দৈনিক আজাদী উপ-সম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
২২ জুন শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ৮ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ১ শাবান ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
ক্রমেইএকাকী, নিসঙ্গ আর সংকীর্ণ হয়ে পড়ছিল পুকুরটি। তার চতুষ্পার্শে গজিয়ে উঠেছে সুউচ্চ দালান। চারপাশের নোংরা পানিতে কবেই শুদ্ধতা হারিয়েছে এই জলধারিণী। অথচ শত বছর ধরে এই এলাকার অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, পরিবেশকে শীতল করেছে আর আমিষের জন্যে যোগান দিয়েছে মাছের। কত কালের সাক্ষী, কত ঘটনা আর কতো কতো মানুষের অসংখ্য স্মৃতির মুন্সি পুকুর আজ বিপন্নের সম্মুখীন। কিছু অর্থলোলুপ, ভূমি দস্যু ও প্রকৃতি বিনাশী মানুষের লোভের থাবায় হারিয়ে যেতে বসেছে চকবাজার এলাকার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই পুকুরটি। কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশের কিছু শ্রেণীর মানুষ আবাসন ব্যবসার নামে দেশের খাল- বিল- নদী- নালা-পুকুর জলাশয় এমনকি সাগর পর্যন্ত দখল করে নেয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এদের হাত থেকে ভবিষ্যতে হয়ত কবরস্থান, শ্মশানের মতো জায়গাগুলোও পরিত্রাণ পাবে না। এই ধারায় বেশ কয়েক বছর ধরে পুকুরটি ভরাট করে তার ওপর বিল্ডিং বানানোর পাঁয়তারায় এটিকে ইচ্ছেমতো দূষণ করা হয়েছে। রাতের আঁধারে ময়লা ও মাটি ফেলতে ফেলতে সবার অলক্ষে এর অনেক অংশ অনেক আগেই ভরাট করে ফেলা হয়েছিল। এবং শেষে প্রকাশ্যে পুকুরটি ভরাট করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হলে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠন। অবশষে শত বছরের পুরোনো মুন্সিপুকুর দখল, মাটি ভরাট ও ভবন নির্মাণের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গত রোববার ১৭ জুন এই আদেশ প্রদান করেন বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি ফরিদ আহম্মদের আদালত। তার আগে ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি অবৈধ দখল, মাটি ভরাট এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগের বিষয়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও এখলাস উদ্দিন ভূঁইয়া একটি রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তিন মাসের এই স্থগিতাদেশ দেয়। এই আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার, চসিক ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পাঁচলাইশ থানার ওসিকে। এই পুকুরে মাটি ভরাট ভবন নির্মাণ ও দখলকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং পুকুরটি সংরক্ষণে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানাতে বিবাদিদের চার সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুসারে কোন পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি।
২২ জুন শুক্রবার ২০১২ খ্রি. ৮ আষাঢ় ১৪১৯ সাল ১ শাবান ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
ক্রমেইএকাকী, নিসঙ্গ আর সংকীর্ণ হয়ে পড়ছিল পুকুরটি। তার চতুষ্পার্শে গজিয়ে উঠেছে সুউচ্চ দালান। চারপাশের নোংরা পানিতে কবেই শুদ্ধতা হারিয়েছে এই জলধারিণী। অথচ শত বছর ধরে এই এলাকার অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, পরিবেশকে শীতল করেছে আর আমিষের জন্যে যোগান দিয়েছে মাছের। কত কালের সাক্ষী, কত ঘটনা আর কতো কতো মানুষের অসংখ্য স্মৃতির মুন্সি পুকুর আজ বিপন্নের সম্মুখীন। কিছু অর্থলোলুপ, ভূমি দস্যু ও প্রকৃতি বিনাশী মানুষের লোভের থাবায় হারিয়ে যেতে বসেছে চকবাজার এলাকার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই পুকুরটি। কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশের কিছু শ্রেণীর মানুষ আবাসন ব্যবসার নামে দেশের খাল- বিল- নদী- নালা-পুকুর জলাশয় এমনকি সাগর পর্যন্ত দখল করে নেয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এদের হাত থেকে ভবিষ্যতে হয়ত কবরস্থান, শ্মশানের মতো জায়গাগুলোও পরিত্রাণ পাবে না। এই ধারায় বেশ কয়েক বছর ধরে পুকুরটি ভরাট করে তার ওপর বিল্ডিং বানানোর পাঁয়তারায় এটিকে ইচ্ছেমতো দূষণ করা হয়েছে। রাতের আঁধারে ময়লা ও মাটি ফেলতে ফেলতে সবার অলক্ষে এর অনেক অংশ অনেক আগেই ভরাট করে ফেলা হয়েছিল। এবং শেষে প্রকাশ্যে পুকুরটি ভরাট করে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হলে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠন। অবশষে শত বছরের পুরোনো মুন্সিপুকুর দখল, মাটি ভরাট ও ভবন নির্মাণের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গত রোববার ১৭ জুন এই আদেশ প্রদান করেন বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি ফরিদ আহম্মদের আদালত। তার আগে ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি অবৈধ দখল, মাটি ভরাট এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগের বিষয়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও এখলাস উদ্দিন ভূঁইয়া একটি রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তিন মাসের এই স্থগিতাদেশ দেয়। এই আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার, চসিক ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পাঁচলাইশ থানার ওসিকে। এই পুকুরে মাটি ভরাট ভবন নির্মাণ ও দখলকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং পুকুরটি সংরক্ষণে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানাতে বিবাদিদের চার সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুসারে কোন পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি।
এখন কথা হলো মাননীয় আদালত তিন মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন ভাল কথা, কিন্তু তারপর? সমাজের এই অর্থলোলুপ দানবদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা থেকে রেহাই পাবে তো মুন্সিপুকুর? নাকি দেশের হাজার হাজার জলাধারের বা পুকুরদিঘির নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো ভাগ্যবরণ করে নিতে হবে শতবর্ষী এই পুকুরকে? মুন্সিপুকুরের দিকে হাত বাড়িয়েছিল যারা, তারা বড়ই ক্ষমতাশালী। এদের অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার দাপটের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারেন যে কেউ। এদেশে তো বিক্রি হয়ে যাওয়ার লোকের অভাব নেই। কেউ কম দামে কেউ বা বেশি দামে, আর যারা দাম পান না তাঁরা বাইরে বাইরে সততার ভান ধরেন শুধু। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে তা এতই নগণ্য যে তাদের শক্তিশালী বীক্ষণযন্ত্রেও খুঁজে পাওয়া দায়। (এই ব্যতিক্রমী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা) এমন একটি শক্তির হাতে পড়ে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আসকার দিঘির অস্তিত্বও আজ বিলীন হওয়ার পথে।
প্রায় ৩৪০ বছর আগে মোঘল সম্রাট কর্তৃক এই এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে এসেছিলেন আসকর খাঁ। ১৬৬৯ থেকে ১৬৭১ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলে প্রজাদের পানীয় জলের সুবিধার্থে এই দিঘিটি খনন করেছিলেন তিনি। প্রায় ৫ কানি জমির ওপর খনন করা এই দিঘিটি তাঁর নামানুসারেই পরিচিতি হয় আসকার দিঘি বলে। শত শত বছর এই দিঘিটি আশেপাশের অসংখ্য মানুষের পানীয় জল ছাড়াও দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়েছে। মোঘলদের পরে এই দিঘি আনোয়ারার জমিদার যোগেশ চন্দ্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে লিজ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হাত বদল হয়ে আজ যাঁদের মালিকানায় গিয়ে ঠেকেছে তাঁরা আজ ঐতিহ্যবাহী এই দিঘিকে কৌশলে ভরাট করে তার ওপর আবাসন প্রকল্প গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে গেলেও প্রশাসন ও জনগণ আজ নিশ্চুপ ও নির্বিকার। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এক সময়ের নয়নাভিরাম এই দিঘিটি আজ দেখে মনে হবে যেনো একটি আস্ত ডোবা। পুরোটাই কচুরিপানায় ভর্তি। দিঘির বিশাল একটি অংশ ইতোমধ্যেই ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পাড়সহ ভরাট করা অংশে অনেক পাকা ভবনও তৈরি করা হয়েছে। এক সময় সাধারণ মানুষের পানীয় জলের জন্যে খনন করা এই দিঘির পানিকে সুকৌশলে এমন দূষিত করা হয়েছে যে, তা আজ কাপড় চোপড় বা থালা বাসন ধোয়ারও অযোগ্য। দু’দশক আগেও দিঘির উত্তর পাড় শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ সড়ক দিয়ে আসতে যেতে চোখে পড়তো সুবিশাল এই দিঘিটি। বিকেল হতে অনেক রাত পর্যন্ত দিঘির পাড়ে মানুষ ঘুরতে আসতো, আড্ডা দিতো, দুঃসহ গরমের মৌসুমে গভীর রাত অবধি মানুষ হাওয়া খেতে আসতো। আজ সেসব স্থানে গড়ে উঠেছে আসবাবপত্রের দোকান। দোতলা এই দোকানগুলোর উপরের তলায় শো রুম আর নিচের তলায় কারখানা। সে কারখানা ও কারখানার শ্রমিকদের যাবতীয় বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয় দিঘির জলে। কচুরিপানায় ভর্তি এই দিঘি দেখে আর বোঝার উপায় নেই ভরতে ভরতে এর অবস্থা এখন প্রকৃত কী রূপ। আশেপাশে বাস করা লোকদের কাছ থেকে শোনা কচুরিপানার তিন থেকে চার ফুট নিচেই এখন দিঘির তলদেশ। এভাবে চললে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দিঘিটি ভরে একটি মাঠে পরিণত হবে। আর এর মালিকপক্ষ এই সুযোগটির জন্যেই অপেক্ষা করছেন। কারণ তখন তাকে আর জলাধার সংরক্ষণ আইনের ঝামেলায় যেতে হবে না। অথচ সংরক্ষণ করা হলে এই দিঘিটিও হতে পারতো নগরবাসীর বিনোদনের একটি অন্যতম স্থান। এর চারপাশে ঘাট বাঁধিয়ে দিয়ে পায়ে চালিত নৌকার ব্যবস্থা করা গেলে মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি দিঘিটি বাঁচতো, রক্ষা পেতো পরিবেশ আর মালিকপক্ষও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। কিন্তু মালিক পক্ষ তা করবেন না, কারণ আবাসন শিল্পে এখন যে লাভ তার তুলনায় এ ধরনের উপার্জন তাদের কাছে নস্যি। আমাদের দেশের শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের কাছে “সোস্যাল রেসপনসিবিলিটি” বা সামাজিক দায়বদ্ধতা বলতে যে একটি ধারণা আছে সে ব্যাপারে কোনরূপ জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি প্রায় সাড়ে তিন’শ বছরের এই দীঘিটিকে জাতীয় ঐতিহ্য ঘোষণা করে একে রক্ষা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। কুমিল্লার ধর্মসাগরের মতো এই দিঘি নগরবাসীর জন্যে অবারিত করা হোক।
’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে চট্টগ্রামে দিঘি ও পুকুরের সংখ্যা ছিল ১৫০০০ এরও বেশি। ছয় বছর আগের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল এই সংখ্যা মাত্র ১৮০০ মতো। আর এই লেখাটি যখন লিখছি তখন এর প্রকৃত সংখ্যা কত তা বলার মতো কর্তৃপক্ষও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকার একটি পানি আইন প্রণয়ন করেছে এবং এর ফলে জলাধার ভরাট, নদী ভরাট বা গতি পরিবর্তনসহ অনেক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কার্যত এর সুফল মানুষ কতটা পাবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। বর্তমানে যেখানে বক্সিরহাটের বাজার বসে সেখানে ছিল পাঁচটি পুকুর। তার মধ্যে মাজার সংলগ্ন পুকুরটি ছাড়া আর কোনটির অস্তিত্ব নেই। সেটিও রক্ষা পেয়েছে মাজারের কারণেই হয়ত। যেভাবে শতবর্ষী কোরবানীগঞ্জের বলুয়ার দীঘিটিকে চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে ভরাট করে দালান তোলা হচ্ছে, ক্ষমতাবান এই লোকগুলোর বিপক্ষে দাঁড়াবে তেমন কেউ নেই সেই এলাকায়। চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি পাড়ায় দু’তিনটি করে পুকুর ছিল, যার কোন অস্তিত্ব এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের উদগ্র লাল সার কাছে এভাবে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পুকুর বা জলাধারগুলো। আগে বিভিন্নস্থানের অবস্থাপন্ন পরিবার বা জমিদাররা সাধারণ মানুষের পানীয়জলের অভাব মেটানোর জন্যে এ ধরনের অসংখ্য পুকুর-দিঘি খনন করতেন। রাস্তার ধারে ধারে পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণার্থে কলসিতে পানি সরবরাহ করতেন। আর আজকের অবস্থাপন্ন বা বড় বড় ব্যবসায়ীরা সেসব পুকুর দিঘিগুলো ভরাট করে বাড়ি, কলকারখানা বা সুপার মার্কেট নির্মাণ করে ২৫ টাকায় এক লিটার পানি কিনতে বাধ্য করছে মানুষদের।
আগামী দু’তিন দশকের মধ্যে সুপেয় পানিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি পদার্থ। মোট কথা মিঠা পানিই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে বিশ্ব রাজনীতির। আমার এই আশংকাকে অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিশ্ব পরিবেশের খবরাখবর যারা রাখেন তাঁরাও ইতিমধ্যেই এ ধরনের আশংকা প্রকাশ করে ফেলেছেন। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও অবিরাম দখল-দূষণে নদীগুলো মৃত প্রায়। জলাশয়গুলো বিলীনের পথে আর উজানে নদীতে বাঁধ, গতি পরিবর্তন ও পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে ভারত ইতিমধ্যেই আমাদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছে। অকাতরে জলাধার ভরাট করায়ও ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে মাটির নিচে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। সে সাথে শূন্য হয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ অনেক জলাধার। পুকুর-জলাশয় ভরাট করার কারণে বৃষ্টি ও বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে নদীতে, ফলে নদীর উচ্চতা বেড়ে গিয়ে বন্যা হচ্ছে। আর নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সে বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করতে না পেরে নদীর দুকূল ভেঙে পড়ছে অতি দ্রুত ও নির্মমভাবে। সমতল জায়গায় পানি ধারণের ব্যবস্থা না থাকায় ভূগর্ভে পানি ঢুকতে পারছে না, ফলে ভূগর্ভেও পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। সে সাথে মাটি পানি শোষণ করতে না পারায় বাড়ছে উষ্ণতা। চরমভাবাপন্ন অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ।
এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে মূলত যারা দায়ী তারা অর্থ-বিত্তে ক্ষমতাশালী। তাদের সন্তানরা বিদেশে লেখাপড়া করে। সে সুবাদে তাদের প্রায় পুরো পরিবারই অবস্থান করেন বিদেশে। ছুটি কাটাতে মাঝে মধ্যে দেশে আসেন। এই দেশে তাঁদের সন্তানরা পাকাপোক্তভাবে বসবাস করবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। এই দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়লে তাদের কিছু যায় আসে না। বিত্তের জোরে বিশ্বের যে কোন উন্নত দেশে উন্নত জীবনযাপন করা তাঁদের জন্যে অসাধ্য নয়। কিন্তু আমরা যারা মাটি কামড়ে দেশে পড়ে থাকতে চাই, সন্তানদের যারা দেশ বা মাতৃভূমিকে মায়ের মতো ভালবাসার শিক্ষা দিয়েছি, কিংবা ঢাকায় যাওয়ারও যাদের গাড়ি ভাড়া নেই তাদের কি হবে? আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্যে কি ধরনের স্বদেশ রেখে যাবো আমরা। আমার পূর্ব প্রজন্মের কাছ থেকে তো এমন বিপজ্জনক স্বদেশ আমরা লাভ করিনি। তবে কেন এই ধ্বংসের দায়ভার নেবো আমরা। কেন এ দেশকে ধ্বংস করার, নিঃস্ব করার দৃশ্য অসহায়ের মতো দেখতে থাকবো আমরা। আমরা কি শুধু রাজনীতি করে করেই কাল কাটাবো নাকি তলে তলে, ধীরে ধীরে দেশকে যে ঝাঁঝড়া করে তোলা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত হবো। দেশটাতো আপনার আমার মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষের। আমরা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিপক্ষে মাত্র কয়েক হাজার বা লাখের মতো দুর্বৃত্ত, তাদের ঠেকাতে পারবো না আমরা?
আমার প্রিয় কবি সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলি, “আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি, তুমি বাংলা ছাড়ো।” প্রিয় পাঠক, আমার লেখা যারা নিয়মিত পড়ে থাকেন, সন্দেহ নেই তাঁরা প্রায় সকলেই আমার মতো সাধারণ মানুষ। আসুন আমরা অধিকাংশ সাধারণ মানুষরা এই গুটি কয়েক অসাধারণ(!) মানুষদের অসাধারণ(!) কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। নির্ভরতার চাবি আজ নিজের হাতেই তুলে নিই। দুর্বৃত্তরা বাংলা ছাড়ণ্ডক।
শিল্পপতিদের শিল্প বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে আমার নদী। ধনবানরা ভরাট করছে আমার জলাশয়। দুর্বৃত্তরা লুটপাট করে গড়ে তুলছে অর্থের পাহাড়। আর আমরা সাধারণ মানুষ মাশুল দেবো সকল অপকর্মের? প্রিয় পাঠক আপনার বিবেক কি বলে? বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কবিতার একটি পংক্তি দিয়ে শেষ করছি লেখাটি, “..... যাহারা তোমার বিষায়েছে বায়ু/ নিভায়েছে তব আলো,/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ/ তুমি কি বেসেছো ভালো.....।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন