পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১২

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনো অপরিহার্য কেন

দৈনিক আজাদী                            উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
১১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৬ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌২৪ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুই ধারায় বিভক্ত। একটি ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িকধর্মনিরপেক্ষশোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অন্যটি আধা সামরিকপুরো পাকিস্তানি ভাবধারায় সাম্প্রদায়িক ও লুটেরা শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হোক প্রথমটির নেতৃত্বে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অন্যটির নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। এ পর্যন্ত পড়ে অনেক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে-আওয়ামী লীগ কি লুটেরা নয়বা আওয়ামী লীগে কি সবাই ধোয়া তুলসী পাতাএ বিষয়ে আমার সাফ জবাব হ্যাঁ এবং আছে। বিশদ আলোচনার আগে বিশ্ব বিখ্যাত আরব কবি কাহলিন জিবরানের একটি গল্প বলি। ছোট ছোট কয়েকটি বাচ্চা নিয়ে উপত্যকায় খাদ্য অন্বেষণ করছিল একটি মেষ। এমন সময় একটি বাজপাখি মেষ শাবককে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে আরেকটি বাজপাখি এসে বাধা দেয়ফলে যুদ্ধ লেগে যায় আকাশে দু’বাজপাখির মধ্যে। মেষ শাবকগুলো ভয় পেয়ে মায়ের কাছে ছুটে এসে বললো, ‘ঐ পাখি দুটো বুঝি আমাদের আক্রমণ করতে আসছে।’ শুনে মা বলল ‘‘তোমরা বুঝতে পারছোনা বাছা কোনটি আমাদের আক্রমণ করতে চায় কোনটি চায় বাঁচাতে।” ইঙ্গিতটি যাঁরা বুঝতে পেরেছেন তারা এখানেই পড়া বন্ধ না করে কলামটি দয়া করে শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির যে একটি স্বাধীন মাতৃভূমির প্রয়োজন এবং তা প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব এ বোধ ও সাহসটুকু জুগিয়েছিল ’৫২ এর সফল আন্দোলন। আমি পূর্বে অনেকবার বলেছি যে, ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন স্রেফ রাষ্ট্র ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না। এই দাবিতে আন্দোলন হয়েছে ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেদিনের সেই আন্দোলন ছিল একাধারে ভাষাইতিহাসঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনও। যার কারণে ঐ আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মতো একটি সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষশোষণহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ মূলত সে পথেই যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ’৭৫ এর মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সে যাত্রাপথকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। দেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়ার সকল প্রকার চেষ্টা করা হয়েছে। কথাটি একজন কট্টর সমর্থকদের মতো শোনাবে তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি আওয়ামী লীগ ও তার নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাঙালির স্বপ্নস্বাধীন মাতৃভূমির স্বাদ এখনো পূরণ হতো না। এবং ’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশকে যে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল তাও আওয়ামী লীগ না হলে ঠেকানো যেত না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় এখনো বাংলাদেশ যতটুকু বাংলাদেশ আছে তা সম্ভব হয়েছে এখনো আওয়ামী লীগ আছে বলেই। নতুবা এতদিনে এটির পরিণামও পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তানের মতই হতো। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে এদেশে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া যখন নিষিদ্ধ প্রায় তখনও অনেকে বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শকে বুকে লালন করে শুভ দিনের প্রত্যাশা করেছে। জেলে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যেও ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা। তা করা গেলে আরেকটি পাকিস্তান তৈরির পথ অনেকটা সুগম হবে তা বুঝতে ভুল করেনি ’৭৫ এর ঘাতকরা। তাদের সেই অভিপ্রায় সফল ও হতো যদি শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করতেন এবং দলের হাল না ধরতেন। ’৭৫ থেকে ’৮২ এই ক’বছরেই নানা ষড়যন্ত্রেনানা মতবাদে নানা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে যাচ্ছিল। ’৭৫ পরবর্তী হতাশবিভক্তকোণঠাসা ও দুর্বল আওয়ামী লীগকে আজকের এই পর্যায়ে আনার পেছনে শেখ হাসিনার অবদান কম নয়। তা যেমন তার নেতৃত্বের কারণে তেমনি জাতির জনকের রক্ত সম্পর্কের কারণেও। বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতিতে এখনো আওয়ামী লীগের বিকল্প গড়ে না ওঠার দায় আওয়ামী লীগের নয়। এই ব্যর্থতা বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোর। কারণ শুধু ক্ষমতার রাজনীতির জন্যেলুটপাটে অংশ নেয়ার জন্যে যারা আজ আওয়ামী লীগে ভিড়েছে এবং যাদের জন্যে আওয়ামী লীগ আজ বিতর্কিত ও নিন্দিত হচ্ছে তাদের উত্থান ঠেকানো যেত যদি এদেশে একটি দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান ঘটতো। অতীতের মতো এখনো দেখতে পাই আওয়ামী লীগকে চাপে রাখতেসঠিক পথে পরিচালিত করতে ১৪ দলের মতো রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন আছে। আমরা এখনো দেখতে পাই বর্তমান মন্ত্রিসভায়ও উজ্জ্বলসফল ও ব্যতিক্রম ব্যক্তিরা কোন একটি সময়ে বাম ঘরানার রাজনীতি করেছেন নতুবা কোন না কোনভাবে যুক্ত ছিলেন। তারপরেও বলতে হয় এদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকাতেসাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঠেকাতে আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনো নেই। এবং সে আওয়ামী লীগকে একতাবদ্ধ করতেসুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। ১/১১ এর ঘটনা থেকেই আমরা শিক্ষা পেয়েছি হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগকে যোগ্য নেতৃত্ব দেয়ার একক কোন নেতা নেই। আর আওয়ামী লীগ দুর্বল হলেদ্বিধা বিভক্ত হলেএদেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীরই শক্তি বৃদ্ধি হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এটি কোন গণতান্ত্রিক দেশের একটি গণতান্ত্রিক দলের সুস্থ রাজনৈতিক ধারা কিনাআমি নি:সন্দেহে বলবো তা নয়। এমন পরিস্থিতি কাম্যও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির ধারাতো তাই। বাংলাদেশ ছাড়া পার্শ্ববর্তী মায়ানমারভারতপাকিস্তানশ্রীলঙ্কা এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও রাজনীতি করেছেন দীর্ঘদিন। ভাল হোক আর মন্দ হোক এই পারিবারিক রাজনীতির আবর্তেই চলছে এদেশগুলোর রাজনীতি। তা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। যাক সে কথাএবার অন্য শক্তিটির কথা বলি। অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক ও ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা দল ও সামরিক ছত্রছায়ায় জন্ম নেয়া দলগুলোর কথা যদি ধরি। আরেকটু খুলে বললে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তির কথা যদি ধরি সেখানে নেতৃত্বের কোন সংকট নেই। প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নেতৃত্বে আজ খালেদা জিয়াও যা নিজামীও তা কিংবা তা যেকোন ব্যক্তি,তাকে শিখন্ডি করে এই শক্তির তৎপরতা চলতে কোন বাধা নেই। স্বাধীনতার পরে যে কোনভাবেই হোক জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করে এসেছে। এবং দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল ও মিথ্যা ইতিহাস শুনিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তৈরি করা হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী যেকোন শক্তিকে সমর্থন দেবেনেতৃত্বে যারাই থাকুক না কেন। একটি মুসলিম প্রধান দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে পরিণত করা সহজ সাধ্য নয়। এছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম মুসলিম দেশ যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা আছে। (প্রকৃত গণতন্ত্র অবশ্য এখনো সুদূর পরাহত)। অন্তত ভোটাধিকার সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ কিছুটা হলেও আছে। এই ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে একটি শক্তি বাংলাদেশে সর্বদাই সক্রিয়। এরা রাজনৈতিকভাবেই শুধু চিহ্নিত নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এরা সক্রিয়। এরা মুখে উদারতা ও প্রগতিশীলতার কথা বললেও কার্যত আক্রমণ ও ক্ষতি করেন প্রগতিশীল শক্তির।

বিশ্বে বর্তমান সরকার প্রধানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীযুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকপ্রধান বিরোধি দল, (২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালিন সরকারের সময়ে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। অভিযোগ আছে এই ঘটনার সাথে তৎকালিন জোট সরকারের সংপৃক্ততা ছিলপার্শ্ববর্তী মায়ানমারের আরকানি মুসলিমদের জঙ্গিগোষ্ঠীআসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাসহ বেশ কিছু উগ্রগোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু এখন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার জীবন বিপন্ন হওয়া মানে মৌলিক বাংলাদেশউদার বাংলাদেশ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়া।

তাইঅনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে এখনো অপরিহার্য বলেই মনে হয়। আজকে দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী যখন নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে হাসিনা-খালেদা কিংবা আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে একই পাল্লায় মাপার চেষ্টা করেন এবং আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে ভাবেন তখন বিস্মিত হই। ওরা হয় অপরিণামদর্শী নতুবা জ্ঞানপাপী। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিহলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার জন্যে সরকার সমালোচিতনিন্দনীয় হতে পারে। পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও কালক্ষেপণ সমালোচনার বিষয় হতে পারে কিন্তু তা কোনক্রমেই সরকার পতনের কারণ হতে পারেনা। এটি ভাববার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ নেই যে,আওয়ামী লীগ সরকারের ওসব ব্যর্থতা বা বিতর্কিত কাজের জন্যে আগামীবার বিএনপি-জামাত জোটকে পুনরায় ক্ষমতায় আনা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ ১০০ ভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বটে কিন্তু তাই বলে যে কাজ বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে করা সম্ভব তা ধারণা করা বা মনে করা চরম বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

বিগত জোট সরকারের শাসনকালেএমন কি নির্বাচনে জেতার পরদিন থেকে শুরু হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনসারাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলাসিনেমা হল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বোমা হামলাব্রিটেন রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলাদশ ট্রাক অস্ত্র চালান২১ আগস্ট বিরোধী দলের সমাবেশে গ্রেনেড হামলাআদালতে বোমা ফাটিয়ে বিচারক হত্যাবাংলা ভাইয়ের উত্থানসাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ.এম এস কিবরিয়া হত্যা প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও জঙ্গি হামলার মতো অসংখ্য ঘটনার পরে এখনো যারা মনে করেন আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি-জামাত নেতাদের মানসিক সুস্থ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগ্রত হয়। আমি বরং মনে করি সত্যিকার দেশপ্রেমিক বাম ও গণতান্ত্রিক মোর্চাগুলো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালি হোক। দর কষাকষি করার মত সংসদে আসন লাভ করুক এবং বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে প্রগতিশীল,ধর্মনিরপেক্ষ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে চাপে রাখুক। একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের সরকার প্রধান হয়ে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে জাতিসংঘবিশ্ব ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সংস্কারের যে দাবি করে চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। চার দশক আগে যে দশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অপমানিত করা হয়েছিল সে দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী সেই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন এই দাবি করেছিলে-তখন তাঁর এই স্পর্ধা একজন বাঙালি হিসেবে আমাকে জাগিয়ে তুলেছে ফের। লক্ষণীয় ইতোমধ্যে বিশ্ব ব্যাংক সংস্কারের কথা নিজেই বলেছেন সংস্থাটির প্রধান। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় অগ্রজ সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী ‘সংকট বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থারমন্ত্রীর নয়” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। আমি তাঁর লেখার সাথে একমত। বস্তুত ব্যক্তির নয় সংকট ব্যবস্থার। ব্যবস্থার কারণেই বঙ্গবন্ধু সফল হতে পারেননি। আর সীমাহীন আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত সততা থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় হোঁচট খাচ্ছেন বার বার। আমরা নিজেরা বর্তমান বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করছি বটে। কিন্তু তার জন্যে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ তাগিদ শুধু আজ বাংলাদেশেই নয় ভেনিজুয়েলায় শ্যাভেজের চতুর্থবারের বিজয় কিংবা ল্যাটিন আমেরিকাসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে তরুণদের মধ্যে বিপ্লবী বীর চে’ গুয়েভারাকে নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি সে ইঙ্গিতই প্রদান করে। বর্তমান লুটেরা শ্রেণীর শাসন থেকে মুক্তির জন্য আমাদেরও বিপ্লব ও সে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে একজন চে’র প্রয়োজন। কিন্তু সে সম্ভাবনা ও বাস্তবতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আর যাই করি না কেন জঙ্গি সমর্থিত একটি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় পুনরার আসীন করতে পারি না।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১২

আমার ধারণা ভ্রান্ত হোক

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                             উপসম্পাদকীয়                             ব্রাত্যজনের কথা




দেশের প্রত্যন্ত এলাকার চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে মধ্য রাতের টকশো পর্যন্ত এখন দু’টি ঘটনা আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। আর বিগত কয়েকদিন ধরে সংবাদ মাধ্যমের প্রধান শিরোনামও এখন এ দুটি ঘটনা। তার একটি হলো রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় বৌদ্ধ মূর্তিতে হামলা, বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, অপরটি হলমার্ক কেলেঙ্কারির হোতা তানভির মাহমুদের গ্রেফতার।
বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা বাংলাদেশে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগে বৌদ্ধরা কখনো এদেশে মুসলিমদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। তবে কয়েকদিন আগে রামুতে যা ঘটেছে সে ঘটনায় দেশের প্রায় প্রতিটি শান্তিপ্রিয় মানুষ আহত হয়েছেন। এ হামলা শুধু বৌদ্ধদের ওপর নয়, এ হামলা হয়েছে মানবতার ওপর, বাংলাদেশের সংবিধানের ওপর, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর।
কোথাও কোন একজনের ফেইসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করা হবে, আর তা দুয়েক ঘণ্টার মধ্যে চাউর হয়ে যাবে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হবে এবং সবশেষে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত বৌদ্ধ বসতিতে হামলা চালাবে, অগ্নিসংযোগ করবে, জ্বালিয়ে দেবে পবিত্র উপাসনালয়, শত শত বছরের পুরোনো মন্দির, পাঠাগার তা কোন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। সেই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর থেকে যতই দিন যাচ্ছে ততই পরিষ্কার হচ্ছে এই ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল, তারা কোন শক্তির ইন্ধনদাতা, তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল।
এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা চলছে তা আমি পূর্বেও উল্লেখ করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও সমালোচিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সরকারি ও বিরোধীদল ঐতিহ্য অনুযায়ী একে অপরকে দোষারোপ করে বক্তব্য রেখে চলছেন। অনেকে ইতিমধ্যেই সংশয় প্রকাশ করেছেন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে। অবশ্য সংশয় অমূলক নয়।
অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়েই এমন সংশয় ব্যক্ত করেছেন অনেকে। কারণ এরশাদের শাসনামল থেকে শুরু হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার আজ অবধি হয়নি। এরশাদের শাসনামলে অন্তত চট্টগ্রাম মহানগরীতে কার কার নেতৃত্বে হিন্দুদের মন্দিরে আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল তা নগরীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে কমবেশি সবাই জানে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের কেউ কেউ দল বদল করে বর্তমান প্রধান বিরোধী দলের সাথে ভিড়ে গেলেও কৃতকর্মের জন্যে কখনো তাদের জবাবদিহি করতে হয়নি।
দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা বিচারের সম্মুখিন হওয়া তো দূরের কথা। শুধু তাই নয় ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরে সারাদেশে যেভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা নিয়েও পরবর্তীতে জোরালো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মাত্র কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রে দেখলাম বর্তমান সরকার ২০০১ সালে সারাদেশে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে মামলা করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তা এত দীর্ঘদিন পরে কেন? এবং যাদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, দেখে-শুনে পুনরায় মনে হচ্ছে এর বিচারও কোনদিন হবে না।
চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, হাটহাজারীর নন্দীরহাটে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের যদি দ্রুত ও সঠিক বিচার হতো বা বিচারের উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলে রামু বা পটিয়ার এসব দুঃখজনক ঘটনা রোধ করা যেত বলে মনে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার না হওয়া, অধিকন্তু দাঙ্গাকারীরা সমাজে দাপটের সঙ্গে চলতে পারায় একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। আইন বা সমাজ তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।
দ্বিতীয় যে ঘটনা ব্যাপক আলোচিত তা হলো দেশের সর্ববৃহৎ অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা।
সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামক নতুন গজিয়ে ওঠা একটি কোম্পানি   কর্তৃক প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে বর্তমান সরকার চরম বেকায়দায় আছে- বোঝা যাচ্ছে তাদের অস্বাভাবিক আচরণ, পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত দেখে। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রচুর জল ঘোলা করার পর সম্প্রতি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মামলায় বাদি দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। তার আগে সোনালী ব্যাংক বলে দিয়েছিল হলমার্কের বিরুদ্ধে তারা মামলা করবে না। বর্তমান দুদক দায়েরকৃত মামলাগুলো ফৌজদারি। টাকা গ্রহণে অসৎ ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার বিরুদ্ধে এই মামলা। যার মাধ্যমে হলমার্কের হাতিয়ে নেওয়া টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। অর্থ ফেরত পেতে হলে মামলা করতে হবে সোনালী ব্যাংককেই এবং তা অর্থঋণ আদালতে। তাছাড়া বর্তমানে হলমার্ক গ্রুপের যে অবস্থা অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে এত বিপুল অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে সম্পদ বন্ধক হিসেবে দেখানো হয়েছিল সেখানে শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। তার মানে বর্তমানে হলমার্ক গ্রুপের সমুদয় সম্পদ বিক্রি করেও এক-চতুথাংশ অর্থ আদায় সম্ভব হয়ে উঠবে না। তার মানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের যে সংস্কৃতি দেশে বিদ্যমান।
ব্যাংকের টাকা নিয়ে তা গায়েব করে দেয়ার যে ধারা বিদ্যমান তা থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ বাংলাদেশেই এমন অনেক শিল্পপতি আছেন ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে গেলে যাদের থালা নিয়ে বসতে হবে আমানত শাহ (রা.) মাজারের সামনে। এ পরিস্থিতির উদ্ভব হবেনা কখনো বাংলাদেশে। অর্থাৎ ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়ার সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে চালু হবে না বাংলাদেশে। কারণ তাতে ধরাশায়ী হবেন অনেক রুই কাতলারা। অতএব, সময় গড়াবে। তানভির জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। আদালতে তাঁর পক্ষে দাঁড়াবেন বাঘা বাঘা আইনজীবীরা। আগামী নিরানব্বই বছরেও এ টাকা শোধ হবার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখছিনা।
আমার ধারণা বাংলাদেশে অন্তত দুটি অপকর্মের বিচার আপাতত হবে না। কারণ অতীতে হয়নি। একটি সংখ্যালঘু নির্যাতন আর একটি সরকারি তথা জনগণের টাকা মেরে দেয়া বা আত্মসাৎ করা।
কারণ অতীতে ও তা হয়নি। তারপরেও আমি কায়মনোবাক্যে প্রত্যাশা করি আমার ধারণা ভ্রান্ত হোক। অন্তত রামু এবং হলমার্ক কেলেঙ্কারিই হোক এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১২

বাংলাদেশ সংখ্যালঘু শূন্য হলে লাভ কার

দৈনিক আজাদী                      উপসম্পাদকীয়                         কাল আজ কাল
৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৯ আশ্বিন ১৪১৯ সাল ‌১৭ জিলক্বদ ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

বাংলাদেশে কখনোই কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। এমনকি ’৪৭ এর দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের ২৩ বছর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ৪১ বছরের মধ্যে এই বক্ষমান কলামটি লেখার সময় পর্যন্ত কোথায়ও কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি। যা হয়েছে তা সংখ্যালঘুর ওপর হামলা ও নির্যাতন। দাঙ্গার জন্যে দু’পক্ষকে সক্রিয় হতে হয়। দু’পক্ষেরই অংশগ্রহণ থাকে তাতে। এ ভূ-খণ্ডের কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দাঙ্গায় অংশ নেয়ার মতো বা দাঙ্গা করার মতো মানসিক শক্তি অর্জন করেনি। তারা বরাবরই সংখ্যাগুরুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং এদের বিশাল একটি অংশ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। ’৪৭ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দুদের দেশত্যাগ কখনো থামেনি। ’৪৭ এ একবার, ’৬৫তে পাক-ভারত যুদ্ধের পরে একবার ’৭১ এ একবার এরশাদের আমলে দুবার২০০১ সালে জোট সরকার (বিএনপি-জামাত জোটক্ষমতায় আসার পরে একবার এভাবে এদেশের বিপুল সংখ্যক হিন্দু পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে এদেশের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে। আশ্রয় নিয়েছে না বলে বলা উচিৎ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত আদম শুমারীর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে বিগত দশ বছরে ৯ লাখ সংখ্যালঘু কমেছে দেশে। দেশ বিভাগের সময় সংখ্যালঘুর সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় এক চতুর্থাংশ আজ সেখানে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ৮ ভাগের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। তথ্যটি উদ্বেগজনক,অমানবিকসাম্প্রদায়িক ও একটি সভ্য জাতির জন্যে অবমাননাকর।

এই চট্টগ্রামেই কয়েকমাস আগে পাথরঘাটার একটি মসজিদে আক্রমণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোর উপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। সে সময় অনেকের বাড়িতে আগুনও দেয়া হয়। এই এলাকার এই মসজিদকে কেন্দ্র করে বা মসজিদে ভাংচুর করার অভিযোগ তুলে দুয়েক বছর পরপর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেও আজ পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। বিচার হওয়াতো দূরের কথা। এখানে বলে রাখা ভাল চট্টগ্রাম নগরীর এই এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এই ঘটনার কিছুদিন পরে হাটহাজারী থানার নন্দীরহাট গ্রামেও এমনি করে মসজিদ ভাঙ্গার চেষ্টা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে হিন্দুদের ওপর হামলা নির্যাতন করা হয়েছে। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বেশ ক’টি মন্দির। এই ঘটনারও কোন সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। দোষীদের চিহ্নিত করা হয়নি। বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তখনকার পত্র-পত্রিকায় জড়িত দু’একজনের নাম প্রকাশ পেলেও পরবর্তীতে তাদের কারুরই বিচার হয়নি।

মাত্র কয়েকদিন আগে রাঙামাটি কলেজে পাহাড়ি ও বাঙালি দু’ছাত্রের মধ্যে সামান্য কথা কাটিকাটিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত হয় পাহাড়িরা। এখানেও বলে রাখা প্রয়োজন আগামী দু’এক দশকের মধ্যে পাহাড়ে পাহাড়িরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। (সুযোগ পেলে এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে আছে)। রাঙামাটিতে সংঘটিত এই ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতে গত শনিবার রাতে এবং পরবর্তী আরও দু’দিন কক্সবাজারের রামুউখিয়াটেকনাফ আর চট্টগ্রামের পটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। বাড়ি-ঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বসতির পর বসতি এমনকি বৌদ্ধদের ধর্মীয় উপাসনালয় বিহার ও প্যাগোডা। সেখানে গৌতমবুদ্ধের মূর্তি ভাংচুর ও অপমান করা হয়েছে। দুর্বৃত্তরা নির্বিচারে জ্বালিয়ে দিয়েছে শত শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোযা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যই শুধু নয় বলতে হবে বিশ্ব ঐতিহ্যও। তারা শতবর্ষী পাঠাগারও জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি অনেক বছর আগে রামুর ঐ এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এই মন্দিরগুলোর নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আবার নতুন করে এসব নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। যদিও বা নির্মাণ করা যায় বৌদ্ধদের মনে আর মুসলিমদের বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা যাবে কিনা সন্দেহ আছে। সহিংস ধর্মের পবিত্রস্থান হিংসার অনলে দাহ হতে পারে তা ভাবতেও কুণ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু এই হিংসা কেনকার বিরুদ্ধেকী অপরাধ করেছিল সেদিন ঘুমন্ত,পরিশ্রান্তশান্তিপ্রিয়রামুবাসী বৌদ্ধরাতাদের একটি মাত্র অপরাধ হতে পারে তারা সংখ্যায় কম। প্রতিরোধ করার শক্তি তাদের নেই এবং এ ধরনের সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার এই দেশে আজ অবধি না হওয়া। (সম্ভবত ২০০১ এর নির্যাতনের শিকার পূর্ণিমা ছাড়া)। আমি পূর্বে যে ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিলাম তা শুধুমাত্র চট্টগ্রামে খুব অল্প সময়ে সংঘটিত হওয়া যার একটিরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারকাজ সম্পন্ন হয় নি। যা পূর্বেও উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৌদ্ধদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এর আগে সম্ভবত ঘটেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এইসব কি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনাআমি তা মনে করি না। আমার মনে হয় দেশের বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন কোন ব্যক্তিই তা মনে করেন না। ধারাবাহিক ঘটনার কথা পরে বলবো আগে বর্তমানগুলো নিয়ে বলি। বর্তমানে দেশে খুব বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রম চলছে আর তা হলো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম। যে যাই বলুক কিংবা যত শিথিলতাই (!) থাক আগামী ডিসেম্বর বা তার কয়েক মাসের মধ্যেই ক’জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ শেষ হবে এবং রায়ত্ত ঘোষিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে সাড়ে তিন বছর আগে তা কল্পনাও করা যায়নি। এই তালিকায় এমন কয়েকজন আছেন সরকার তাদের গ্রেফতার করতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা খোদ আওয়ামী লীগেরও অনেকে ভাবতে পেরেছে কিনা সন্দেহ আছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কী পরিমাণ অর্থ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়েছে এই বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্যে এবং বর্তমান আইন এবং ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার জন্যে। মীর কাশিম আলী একার পক্ষেই বিদেশি লবিস্ট নিয়োগের জন্যে দেয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার। প্রবাদ আছে, “টাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকেন।” জামাত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধীদের টাকা এখন কথা বলতে শুরু করেছে। অতএব বাংলাদেশে এখন থেকে প্রতিদিনই অপেক্ষা করতে হবে নতুন নতুন অরাজক পরিস্থিতি অবলোকন করার জন্যে। এ কাজে যে শুধু বিএনপি-জামাত বা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা জড়িত তা নয়। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পুলিশে ও অন্যান্য বাহিনীতে এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও লুকিয়ে আছে তাদের সমর্থক ও চর। তাদের ইন্দনেই এমন ঘটনা আরও ঘটবে। শুধু সংখ্যালঘু নয় মুসলিমদের মধ্যেও বিভিন্ন তরিকা বা মতভেদ নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হতে পারে। পুলিশ বিরোধী দল ঠেকাতে যত সহজে অ্যাকশনে যেতে পারে। লাঠি পেটা এমন কি গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না সেই পুলিশ সংখ্যালঘু নির্যাতনের সময় নিষ্ক্রিয় থাকে কাদের খুশী করার জন্যে। কাদের ফায়দা লুটের জন্যে।

আরাকানে রাখাইনদের দ্বারা রোহিঙ্গা নির্যাতনের পরে। এবং রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কারণে এসব সীমান্ত এলাকায় আগে থেকে প্রশাসন সতর্ক মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেনকেন সন্ধ্যা থেকে রামুতে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হলেও পুলিশ আগাম কোন ব্যবস্থা নেয়নি। রামুর ঘটনার পর অন্যান্য এলাকায় আক্রমন করার সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে। এসব এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি কেনএখন পর্যন্ত দোষীরা চিহ্নিত হলো না কেনসে রাতে গাড়িতে করে কোন কোন এলাকা থেকে লোক আনা হয়েছিল। সেসব গাড়ির মালিক কারাঅনেক প্রশ্নের উত্তর একটিই। আর তা হলো সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল।

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও তাড়ানোর ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী কারণটি বলি। বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দ্বিধারায় বিভক্ত। একটি ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে উজ্জীবিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় লালিত অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষউদার গণতান্ত্রিক ধারা। অন্যটি পাকিস্তানী ভাবধারায় লালিত সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িকআধা সামরিক ও জঙ্গি গোষ্ঠী সমর্থিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ধারা। ঐতিহাসিকরাজনৈতিক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা প্রথম ধারাটির সাথে যুক্ত এবং সমর্থক। এখন বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইলেদুর্বল করতে হবে প্রগতিশীল ধারাটিকে। আর প্রগতিশীল ধারার বড় একটি অবলম্বনসমর্থক বা সহজ করে বললে ভোটার দেশের সংখ্যালঘু জনগণ। এখন সংঘাত স্থানীয় মাধ্যমেআক্রমণ আতঙ্ক ও জবরদখলের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা গেলে দুর্বল হবে প্রগতিশীল শক্তি। আর তাতে সহজ অংকে লাভবান হবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। অংকটি বড় সহজ। যে অংকের শুরু ’৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর। এর সাথে একটি উপরি পাওনা আছে বটে। হিন্দুদের ফেলে যাওয়া জায়গা জমি। ভোট কমার সাথে সম্পদ বৃদ্ধির হিসেব যারা বোঝে তাদের খুব বেশি বোকা ভাবা ঠিক হবে না। আমরা চাই রামুর ঘটনাটি দেশে এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা হোক। সে সাথে প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক। বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশ সাম্প্রদায়িক নয়। হাজার বছর দরে এদেশে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃস্টান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করেছে। সাম্প্রদায়িক হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণেই যুগে যুগে এই উপমহাদেশে বলি হয়েছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। এই ঘৃন্য অপকর্মের অবসান চাই।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ