১৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১ ভাদ্র ১৪১৯ সাল ২৭ রমজান ১৪৩৩ হিজরি
‘এই খেদ আমার মনে মনে।
ভালবেসে মিটল না আশ-কুলাল না এ জীবনে।
হায় জীবন এত ছোট কেনে?’
এ যেনো, ‘এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ-মর্ত্য ছেয়ে।/ সবচেয়ে পুরাতন কথা,/ সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন; এ ক্রন্দন শোনা গিয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যার এর ‘কবি’ উপন্যাসের নায়ক নিত্য বা নিতাইয়ের কণ্ঠে। জীবনের এক চরম ও নির্মম সত্যকে গানের মাধ্যমে তুলে এনেছিল গ্রাম্য কবি নিতাই। নিতাই কবি হতে চেয়েছিল। মানুষের জীবনের ক্ষণ স্থায়িত্ব ও প্রেম তৃষ্ণার অতি প্রসার ও চিরস্থায়ী অতৃপ্তজনিত বেদনাবোধ থেকে যে গানের ধারা নিঃসৃত তা মুহূর্তেই বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাঙালির জীবনের এ যেনো এক নির্মম সত্য ও ট্রাজেডির প্রামাণ্য বয়ান। কয়েক বছর পরপরই আমরা হারাতে থাকি আমাদের বরেণ্য সন্তানদের। তারপরে দীর্ঘশ্বাসের সাথে পুনরায় উচ্চারণ করি জীবন এত ছোট কেনে?
এই অগাস্ট, রক্তাক্ত অগাস্ট। শোক, বেদনা, হাহাকার আর দীর্ঘ বিলাপের অগাস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বরে রচিত হলো বিশ্বের ভয়ংকর ও বর্বরতম ইতিহাস। হত্যা করা হলো ইতিহাসের মহানায়ককে। হত্যা করা হলো একটি জাতির স্বপ্নকে। একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় যোগ্যতায়,সততা ও নিষ্ঠায় একটি জাতির জনকে পরিণত হয়েছিলেন। জন্ম দিয়েছিলেন বাঙালির প্রথম সার্বভোম রাষ্ট্রের। দেশের চরম প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ও তাদের আদর্শিক মিত্র সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হলেন তখন তার বয়স কতো? ১৯২০ থেকে ১৯৭৫- মাত্র ৫৫ বছর। তিনি জাতির পিতায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন যখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০ পেরিয়েছে। এই অল্প বয়সেই একটি রাষ্ট্রের স্থপতি হলেন তিনি। বাঙালির দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ,দুজনের মধ্যে কিছু সাজুয্য আছে। বিশ্বকবি উত্তরাধিকায় সূত্রে কোন সমৃদ্ধ ভাষা, সাহিত্য পাননি। তিনি সব ক’টি পথ নিজেই নির্মাণ করেছেন এবং যে পথে নিজের জাতিকে, ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সে ভাষায় কবিতা লিখে-নোবেল পুরস্কারও এনে দিয়েছেন। গান, কবিতা, উপন্যাস, গল্প ছোট গল্প, নাটক,চিত্রকলা যে খানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই তিনি ফুলে ফলে সুশোভিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুও তেমনি একটি জাতিকে জাগিয়ে তুলে তাঁর বুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন বীজ বপন করে তাকে মহীরূহে পরিণত করেছেন। জাতির হস্তে তুলে দিয়েছেন স্বাধীনতার অনন্ত পতাকা। একদা বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন শাসকের দ্বারা শাসিত হওয়া জাতিকে দান করেছিলেন তাদের হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সে স্বাধীন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্নির্মাণ করেছেন একান্ত নিজের মোহনীয় নেতৃত্ব ও শাসনক্ষমতার গুণে। বাঙালির পাপ তাপ ধারণ করে অগাস্টে যিশুর মতো প্রাণ দিয়েছেন মুজিব। তারপর ১৯৭৬ এর ২৭ অগাস্ট জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এর মহাপ্রয়াণ। নজরুল যে অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন বঞ্চনাহীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, মুজিবের সেই বাংলাদেশেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মানবতার নবী, মানবতার কবি নজরুল ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন বটে,কিন্তু তাঁর কবিসত্তা বা লেখনির মৃত্যু হয়েছিল আরো আগে ১৯৪১ সালে। নজরুলতো প্রকৃত বেঁচেছিলেন ৪২ বছর। ২০০৭ সালের ১৭ অগাস্ট মৃত্যুবরণ করেন বাংলা কবিতার রাজপুত্র কবি শামসুর রাহমান। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে, মানবতার পক্ষে অবিচল এক কলমযোদ্ধা। ২০০৫ সালের ১২ অগাস্ট জীবন থেমে যায় আরেক প্রতিবাদী ও প্রথাবিরোধী সব্যসাচী লেখক হুমায়ুন আজাদের। বাংলাদেশের মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে তীব্র আক্রমণ করে লেখা তার কবিতা ও সাহিত্যের জন্যে তাদের হাতেই আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশেও ফিরেছিলেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন সাহসী সন্তানকে হারিয়েছিল। তারপর গত বছর এই অগাস্টে ১২ তারিখে জাতির দুই বরেণ্য সন্তান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর প্রাণ হারান এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে যিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন এবং মুক্তির গানের মাধ্যমে যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ছবিকে জাতির কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। সে তারেক মাসুদ জীবন ও কর্মের মাঝামাঝিতে হারিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান মিশুক মুনীর। অপূর্ণ জীবনে অপূর্ণ রয়ে গেলো কর্ম।
গত ১৯ জুলাই আমেরিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক, নাটকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। মৃত্যুর আগে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, একটি কাছিমও বাঁচে ৩০০ বছর। কিন্তু একজন মানুষ কেন এত কম জীবন পাবে। তার কণ্ঠেও হাহাকার করে উঠেছিল নিতাই এর বেদনা ‘জীবন এত ছোট কেনে?’
আসলে জীবন এত ছোট কেন? বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্র, নজরুল-সুকান্ত, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর, হুমায়ূন আহমেদসহ দেশের বরেণ্য সন্তানেরা, কৃতি সন্তানেরা দীর্ঘ জীবন বাঁচে না কেন? এর মধ্যে বিশ্ব কবির জীবন হয়ত কিছুটা পূর্ণতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু অন্যদের? কী এমন ক্ষতি হতো প্রকৃতির বা বিধাতার, আমাদের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানরা যদি আরও দীর্ঘ জীবন লাভ করতেন। এ জাতিকে দেয়ার তো তাদের আরও অনেক কিছুই ছিল। এই অভাগা জাতিকে আর বঞ্চিত না করলে কী এমন ক্ষতি হতো এই মহাসৃষ্টির। এঁরাতো আর প্রতি যুগে যুগে জন্মাবেন না। খুব সাধারণভাবে বলতে ইচ্ছে হয় দেশেতো এমন অনেক দুর্বৃত্ত আছে যারা দীর্ঘ জীবন লাভ করে মানুষের জীবনকে করে তুলছে বিষময়। এই মন্দ লোকেরা সমাজে বেঁচে থাকবে আর অকালে মৃত্যুবরণ করবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা। আমি জানিনা প্রকৃতই জানিনা আগামীকাল কার অকাল মৃত্যু সংবাদে বিচলিত হয়ে উঠবে। আবার কোন বরেণ্য সন্তান তাঁর আধেক জীবনে, আধেক কর্মে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়ে ওপারে পাড়ি জমাবেন।
‘এই খেদ আমার মনে
ভালবেসে মিটল না সাধ- কুলাল না এ জীবনে।
হায়- জীবন এত ছোট কেনে?
এই ভুবনে?
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com