহিনীর শীর্ষ বাঙালি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলেন না কেন? তিনি লিখেছেন, ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রূপ নেয়। এখান থেকে প্রথমে স্থানীয় নেতারা ও পরে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমি মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা পুলিশ এবং চট্টগ্রামের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা জানতে পারি। এখানেও তথ্যগত ভুল করেছেন তিনি। কার্যত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়নি। তার কিছু যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে কালুরঘাটে অবস্থিত আরেকটি ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে ঘোষণা পাঠ ও প্রদান করা হয়েছিল। সে কেন্দ্রের ফ্রিকোয়েন্সি বেশি ছিল না বলে তার কোনো ঘোষণা ঢাকায় বসে শোনা সম্ভব নয়। যাক তারপরে তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী স্থলপথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ করতে না পেরে ২৯/৩০ মার্চ বিমানের সাহায্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে বোমা বর্ষণ করে। ২৮ বা ২৯ মার্চের পর থেকে বিমান বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলো বাঙালিদের পরিবর্তে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানি বৈমানিকদের দ্বারা উড্ডয়ন করা হতো। আমিসহ সব বাঙালি কর্মকর্তা তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ছিলাম নামে মাত্র। আমাদের কোনো দায়িত্ব-কর্তব্যে নিযুক্ত করা হতো না। পাকিস্তান বিমান বাহিনী কোথাও আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা ধারণা করতে পারতাম কিন্তু কবে, কখন কোথায় তা কার্যকর হবে তা নির্দিষ্টভাবে জানতে পারতাম না।’ প্রশ্ন উঠতে পারে যিনি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নির্মমতা দেখে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি ২৯ তারিখ পর্যন্ত তাঁর ভাষায় বিমান বাহিনীতে চাকরি করলেন কী করে? আর তাঁর কথায় মনে হলো তাঁকে বা তাঁদের বসিয়ে না রেখে দায়িত্ব বা কর্তব্য অর্পণ করলে তিনি খুশি হতেন। (পরবর্তী সপ্তাহে)
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

'ষোড়শ সংশোধনী বনাম বর্তমান আইন সভা' - ২য় পর্ব

দৈনিক আজাদী                                      উপসম্পাদকীয়                                          কাল আজ কাল
৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২০ ভাদ্র ১৪২১ সাল ৮ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত সপ্তাহে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করার লক্ষ্যে সংবিধানে যে সংশোধনী অর্থাৎ ষোড়শ সংশোধনী পাশ হতে যাচ্ছে তা কোনোভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং তা না থাকাটাই সাংঘর্ষিক ও বিপরীত। তবে প্রশ্ন তুলেছিলাম এ ক্ষমতা যে সংসদ বা যে ধরনের সংসদ সদস্যদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি সে সংসদ বা তার সদস্যগণ তার জন্যে কতটা উপযুক্ত।

পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম বিগত কয়েকটি সংসদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখতে পাই তাতে প্রতিনিধিত্বকারীর মধ্যে প্রকৃত রাজনীতিকের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত রাজনীতিকের সংখ্যাতো আশঙ্কাজনকভাবে কম। বলা যায় বিরলপ্রজ হয়ে উঠছেন তারা এবং সে সাথে এ-ও উল্লেখ করেছিলাম যে, রাজনীতিকে কলুষিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বেশ আগে। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পরে যে শক্তিটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তারাই মূলত তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাজনীতিকদের কেনাবেচা ও দলছুট করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বাস্তবেই রাজনীতিকদের জন্যে রাজনীতি কঠিন করে ফেলা হয়েছিল।

একজন জাতীয় সংসদ সদস্য পক্ষান্তরে যিনি একজন আইনসভার সভ্য তাঁর কাঁধে এত বেশি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার পদটিকে এত বেশি লাভজনক ও লোভনীয় করা হয়েছে যে, তা আয়ত্ত করতে, দখল করতে সুবিধাবাদীরা উন্মুখ হয়ে থাকে। একজন সংসদ সদস্যের হাত দিয়েই তার এলাকায় শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের টাকা খরচ হয়। বদলি, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে কোনো কাজ একজন সংসদ সদস্যের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজেই একজন মানুষ না চাইলেও দেশের বিদ্যমান ‘সিস্টেম’ তাকে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে তার অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

এরশাদ আমলে প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীয়করণ করতে গিয়ে উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছিল। সরকারের উন্নয়ন কাজ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে করার লক্ষ্য(!) নিয়ে তা করা হলেও মূলত কখনও তা সঠিক ও সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা প্রশাসনকে অকার্যকর করে রাখে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও উপজেলা প্রশাসন পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাধা হিসেবে কাজ করেছে সংসদ সদস্যরাই। তাদের এলাকায় নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব খর্ব হতে পারে মনে করে সংসদ সদস্যরা উপজেলা বা স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালনে বাধা প্রয়োগ করেছে। সংসদ সদস্যরাই যেহেতু আইন প্রণয়ন করে থাকেন সেহেতু তাঁদের ক্ষমতা খর্ব করার মতো কোনো আইন প্রণয়নে তারা সম্মত হননি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকা ছিল এক ও অভিন্ন। যে কারণে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হলেও সরকারের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আর আগ্রহ দেখা যায়নি। এক সময়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে উপমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করতেন। বর্তমান সরকারের আমলে সে মর্যাদাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে উন্নয়ন কাজে সরকার সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করবেন না কি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানদের ব্যবহার করবেন। দেশের সুশীল শ্রেণির একটি অংশ উন্নয়ন কাজে স্থানীয় সরকারকে ব্যবহার করা এবং সে সাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর মত ব্যক্ত করে থাকেন। এখন আমরা দেখতে চাই সে ক্ষেত্রে আমাদের কী কী অসুবিধাগুলোর সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

১৯৪৭ সালে একই সাথে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলেও ভারতে গণতন্ত্র বিকাশের সাথে সাথে একই সমান্তরালে শক্তিশালী হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। যে কারণে সেখানে কার্যকর সংসদের পাশাপাশি কার্যকর তাদের স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন গ্রাম পঞ্চায়েত। কিন্তু পাশাপাশি অপর রাষ্ট্র পাকিস্তানে না হয়েছে গণতন্ত্রের বিকাশ, না হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ। পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিকাশই লাভ করতে পারেনি। মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। তেমনি করে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল সংগঠন ইউনিয়ন পরিষদ সমূহেও হয়নি এবং সেখানেও প্রতিনিধিত্ব করেছে কিছু ব্যক্তি যারা পক্ষান্তরে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় থাকার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৯ সানে পাকিস্তানে জেনারেল ইসকান্দর মীর্জার নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর জেনারেল ইসকান্দর মির্জাকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সেনা প্রধান জেনারেল আইউব খান। তিনি ক্ষমতায় এসে তা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পাকিস্তানে প্রবর্তন করেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শন প্রসূত বেসিক ডেমোক্রেসি বা বিডি। আইউব খানের প্রবর্তিত বেসিক ডেকোক্রেসিতে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন ইউনিয়ন বোর্ডের (বর্তমান পরিষদ) চেয়ারম্যানগণ। এটি ছিল আইউব খানের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ছিল না। সে ব্যবস্থায় বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সরকারের তোষামোদকারীরা টাকা,ক্ষমতা উপঢোকন কখনওবা ভয় দেখিয়ে চেযারম্যানদের ভোট আদায় করে প্রাদেশিক ও গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হতেন। আমরা একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব আইউব খান তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছিলেন পরবর্তীতে প্রতিটি সামরিক শাসক সে ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ তারাও তাঁদের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার খাতিরে প্রথমেই ব্যবহার করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার প্রতিনিধিদের। জনগণ ও তার প্রতিনিধিদের ভয় পায় বলে প্রায় প্রতিটি স্বৈরশাসক প্রথমে বেছে নিয়েছে স্থানীয় সরকারকে। সংসদকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সংসদ ভেঙে দিয়ে এসব স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সাহায্যে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছে। জেনারেল জিয়া, এরশাদ (তারা উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে) এবং সর্বশেষ- ১/১১ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেশ পরিচালনার ইতিহাস দেখলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। কাজেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও তার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি গণতন্ত্রমনস্ক জনগোষ্ঠীর আস্থা ও সমর্থন খুব বেশি বলে আমার মনে হয় না। ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান এবং অধুনা উপজেলা চেয়ারম্যানদের দুর্নীতির খতিয়ান সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম দীর্ঘ নয়।

এ ছাড়া আরও একটি আশঙ্কার কারণ আছে। একজন সংসদ সদস্য তার ভালো-মন্দ-কাজের জন্যে তার দল ও সংসদের কাছে দায়ী থাকেন। খুব বেশি নয়, ১০ থেকে ২০ জন সংসদ সদস্যের দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে একটি সরকারের ভিতও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি থাকে সংসদে। আর সেখানে শাস্তি না হলেও পরবর্তী নির্বাচনে জনগণই তাকেসহ তার দলকে উপযুক্ত জবাবটুকু প্রদান করতে পারে। কাজেই একজন সদস্য সব কিছুর উর্ধ্বে থাকতে পারেন না। কম বেশি অন্য সদস্যদের কাছে হলেও তাকে ভর্ৎসনা শুনতে হয়। অন্যদিকে আগেই বলেছি স্থানীয় সরকার বা উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ নির্বাচিত হন নির্দলীয়ভাবে। তার কর্মকাণ্ডের জন্যে কোনো দলের কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় না। দুর্নীতিতেও তারা সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম অগ্রসর নন। কয়েকজন সংসদ সদস্যের কৃতকর্মের কারণে পার্টি ক্ষমতা হারাতে পারে কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানরা এক একজন স্বতন্ত্র। কাজেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো দলীয় শৃঙ্খলাও কার্যকর নয়। আরেকটু খুলে যদি বলতে হয় তাহলে বলি এ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাই বেশি দুর্নীতির সাথে যুক্ত অতীতের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।

এখন জিজ্ঞাসা তাহলে বাকি থাকল কে? সংসদ সদস্য থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান দুপক্ষ নিয়েই আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাহলে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবে কে?

এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো- ব্যক্তিকে সৎ হওয়া। একজন সৎ মানুষের হাতে যে দায়িত্বই অর্পণ করুন না কেন, তা সঠিকভাবে পরিচালিত হতে বাধ্য। আর সৎ না হলে সে দায়িত্ব একজন সংসদ সদস্যকে দেওয়া হোক বা উপজেলা চেয়ারম্যানকে দেওয়া হোক ফল হবে অভিন্ন। দায়িত্ব নিতে হবে জনগণকে। জনগণ যদি যে কোনো মূল্যে দুর্নীতিবাজ নেতাকে প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতি পাল্টাতে বাধ্য। কারণ ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজ সৎ হবে না। সমাজ সৎ না হলে রাষ্ট্রও সৎ হবে না। কাজেই আগে ব্যক্তিকে সৎ হতে হবে। তাতে যে প্রক্রিয়া বা যে পদ্ধতিই বহাল থাকুক না কেন তাতে সুফল পাওয়া যাবে।

জনগণ যদি চায় তার প্রতিনিধি হোক একজন ভালো মানুষ, সৎ মানুষ তবে তা-না হয়ে উপায় কী। প্রশ্ন হলো জনগণ কি তা চায়। না কি পুরনো সে কথাটিই পুনরায় স্মরণ করব যে, ডাকাতের সর্দার হয় ডাকাত, আউলিয়ার সর্দার হবে আউলিয়া।

জনগণ সৎ হলে তার প্রতিনিধিরা সৎ হবে না কন?

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৪

'ষোড়শ সংশোধনী বনাম বর্তমান আইনসভা' - ১ম পর্ব

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ১৩ ভাদ্র ১৪২১ সাল ১ জিলকদ ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
সরকারের তিনটি বিভাগ-আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের দায়িত্ব, কর্তব্য, কর্তৃত্ব ও পরিধি যে এখনো মীমাংসিত নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে কয়েকদিনের টকশো পত্রিকার কলাম ও বিভিন্ন আলাপ ও আড্ডার আলোচ্য বিষয় দেখে ও শুনে। বিতর্কটি তৈরি হলো সরকারের সংবিধানের ১৬শ সংশোধনীর প্রস্তাবে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ বা আইনসভা ফিরে পাচ্ছে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা, যা ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল, পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে এক ফরমান বলে তা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে প্রদান করা হয়েছিল।

এ নিয়ে দেশে বেশ হৈচৈ হচ্ছে এখন। মানুষ রাত জেগে রাজনৈতিক টকশো দেখছে। পত্র-পত্রিকাগুলোয় বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে, প্রধান বিরোধী জোট অর্থাৎ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নতুন একটি আন্দোলনের ইস্যু পেয়ে চাঙা হয়ে ওঠার সুযোগ কাজে লাগাতে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করছে। বিচার ও আইন পেশায় জড়িতরা এখন ভি আইপিতুল্য কভারেজ পাচ্ছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

বিষয়টি নতুন কিছু নয়, গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্যেতো নয়ই বাংলাদেশের জন্যেও নয়। আগেই বলেছি সংসদের এই ক্ষমতাটি পূর্বেও অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল। মাঝখানে কয়েক দশক বাদে তা আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। বিষয়টি গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা গণতন্ত্রপরিপন্থিও নয়। কেন নয় সে বিষয়টি পরিষ্কার হোক আগে।

Government of the people by the people for the people. এটিকে যদি গণতন্ত্রের মৌলিক ব্যাখ্যা হিসেবে ধরি তাহলে বলতে হয় গণতন্ত্রে জনগণই হচ্ছে সার্বভৌম, জনগণই হচ্ছে রাষ্ট্রের ‘সুপ্রিম পাওয়ার’। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে আইন সভা বা জাতীয় সংসদই যেহেতু জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সেহেতু জাতীয় সংসদই হবে সার্বভৌম এবং অন্য দুটি বিভাগের চেয়ে অধিক সুপ্রিম ও স্বাধীন। কাজেই জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে পক্ষান্তরে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার মধ্যে কোনো অগৌরব আছে বলে আমি অন্তত মনে করি না। ফলে সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বরং তা একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে সংসদের বা সংসদ সদস্যদের হাতে এমন সুপ্রিম পাওয়ার তুলে দিচ্ছি সে সংসদ ও সংসদ সদস্যরা কেমন হতে পারে? তাদের যোগ্যতা, সততা, জবাবদিহি ও বিচক্ষণতা কেমন হতে পারে? তার আগে সংসদ বা একটি রাষ্ট্রের আইনসভা ও তার সভ্যদের বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বাংলাদেশের আইন সভাকে ‘জাতীয় সংসদ’ নামে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম ভাগ ‘আইনসভা ১ম পরিচ্ছদ ‘সংসদ’ এ বলা হয়েছে ৬৫(১) জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে। ‘তবে শর্ত থাকে যে, সংসদের আইন দ্বারা যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে আদেশ, বিধি, প্রবিধান উপ-আইন, বা আইনগত কার্যকারিতাসম্পন্ন অন্যান্য চুক্তিপত্র প্রণয়নের ক্ষমতার্পণ হইতে এই দফায় কোনো কিছুই সংসদকে নিবৃত্ত করিবে না। অর্থাৎ আমাদের সংবিধানই জাতীয় সংসদকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। অন্যদিকে আইন সভার সভ্য বা জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে। ৬৬(১) কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হইলে এবং তাহার বয়স পঁচিশ বছর পূর্ণ হইলে এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত বিধান সাপেক্ষে তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন।

(২) কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না যদি

ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা না করেন।

খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন।

গ) তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।
ঘ) তিনি নৈতিক স্বল্পজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হইয়া থাকে।

ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীনে যে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন। (সংক্ষিপ্ত করা হলো)

ঞ) সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি

১। সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। ২। সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর ওপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি সকল ক্ষমতা প্রয়োগ সম্পর্কিত কোনো ব্যাপারে কোনো আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না। ৩। সংসদে বা সংসদের কোনো কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। ৪। সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোনো রিপোর্ট কাগজপত্র ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। ৫। এই অনুচ্ছেদ সাপেক্ষে সংসদের আইন দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটি সমূহের সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারিবে।

সংবিধানের ৭৮ ধারার বিভিন্ন উপধারায় আমরা দেখতে পাচ্ছি সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার ও ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের হাতে যদি বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেওয়া হয় তবে তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু শঙ্কা হলো কোন ধরনের সংসদ বা সংসদ সদস্যদের হাতে আমরা এমন একটি স্পর্শকাতর অধিকার অর্পণ করছি।

বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে বিগত কয়েকটি সংসদের সদস্যদের মধ্যে প্রকৃত রাজনীতিকের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কম এবং এই প্রবণতা বা ধারা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতি এখন প্রকৃত রাজনীতিকদের জন্যে কঠিন হয়ে উঠেছে। রাজনীতির মাঠ বা নেতৃত্ব দখল করেছে কালো টাকার মালিক, গডফাদার, মাস্তান, চাঁদাবাজ পেশি শক্তি। ফলে ব্যয় বহুল নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এখন দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে বিত্তবানদের, যাদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে কালো বা অবৈধ টাকার মালিক। এদের দৌরাত্ম্যে সৎ,দেশপ্রেমিক নিবেদিত রাজনীতিকরা কোণঠাসা। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত আমলা সামরিক বা অন্যান্য বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তরা মনোনয়নের দৌড়ে রাজনীতিকদের অনেক আগে। ফলে জাতীয় সংসদ এখন অনেকটা বিত্তবানদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। এছাড়া নির্বাচিত হওয়ার পরে এসব সংসদ সদস্যরা জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন অপকর্মে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে। এদের মধ্যে অনেকেই এমন কিছু আচরণ করে থাকেন ভাবতে কষ্ট হয় তা কোনো ভদ্র ও বিবেকবান মানুষের পক্ষে করা সম্ভব কিনা।

তবে এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন বিচারহীনতা, জবাবদিহিতার অভাব ও সমাজ থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পাওয়ার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর রাজনীতির এমনও ব্যাপক ক্ষতিটি করেছে আমাদের দেশের সামরিক শাসকরা। জিয়া থেকে এরশাদ তাদের অবৈধ ও সামরিক সরকারকে জনগণের কাছে গ্রহণীয় করে তুলতে রাজনীতিকদের অর্থ, ক্ষমতা পদের লোভ অথবা ভয় দেখিয়ে দলছুট করেছেন। দল ভেঙে নিজের দল গড়েছেন। জিয়া এ কাজে স্বাধীনতা বিরোধীদের ব্যবহার করেছিলেন, এরশাদ ব্যবহার করেছিলেন স্বাধীনতাবিরোধীসহ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের। সেই যে রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শহীনতা প্রবেশ করেছে তা থেকে রাজনীতি আর মুক্ত হতে পারেনি বরং এই দৈত্য আরও জেঁকে বসেছে রাজনীতির কাঁধে। ফলে এখন রাজনীতি হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে আর ক্ষমতা হয়ে উঠেছে নিজের আখের গোছানোর মস্ত বড় অবলম্বন হিসেবে। যে জন্যে আজ সংসদ সদস্য হওয়া একটি বড় পুঁজি খাটানোর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে পুঁজি খাটালে তা যে কয়েক শ কারো কারো বেলায় হাজার গুণ লাভের ক্ষেত্র তা এখন প্রকাশ্য বিষয়। যেহেতু পদটি অত্যন্ত লাভজনক পদে পর্যবসিত হয়েছে সে কারণে ওখানে লগ্নি করতে অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। শুধু দলের মনোনয়ন পেতেই কয়েক কোটি টাকা খরচ করেন অনেকে। অনেকে আছে টাকা নিয়ে রাজধানীতে যান এক দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হলে অন্যদল থেকে মনোনয়ন কিনে নিয়ে আসেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বর্তমানসহ বিগত কয়েকটি সংসদের সদস্যদের অনেকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে।

তবে এর জন্যে আমি শুধু মাত্র ব্যক্তিকে দায়ী করব না। এর জন্যে দায়ী অনেকটা আমাদের ‘সিস্টেম’। অর্থাৎ আমরা এমন কিছু সুযোগ করে রেখেছি একজন সংসদ সদস্যের জন্যে যে,তাঁকে দুর্নীতিবাজ হতে সে পথই উৎসাহিত করে, আহ্বান করেন।

পূর্বেই বলেছি একজন সংসদ সদস্য মূলত একজন আইন সভার সভ্য। আইন প্রণয়ণটি যাঁর মহৎ কাজ। সংবিধান অনুযায়ী তাঁরা আইন প্রণয়ন করবেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর কাজ করবেন এবং সরকারের সহায় হিসেবে অবদান রাখবেন। কিন্তু আমাদের দেশে একজন সংসদ সদস্য থানার ওসি-দারোগা থেকে শুরু করে স্কুলের দপ্তরিকে পর্যন্ত বদলির দায়িত্ব পালন করেন। স্কুল কমিটিতে হস্তক্ষেপ করা ছাড়াও তাঁর এলাকায় এমন কোনো কাজ করতে দেন না যাতে তাঁর সায় নেই বা লাভ নেই। তাঁর হাতেই তাঁর এলাকার সমস্ত উন্নয়ন কাজের ভার। তাঁর হাত দিয়েই ব্যয় হয় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের অর্থ। তিনি তার নির্বাচনী এলাকার একমাত্র বাদশা। তাঁর কথার বাইরে সরকারি লোকও কিছু করতে পারেন না। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি অর্থাৎ উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাকিয়ে থাকেন তাঁর কৃপা দৃষ্টির জন্যে। তবে দু’একটি এলাকার যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান কোনো কারণে কিছুটা দাফট রাখেন সেখানের চিত্র ভিন্ন।

এই যখন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সেখানে আমাদের ভাবতে হবে দু’বার যে এমন সংসদ সদস্যদের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অর্পণ কতটা যুক্তিযুক্ত। তবে সে সাথে এর বিরূপ নিয়েও ভাবতে হবে আমাদের। এই যে জাতীয় সংসদ সদস্যদের দুর্নীতির কথা, হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্পণ ও তার অপ প্রয়োগের কথা বললাম তাতো একটি দিক। এর বিকল্প কী হতে পারে? অর্থাৎ যে সংশোধনীর মাধ্যমে তাদের হাতে আরেকটি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে এবং সে সাথে তাঁদের হাতে সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ তুলে দেওয়া হচ্ছে এর বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে?

একদিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল যা বর্তমানে বহাল আছে এবং উন্নয়ন কাজে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে কর্তৃত্ব দেওয়া তার আগে আমরা দেখে নিতে চাই এক্ষেত্রে আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা কী। প্রিয় পাঠক তার জন্যে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০১৪

'সারা শহর কসাইখানা!'

দৈনিক আজাদী            উপসম্পাদকীয়             কাল আজ কাল 
২১ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ৬ ভাদ্র ১৪২১ সাল ২৪ শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে এক সময়ে অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র ছিল হাট বা বাজার। শিল্প স্থাপনের আগে কৃষি ও কৃষিপণ্যই ছিল বেচা-কেনা বা অর্থ প্রবাহের প্রধান মাধ্যম। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে সে টাকায় অন্য পণ্য ক্রয় করতো মানুষ। কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি বাজার আর সে বাজারে সপ্তাহে এক কখনও দুদিন ছিল হাটবার। হাটবারেই সপ্তাহের অন্যান্য দিনের কেনাবেচা হতো। এই ব্যবস্থার বড় আয়তন ছিল গঞ্জ বা জেলা-মহকুমা শহরের পাইকারি বাজার, যেখান থেকে গ্রামের হাটবাজারের জন্যে পণ্য কিনে নিয়ে যেত খুচরা বিক্রেতারা। এখনও গ্রাম বাংলার অর্থনীতির প্রধান প্রাণকেন্দ্র এই হাট বা বাজার। এই বাজার বা হাট শহরেও ছিল। শহরেও এক সময় হাটবার প্রচলিত ছিল যেদিন বাজারটি সাধারণ দিনের চেয়ে বড় আকারে বসতো। চট্টগ্রামে বাজারগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাট বলেই পরিচিত। বাজার নামটি ব্যবহৃত হচ্ছে গত শতকের প্রায় মাঝামাঝি থেকে, কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। চট্টগ্রাম শহরের বাজারগুলোও হাট দিয়ে নামকরণ করা। যেমন-বক্সিরহাট, বহদ্দারহাট, বিবিরহাট, ইশাইন্যার হাট। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলোর অধিকাংশের নাম হাট দিয়ে। 

গ্রামে-গঞ্জে এই হাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল মানুষ। নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা থেকে শুরু করে উৎসব আনন্দে কাপড় চোপড়, জুতা সেন্ডেল ইত্যাদি কেনা হতো হাট থেকে। এত ঝলমলে বিপণিকেন্দ্র বা বড় বড় মার্কেট, সুপার সেন্টারতো তখন ছিল না। এ ধরনের হাটে মাছ-মাংস থেকে শুরু করে কোরবানির গরু-ছাগলও বিক্রি হতো। বড় বড় হাটগুলোতে কিংবা অবস্থাপন্ন গ্রামগুলোর হাটে তখন গরু জবাই হতো শুধু হাটবারেই। ছোট হাট বা ক্রয় ক্ষমতা কম এমন এলাকায় হাট বারেও গরু জবাই হতো না ক্রেতার অভাবে। বাড়ির অতিথি বা কোনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানে গরুর মাংসের প্রয়োজন পড়লে থানা, মহকুমা বা জেলা সদরের বাজারে যেতে হতো। এখন অবশ্য সময় পাল্টেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরের অবস্থা বাদই দিলাম গ্রামেও এখন অনেক স্থানে সকালেই কয়েকটি গরু জবাই হয়। সন্ধ্যার আগে আগে তা বিক্রিও হয়ে যায়। গ্রামেও এখন শুধু সপ্তাহের দুদিন হাটের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় না। অধিকাংশ বাজারে এখন প্রতিদিনই হাট। হাট বা বাজার ছাড়াও এখন গ্রাম শহরের রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাজার যেখানে সকাল থেকে রাত অবধি প্রায় সকল পণ্যই বেচাকেনা হয়। যে কারণে গ্রামাঞ্চলের অনেক পুরনো হাট এখন বিলীনের পথে। সে সব হাটে এখন আগের সে জৌলুস নেই। এর অবশ্য আরেকটি কারণও আছে আগে বাজার বা হাট গড়ে উঠতো কোনো না কোনো নদী বা খালকে কেন্দ্র করে। আগে যেহেতু নদী পথেই পণ্য পরিবহন হতো বেশি সে কারণে গড়ে উঠেছিল এই ব্যবস্থা। এখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় অধিকাংশ পণ্য পরিবহন করা হয় সড়কপথে আর অন্যদিকে নদী ও খালগুলো ভরাট ও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে নৌকা চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় নদীপাড়ের বাজারগুলো এখন মৃতপ্রায়। তার বদলে সড়কের আশেপাশেই গড়ে উঠেছে নতুন নতুন হাটবাজার। শহরের চিত্রও পাল্টেছে। প্রাচীন ও এক সময়ের নামকরা বাজারগুলোর জৌলুস এখন ম্রিয়মান। এখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঠেলাগাড়িতে সবজি থেকে শুরু করে মুরগি শুটকি ইত্যাদি বিক্রি হয়। আর সন্ধ্যার পরে পরে শহরের অনেক স্থানে ফুটপাত জুড়ে বসে মাছের বাজার। মানুষ এখন সকালে উঠেই বাজারে দৌড়ায় না। বরং অফিস বা নানান কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় এসব দোকান বা ফুটপাত থেকে সওদা করে নেয়। নগরে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে হাটবাজারের চিত্রও। পুরনো হাট ভেঙে এখন শহরের অধিকাংশ সড়ক ও ফুটপাতগুলো বাজারে পরিণত হয়েছে। (অবশ্য এর বাইরে পরিকল্পিত ও অভিজাত পরিবর্তনও আছে যেমন সুপার স্টোরগুলো। যেখানে পরিবারের সব পণ্য অর্থাৎ সুচ থেকে পারফিউম সবজি থেকে মাছ মাংস সব পণ্য পাওয়া যায়)এখন ফুটপাতে বসছে বাজার যেখানে শুধু শাক-সব্জি নয় রীতিমত মাছের বিশাল বাজার বসে সেখানে। এছাড়া এখন বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে গরুর মাংসের দোকান। বাজার বা হাটের বাইরে এসব দোকান মূলত অননুমোদিত। এসব দোকান ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-পরবে পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় লোকদের উদ্যোগে গরু জবাই হয়। যা ভাগ বা ভাগা করে বিক্রি করা হয়ে থাকে। পাড়ার লোকেরাই এসব মাংস কিনে নেয়। শবে বরাত, শবে কদর, মহররম ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় এখন অনেক পশু জবাই হয়ে থাকে। আমি যে এলাকায় থাকি সে পাড়াতেই গত রমজানেই প্রায় ৬/৭টি গরু জবাই করা হয়েছে। অনেক সময় পাড়ার মানুষের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে বা চক্ষুলজ্জায়ও অনেকে এসব মাংস কিনে থাকেন। তবে এভাবে পশু জবাই ও তার মাংস বিক্রি কতটা আইনসিদ্ধ তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। 

নগরীতে যে কোনো পশু জবাই করার জন্য সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত নির্দিষ্ট কসাইখানা আছে। নিয়ম হলো এখানে পশু জবাই করার আগে তা সিটি কর্পোরেশন নিযুক্ত পশু চিকিৎসক পরীক্ষা করবেন। যে পশুর মাংস মানবদেহের জন্যে ক্ষতিকর নয় শুধুমাত্র সে সব পশু জবাই করে মাংস বিক্রি করার অনুমতি প্রদান করে থাকেন। নির্দিষ্ট চিকিৎসকের সিল ছাড়া এই মাংস মূলত বিক্রির জন্য অনুমোদিত নয়। যদিও অভিযোগ আছে সিটি কর্পোরেশনের এসব কসাইখানায় চিকিৎসকরা নিয়মিতভাবে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না। কসাই বা কসাইখানার কর্মচারীরাই মাংসের গায়ে সিল মেরে দেন। 

এখন প্রশ্ন হলো এভাবে পরীক্ষাবিহীন পশুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্যে কতটা নিরাপদ। কসাইখানায়তো পরীক্ষা হচ্ছে না কে সাথে যারা শহরজুড়ে যেভাবে স্থানীয় মাংসের দোকান গড়ে উঠেছে সেখানেও পশু জবাইয়ের আগে কে করছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অসুস্থ পশুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি স্বরূপ। এ ছাড়া পশুকে দ্রুত মোটা করার জন্যে এমন কিছু ওষুধ খাওয়ান হয় যা পরবর্তীতে মানুষের দেহেও নানা রকম মারাত্মক রোগের জন্ম দিচ্ছে। উন্নত বিশ্বের কোথাও এভাবে প্রকাশ্যে ও পরীক্ষাবিহীন পশু জবাই ও তার মাংস বিক্রি করা আইনসিদ্ধ নয়। এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের দেশে এ কাজটি করা হয় অত্যন্ত অমানবিক ও অনেকটা আদিমভাবে। কোরবান ঈদে বিভিন্ন ওরশ, মেজবান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্যে বসতি সড়ক ও অন্যান্য স্থানে প্রকাশ্যে জবাই করা হয় পশু। ব্যাপারটি দৃষ্টিকটুতো বটেই সাথে সাথে প্রচণ্ড অমানবিকও বটে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশেও কোরবানির পশু এভাবে প্রকাশ্যে জবাই করা যায় না। পশ্চিমা বিশ্বেতো নয়-ই। ওসব দেশে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয় যে কোনো খাদ্য দ্রব্য বিক্রির আগে তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। একটি সভ্য ও আধুনিক সমাজে প্রকাশ্যে পশু জবাই শোভনীয়ও নয়। 

সামনে পবিত্র কোরবানের ঈদ। এই ঈদে লাখ লাখ পশু জবাই হবে আমাদের দেশে এবং তা সবই প্রকাশ্যে জনপদ ও লোকালয়ে। যা খোদ সৌদী আরবেও সম্ভব নয়। ওখানেও লাখ লাখ হাজি কোরবান করেন তবে তা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ও তাদের নিয়ন্ত্রণেই। কাজেই বাংলাদেশেও প্রকাশ্যে পশু জবাই করার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পশু জবাই, যত্রতত্র পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধ করা উচিত। 

বেশি জনসংখ্যার দেশ বলে অনেক সময় অনেক কিছু হয় নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। সামনে কোরবান ঈদে যেখানে লাখ লাখ পশু জবাই হবে সেখানে হয়ত সব পশু পরীক্ষা, নিরীক্ষা করাও নির্দিষ্ট স্থানে জবাই করা সম্ভব হবে না। তবে জনগণ যদি স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে ওঠে,তারা যদি নাগরিক হিসেবে সভ্য হয়ে ওঠে আমার ধারণা এ ব্যবস্থাও তারা নিজেরাই করে নিতে পারবেন নিজেদের উদ্যোগে এবং তা করতে হবে নিজ নিজের পরিবার ও স্বজনদের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরেই। 

সারা শহরকে কসাইখানা না বানিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় এখন শৃঙ্খলা আনয়ন জরুরি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৪

' আজ জাতীয় শোক দিবস '



দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ


কামরুল হাসান বাদল | ১৫ আগষ্ট ২০১৪

                           "... আমরা তখন রুটিন মাফিক ট্রিগার টিপলাম।
                            তোমার বক্ষ বিদীর্ণ করে হাজার হাজার পাখির ঝাঁক
                            পাখা মেলে উড়ে গেলো বেহেশতের দিকে…।
                            … তারপর ডেডস্টপ।

                            তোমার নিষ্প্রাণ দেহখানি সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে, গড়াতে, গড়াতে
                            আমাদের পায়ের তলায় এসে হুমড়ি খেয়ে থামলো।
                            – কিন্তু তোমার রক্তস্রোত থামলো না।
                            সিঁড়ি ডিঙিয়ে, বারান্দার মেঝে গড়িয়ে সেই রক্ত,
                            সেই লাল টকটকে রক্ত বাংলার দূর্বা ছোঁয়ার আগেই
                            আমাদের কর্ণেল সৈন্যদের ফিরে যাবার বাঁশি বাজালেন।"

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেষরাতে সভ্যতার ইতিহাসে বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের চিত্রটি কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় এভাবে এঁকেছেন। যদিও সে রাতের হত্যাকাণ্ডের বর্বরতার সঠিক চিত্রটি আমরা কখনই পাব না। পাব না কারণ তা বিবৃত করার মতো কাউকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি। এমনকি শিশু রাসেলকেও। বস্তুত সে রাতের নির্মমতা ও শোককে প্রকাশ করার সঠিক শব্দ, বাক্য কিংবা উপস্থাপন শৈলীও আমাদের জানা নেই। তারপরেও প্রতিবছর এইদিনটি আসে। গ্লানি, অপমান, বেদনা ও জাতির জনকের মৃত্যুর অপার শোক নিয়ে আসে।

আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। রাজনীতির কবি, ইতিহাসের রাখাল রাজা, বাঙালি জাতির জনক, এই রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ৪০তম মৃত্যুদিবস। তাঁর জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বিখ্যাত শেখ পরিবারে। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান, মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল তাঁর ছোট দাদা শেখ আবদুর রশিদ প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এমই স্কুলে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি তাঁর পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জে চলে যান। ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। তাঁর পিতা ছিলেন আদালতের সেরেস্তাদার। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। খেলাধুলা, গান বাজনা ভীষণ পছন্দ করতেন। তবে ছোটবেলাতেই বেরিবেরি রোগ ও চোখে গ্লুকোমা হওয়ায় তাঁর পড়াশোনার বিরতি ঘটে। ছাত্র থাকাকালীন তাঁর ভেতরে নেতৃত্বসুলভ আচরণ গড়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে, শেরেবাংলা এ কে ফজুলল হক তখন প্রধানমন্ত্রী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী।

তাঁরা দুজন গোপালগঞ্জে এলেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলার ভার পড়ল তাঁর ওপর। সে অনুষ্ঠান শেষে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে পরিচয় আলাপের সুযোগ হয় তাঁর এই পরিচয়ই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি যখন কলকাতায় বেকার হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করছিলেন তখন তাদের ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনে ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশবিভাগের পরে ১৯৪৯ সালে ঐতিহাসিক কারণে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময়ে তিনি কারাগারে থেকেও আন্দোলনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে তিনি সে মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু ‘পূর্ব বাংলা’র পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামকরণের বিরোধিতা করে একটি ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৫৬ সালে ৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করলে তিনি ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি কখনও জেলে কখনও মুক্তভাবে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করলে ৭ মার্চ তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি এক ভাষণ প্রদান করেন যা বিশ্ব ইতিহাসে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ভাষণের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ পরে পাকিস্তানি জান্তা তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে আটক করে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ কার্যত তাঁর নামেই পরিচালিত হয়। ত্রিশ লাখ শহীদ আর প্রায় ৩ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিজয় অর্জিত হলে পাকিস্তান তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিশ্বাসঘাতকের গুলিতে সপরিবারে প্রাণ হারান একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা জনক ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও নিজ নেতৃত্বগুণ, মেধা ও পরিশ্রমে একটি জাতির জনকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। তিনি এমন একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন যা পূর্বে কখনও ছিল না। অর্থাৎ বাঙালিরা হাজার বছরের ইতিহাসে কখনও স্বাধীন ও স্বশাসিত ছিল না। তাঁদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশই প্রথম বাঙালি জাতির স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ইতিহাসের এমন মহানায়ককে হত্যা করা হয়েছিল অত্যন্ত নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে। বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। মাত্র দু দশক সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় একটি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জন করে দিয়েছিলেন। মাত্র ৫১ বছর বয়সে পরিণত হয়েছিলেন একটি জাতির জনকে। তাঁর দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনগণের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা যুগে যুগে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রেরণা হয়ে থাকবে, আদর্শ হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন অনুসরণীয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন যা বিশ্বের একটি অন্যতম সংবিধান হিসেবে বিবেচিত। তিনি রাষ্ট্রের মূল চার স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করে অসীম উদারতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমঅধিকার ও শোষণমুক্ত একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁকে হত্যা করে। এখন তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল তাঁর প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারি শুধু।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 email: qbadal@yahoo.com

বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৪

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী বঙ্গবন্ধু - ৩য় কিস্তি

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ

কামরুল হাসান বাদল | ১৩ আগষ্ট ২০১৪ | প্রথম পাতা

আজ রাজনীতি পরিণত হয়েছে অল্প সময়ে কোটিপতি হওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে। নিজেদের আখের গোছাতেই তৎপর আজ প্রায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। দেশের জন্যে জাতির জন্যে ত্যাগ কাকে বলে বর্তমান রাজনীতির অভিধানে তা বোধ হয় নেই। ক্ষমতার সাথে সাথে নিজেদের ভাগ্য বদলই আজ মুখ্য উদ্দেশ্য অধিকাংশ নেতা কর্মীদের।

মূল সংগঠনের নেতাদের বাদই দিলাম। আজ ছাত্র নেতারাও কোটিপতি। তারা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। নিজস্ব বাড়ি বা ফ্ল্যাটে বসবাস করে চলাফেরা করেন নিজস্ব গাড়িতে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতি করার চেয়ে টেন্ডার আর চাঁদা ভাগাভাগীর রাজনীতিতে ব্যস্ত বেশি তারা। এই অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরাও বাদ যাবে না। অথচ এই ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু স্বয়ং কেমন ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে? দেখা যাক তার নিজের জবানবন্দিতে। (দেশ বিভাগের আগে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার পতন হয়েছে। এমএলএরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন) এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না যে, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি।’ ওই সময়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অনাস’া ভোটের প্রচলন ছিল যেখানে দলীয় এমএলএরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারতেন। এই নিয়মের সুযোগে তৎকালীন এমএলএরা টাকার বিনিময়ে নিজ দলের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস’া ভোট দিতেন। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে বর্তমান ৭০ নং ধারাটির প্রচলন করেছিলেন যেখানে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বা অনাস’া ভোটে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে অর্থাৎ ফ্লোর ক্রস করলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হয়। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পরে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যখন সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুকে আহবান জানাতে গড়িমশি করছিল তখন মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত সকল প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ সরকার পতনের ওই সময়ের একটি ঘটনা। যখন এমএলএদের পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষের টাকা খেয়ে যেনো শহীদ সাহেবের হোসেন শহীদ সোহরাওর্য়াদী বিরুদ্ধে অনাস’া ভোট না দেয়। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এই সময়ে ফজলুর রহমান সাহেব আমাকে ডাকলেন। তিনি চিফ হুইফ ছিলেন। আমাকে বললেন, “আপনাকে এই বারটার সময় আসাম বেঙ্গল ট্রেনে রংপুর যেতে হবে। মুসলিম লীগের একজন এমএলএ যিনি খান বাহাদুরও ছিলেন তাকে নিয়ে আসতে হবে। টেলিগ্রাম করেছি, লোকও পাঠিয়েছি, তবুও আসছেন না। আপনি না গেলে অন্য কেউ আনতে পারবে না।”— খাওয়ার সময় পেলাম না। যুদ্ধের সময় কোথাও খাবার পাওয়া কষ্টকর। ট্রেনে চেপে বসলাম। তখন ট্রেনের কোনো সময়ও ঠিক ছিল না। মিলিটারিদের ইচ্ছেমত চলতো।— রিকশাওয়ালা খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি চেনে, আমাকে ঠিকই পৌঁছে দিল। আমি অনেক ডাকাডাকি করে তাঁকে তুললাম, চিঠি দিলাম। তিনি আমাকে জানেন। বললেন, “আগামীকাল আমি যাবো।” আজ ভোর পাঁচটায় যে ট্রেন আছে সে ট্রেনে যেতে পারবো না। আমি বললাম, তাহলে আপনি চিঠি দিয়ে দিন, আমি ভোর পাঁচটায় ট্রেনে ফিরে যেতে চাই। তিনি বললেন, সেই ভালো হয়। আমাকে জিজ্ঞাস করলেন না কিছু খাব কিনা। পথে খেয়েছি কিনা। বললেন, এখন তো রাত তিনটা বাজে, বিছানার কি দরকার হবে? বললাম দরকার নাই। যে সময়টা আছে বসিয়েই কাটিয়ে দেবো। ঘুমালে আর উঠতে পারবো না খুবই ক্লান্ত। একদিকে পেট টনটন করছে। অন্যদিকে অচেনা রংপুরের মশা। গতরাতে কলকাতার বেকার হোস্টেলে ভাত খেয়েছি। এক গ্লাস পানি দিলে ভালো হয়।— কলকাতায় পৌঁছলাম আরেক সন্ধ্যায়। রাতে আবার হোস্টেলে এসে ভাত খাই।’

৪৮ ঘণ্টার প্রায় অনাহারে কলকাতা-রংপুর-কলকাতা ঘুরে এসেছেন দলীয় সিদ্ধান্তে। এমনি শত শত ঘটনা আছে বঙ্গবন্ধুর জীবনে। বঙ্গবন্ধু কারাগারে একবার অনশন করেছিলেন। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বঙ্গবন্ধু মুক্তির জন্যে আপোষ করেননি। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে যাওয়া বা নিজেকে রক্ষা করার মত কোনো শিক্ষা বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেননি। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নিজের এবং পরিবারের জীবন অনিশ্চয়তায় জেনেও পালিয়ে যাননি তিনি। কারণ পালিয়ে যাওয়ার মত নেতা তিনি নন।

১৯৩৮ সালে তার ছাত্রজীবনের একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘কোনো গণ্যমান্য লোকের ছেলেদের বাকি রাখে নাই। সকাল ন টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কী করে আসবে- থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা লাগছিল। প্রায় দশটার সময় হল মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তাঁর উদ্দেশ্য হলো আমি যেনো সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো। সে আমাকে বলে, মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাওনা। বললাম যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি।

১৫ আগস্ট কাল রাতে উদ্যত মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধু তাঁর তর্জনী উত্তোলন করেছিলেন, ঘাতকরা তাঁর পিঠে গুলি করতে পারেনি। তিনি অসীম সাহসে মৃত্যুর মুখে নিজের বুক পেতে দিয়েছিলেন, পলায়ন কাকে বলে তা জানতেন না বঙ্গবন্ধু।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০১৪

'প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুদিবস আজ'


দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ
১২ আগষ্ট ২০১৪ | শেষের পাতা

কামরুল হাসান বাদল
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘যেমনি বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল।’ বাংলাদেশের সমাজ যখন ক্রমশ বুনো হয়ে উঠছিল তিনি তখন বাঘা তেঁতুলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই তাঁর সে অবস’ান, মতামত, মন্তব্য ও লেখালেখিকে আপোষবাদীরা ঔদ্ধত্য, অশালীন বলেছেন আর তারুণ্যদীপ্ত অনাপোষকারীরা সাহসী, দুর্বিনীত ও প্রথাবিরোধী বলেছেন।

আজ সে বহুমাত্রিক ও প্রথাবিরোধী সাহসী লেখক হুমায়ুন আজাদের ১০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মূর্খতা, ভণ্ডামী, আপোষহীনতা, ধূর্ততা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে গিয়ে, সত্য কথাটি অকপটে বলতে গিয়ে, মৌলবাদকে সরাসরি আক্রমণ করে লিখতে গিয়ে তিনি এইসব অপশক্তির শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাদের আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন আর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আক্রমণের শিকার হতে পারেন জেনেও তিনি ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ এর মতো গ্রন’ রচনা করেছিলেন যেখানে তিনি এই অপশক্তিকে সরাসরি আঘাত করেছিলেন। এছাড়া ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’ (ফেব্রুয়ারি ২০০৩) ‘ধর্মানুভূতির উপকথা ও অন্যান্য’ (ফেব্রুয়ারি ২০০৪) ‘সাম্প্রদায়িকতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে’। গদ্যগ্রন’ ও ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কাব্যগ্রনে’র মাধ্যমে তিনি সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।

নিজে পুরুষ হয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস’ার বিরুদ্ধে ‘নারী’র (১৯৯২) মতো এক অসাধারণ গ্রন’ রচনা করেছিলেন, যা তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। তাঁর অসাধারণ প্রবচনগুচ্ছ বর্তমান সমাজব্যবস’ার বিরুদ্ধে এক শব্দবিপ্লব। সমাজের কপটতা, ধূর্ততা ও শঠতাকে তিনি তাঁর প্রবচনের মাধ্যমে চিত্রণের পাশাপাশি তির্যক আক্রমণও করেছেন। তাঁর একটি অসাধারণ প্রবচন, ‘মানুষ সিংহের প্রশংসা করে কিন’ আসলে গাধাকেই পছন্দ করে’। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় এর চেয়ে সত্য কথা কেউ এমন অকপটে বলেননি।

১৯৮৫ সাল। দেশে তখন জেনারেল এরশাদের স্বৈরতন্ত্র চলছে। সে বছর এপ্রিলে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন’ ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। আজ থেকে আটাশ বছর আগে বাংলাদেশকে নিয়ে যে সংশয় তিনি প্রকাশ করেছিলেন আমরা গভীর বিস্ময়ের সাথে তার সত্যতা দেখতে পাই। বুঝতে পারি হুমায়ুন আজাদের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি আর নিজের দেশ ও কালকে বুঝে ওঠার, তুলে ধরার নিপুণ অকপটতাকে।

তিনি ছিলেন তাঁর সময়ে কিংবা সব সময়ের এক সাহসী সন্তান। তাই তাঁর চিন্তা ছিল মুক্ত ও স্বাধীন।

কাউকে তুষ্ট করতে শেখেননি তিনি এবং সচেতনভাবে তা করতেও চাননি। যে কারণে তিনি যে শুধু ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দ্বারাই সবসময় আক্রান্ত হয়েছেন তা নয়, তিনি তাঁর সহকর্মী, সহলেখক ও নিজের মানুষেরও বিরাগভাজন হয়েছিলেন। যাঁরা সরাসরি সত্য শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

বহুমাত্রিক লেখক ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক এবং কলাম লেখক। তাঁর প্রকাশিত গ্রনে’র সংখ্যা ৭০ এরও বেশি। তাঁর ১০টি কবিতার বই, ১৩টি উপন্যাস, ৮টি কিশোর সাহিত্য, ৭টি ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন’ আছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্যে তিনি লাভ করেছিলেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৬), অগ্রণী শিশুসাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৪) ও মরণোত্তর একুশে পদক (২০১২)। তাঁর সম্পাদনায় বেশকিছু গ্রন’ও প্রকাশিত হয়েছে।

মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে খুব কঠিন ভাষায় আক্রমণ করলেও তাঁর হাতে রচিত হয়েছে ‘আব্বুকে ভালোবাসি’র মতো লেখা। শিশু-কিশোরদের জন্যে তাঁর লেখা ‘লাল-নীল-দীপাবলী’ ও ‘কত নদী সরোবর’ এমন দুটি বই যা পাঠ করে একজন কিশোর শুধু নয় যে কেউ বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করতে পারেন। যে হাতে তিনি পাক যার জমিন সাদ বাদ এর মতো বই লিখেছেন সে হাতে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্যে অত্যন্ত কোমল ও আবেগময় ভাষায় ‘শুভেচ্ছা’র মতো কবিতাও লিখেছেন-

ভালো থেকো ফুল মিষ্টি বকুল
ভালো থেকো
ভালো থেকো ধান ভাটিয়ালি গান
ভালো থেকো
ভালো থেকো মেঘ মিটিমিটি তারা
ভালো থেকো পাখি সবুজ পাতারা…।

এই দুর্বিনীত ভয়হীন মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। এই আপোষকামীতার যুগে, মানিয়ে চলার যুগে, তোষামোদ ও সুবিধাবাদীতার যুগে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রম পুরুষ তরুণরা যার ভেতরে আবিষ্কার করতেন বিদ্রোহ ও বিক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

তিনি লিখেছিলেন-‘এইসব গ্রন’ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র-
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের সুর
গদ্যপদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্ক্স লেলিন,
আর বাঙলার বনের মত আমার শ্যামল কন্যা
রাহুগ্রস্ত সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।’

তারপরেও আজ তাঁর প্রয়াণদিনে আমরা তাঁর ভাষাতেই প্রার্থনা করবো-ভালো থেকো ফুল মিষ্টি বকুল-ভালো থেকো…

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী বঙ্গবন্ধু' - ২য় কিস্তি


কামরুল হাসান বাদল | ১২ আগষ্ট ২০১৪ 
১৯৪৭ এর দেশভাগ ভারতবর্ষের এক রক্তাক্ত ইতিহাসও বটে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শুধু মানচিত্রই ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম সমপ্রীতিও। সে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর অসীম সাহসী ভূমিকার কথা জানা যায় তাঁর আত্মজীবনী মূলক গ্রন’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন অনেক হিন্দু ও মুসলিমের। ’৪৭ এর পরে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে আর চিন্তা কি? এখন ঢাকায় গিয়ে ল’ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করব, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়। যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে পূর্ব বাঙলার ঘরে ঘরে তিনি আন্দোলন ও জনমত তৈরি করেছিলেন সে পাকিস্তানে মাত্র কয়েক মাসেই তার মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি লিখেছেন, “আমি বললাম” এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব (শামসুল হক)।” হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “এই তো দুনিয়া।”

কলকাতা থাকাকালীন তিনি ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছেন। হিন্দুদের হাতে মুসলিম নারী-শিশুদের হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের একসেট ফটোগ্রাফও তিনি মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুজিব লিখছেন, ‘আমরা যখন জেলে তখন এক রক্তক্ষয়ী সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হল কলকাতা ও ঢাকায়। কলকাতায় নিরপরাধ মুসলমান এবং ঢাকা ও বরিশালে নিরপরাধ হিন্দু মারা গেল।’ এ ঘটনায় গ্রেফতার করে অনেককে জেলে পাঠানো হয়। এদের সাথে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন, ‘তাদের কাছে বসে বলি, দাঙ্গা করা উচিত না, যে কোনো দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ। মুসলমানরা কোনো নিরপরাধীকে অত্যাচার করতে পারে না। আল্লাহ ও রসুল নিষেধ করেছেন। হিন্দুদেরও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তারাও মানুষ। হিন্দুস’ানের হিন্দুরা অন্যায় করবে বলে আমরাও অন্যায় করবো-এটা হতে পারে না। ঢাকায় অনেক নামকরা গুণ্ডা প্রকৃতির লোকদের সাথে আলাপ হলো, তারা অনেকেই আমাকে কথা দিল, আর কোনোদিন দাঙ্গা করবে না।’

একটি ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম এবং সে সাথে একটি চরিত্র চিত্রণে তাঁর অসাধারণ মুন্সীয়ানা ধরা পড়ে। ‘সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটা-চলা করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম এমন সময় একজন আধবুড়া কয়েদি, সেও হাসপাতালে ভর্তি আছে আমার কাছে এল এবং মাটিতে বসে পড়ল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন বাড়ি গোপালগঞ্জ থানায় ভেন্না বাড়ি গ্রামে নাম রহিম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম রহিম মিঞা আপনি না আমাদের বাড়িতে চুরি করে সর্বস্ব নিয়ে এসেছিলেন। রহিম মিঞা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। এই ডাকাতের সাথেও পরম আন্তরিকতায় আলাপ চালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁকে দুর্ব্যবহার না করে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শেষে রহিম ডাকাতই বলছে, ‘জানেন জীবনে ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়ে আমি ধরা পড়ি নাই। কিন’ আপনাদের বাড়ি চুরি করার পর যেখানেই গেছি ধরা পড়েছি। জেলে বসে চিন্তা করে দেখলাম, আপনাদের বাড়ি আমাদের পুণ্যস’ান ছিল। সেখানে হাত দিয়ে হাত জ্বলে গেছে। আপনার মা’র কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে বোধহয় পাপমোচন হতো।’

আমি বলছি না, ইতিহাস সাক্ষী দেয় বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাঁকে যারা হত্যা করেছিলেন এবং এসব হত্যাকারীদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও পুনর্বাসন করেছিলেন দেশে বা বিদেশে তাদের কারুরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিচারের মাধ্যমে (দেশে) এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে (ভূট্টো ও গাদ্দাফী) তাঁদের নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

ধর্মীয় হানাহানি ও সাম্প্রদায়িকতার যে বীভৎস রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। যে কারণে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ধর্মীয় হানাহানি বন্ধ করা না গেলে, সব ধর্মের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স’াপন করা না গেলে একটি জাতি ও রাষ্ট্রের সঠিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্ভব নয়।

স্বাভাবিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনায় জাতিকে উদ্ভুদ্ধ করতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকেও তিনি সংবিধানের মূল স্তম্ভ করে নিয়েছিলেন। আর গণতন্ত্র ও শোষণমুক্তির সংগ্রামে লড়াকু এই নেতা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে ধারণ করেছিলেন সংবিধানে। দেশ স্বাধীনের এক বছরের মধ্যে তিনি যে সংবিধানটি প্রণয়ণ করেছিলেন তা চিন্তা, চেতনা মূল্যবোধের দিক দিয়ে বিশ্বের এক অনন্য সংবিধান।


 লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০১৪

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী বঙ্গবন্ধু' - ১ম কিস্তি

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ
কামরুল হাসান বাদল | ১১ আগষ্ট ২০১৪ | প্রথম পাতা
“বন্ধুবান্ধবরা বলে তোমার জীবনী লেখ”। সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলী লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে”। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, “বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনকাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না, আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”….

“হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভাল না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কি? সময় তো কিছু কাটবে। বই ও কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে চোখ দুইটাও ব্যথা হয়ে যায়। তাই খাতাটা নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আমার অনেক কিছুই মনে আছে। স্মরণশক্তিও কিছুটা আছে। দিন তারিখ সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক হবে বলে আশা করি। আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেনু আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেনু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”
এ যাবতকালের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ’ অসমাপ্ত আত্মীজীবনী’র শুরুর অংশবিশেষ এটি। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর চিঠিগুলো যখন ইতিহাসের অংশ হতে দেখতাম, কিংবা বিশ্বের অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী পড়ার, দেখার অথবা শোনার সুযোগ হতো তখন আমি এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু কি কোনোদিন কিছু লিখেননি? তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে কারো কাছে কি একটি চিঠিও লিখেননি। এমন কি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের কাছেও? তিনি লিখলে কেমন লিখতেন। ১৯৭৫ এ তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপরে দীর্ঘকাল তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁকে নিয়ে এতসব অপপ্রচার, নিন্দা আর কুৎসা রটিয়েছিল যে, তা একটি সময় প্রায় সত্যে পরিণত হয়ে উঠেছিল। জার্মানির হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে দশবার প্রচার কর এক সময় তা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে।’ একটি সময়ে এই দেশের অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী (!) বঙ্গবন্ধুকে অর্ধশিক্ষিত বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি ভালবাসা আর শুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ শুনে আমার হীনম্মন্যতা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না আমার জন্যে কিংবা বাঙালি জাতির জন্য কিংবা বিশ্বের সকল ত্যাগী, সৎ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের জন্যে একটি চরম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। আর তা হলো “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শেখ মুজিবুর রহমান। হাতে আসা এবং পাঠের আগ পর্যন্ত। বাঙালির আরেক শ্রেষ্ঠতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। অথচ বঙ্গবন্ধু কত সহজেই না তাঁর জীবনের কথা, দেশের কথা, মানুষ আর রাজনীতির কথা লিখলেন। বাংলাভাষার যে কোনো শক্তিমান লেখকের জন্যে তা এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বর্ণনা চরিত্র চিত্রন, ঘটনার সূক্ষ্ম বর্ণনা ভাষাশৈলী সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি একদিকে ইতিহাসের আকর হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসের মতো গতিশীল ও সুখপাঠ্য। সততা হচ্ছে একজন লেখকের প্রধান শক্তি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কেমন, তার কয়েকটি বর্ণনা তুলে দিচ্ছি। ‘তখন পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট চলছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি হুকুম দিলেন কলকাতার বড় বাজার ঘেরাও করতে। সেখানে গুদামের পর গুদাম চাউলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কাপড় গুদামজাত করে রেখেছিল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। শহীদ সাহেব এসব উদ্ধার করলেন বটে তবে মাড়োয়ারিরা তার বদলা নিতে কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে কয়েকজন এমএলএকে কিনে নেয়। এরপরে লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটে প্রবর্তিত হয় গভর্নর এর শাসন। এমন পরিস্থিতির পরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রীত্ব নাই, তখন দেখি টুপি ও পাগড়ি পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈ চৈ করতে আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে, আরও অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম, ওরা ভাগতে শুরু করলো।” সাধারণত আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের দুর্বলতার কথাগুলো প্রকাশ করেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তিনি অত্যন্ত সততার সাথে তাঁর জীবনের এই অংশগুলোও প্রকাশে দ্বিধা করেন নি। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব। আবুল হাশিম সাহেব মিল্লাত পত্রিকার প্রেস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলে বললো “তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।” বললাম, ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।” এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু হাশিম সাহেবের সাথে রেগে কথা বলেছিলেন। এরপর তিনি লিখেছেন, “পরের দিন ঐ সমস্ত বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বললো, “হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, মুজিব আমাকে অপমান করলো।” “আমি হাশিম সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম, আপনি মনে কিছু করবেন না। আমার এভাবে কথা বলা অন্যায় হয়েছে, আপনি যা ভাল বোঝেন তাই করুন। আমার কিছুই বলার নাই।” হাশিম সাহেব হিন্দুস্থানে থাকবেন, আমি চলে আসবো পাকিস্তান। আমার বাড়িও পাকিস্তানে। আমি যাওয়াতে তিনি খুশী হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্নমত হতে পারি কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটাতো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোন দিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেবো, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকতো না।” “আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করবো ঠিক করি তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com Google+

শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০১৪

'রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও অন্যান্য'


দৈনিক আমাদের সময়
 আগষ্ট ০৯,২০১৪

-কামরুল হাসান বাদল

কাল সকালে পত্রিকা খুলে কোনও পাঠক যদি এমন একটি সংবাদ পড়ে যে, নরওয়ের সব অধিবাসী কয়েক দিনের ছুটি কাটাতে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, কেমন চমকপ্রদ হবে তা? অথবা সুইজারল্যান্ডের সব জনগণ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সব মানুষ?

এমন ঘটনা হয়তো কখনোই ঘটবে না, তবে আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গটি তুললাম। কেন তুললাম তা বলার আগে আপাতত এই কয়েকটি দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার বিষয়ে একটু ধারণা দিই। সুইডেনের আয়তন ১৭৩,৮৬০ বর্গমাইল বা ৪৫০২৯৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৯৫ লাখ। নরওয়ের আয়তন ৩৮৫,২৫২ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪৯ লাখ। সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ৭৫০৭০০০ (পঁচাত্তর লাখ সাত হাজার) আর মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের মোট জনসংখ্যা হবে ৫০ লাখের কাছাকাছি। নরওয়ের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মাত্র দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে যদি অন্যত্র ছুটি কাটাতে যায় তখন কী হতে পারে পরিস্থিতি। তা-ও আবার ৩,৮৫,২৫২ বর্গকিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ। বিশ্বের অন্যতম ধনী ও আধুনিক এই রাষ্ট্রের পক্ষে কি সম্ভব এত বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুচারুভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া? এত যানবাহন, এত অবকাঠামো এবং এত এত সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও। অন্যতম ধনী দেশ সুইজারল্যান্ড, যার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। কিংবা বিশাল দেশ আর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো?

অথচ বাংলাদেশে এমন ঘটনাই ঘটছে অন্তত বছরে দুবার এবং তা বছরের পর বছর ধরে। শুধু তাই নয়, নরওয়ে বা সুইজারল্যান্ড কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মতো বিস্তীর্ণ ও বিশাল এলাকা থেকে নয়। মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা থেকে নরওয়ে কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান মানুষ দুই ঈদের আগে মাত্র দুই বা তিন দিনের ব্যবধানে রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছে।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এ দেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি। শুধু রাজধানী ঢাকায়ই বাস করে এক কোটি ২০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য মতে, শুধু ঢাকা শহর থেকে প্রতি ঈদে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বা অন্যান্য জেলায় গমন করে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে যায় মাত্র দুই বা তিন দিনের ব্যবধানে।

রমজান ও ঈদ কাছাকাছি এলে আমাদের সংবাদমাধ্যমজুড়ে থাকে দুটি বিষয়। রমজানের আগে থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত কোন পণ্যের দাম কত? কোন পণ্যের দাম বাড়ল বা কমল এবং কাঁচামরিচ, বেগুন ইত্যাদির মতো দুয়েকটি পণ্যের দাম কীভাবে হঠাৎ আকাশচুম্বী হল তা। আর ঈদের আগে কোন শপিংমলে কী পাওয়া যায়, এবারের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক তার দাম ইত্যাদি। বিষয়গুলো দৈনন্দিন ও উৎসব-সংশ্লিষ্ট বলে পাঠক বা দর্শকেরও জানার আগ্রহ থাকে। তবে ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকে শুরু হওয়া ট্রেন, বাস, স্টিমারের টিকিট বিড়ম্বনা ও যাত্রী হয়রানির সংবাদ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি। মানুষের বাড়ি যাওয়ার আকাক্সক্ষা, প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দ, লটারি পাওয়ার মতো যানবাহনের টিকিট পাওয়ার আনন্দ, বাস, স্টিমারের টিকিটের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের শিডিউল বিপর্যয় এবং অনিবার্য নিয়তির মতো দুর্ঘটনার সংবাদ আমি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। অবশ্য শুধু আমি নই, দেশের প্রায় মানুষই তা দেখেন বা জানার চেষ্টা করেন। ঈদের আনন্দের মধ্যে মাঝে মাঝে দুর্ঘটনার খবর হরিষে বিষাদ হয়ে আসে আমাদের জীবনে।

অন্যদের বেলায় কী হয় জানি না, তবে আমি ভীষণ অবাক হই। বিস্মিত হই এবং প্রতিবারেই আমার বিস্ময়ের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। আমি ভাবতে থাকি এটি কী করে সম্ভব! এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত দেশে, যেখানে সুষ্ঠু কোনও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই, সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। আধুনিক ট্রেন নেই, ভালো সড়ক নেই, আধুনিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসমৃদ্ধ নৌপরিবহনব্যবস্থা নেই, এমন একটি দেশে তা সম্ভব হয়ে উঠছে কী করে! টিকিট পাব না পাব না বলে এক সময়ে ঠিকই টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, যেতে পারব পারব না করে এক সময়ে ঠিকই বাড়ি যাওয়া হচ্ছে। এই অসাধারণ কর্মযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত কী করে সম্ভব হয়ে উঠছে। ভাঙা সড়ক, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি, ফিটনেসহীন স্টিমার, বৈরী আবহাওয়া, পুরনো ও সেকেলে বগি, সংস্কারবিহীন রেলপথ, কী করে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পারল। তা-ও আবার মাত্র দুটি রেলস্টেশন (কমলাপুর ও বিমানবন্দর), একটি স্টিমারঘাট (সদরঘাট) ও মাত্র কয়েকটি বাস স্টেশন থেকে। (দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরের হিসাব এখানে ধরা হল না) ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের ওই সব ধনী দেশ কী এর চেয়ে সুচারুভাবে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পারত? আমার ভীষণ ইচ্ছে হয়, তেমন একটি বাস্তবতা দেখতে।

ঈদের আগে ও পরে বেশ কদিন ধরে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো অনবরত নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে থাকে। কোথায় ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হল, কোথায় কোন কাউন্টারে টিকিট পাওয়া গেল না। টিকিট পাওয়া গেলেও দাম বেশি নিচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু একবারও কেউ প্রচার করে না, এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পুরো সিস্টেমে কেমন একটু নড়াচড়া হতে পারে। আমার তো মনে হয়, বাংলাদেশের বর্তমান যে সক্ষমতা তার তুলনায় এই কাজটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং ‘ওভারলোডেড’ তো বটেই। আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না ভাঙাচোরা সড়ক, দীর্ঘ যানজট আর প্রায় পুরনো গাড়িগুলো এত লাখ লাখ মানুষ পরিবহন করে কীভাবে। শত বছরের পুরনো সংস্কারবিহীন রেলপথ এত যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছয় কী করে! আর বেশিরভাগ লঞ্চ-স্টিমার ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী নিয়ে বৈরী আবহাওয়ায় যাত্রী পরিবহন করে কী করে। অন্য কোনও দেশে বাংলাদেশের মতো সক্ষমতা নিয়ে এর চেয়ে ভালো সেবা কি পাওয়া যেত! আমার জানার বড় আগ্রহ। কারণ আমাদের কোনও সংবাদমাধ্যম আজ পর্যন্ত এক প্রকার অসাধ্য সাধনের গল্প বা চিত্রটি ইতিবাচকভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেনি। শুধু ব্যর্থতার চিত্র নয়- সাফল্যের চিত্রও সমানভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাই প্রধান বৈশিষ্ট্য সেখানে এ ধরনের সফলতার কাহিনি প্রচার হওয়া বড্ড প্রয়োজন। আমার মনে হয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু পাল্টানো দরকার। যে বাসচালক ও হেলপার দিনের পর দিন বিশ্রামহীনভাবে কখনও ৪৮ ঘণ্টারও বেশি বাসের ওপরে কাটাল, যে লোকোমোটিভ মাস্টার নির্ঘুম রাত জেগে ট্রেনটিকে গন্তব্যে পৌঁছাল কিংবা যাদের অকান্ত পরিশ্রমে দুই ঈদের এই মহাযজ্ঞ সমাধা হয় তাদের কথাও একটু তুলে ধরা দরকার। তাদের পক্ষেও দু-চার বাক্য ব্যয় করা দরকার।

তবে তার পরও কথা থাকে। কথা থাকে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ঈদের আনন্দ নিয়ে, তাদের যাত্রার বিড়ম্বনা আর দুর্ঘটনা নিয়ে আরও কথা থাকে। আর তা হল এই বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ থেকে মানুষকে একটু স্বস্তি ও মুক্তি দিতে ঈদের ছুটি নিয়ে কথা থাকে। যে যাই বলুক রমজানে এমনিতেই বিপুল শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, বিশেষ করে সরকারি, আধা-সরকারি ও কিছু কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে পুরো রমজান মাসেই কাজ চলে ঢিলেঢালাভাবে, অধিকাংশ অফিসে জোহরের নামাজের পর তেমন কোনও কাজই হয় না। অবশ্য যেসব প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরে ঘুষের কাজ আছে তার চিত্র ভিন্ন। এসব অফিসে শবেকদরের পরে ‘সিরিয়াসলি’ কোনও কাজ হয় বলে মনে হয় না। তাই আমার মনে হয় ঈদের ছুটি শবেকদরের বন্ধের সঙ্গেই শুরু হলে যানবাহন বা বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে অত্যধিক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে ঈদের ছুটি মাত্র তিন দিন। এর আগে পরে লাগোয়া সাপ্তাহিক বন্ধ পড়লে তা কিছুটা দীর্ঘ হয়। কাজেই ঈদে অত্যাবশ্যকীয় যেমন পরিবহন, আইনশৃঙ্খলা, চিকিৎসার মতো কিছু বিভাগ ছাড়া সরকারি অন্যান্য বিভাগে একটু আগে ছুটি দিলে ঈদের দুদিন আগের চাপ অনেকটা কমে আসত। তাতে অন্তত যানবাহন খাতে অরাজকতা ও দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশের মানুষ নগরবাসী হয়েছে সম্প্রতি। এখনও গ্রামেই রয়ে গেছে তাদের নাড়ির টান। কাজেই প্রতি ঈদে নগরবাসীর একটি বিশাল অংশ বাড়ি ফিরবে। আমাদের সীমিত সাধ্য ও ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে ঈদের ছুটি যদি আরও দুদিন বাড়ানো যায়, আমার ধারণা তাতে মানুষের আনন্দ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ঝামেলাও অনেকাংশে কমে যাবে। 

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

পোস্টসমূহ