পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ইমাম, মুয়াজ্জিনদের জন্যে আলাদা বেতন স্কেল প্রয়োজন

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                                                    ব্রাত্যজনের কথা                                           
চট্টগ্রাম, বুধবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২, ২৮ ভাদ্র ১৪১৯

কামরুল হাসান বাদল
খুব বেশিদিনের কথা নয়। ২০/৩০ বছর আগেও দেশে প্রতি গ্রামে খুব বেশি হলে একটি করে মসজিদ ছিল। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি পাড়ায় একটি আর বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মুসল্লির সংখ্যা বেড়েছে। সে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে ধর্মাচার। এখন আগের চেয়ে বেশি বেশি মানুষ নামাজ পড়ে। বেশি বেশি হজ করে। বড় বড় গরু কোরবানি দেয়। ঈদে বেশি বেশি অর্থ ব্যয় করার প্রতিযোগিতায় নামে। এখন বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। চট্টগ্রামে প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার মেজবান অনুষ্ঠিত হয়। আগে সবকিছুই কম কম হতো। বেশিরভাগ মানুষ ভাগে কোরবানি করতো। ঈদে সাদা-মাটা কাপড় কিনতো। খাবার-দাবারে এমন অপচয় ছিল না। অনেক দূর হেঁটে গিয়ে নামাজ আদায় করতো। কিন্তু তখন এমন সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ছিল না। মানুষ এমন নির্লজ্জ ছিল না। নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর ছিল না। সমাজে এমন হানাহানি ছিল না। অর্থের নগ্ন প্রতিযোগিতা ছিল না। বড়লোকী দেখানোর বিষয় ছিল না। সম্পদের এমন বৈষম্যও ছিল না। কিন্তু মানুষ অধিকাংশে সৎ ছিল। ঘুষখোর, চাঁদাবাজ, ছিনতাই, রাহাজানি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ভূমিদখল, নদী-নালা, খাল-বিল দখল ও দূষণ ছিল না। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, গুম, খুন এত অধিক মাত্রায় ছিল না। এখন অধিক মাত্রায় ধর্মাচারের সাথে সাথে সমাজে, দেশে এই প্রবণতাগুলোও বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য করে, ফাইল আটকে ঘুষ খেয়ে, মামলার চার্জশিট বদল করে, আয়কর ফাঁকি দিয়ে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, ওভার ইনভয়েসে বিদেশে অর্থ পাচার করে, সরকারি সম্পত্তি দখল করে, ভূমি দখল করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে রাতারাতি বড়লোক হওয়াদের ধর্মচর্চার কাছে প্রকৃত ঈমানদার এখন বড়ই শরমিন্দা। আজকাল খুব বেশি বেশি বলা হচ্ছে রাজনীতি এখন প্রকৃত রাজনীতিবিদদের দখলে নেই। আমলা, ব্যবসায়ী আর অবসরপ্রাপ্তদের দখলে। কালো টাকা আর পেশির দখলে।  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা, পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তারা আছেন।

মাত্র সাত বছরে জীবন পাল্টে যাওয়া হলমার্কের তানভীরকে কেউ কি এই প্রশ্ন করার সাহস করেছিল গত ক’বছরে? সাধারণ মানুষ কে? আয়কর বিভাগ? ৭ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে যার গ্যারেজে থাকে ২৭টি দামি গাড়ি এই তথ্য কি আয়করওয়ালারা পান নি? তাদের মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগেনি এত অর্থের উৃৎস কী? লুটপাট করে টাকা বানিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি আলীশান পাকা মসজিদ, পারলে একটি স্কুল, স্থানীয় কবরস্থান পাকা করা, প্রতিবছর দু’তিনবার গরু জবাই করে খাওয়ালে আর বছর বছর হজ করে এলেইতো হয়ে গেলো। কেউ প্রশ্ন করবে না এই অর্থের উৎস কী?

সাধারণ মানুষকে না হয় বাদ দিলাম। ধর্ম রক্ষা ও প্রচারের নিয়তে যারা আরবি মাধ্যম অর্থাৎ মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করে ঈমাম, মুয়াজ্জিন হয়েছেন তারাও কি কখনো এ প্রশ্ন করার সাহস করেছেন কাউকে? অথবা যখন জানতে পেরেছেন এই ব্যক্তির উপার্জন হালাল নয়, তখন কি তাকে বয়কট করার সাহস করতে পেরেছেন? পারেন নি। কারণ ঐ সাহস তাঁরা সঞ্চার করতে পারেন না।

এরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মসজিদ করেন ঠিকই। কিন্তু সবচেয়ে কার্পণ্য করেন ঈমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা প্রদানে। আমি দেখেছি গ্রামে গ্রামে যে মসজিদগুলো আছে তার অধিকাংশ ঈমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা অত্যন্ত মানবেতর। এমন অনেক ঈমাম-মুয়াজ্জিন আছেন যাদের বেতন দেয়া হয় ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। এদের কোন আবাসন সুবিধা নেই। দুটি কক্ষ নেই। বোনাস ভাতা এমন কি চাকরির নিশ্চয়তাটুকুও নেই। মসজিদ কমিটির কর্তাব্যক্তিদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাদের চাকরি। এরা সাধারণত পরিবার থেকে থাকেন দূরে। বছরে দু একবারও অনেকে পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারে না। অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও এদের দেখভালের কোন স্বজন কাছে থাকে না। এদের দুবেলা খেতে হয় অন্যের ঘরে পালাক্রমে। এক সপ্তাহ এই পরিবারে তো আরেক সপ্তাহ ঐ পরিবারে। নিজের ভালমন্দ খাওয়ার স্বাধীনতা নেই। দেখা গেলো আজ তার পেটে অসুখ। খেতে ইচ্ছে করছে আনাজ কলা অথচ তাকে দেয়া হতো গরুর কালো ভুনা মাংস। অর্থাৎ অন্যের করুণায়, অনুগ্রহ আর সাহায্যে জীবন নির্বাহ করতে হয় এসব ঈমাম-মুয়াজ্জিনদেরকে। এদের বাড়তি আয়ের একমাত্র উৎস কারো ঘরে বা পরিবারে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মিলাদে অংশ নেয়া, খতমে কোরআন বা ওয়াজ নসিহত করা।

এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত। নির্ধারিত হওয়া উচিত ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের আলাদা বেতন কাঠামো। মসজিদ প্রতিষ্ঠার আগে সরকারি অনুমোদন নেয়া অত্যাবশ্যক করার পাশাপাশি মসজিদ প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদানের শর্ত হিসেবে যোগ করা উচিত এর ব্যয়ভার ও ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি। সারাদেশের মসজিদগুলোকে শ্রেণী বিভাগ করে প্রতিটি শ্রেণীর মসজিদের ঈমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরিবিধি প্রণয়ন, বেতন-ভাতা নির্ধারণ, স্থায়ী নিয়োগপত্র প্রদান, গ্র্যাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পেনশনের ব্যবস্থাসহ আবাসিক সুবিধা প্রদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ মাসের পর মাস পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকবেন এমন কি তার বাৎসরিক ছুটিরও কোন হিসাব থাকবে না তা অত্যন্ত অমানবিক। যে কোন কাজ বা শারীরিক অবস্থা যাই থাকুক, বছরের পর বছর দিনের পাঁচটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজটি সম্পাদন করা খুব সহজ নয়। মসজিদ নির্মাণের আগে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ