পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

চট্টগ্রাম থেকে হজফ্লাইট নেই, কী করতে আছেন এমপি, মন্ত্রীরা!

দৈনিক আজাদী                               উপ-সম্পাদকীয়                         কাল আজ কাল
২০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ৫ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌৩ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

এ বছর চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি কোন হজ ফ্লাইট নেই। অর্থাৎ চট্টগ্রামের ১০ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে মাত্র ২ হাজার হজযাত্রী নিয়মিত ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ পেলেও বাকি ৮ হাজার হজযাত্রীকে ঢাকা হয়ে জেদ্দা যেতে হবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বোয়িং ৭৪৭ এবং ৭৭৭ এর মতো বড় বোয়িং বিমানগুলোর অবতরণ সুবিধা নেই চট্টগ্রামের কথিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত বছর চট্টগ্রাম থেকে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট থাকায় হজযাত্রীদের সুবিধা হয়েছিল। কিন্তু এ বছর বিমান কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা না করায় মহাদুর্ভোগে পড়বেন হজযাত্রীরা।

বাংলাদেশ একটি বৃহত্তম মুসলিম দেশ। প্রতিবছর এদেশ থেকে হজে যাওয়ার যাত্রী বাড়ছে। অথচ আজ কয়েক বছর থেকে হজ মওসুম এলেই বিমান কর্তৃপক্ষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার হজযাত্রীকে দু:সহ যন্ত্রণার মধ্যে পড়তে হয়। আমাদের মনে আছে গত জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামের মীর নাছির বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে কমিশন বাণিজ্যের জন্য ফ্লাই বিড়ম্বনায় কত হজযাত্রী কষ্ট পেয়েছিলেন। শেষেতো এক কি দুজন হজযাত্রী মৃত্যুবরণও করেছিলেন। তবে এ বছর এখনো হজ ফ্লাইট নিয়ে কোন ধরনের বিড়ম্বনা বা অনিয়ম ঘটেনি। গত রোববার থেকে যে ক’টি হজ ফ্লাইট ঢাকা বিমান বন্দর ত্যাগ করেছে তার কোন যাত্রীও কোনরূপ অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। তবে ভাড়া করা একটি বিমান পালিয়ে যাওয়ায় এবং হজ ফ্লাইট সিডিউল ঠিক রাখতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার যাত্রী চরম বিপাকে পড়েছেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে বিমান বন্দরে আটকা পড়েছেনযাদের অনেকের চাকরিতে যোগদানের শেষ সময়টুকুও পার হয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে বিমানের সময়সূচি ভাঙতে শুরু করে। এই কয়েকদিন ধরে চলা সংকটে বিভিন্ন গন্তব্যের ফ্লাইটসূচির বারবার বদলাতে হচ্ছে। পরে সে বদলানো সময়সূচিও ঠিক রাখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিমান বন্দরে যাত্রীরা বিক্ষোভ করেছে। চট্টগ্রামের যাত্রীরা ২য় বারের মতো বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেছে। এর আগে বিমান অফিসও ভাঙচুর করা হয়েছিল এক দফা।

আসলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। তবে এই পরিস্থিতি আকস্মিক কিংবা অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ বিমানের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়। কোন সরকারের আমলেই এমন কি সেনা শাসিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও বিমানের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করা এমনকি কমানোও সম্ভব হয়নি। বরং এই মন্ত্রণালয় যার দায়িত্বেই দেয়া হয়েছে তিনিই জড়িয়ে গেছেন দুর্নীতিতে। যাদের রক্ষক হওয়ার কথা তারাই ভক্ষক হয়েছেন বিমানের শত শত কোটি টাকার সম্পত্তির। বিমানের সামান্য ঝাড়ণ্ডদার থেকে শুরু করে শীর্ষ পদের লোকটি পর্যন্ত কোন না কোনভাবে দুর্নীতিঅনিয়ম বা দায়িত্বহীনতার সঙ্গে জড়িত। কাজেই এই সংস্থার কাঁধ থেকে দুর্নীতির ভূত কখনোই তাড়ানো সম্ভব হয়নি।

দুঃখিতআমি লিখতে বসেছিলাম চট্টগ্রামে হজ ফ্লাইট না দেয়া ও বিমান বন্দরের সীমাবদ্ধতা বা নির্মাণ ত্রুটি নিয়েঅথচ লিখে ফেললাম বিমানের দুর্নীতি নিয়ে। আসলে কান টানলে মাথা আসে। আমার মতো চট্টগ্রামবাসী সবার মনে থাকার কথা গত আওয়ামী লীগ আমলে এই বিমান বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু ও সমাপ্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম বেতার ঘোষক এমএ হান্নানের নামে তার উদ্বোধন হয়েছিল। বলা হয়েছিল-এটি একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। অনেক বিদেশি বিমান সংস্থার বোয়িং বা ফ্লাইট আসা-যাওয়া ছাড়াও শুধু এখাতে জ্বালানি বিক্রি করেও এই বিমান বন্দর অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,তেল বিক্রিতো দূরের কথা দিনে দিনে কমে গেছে বৈদেশিক উড়োজাহাজের সংখ্যা। হাতে গোণা যে ক’টি বিদেশি সংস্থার উড়োজাহাজ আসা-যাওয়া করে তার মধ্যে বেশ ক’টি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে পারে।

এ বছর চট্টগ্রাম থেকে হজ্বফ্লাইট দিতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিমানের চট্টগ্রাম অফিসের মহাব্যবস্থাপক একটি দৈনিকের প্রতিনিধিকে বলেছেন বড় ধরনের বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের সুবিধা এই বিমানবন্দরে নেই। অর্থাৎ পর্যাপ্ত রানওয়ের অভাবে এ ধরনের বোয়িংগুলো চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামতে উঠতে পারবে না। এ পরিস্থিতিতে আমাদের প্রশ্ন হলোমাত্র ১০/১২ বছর আগে নির্মিত একটি বিমানবন্দরে এই সীমাবন্ধতা কেননির্মাণের সময় কর্তৃপক্ষ কি ভাবেনি এখানে কী ধরনের বা কোন কোন বিমানগুলো অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে পারবেতার মানে নামে আন্তর্জাতিক হলেও বাস্তবে কি এই বিমানবন্দরটি একটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আধুনিক রূপ(বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেসিভিল এডিয়েশন কর্তৃপক্ষ কী জবাব দেবেন তারস্বাধীনতার পরপর আমরা লক্ষ করছিপ্রশাসন বা ক্ষমতার কেন্দ্রে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী এমন একটি শক্তি আছে যারা প্রতি পদে পদে চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। চট্টগ্রামের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে দিন দিন খাটো করার একটি সুগভীর চক্রান্ত চলছে দীর্ঘদিন থেকে। আমদানি-রপ্তানিব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভাবেও চট্টগ্রামকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই রেল,নৌসহ অনেক সংস্থার সদর দফতর চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেক বহুজাতিক কোম্পানির মূল কারখানা বা মূল কার্যালয়ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গত কয়েক মাস আগে এভাবে চা বোর্ডের নীলাম অফিসও সিলেটে নিয়ে যাওয়ার পায়ঁতারা করা হয়েছিল। প্রবল জনক্ষোভে ও প্রতিবাদে আপাতত তা বন্ধ হয়েছে।

এ বছর তার সাথে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি হজফ্লাইট। এ বিষয়ে প্রাক্তন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এবং বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে হজ্বযাত্রীদের জন্য বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের কথা কর্তৃপক্ষকে বলেছিকিন্তু তারা কী করেছেন তা এখন পর্যন্ত জানি না। বক্তব্যটি একজন জনপ্রতিনিধি ও চট্টগ্রামের রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দায়িত্ববান কথা বলে মনে হয়নি। বরং এ বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়। সরকারি দলের একজন এমপি ও মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামে হজযাত্রীরা সরাসরি কোন হজফ্লাইট পাবে না এবং এ বিষয়ে মাননীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কিছু করণীয় নেই তা বুঝে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নিয়েছেন বটেতাই বলে প্রধানমন্ত্রী কাঁধকে এত শক্ত ও প্রশস্ত ভাববার কোন অবকাশ নেই। কারণ তাঁর একার পক্ষে এতকিছু নজরে রাখাও তদারক করা সম্ভব নয়। সমীচিনও নয়। চট্টগ্রামের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হওয়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উত্তীর্ণ করার কাজ ঝুলে যাওয়া এবং যারা চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে সড়ক অব্যবস্থাপনা ও সংস্কার না হওয়ার জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকেই জবাবদিহি করতে হবে। জনতার মুখোমুখী দাঁড়াতে হবে এবং সে সময়ও খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র এক বছর কয়েক মাস।

মনে রাখা দরকার সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ