দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
৩০ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৫ ভাদ্র ১৪১৯ সাল. ১১ শাওয়াল ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
৩০ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৫ ভাদ্র ১৪১৯ সাল. ১১ শাওয়াল ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
শুধু বিঘে দুই/ ছিল মোর ভুঁই/ আর সবই গেছে ঋণে/ বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন/ এ জমি লইব কিনে’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যখন এই কবিতাটি লিখছিলেন তখন হয়ত বাবুদের সামান্যতম হলেও চক্ষুলজ্জা ছিল। উপেনের জমি তার চাই। কিন্তু সামান্য ভদ্রতার খাতিরে হলেও সে বলছে ‘এ জমি লইব কিনে’। কবিতাটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন শেষ পর্যন্ত উপেনের কাছ থেকে জমিটি জমিদার বাবু দখল করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় চুরির অপবাদ নিয়ে উপেনকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছিল। বাবুদের এই কীর্তি নতুন নয়। যুগে যুগে কালে কালে, স্থানে স্থানে বাবুদের জন্ম হয়। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন চেহারায়। ছোট বাবু মেঝো বাবু, বড় বাবু এবং শেষমেশ বিশ্ব বাবু, ( বিশ্বজিৎ কিংবা বিশ্বনাথ নয়) এরা একে অপরের সহায়ক হয়ে ওঠে। এবং ওভাবেই সারা বিশ্বের উপেনদের সর্বস্ব কেড়ে নেয় বাবুরা। বিশ্ব বাবুদের স্বার্থ রক্ষা করে যে দেশীয় বাবু তাকে ক্যাপানো যায় না। তার বিরুদ্ধে বলা যায় না, আন্দোলন করা যায় না, তাতে বিশ্ব বাবু ক্ষেপে যায়। দুর্গতি নেমে আসে সে দেশে। আমাদের দেশে এখন ছোট বড় অনেক বাবু। এরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ভূমিহীন করছে অসংখ্য উপেনকে। তবে আগের মতো ভদ্রতার খাতিরেও বলে না, ‘এ জমি লইব কিনে’। এখন সরাসরি দখল ও রাতারাতি দেয়াল। রাষ্ট্রযন্ত্র এখানে নির্বিকার। পক্ষান্তরে বাবুদের পক্ষেই। তাই বাবুরা এখন আর ভূমি দখল করেই ক্ষান্ত নয়, ব্যাংক,বীমা, কল-কারখানা, নদী-সাগর- পাহাড়- অরণ্য সবকিছুতে তাদের আগ্রাসী নখর। তবু আজও উপেনরা বলে, সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ/ যে মাটি সোনার বাড়া/ দৈনের দায়ে বেচিব সে মায়ে/এমনি লক্ষীছাড়া। তারপরেও রক্ষা নেই।
আজ দুই দশক ধরে এমন অনেক বাবুদের নাম শুনেছি। তাদের কীর্তিকলাপ জেনে এসেছি। আজ কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আরেকটি নতুন বাবুদের দলের নাম শুনছি। তার নাম হলমার্ক গ্রুপ। গত কয়েক দিন আগে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে খবর বেড়িয়েছে কেবল ১০ একর সরকারি জমিই নয়, হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে জনতা হাউজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের শতাধিক প্লট জোর করে দখল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৫০টি মামলা ও ২০টি জিডি আছে থানায়। একটি মামলায় হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির মাহমুদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। ওসবের আগে হলমার্ক গ্রুপ আরেকটি নজিরবিহীন কেলেংকারির জন্ম দিয়েছে। সোনালী ব্যাংক, রূপসী বাংলা শাখা থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দুই হাজার ৬৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এতবড় কেলেংকারির সাথে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শাখা ব্যবস্থাপকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়ি বলে একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষ নিরীক্ষার পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর- অর্থমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলেন সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দিতে। তার উত্তরে গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটি গভর্নর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার বহির্ভূত। অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী আপাতত এই কেলেংকারিদের পক্ষেই তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করলেন। সোনালী ব্যাংকের ওই শাখার ঋণ দেয়ার যে ক্ষমতা ছিল তা থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে। শুধু তাই নয় ব্যাংক যেভাবে চেয়েছে সেভাবে নয় বরং হলমার্ক গ্রুপ যেভাবে চেয়েছে ব্যাংক সেভাবেই ঋণ দিয়েছে। তার মানে আরেকটি শেয়ার বাজার কেলেংকারি, আরেকটি ইউনি পে-টু ইউ, আরেকটি ডেসটিনি। বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্দেশে বিদ্রোহী কবি নজরুল থেকে ধার করে বলতে চাই, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’।
এই সংবাদগুলো যেদিন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হলো সে দিনের আরেকটি সংবাদের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সংবাদটি শুরু হয়েছে এভাবে। “বাবার সঙ্গে চুল কাটাতে গেল দুই সন্তান মুন্নি আক্তার (১০) ও মানসুর হোসেন (৫) কিন্তু শিশুদের বাবা ওদের চুল কাটাতে নিয়ে গেলেন না। নিয়ে গেলেন পদ্মা নদীর ওপর লালন শাহ সেতুতে। এরপর সেতু থেকে তাদের নদীতে ফেলে দিলেন”। এই বর্ণনা ওই দুই শিশু সন্তানের মায়ের। এ শিশু দুটির পিতা মালেক সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার সকালে (ঈদের আগের শুক্রবার) দুই সন্তানকে নিয়ে লালন শাহ সেতুতে যাই। মুন্নি ও মানসুরকে সেতুর রেলিঙের ওপর বসিয়ে প্রথমে মুন্নিকে ফেলে দেই। ভয়ে মানসুর দৌড় দিলে তাকে ধরে নদীতে ফেলে দেই। মালেক আরও জানায়, “আমার অভাবের সংসার। পেটে ভাত নাই, সন্তান বাঁচিয়ে রেখে কী করব। তাই সেতুর ওপর নিয়ে “ফেলি দিছি”। হায় দারিদ্র্য! হায় দারিদ্র্য বিমোচন!
একদিকে শেয়ার বাজার, ইউনি পে টু ইউ, ডেসটিনি হলমার্ক ও নব্য বাবুদের হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট আর অন্যদিকে এক অসহায় ব্যর্থ পিতা কর্তৃক নিজ শিশু সন্তানকে নদীতে নিক্ষেপ। হায় কী নিদারুণ বৈপরীত্য।
প্রতিটি ক্রিয়ার একটি প্রতিক্রিয়া থাকে। কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হয় মানুষকে। আজ যারা লুটপাটে ব্যস্ত সরকার বদলের সাথে সাথে তাদের অনেকে বদলে যাবে। অনেকে পালিয়ে দেশের লুটের টাকা দিয়ে বিদেশে আয়েশী জীবন যাপন করবে। অনেকে হয়ত পরিবর্তিত ক্ষমতার অংশীদারদের সাথে অর্থের ভাগাভাগি করে নেবে। অনেকে ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাবে। কিন্তু আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ একটু সুশাসনের (আশায়) একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্যে, জাতির জনকের সোনার বাংলার জন্যে বর্তমান সরকারকে সমর্থন করেছিলাম আমাদের কী হবে? আমাদের কোন বাঘের মুখে ফেলে যাবে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা?
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন