পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১২

আমার ধারণা ভ্রান্ত হোক

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                             উপসম্পাদকীয়                             ব্রাত্যজনের কথা




দেশের প্রত্যন্ত এলাকার চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে মধ্য রাতের টকশো পর্যন্ত এখন দু’টি ঘটনা আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। আর বিগত কয়েকদিন ধরে সংবাদ মাধ্যমের প্রধান শিরোনামও এখন এ দুটি ঘটনা। তার একটি হলো রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় বৌদ্ধ মূর্তিতে হামলা, বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, অপরটি হলমার্ক কেলেঙ্কারির হোতা তানভির মাহমুদের গ্রেফতার।
বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা বাংলাদেশে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগে বৌদ্ধরা কখনো এদেশে মুসলিমদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। তবে কয়েকদিন আগে রামুতে যা ঘটেছে সে ঘটনায় দেশের প্রায় প্রতিটি শান্তিপ্রিয় মানুষ আহত হয়েছেন। এ হামলা শুধু বৌদ্ধদের ওপর নয়, এ হামলা হয়েছে মানবতার ওপর, বাংলাদেশের সংবিধানের ওপর, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর।
কোথাও কোন একজনের ফেইসবুকে একটি ছবি ট্যাগ করা হবে, আর তা দুয়েক ঘণ্টার মধ্যে চাউর হয়ে যাবে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হবে এবং সবশেষে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত বৌদ্ধ বসতিতে হামলা চালাবে, অগ্নিসংযোগ করবে, জ্বালিয়ে দেবে পবিত্র উপাসনালয়, শত শত বছরের পুরোনো মন্দির, পাঠাগার তা কোন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। সেই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর থেকে যতই দিন যাচ্ছে ততই পরিষ্কার হচ্ছে এই ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল, তারা কোন শক্তির ইন্ধনদাতা, তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল।
এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা চলছে তা আমি পূর্বেও উল্লেখ করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও সমালোচিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সরকারি ও বিরোধীদল ঐতিহ্য অনুযায়ী একে অপরকে দোষারোপ করে বক্তব্য রেখে চলছেন। অনেকে ইতিমধ্যেই সংশয় প্রকাশ করেছেন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে। অবশ্য সংশয় অমূলক নয়।
অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়েই এমন সংশয় ব্যক্ত করেছেন অনেকে। কারণ এরশাদের শাসনামল থেকে শুরু হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার আজ অবধি হয়নি। এরশাদের শাসনামলে অন্তত চট্টগ্রাম মহানগরীতে কার কার নেতৃত্বে হিন্দুদের মন্দিরে আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল তা নগরীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে শুরু করে কমবেশি সবাই জানে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের কেউ কেউ দল বদল করে বর্তমান প্রধান বিরোধী দলের সাথে ভিড়ে গেলেও কৃতকর্মের জন্যে কখনো তাদের জবাবদিহি করতে হয়নি।
দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা বিচারের সম্মুখিন হওয়া তো দূরের কথা। শুধু তাই নয় ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরে সারাদেশে যেভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা নিয়েও পরবর্তীতে জোরালো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মাত্র কয়েকদিন আগে সংবাদপত্রে দেখলাম বর্তমান সরকার ২০০১ সালে সারাদেশে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে মামলা করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তা এত দীর্ঘদিন পরে কেন? এবং যাদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, দেখে-শুনে পুনরায় মনে হচ্ছে এর বিচারও কোনদিন হবে না।
চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, হাটহাজারীর নন্দীরহাটে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের যদি দ্রুত ও সঠিক বিচার হতো বা বিচারের উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলে রামু বা পটিয়ার এসব দুঃখজনক ঘটনা রোধ করা যেত বলে মনে হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার না হওয়া, অধিকন্তু দাঙ্গাকারীরা সমাজে দাপটের সঙ্গে চলতে পারায় একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। আইন বা সমাজ তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।
দ্বিতীয় যে ঘটনা ব্যাপক আলোচিত তা হলো দেশের সর্ববৃহৎ অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা।
সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামক নতুন গজিয়ে ওঠা একটি কোম্পানি   কর্তৃক প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে বর্তমান সরকার চরম বেকায়দায় আছে- বোঝা যাচ্ছে তাদের অস্বাভাবিক আচরণ, পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত দেখে। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রচুর জল ঘোলা করার পর সম্প্রতি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মামলায় বাদি দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। তার আগে সোনালী ব্যাংক বলে দিয়েছিল হলমার্কের বিরুদ্ধে তারা মামলা করবে না। বর্তমান দুদক দায়েরকৃত মামলাগুলো ফৌজদারি। টাকা গ্রহণে অসৎ ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার বিরুদ্ধে এই মামলা। যার মাধ্যমে হলমার্কের হাতিয়ে নেওয়া টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। অর্থ ফেরত পেতে হলে মামলা করতে হবে সোনালী ব্যাংককেই এবং তা অর্থঋণ আদালতে। তাছাড়া বর্তমানে হলমার্ক গ্রুপের যে অবস্থা অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে এত বিপুল অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে সম্পদ বন্ধক হিসেবে দেখানো হয়েছিল সেখানে শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। তার মানে বর্তমানে হলমার্ক গ্রুপের সমুদয় সম্পদ বিক্রি করেও এক-চতুথাংশ অর্থ আদায় সম্ভব হয়ে উঠবে না। তার মানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের যে সংস্কৃতি দেশে বিদ্যমান।
ব্যাংকের টাকা নিয়ে তা গায়েব করে দেয়ার যে ধারা বিদ্যমান তা থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ বাংলাদেশেই এমন অনেক শিল্পপতি আছেন ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে গেলে যাদের থালা নিয়ে বসতে হবে আমানত শাহ (রা.) মাজারের সামনে। এ পরিস্থিতির উদ্ভব হবেনা কখনো বাংলাদেশে। অর্থাৎ ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়ার সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে চালু হবে না বাংলাদেশে। কারণ তাতে ধরাশায়ী হবেন অনেক রুই কাতলারা। অতএব, সময় গড়াবে। তানভির জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। আদালতে তাঁর পক্ষে দাঁড়াবেন বাঘা বাঘা আইনজীবীরা। আগামী নিরানব্বই বছরেও এ টাকা শোধ হবার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখছিনা।
আমার ধারণা বাংলাদেশে অন্তত দুটি অপকর্মের বিচার আপাতত হবে না। কারণ অতীতে হয়নি। একটি সংখ্যালঘু নির্যাতন আর একটি সরকারি তথা জনগণের টাকা মেরে দেয়া বা আত্মসাৎ করা।
কারণ অতীতে ও তা হয়নি। তারপরেও আমি কায়মনোবাক্যে প্রত্যাশা করি আমার ধারণা ভ্রান্ত হোক। অন্তত রামু এবং হলমার্ক কেলেঙ্কারিই হোক এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

1 টি মন্তব্য:

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ