পৃষ্ঠাসমূহ

মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০১৪

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী বঙ্গবন্ধু' - ২য় কিস্তি


কামরুল হাসান বাদল | ১২ আগষ্ট ২০১৪ 
১৯৪৭ এর দেশভাগ ভারতবর্ষের এক রক্তাক্ত ইতিহাসও বটে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শুধু মানচিত্রই ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম সমপ্রীতিও। সে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর অসীম সাহসী ভূমিকার কথা জানা যায় তাঁর আত্মজীবনী মূলক গ্রন’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন অনেক হিন্দু ও মুসলিমের। ’৪৭ এর পরে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে আর চিন্তা কি? এখন ঢাকায় গিয়ে ল’ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করব, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়। যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে পূর্ব বাঙলার ঘরে ঘরে তিনি আন্দোলন ও জনমত তৈরি করেছিলেন সে পাকিস্তানে মাত্র কয়েক মাসেই তার মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি লিখেছেন, “আমি বললাম” এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব (শামসুল হক)।” হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “এই তো দুনিয়া।”

কলকাতা থাকাকালীন তিনি ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছেন। হিন্দুদের হাতে মুসলিম নারী-শিশুদের হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের একসেট ফটোগ্রাফও তিনি মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুজিব লিখছেন, ‘আমরা যখন জেলে তখন এক রক্তক্ষয়ী সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হল কলকাতা ও ঢাকায়। কলকাতায় নিরপরাধ মুসলমান এবং ঢাকা ও বরিশালে নিরপরাধ হিন্দু মারা গেল।’ এ ঘটনায় গ্রেফতার করে অনেককে জেলে পাঠানো হয়। এদের সাথে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন, ‘তাদের কাছে বসে বলি, দাঙ্গা করা উচিত না, যে কোনো দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ। মুসলমানরা কোনো নিরপরাধীকে অত্যাচার করতে পারে না। আল্লাহ ও রসুল নিষেধ করেছেন। হিন্দুদেরও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তারাও মানুষ। হিন্দুস’ানের হিন্দুরা অন্যায় করবে বলে আমরাও অন্যায় করবো-এটা হতে পারে না। ঢাকায় অনেক নামকরা গুণ্ডা প্রকৃতির লোকদের সাথে আলাপ হলো, তারা অনেকেই আমাকে কথা দিল, আর কোনোদিন দাঙ্গা করবে না।’

একটি ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম এবং সে সাথে একটি চরিত্র চিত্রণে তাঁর অসাধারণ মুন্সীয়ানা ধরা পড়ে। ‘সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটা-চলা করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম এমন সময় একজন আধবুড়া কয়েদি, সেও হাসপাতালে ভর্তি আছে আমার কাছে এল এবং মাটিতে বসে পড়ল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন বাড়ি গোপালগঞ্জ থানায় ভেন্না বাড়ি গ্রামে নাম রহিম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম রহিম মিঞা আপনি না আমাদের বাড়িতে চুরি করে সর্বস্ব নিয়ে এসেছিলেন। রহিম মিঞা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। এই ডাকাতের সাথেও পরম আন্তরিকতায় আলাপ চালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁকে দুর্ব্যবহার না করে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শেষে রহিম ডাকাতই বলছে, ‘জানেন জীবনে ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়ে আমি ধরা পড়ি নাই। কিন’ আপনাদের বাড়ি চুরি করার পর যেখানেই গেছি ধরা পড়েছি। জেলে বসে চিন্তা করে দেখলাম, আপনাদের বাড়ি আমাদের পুণ্যস’ান ছিল। সেখানে হাত দিয়ে হাত জ্বলে গেছে। আপনার মা’র কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে বোধহয় পাপমোচন হতো।’

আমি বলছি না, ইতিহাস সাক্ষী দেয় বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাঁকে যারা হত্যা করেছিলেন এবং এসব হত্যাকারীদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও পুনর্বাসন করেছিলেন দেশে বা বিদেশে তাদের কারুরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিচারের মাধ্যমে (দেশে) এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে (ভূট্টো ও গাদ্দাফী) তাঁদের নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

ধর্মীয় হানাহানি ও সাম্প্রদায়িকতার যে বীভৎস রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। যে কারণে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ধর্মীয় হানাহানি বন্ধ করা না গেলে, সব ধর্মের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স’াপন করা না গেলে একটি জাতি ও রাষ্ট্রের সঠিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্ভব নয়।

স্বাভাবিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনায় জাতিকে উদ্ভুদ্ধ করতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকেও তিনি সংবিধানের মূল স্তম্ভ করে নিয়েছিলেন। আর গণতন্ত্র ও শোষণমুক্তির সংগ্রামে লড়াকু এই নেতা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে ধারণ করেছিলেন সংবিধানে। দেশ স্বাধীনের এক বছরের মধ্যে তিনি যে সংবিধানটি প্রণয়ণ করেছিলেন তা চিন্তা, চেতনা মূল্যবোধের দিক দিয়ে বিশ্বের এক অনন্য সংবিধান।


 লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ