দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ
কামরুল হাসান বাদল | ১৩ আগষ্ট ২০১৪ | প্রথম পাতা
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+
কামরুল হাসান বাদল | ১৩ আগষ্ট ২০১৪ | প্রথম পাতা
আজ রাজনীতি পরিণত হয়েছে অল্প সময়ে কোটিপতি হওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে। নিজেদের আখের গোছাতেই তৎপর আজ প্রায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। দেশের জন্যে জাতির জন্যে ত্যাগ কাকে বলে বর্তমান রাজনীতির অভিধানে তা বোধ হয় নেই। ক্ষমতার সাথে সাথে নিজেদের ভাগ্য বদলই আজ মুখ্য উদ্দেশ্য অধিকাংশ নেতা কর্মীদের।
মূল সংগঠনের নেতাদের বাদই দিলাম। আজ ছাত্র নেতারাও কোটিপতি। তারা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। নিজস্ব বাড়ি বা ফ্ল্যাটে বসবাস করে চলাফেরা করেন নিজস্ব গাড়িতে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতি করার চেয়ে টেন্ডার আর চাঁদা ভাগাভাগীর রাজনীতিতে ব্যস্ত বেশি তারা। এই অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরাও বাদ যাবে না। অথচ এই ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু স্বয়ং কেমন ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে? দেখা যাক তার নিজের জবানবন্দিতে। (দেশ বিভাগের আগে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার পতন হয়েছে। এমএলএরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন) এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না যে, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি।’ ওই সময়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অনাস’া ভোটের প্রচলন ছিল যেখানে দলীয় এমএলএরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারতেন। এই নিয়মের সুযোগে তৎকালীন এমএলএরা টাকার বিনিময়ে নিজ দলের বিরুদ্ধে সংসদে অনাস’া ভোট দিতেন। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে বর্তমান ৭০ নং ধারাটির প্রচলন করেছিলেন যেখানে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বা অনাস’া ভোটে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে অর্থাৎ ফ্লোর ক্রস করলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হয়। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পরে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যখন সরকার গঠনে আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুকে আহবান জানাতে গড়িমশি করছিল তখন মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত সকল প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ সরকার পতনের ওই সময়ের একটি ঘটনা। যখন এমএলএদের পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষের টাকা খেয়ে যেনো শহীদ সাহেবের হোসেন শহীদ সোহরাওর্য়াদী বিরুদ্ধে অনাস’া ভোট না দেয়। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এই সময়ে ফজলুর রহমান সাহেব আমাকে ডাকলেন। তিনি চিফ হুইফ ছিলেন। আমাকে বললেন, “আপনাকে এই বারটার সময় আসাম বেঙ্গল ট্রেনে রংপুর যেতে হবে। মুসলিম লীগের একজন এমএলএ যিনি খান বাহাদুরও ছিলেন তাকে নিয়ে আসতে হবে। টেলিগ্রাম করেছি, লোকও পাঠিয়েছি, তবুও আসছেন না। আপনি না গেলে অন্য কেউ আনতে পারবে না।”— খাওয়ার সময় পেলাম না। যুদ্ধের সময় কোথাও খাবার পাওয়া কষ্টকর। ট্রেনে চেপে বসলাম। তখন ট্রেনের কোনো সময়ও ঠিক ছিল না। মিলিটারিদের ইচ্ছেমত চলতো।— রিকশাওয়ালা খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি চেনে, আমাকে ঠিকই পৌঁছে দিল। আমি অনেক ডাকাডাকি করে তাঁকে তুললাম, চিঠি দিলাম। তিনি আমাকে জানেন। বললেন, “আগামীকাল আমি যাবো।” আজ ভোর পাঁচটায় যে ট্রেন আছে সে ট্রেনে যেতে পারবো না। আমি বললাম, তাহলে আপনি চিঠি দিয়ে দিন, আমি ভোর পাঁচটায় ট্রেনে ফিরে যেতে চাই। তিনি বললেন, সেই ভালো হয়। আমাকে জিজ্ঞাস করলেন না কিছু খাব কিনা। পথে খেয়েছি কিনা। বললেন, এখন তো রাত তিনটা বাজে, বিছানার কি দরকার হবে? বললাম দরকার নাই। যে সময়টা আছে বসিয়েই কাটিয়ে দেবো। ঘুমালে আর উঠতে পারবো না খুবই ক্লান্ত। একদিকে পেট টনটন করছে। অন্যদিকে অচেনা রংপুরের মশা। গতরাতে কলকাতার বেকার হোস্টেলে ভাত খেয়েছি। এক গ্লাস পানি দিলে ভালো হয়।— কলকাতায় পৌঁছলাম আরেক সন্ধ্যায়। রাতে আবার হোস্টেলে এসে ভাত খাই।’
৪৮ ঘণ্টার প্রায় অনাহারে কলকাতা-রংপুর-কলকাতা ঘুরে এসেছেন দলীয় সিদ্ধান্তে। এমনি শত শত ঘটনা আছে বঙ্গবন্ধুর জীবনে। বঙ্গবন্ধু কারাগারে একবার অনশন করেছিলেন। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বঙ্গবন্ধু মুক্তির জন্যে আপোষ করেননি। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে যাওয়া বা নিজেকে রক্ষা করার মত কোনো শিক্ষা বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেননি। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নিজের এবং পরিবারের জীবন অনিশ্চয়তায় জেনেও পালিয়ে যাননি তিনি। কারণ পালিয়ে যাওয়ার মত নেতা তিনি নন।
১৯৩৮ সালে তার ছাত্রজীবনের একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘কোনো গণ্যমান্য লোকের ছেলেদের বাকি রাখে নাই। সকাল ন টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরও অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কী করে আসবে- থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা লাগছিল। প্রায় দশটার সময় হল মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তাঁর উদ্দেশ্য হলো আমি যেনো সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করতো। সে আমাকে বলে, মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাওনা। বললাম যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি।
১৫ আগস্ট কাল রাতে উদ্যত মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধু তাঁর তর্জনী উত্তোলন করেছিলেন, ঘাতকরা তাঁর পিঠে গুলি করতে পারেনি। তিনি অসীম সাহসে মৃত্যুর মুখে নিজের বুক পেতে দিয়েছিলেন, পলায়ন কাকে বলে তা জানতেন না বঙ্গবন্ধু।
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন