পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪

'মাননীয় পূর্তমন্ত্রী, দয়া করে এই লেখাটি পড়বেন কি?'

২৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১১ বৈশাখ ১৪২১ সাল ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল
চট্টগ্রামের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পীঠস্থান এখন ডিসি হিল বা নজরুল স্কয়ার। প্রায় বছরব্যাপী এখানে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ভোরে,বিকেলে ও সন্ধ্যায় নানান বয়েসি মানুষ এখানে হাঁটতে বা অবসর নিতে আসেন।

একটি সময় ছিল যখন এই পাহাড় বিভিন্ন বড় বড় বৃক্ষ রাজীতে পরিপূর্ণ ছিল। বিশাল বিশাল শিশু গাছের শেকড়ে বসে মানুষ আড্ডা দিতো। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া নববর্ষের অনুষ্ঠান হতো এসব গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে, ছায়ায় ছায়ায়। এই পাহাড়ের পাশ দিয়ে আসতে যেতে হঠাৎ কখনো পলাশ বা শিমুল গাছের ফুল দেখে বোধ হয়েছে এখনতো বসন্তকাল। আমাদের কৈশোর-তারুণ্যে এত এত মিডিয়া টিভি বা পত্রিকা ছিল না। অনেক ঘটা করে আড়ম্বর করে বসন্ত উৎসবও পালিত হতো না। ডিসি হিলের পলাশ ফুল দেখে আর তার ডালে বসা কোকিলের কুহুতান শুনে বুঝতে পারতাম ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আপনি, মাননীয় পূর্তমন্ত্রী তথা দু’দুটো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার সময়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। আর সে সাথে ডিসি হিলের সংস্কার করে ছিলেন বর্তমান মঞ্চ স্থায়ী গ্যালারি ইত্যাদি। সে সময় ডিসি হিলের গাছ কাটা হচ্ছে বলে আমাদের মধ্যে অনেকেই সে উন্নয়ন কর্মসূচির বিরোধীতা করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আপনার সংস্কার কাজ দেখে অনেকে সন্তুষ্টি ও স্বস্তি বোধ করেছেন। তবে সে সময় যতটুকু সংস্কার ও নির্মাণ কাজ করেছিলেন পরবর্তীতে তা পুনঃসংস্কারের অভাবে বর্তমানে জীর্ণ হতে চলেছে। এরই মধ্যে অনেকে ডিসি হিল সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন প্রকার প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। শুনেছি আপনার নিজস্ব কিছু পরিকল্পনাও আছে যা অছিরেই বাস্তবায়ন করবেন।

মাননীয় মন্ত্রী, আপনি চট্টগ্রামেরই সন্তান। একটি রাজনৈতিক পরিবারে আপনার জন্ম। দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিক আপনি। ছিলেন মেধাবী ছাত্র সে হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুরও প্রিয়ভাজন ছিলেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে আপনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন দ্বিতীয়বারের মতো মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার শহরের বাড়িটি ডিসি হিল থেকে অনতি দূরে। সে কারণে ডিসি হিলের স্মৃতি ও এই পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা আমার চেয়ে আপনার বহুগুণ বেশি। তাই সে সাহসে ডিসি হিল নিয়ে আমার ভাবনাটি আপনার নিকট উপস্থাপন করতে চাই।

এক সময় চট্টগ্রাম শহরেই অনেক পাহাড় ছিল। বর্তমান ডিসি হিলটি এই এলাকার কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যে একটি। আন্দরকিল্লা নজির আহমদ সড়কের পশ্চিমে, মোমিন রোডের দক্ষিণ-পূর্ব,বৌদ্ধ মন্দিরের পূর্ব ও সিনেমা প্যালেসের উত্তর অংশ জুড়ে কয়েকটি পাহাড়। ১) ফরেস্ট হিল, ২)তুলসী ধাম, যা কাটার পর একদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও টেলিগ্রাফের টাওয়ার, ৩)কমিশনারের পাহাড় ও ৪) জাফর আলী হিল বা বর্তমানের ডিসি হিল। ইতিহাস বিবৃত করলে পাঠকদের সুবিধা হবে বুঝতে তাই একটু পেছনে ফিরে যেতে চাই। ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে ইংরেজ শাসকরা পার্বত্যবাসীদের খুশি করতে তৎকালীন চাকমা রাজাকে এই চারটি পাহাড়ের মালিকানা প্রদান করে। পরবর্তীতে আঠারো শতকের শেষ দশকে ইংরেজ সরকার চাকমা রাজাদের কাছ থেকে ওর বেশির ভাগ অংশ পওনি হিসেবে নেয়। দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার বর্তমান এই পাহাড়গুলো হুকুম দখল করে। তবে ডিসি হিলের পূর্ব দিকে চাকমা রাজাদের সম্পত্তি এখনও আছে। তাদের একটি দীঘি ছিল যার নাম ছিল রাজাপুকুর। এখন পুকুর নেই রাস্তার নাম রয়ে গেছে রাজাপুকুর লেইন। বর্তমান ডিসি হিল এক সময় জাফর আলী হিল নামে খ্যাত ছিল। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে এটি তৎকালীন সরকারি উকিল বাঁশখালীর জাফর আলী খানের বাস ভবন ছিল। পরবর্তীকালে সাব জজ এবং জাফর আলী খানের সন্তান আনোয়ার আলী সেখানে বসবাস করতেন। এখানেই আনোয়ার সাহেবের পুত্র দার্শনিক ও চিন্তাবিদ শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো স্থাপিত হয়। ওই পদ বিলুপ্ত হলে ডিসি বা জেলা প্রশাসকরা বর্তমানে এই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বাংলোতে বসবাস করে আসছেন।

বর্তমানে ডিসি হিলে একটি মুক্ত মঞ্চ ও দর্শক গ্যালারি আছে। আছে কিছু নার্সারি ও ফুলের দোকান। কিছু অবৈধ দখলদার, সন্ধ্যার পর কিছু বখাটে ও মাস্তান। আর সে সাথে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু গাছপালা যা শতবর্ষী শিশু গাছগুলোসহ প্রকৃতির ক্ষতি সাধন করছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবার আমি আমার প্রস্তাবনাটুকু উপস্থাপন করছি।

১। এই পাহাড়ের সকল নার্সারি ও ফুলের দোকান এবং সে সাথে সকল অবৈধ দখলদারিদের উচ্ছেদ করতে হবে প্রথমে।

২। সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর গাছ কেটে পুরো পাহাড়জুড়ে দেশীয় ফলের গাছ রোপণ করা হোক। আমাদের সন্তানরা বেশিরভাগ দেশীয় ফল চেনে না, গাছ দেখা তো দূরের কথা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে সারা পাহাড় জুড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিলে সবাই ঘুরে ঘুরে গাছ চিনবে, ফল চিনবে। এর মধ্যে কয়েকটি অ্যাপ্রোচ নির্মাণ করে দিলে রোদ ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নেবে তারা। ফলের বাগান হলে সেখানে আপনা থেকেই পাখি আসবে। গড়ে উঠবে পাখিদের অভয়াশ্রম। এর মধ্যে কিছু মনুষ্যবান্ধব পশু যেমন খরগোস, বানর ইত্যাদি ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।

এই ফলের বাগান থেকে হয়ত আর্থিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গাছ, ফুল, ফল চেনাতে ও মৃত্তিকা সংলগ্ন করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এই পাহাড়ে আর একটিও স্থাপনা চাই না। আর এক ইঞ্চিও ইট-চুন-সুরকীর প্রলেপ চাই না। এই পাহাড় তার সবুজ নিয়ে অক্ষত থাকুক। এই পাহাড়ের কয়েকশ গজের মধ্যে বেশ কিছু মিলনায়তন আছে কাজেই এখানে কোনো অডিটোরিয়াম নির্মাণের প্রয়োজন নেই মুসলিম হল, স্টুডিও থিয়েটার ও চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট ছাড়াও চেরাগি পাহাড়ে আছে দুতিনটি ছোট ছোট মিলনায়তন। কাজেই এখানে সে ধরনের কোনো কিছু নির্মাণ করার কোনো যুক্তি নেই। এই পাহাড় থেকে কয়েকশ গজের মধ্যে আছে কয়েকটি মসজিদ। চট্টগ্রামের পাহাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর বলে এখানে ক্যাবলকার করাও নিরাপদ নয়। এখানে কোনো কৃত্রিম হ্রদ না করে পাহাড়ের পূর্ব পাশে আগে যেখানে একটি পুকুর ছিল বর্তমানে যা ভরাট করে নার্সারি ব্যবসায়ীদের লিজ দেওয়া হয়েছে,সেখানে শিশুদের সাঁতার শেখার জন্য একটি সুইমিং পুল নির্মাণ করা যেতে পারে।

মাননীয় মন্ত্রী, এই বিরাট নগরীজুড়ে শুধু ইট-সিমেন্টের অট্টালিকা। কোথাও একটু খোলা ময়দান নেই। আমাদের চট্টগ্রামে কোনো ‘রমনা পার্ক’ নেই, ‘সোহরাওয়ার্দী’ ও ‘ওসমানী উদ্যান’ নেই,আমাদের জাতীয় উদ্যান নেই। তেমন কোনো খোলা মাঠ নেই, সরোবর নেই, লেক নেই, নয়ন জুড়ানো একটু সবুজ নেই। এই বিস্তৃত-বিস্তীর্ণ শহরে একটু খোলা মাটি নেই যে মাটি একটু বৃষ্টির জল শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের সন্তানদের জন্য অন্তত এই ডিসি হিলকে উন্মুক্ত রাখুন- যেখানে জল-কাদা মাখামাখি করতে পারে তারা। হাজারো ভেজালের ভিড়ে এখনও এখানে ভোরে ও সন্ধ্যায় শত শত স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ আসে একটু খোলা নিশ্বাস নিতে এই ব্যবস্থাটি রুদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করবেন না দয়া করে। এই নগরীর হৃদপিণ্ড এই ডিসি হিলকে সবুজে সবুজময় করুন। এর জন্য খুব বেশি ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়েক লাখ টাকায় পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব। মাননীয় মন্ত্রী, দখলে-দূষণে চট্টগ্রাম দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। এই শহরের হাজার হাজার দীঘি-পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পাহাড় কেটে কেটে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বিশেষত্ব খর্ব করা হয়েছে। নদী-খাল দখলে-দুষণে-তার গতিপথ হারিয়েছে। আমরা আমাদের সন্তানদের কী বীভিষীকাময় ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এর দায় থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাব না। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৫৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। উন্নত বিশ্বের পাপের দায় নিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে। এই অবস্থায় আমাদের সকল উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে প্রথমে। মাননীয় মন্ত্রী, আপনি দেশের অন্যতম একজন প্রবীণ রাজনীতিক। চট্টগ্রামের রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। আপনার পক্ষে এ কাজটুকু বাস্তবায়ন করে দেওয়া সম্ভব। এই নগরীর হৃদপিণ্ড ডিসি হিলকে দেশীয় ফলের বাগানে পরিণত করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। চট্টগ্রামবাসী আপনার এই বদান্যতাকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

'ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে...'

দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৭ চৈত্র ১৪২০ সাল ৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
১৯৭৪ সালে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী সঞ্জিত আচার্য লিখলেন আঞ্চলিক গান- আঁর খাল কুলত বাড়ি, বন্ধু মন গইল্যু চুরি। রাইতে রাইতে আইসত বন্ধু সাম্পানত গড়ি---। ১৯৭৬ সাল। ঢাকায় নির্মিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের লোক গাঁথা নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাম্পানওয়ালা’ এর জন্য গানের প্রয়োজন। ট্রেনে ঢাকায় যেতে যেতে এই গানের স্রষ্টা সঞ্জিত আচার্য সুরের মধ্যে নতুন কথা বসিয়ে দিলেন- ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/ অভাগিনীর দুঃখর কথা কইও বন্ধুরে, ওরে কর্ণফুলীরে।

এর আগে ৬০ দশকে শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার মোহন লাল দাশ সৃষ্ট “ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা”ই ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। তবে এই গানের আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাব চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কর্ণফুলী এবং সাম্পান ও সাম্পানওয়ালা (সাম্পান মাঝি) প্রসঙ্গ অনেকভাবে এসেছে। কারণ বৃহত্তর চট্টগ্রামে কর্ণফুলী ও এর শাখা নদী ও খালের বিস্তর প্রভাব আছে দৈনন্দিন জীবন যাপনে।

কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তি ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় হতে। এই নদী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গায় এসে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীটি দেশের আর দশটি নদীর মতো নয়। এই নদীর অবস্থান,চরিত্র, গুরুত্ব সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর মতো অবদান আর অন্য নদীর নেই। এই নদীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মিথ চালু আছে। সবচেয়ে প্রচলিত মিথটি নিয়ে যে বিখ্যাত গানটি রচিত হয়েছে- ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত/ ছোড ছোড ঢেউ তুলি/ লুসাই পাহাড়ত নামিয়েরে যারগুই কর্ণফুলী...। এই গানটির মধ্যে নদীর নামকরণের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গ্রাম্য বালিকা নদীতে নাইতে নেমে উঠে দেখে তার কানের ফুল নেই- সে থেকে নদীর নাম কর্ণফুলী। আরও একটি কাহিনী প্রচলিত আছে- আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যোৎস্না রাতে তারা দু’জন নৌকা নিয়ে নদীতে ভ্রমণ করছিলেন। সে সময় নদীতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার জন্যে রাজকুমারী একটু ঝুঁকলে তার কানে গোঁজা ফুলটি নদীতে পড়ে যায়। ফুলটি উদ্ধারে রাজকন্যা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কিন্তু খড়স্রোতা নদী তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এ অবস্থায় রাজকুমারও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে প্রেমিক যুগলের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর নদীর নাম হয় কর্ণফুলী।

মানব বসতি গড়ে ওঠা ও মানব সভ্যতা বিকাশে নদীর অবদান অপরিসীম। বিশ্বের আদিকাল থেকে মানব বসতি গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। কারণ বিশ্ব এক সময় ছিল সম্পূর্ণ কৃষি নির্ভর। নদীর দু’কূলের মানুষ নদীর পানির সাহায্যে জীবন ধারণ করেছে, চাষাবাদ ও যোগাযোগের জন্যে নদীর ওপর নির্ভর করেছে। উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদীকে কেন্দ্র করে। নীল নদ, ইউফ্রেটিস দজলা-ফোরাত, হোয়াংহো এমন অসংখ্য নদী মানব বসতি ও সভ্যতা বিকাশে ভূমিকা রেখে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা জনবসতির লোকরাই আজ হিন্দু বলে অভিহিত। এটি সিন্ধুর অপভ্রংশ। কাজেই মনে রাখা প্রয়োজন হিন্দু বলে আলাদা কোনো ধর্মের লোক বোঝায় না।

কর্ণফুলী নদীর অবদানও তদ্রুপ অর্থাৎ এই নদীকে কেন্দ্র করেই হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এখানে মানব বসতির শুরু হয়েছে। কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী থেকে নানা পেশার সূত্রপাত হয়েছে পরবর্তীতে। কিন্তু এই নদীর অনন্যতা হচ্ছে এখানেই শেষ হয়নি এর অবদান। এই নদী তার চলার পথে শস্য-শ্যামলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে মানবের বাসযোগ্য করার সাথে সাথে তৈরি করে দিয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি সমুদ্র বন্দর। এই নদী চট্টগ্রাম নগরীর অনতিদূরে পতেঙ্গায় সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে- এটি কখন ঘটেছিল তার সঠিক তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব নয়, তবে এই বন্দর যে দেড় হাজার বছর আগেও ছিল তেমন অনেক তথ্য উপাত্ত উদ্ধার হতে শুরু হয়েছে আজ-কাল।

এই নদীর মোহনাটি বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠায় এই নদীর সাথে সাথে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। নদীর সাথে বেড়েছে চট্টগ্রামের গুরুত্ব। আজ এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি রফতানির ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশের অর্থনীতিকে সচল ও সমৃদ্ধ করতে এই বন্দর একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়াও এই নদীটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। অনেক সময় আমরা তা ভুলেও যাই। এই নদীর উজানে বর্তমান কাপ্তাই উপজেলায় বাঁধ দিয়ে নির্মিত হয় এই উপমহাদেশের প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। যার মাধ্যমে অত্যন্ত সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে আসছে ১৯৬৪ সাল থেকে। অবশ্য এই বাঁধের ফলে তার উজানে রাঙামাটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অর্থাৎ আদি রাঙামাটি ও এর আশপাশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। বর্তমান রাঙামাটি সম্পূর্ণ পাহাড় ও টিলার ওপর অবস্থিত।

কাজেই এই নদী চট্টগ্রামের তো বটেই, সারাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও প্রভাবিত করেছে এই জনপদের মানুষকে। সে কারণে এই নদী ও এর বুকে বয়ে চলা সাম্পান ও সাম্পান মাঝি বা সাম্পানওয়ালাকে নিয়ে অসংখ্য গান ও কবিতা রচিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও উপেক্ষা করতে পারেননি কর্ণফুলী নদীকে। তিনি লিখেছেন-

ওগো ও কর্ণফুলী

তোমার সলিলে পড়েছিল

কবে কার কানফুল খুলি

তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী

কে জানে-

সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার

দয়িতার সন্ধানে---

এ ছাড়াও কবি ওহিদুল আলম ১৯৪৬ সালে কর্ণফুলী মাঝি নামে একটি কাহিনি-কাব্য রচনা করেছিলেন। উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৬২ সালে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস কর্ণফুলী। এই ধারা এখনও বহমান। এই নদীকে নিয়ে অবিরাম রচিত হচ্ছে গান,কবিতা, ছড়া ও থিয়েটার কবিতা। এই কর্ণফুলী এখন আর আগের মতো নেই। ভালোও নেই। নিজেকে বিলিয়ে যে মানব সভ্যতা গড়ে তুলেছিল কর্ণফুলী সে সভ্য মানুষরাই দখলে দূষণে এই নদীকে মৃতপ্রায় করে তুলছে। এ নদীর শাখা নদী ও খালগুলো ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে- এর ফলে কর্ণফুলীও তার গভীরতা হারিয়ে মৃত নদীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ক্ষয় ধরেছে নদীতে অসংখ্য চর বুকে নিয়ে এ নদী এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বাংলাদেশের অন্য নদীগুলোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় কর্ণফুলী। যে কর্ণফুলী বন্দর সৃষ্টি করে হাজার বছর ধরে বিশ্বের সাথে এ অঞ্চলের যোগাযোগের সেতু বন্ধন তৈরি করেছিল, যে কর্ণফুলী নিজের বুকে বাঁধ নিয়ে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করেছিল, যে কর্ণফুলী ও তার মাঝিকে নিয়ে রচিত হয়েছিল অসংখ্য গান ও কবিতা সে কর্ণফুলী, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছুটে চলা স্রোতস্বিনী কর্ণফুলী কাঁদছে- সে ক্রন্দন শোনার সময় আমাদের নেই। এই নদীর জলের উৎস মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে যথেচ্ছ বৃক্ষ নিধনের ফলে ভূমিক্ষয় বাড়ছে। আর সে সাথে ওসব এলাকায় নতুন নতুন জনবসতি বৃদ্ধির ফলে নদী দূষণ ঘটছে। কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাধারের সঞ্চিত ও রক্ষিত পানির পরিমাণ কমছে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণও কমে গেছে আগের তুলনায় অনেক।

এই নদীর বুকে সেতু নির্মাণ করে ওর গতি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। দু’পাশের শিল্প কারখানার বর্জ্য ও চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষের সমস্ত তরল বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হচ্ছে এই নদীতে। প্রতিদিন এই নদীর বুকে চলা জাহাজ ও যন্ত্রচালিত নৌযানের জ্বালানি ও অন্যান্য বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে এই নদীর পানিতে। ফলে কর্ণফুলীর পানি এখন মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কবলে। এখন থেকে সচেতন না হলে বুড়িগঙ্গার চেয়েও ভয়াবহ খারাপের দিকে যাবে পরিস্থিতি।

অথচ এই নদীটি হতে পারত লণ্ডনের টেমস বা কায়রোর নীল নদের মতো। এই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রেখে নদীর দু’পাশে গড়ে উঠতে পারত বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি নগরী। নিয়মিত ড্রেজিং ও এর দূষণ নিয়ন্ত্রণে রেখে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে এই নদীকে এখনও রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এই দায়িত্বটি নেবে কে? সবাই যে হালুয়া রুটি ভাগাভাগির তালে আছে।

চট্টগ্রামের কোনো এক বিরহ কাতর প্রেমিকা বলেছিল, ‘ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে,অভাগিনীর দুঃখর কথা কইও বন্ধুরে- ওরে কর্ণফুলীরে---

আজ ভাবছি দখলে দূষণে মানুষের নষ্টামীতে অস্তিত্বের সংকটের মুখে কর্ণফুলী তাঁর দুর্দশার সাক্ষী কাকে করবে।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৪

'ও পরান’র তালতো ভাই...'

৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২০ চৈত্র ১৪২০ সাল ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
তালতো ভাই বোনের সম্পর্ক নিয়ে আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় শ’খানেক বলে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন শিল্পী ও গীতিকার-সুরকার। যে আবেগ ভালোবাসা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব গান রচিত হয়েছিল তা হয়তো কালের পরিবর্তনে প্রাসঙ্গিকতা, জনপ্রিয়তা হারাবে একদিন। কিন্তু এই গানগুলোর মধ্যেই নিহিত হয়ে থাকবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও জীবনাচারের চিত্র। এ সব গানের কথার মধ্যেই ভবিষ্যত গবেষক ও ইতিহাসবিদের জন্য আছে অনন্য উপাদান।

সত্তর দশকের শেষের দিকে প্রয়াত এম.এন আকতার লিখেছিলেন গানটি। তাঁর করা সুরে প্রথমে ওতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী উমা নন্দী (বর্তমানে উমা খান)। পরে সন্ধ্যা রানী ও শেফালী ঘোষও এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বর্তমানে কল্যানী ঘোষসহ অনেক শিল্পীই এ গানটি গেয়ে থাকেন। গানটির স্থায়ীটা হচ্ছে- ও পরান’র তালতোভাই, চিডি দিলাম পত্র দিলাম ন আইলা কিল্লাই। আঁর পরাননান কে’ন করেদ্দে মিডা মিডা কথার লায়-ই...।

যে কোনো আঞ্চলিক গানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা একেবারে সে অঞ্চলের মাটি ও মানুষের প্রাণের গহীন কথা, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহকে একেবারে সহজ-সরলভাবে শ্রোতা-দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে। এ যেন চিরকালীন মানব সম্পর্কের এক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গানেও আমরা তেমনি একটি চিত্র পাই। নারীর বিরহ ব্যথা কী অসাধারণ নৈপুণ্যে তুলে ধরা হয়েছে একটি গানে- ‘যদি বন্ধু যাইবার চাও, ঘাড়ের গামছা থুইয়্যা যাওরে- ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়্যা যাও কয়্যা যাওরে---।’ ওই নারীর প্রেমিক পুরুষ পেশায় যিনি গাড়োয়ান (গরু মহিষের গাড়ির চালক) একবার-বের হলে ঘরে ফেরে অনেকদিন পরে, তাঁর বিরহে নারীটি থাকতে পারে না, অন্তত তাঁর ঘাড়ের গামছাটি রেখে যাওয়ার অনুরোধ করে সে। একটি অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাপন, আচার-সংস্কৃতি, পেশা ও জীবনমান বুঝতে এ ধরনের আঞ্চলিক গানগুলো বিশাল ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কর্ণফুলী নদী, সাগর, সাম্পান ও সাম্পান মাঝির প্রসঙ্গ আসে কারণ এসব নিয়েই চট্টগ্রাম। অন্যদিকে উত্তর বঙ্গে যেহেতু গরু-ও মহিষের গাড়িই ছিল এক সময়ের একমাত্র বাহন সেহেতু ওই অঞ্চলের গানে গরুর গাড়ি ও গাড়োয়ানের প্রসঙ্গ আসে ঘুরে ঘুরে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেও এমন অনেক উপাদান আছে যা একান্তই চট্টগ্রামের। যেমন উপর্যুক্ত গান- যেখানে তালতো ভাইয়ের জন্য তালতো বোনের প্রেমানুভূতি,আকর্ষণ ও বিরহের ব্যথা অসাধারণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তালতো ভাই ও তালতো বোন সম্পর্কের ব্যাখ্যাটি হচ্ছে- বোন বা ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির পক্ষের- ভাই-বোন। অর্থাৎ বোনের দেবর,ননদ বা ভাইয়ের শালা-শালী পরস্পরকে তালতো ভাই বা তালতো বোন বলে সম্বোধন করে। বাংলাদেশের অন্যজেলায় যা বেয়াই-বেয়াইন হিসেবে সম্বোধিত হয়। অন্যজেলার বেয়াই-বেয়াইন চট্টগ্রামে তালতো ভাই বা বোন হিসেবে সম্বোধিত হলেও চট্টগ্রামে এই সম্পর্কটি যেন চিরকালীন এক রোমান্টিক সম্পর্ক। তালতো ভাই-তালতো বোনের মধ্যে ঠাট্টা-মশকরা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজ খানিকটা রক্ষণশীল হলেও এই সম্পর্কের ব্যাপারে অধিকাংশ পরিবারেই একটু উদারতার ভাব আছে। পরস্পরের মধ্যে আড্ডা দেওয়া, হাসি ঠাট্টা করা দল বেঁধে বা মাঝে মধ্যে শুধু তালতো ভাই-তালতো বোন বেড়াতে যাওয়া নিয়েও খুব বেশি আপত্তি থাকে না দু’পরিবারেই। ভাই বা বোনের পক্ষ থেকেও একটু প্রশ্রয় বা আস্কারা পাওয়া যায়। এর ফলে অনেক সময় ঠাট্টা-মশকরার এই সম্পর্ক প্রেম-ভালোবাসায়ও রূপ নেয়। এখনকার কথা বেশি জানি না। আমাদের সময় থেকে তার আগে পর্যন্ত প্রায় কিশোর-কিশোরী বা তরুণ, তরুণীর প্রথম ভালোবাসার পাঠ শুরু হতো তালতো ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামের মানুষ অতিথি ও ঐতিহ্য পরায়ণ। বর্তমানে আধুনিকতার নামে কিছুটা পরিবর্তন এলেও বছর বিশেক আগেও একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মহা উৎসবের আয়োজন হতো। সপ্তাহ পনরদিন আগে থেকে বিয়ে বাড়িতে নাইওরি আসতো। টিনের বাক্সে যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় ‘কাত্তি’ বলা হয় তা ভর্তি করে নানা জাতের ‘পাক্কন’ পিঠা আনা হতো। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর আনাগোনা ও খাওয়া দাওয়া মিলে সে এক মহামিলন যেন। হবু বর ও তার পক্ষের তালতো ভাই-বোনদের কীভাবে জব্দ করা যায়- তা নিয়ে ফন্দি করা শুরু হতো অনেক আগে থেকেই। বিয়ে বাড়িতে হয়ত সামান্য বিষয় নিয়ে দু-পক্ষের দ্বন্দ্ব-রাগারাগি লেগে গেল অথচ তার মধ্যেও দেখা গেল নতুন তালতো ভাই-বোনদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলছে অবিরাম ও অকৃত্রিমভাবে।

বলছিলাম তালতো ভাই-তালতো বোনের মধ্যে চিরকালীন রোমান্টিক সম্পর্কে নিয়ে। বলেছিলাম অনেকের প্রেমের প্রথম পাঠ শুরু হয় এই সম্পর্কের ভেতরেই। অনেকের সম্পর্কটি পারিবারিকভাবে অনুমোদন পায়- অনেকেরটা পায় না। এ ক্ষেত্রে অনেকে পালিয়ে বিয়ে করেন অনেকে পরিবারের চাপে অন্যের ঘরণী হয়ে বা অন্য নারীকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে অতীত আকুলতায় ভোগেন। পরবর্তী জীবনে দেখা হলেও দীর্ঘশ্বাসটি গোপন করে স্বাভাবিক আচরণের চেষ্টা করেন। একটি সময়ে যে যোগাযোগের অন্যতম একটি মাধ্যম ছিল চিঠি লেখা, যা এই প্রজন্মের সন্তানদের কাছে প্রায় অপরিচিত ও সেকেলে একটি ব্যাপার; এ গানের মাধ্যমে তারও একটি চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে। প্রেমাকুল তালতোবোন চিঠি লেখার পরেও তার দেখা না পেয়ে আক্ষেপ করে বলছে- আঁর পরান্নান কেন গরেদ্দে মিডা মিডা কথার-লায়-ই, চিডি দিলাম পত্র দিলাম না আইলে কিল্লাই।’ গানের তরজমাটি এখানে দিলাম এ কারণে যে, আমার লেখার পাঠকরা অধিকাংশই চট্টগ্রামের আর যারা চট্টগ্রামের আদিবাসী নন দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে এই শব্দগুলো তাঁদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।

আমার ধারণা চট্টগ্রামের মতো অন্য জেলায় এই সম্পর্কটি এত গভীর, আন্তরিক ও মধুময় নয়। এমন কি বর্তমানে চট্টগ্রামেও আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের কাছে এই সম্পর্কটির আলাদা কোনো তাৎপর্য আছে বলে মনে হয় না। তার কারণ এখন সমাজে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার ও তার সাথে নারী পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রেও রক্ষণশীলতা অনেকটা দূরীভূত হয়েছে। সে কারণে হয়ত কোনো তরুণের কাছে তালতোবোনের বক্র চাহনী আগের দিনের মতো কাঙিক্ষত নয়।

তালতোভাই বোনের সম্পর্ক নিয়ে আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় শ’খানেক বলে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন শিল্পী ও গীতিকার-সুরকার। যে আবেগ ভালোবাসা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব গান রচিত হয়েছিল তা হয়তো কালের পরিবর্তনে প্রাসঙ্গিকতা, জনপ্রিয়তা হারাবে একদিন। কিন্তু এই গানগুলোর মধ্যেই নিহিত হয়ে থাকবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও জীবনাচারের চিত্র। এ সব গানের কথার মধ্যেই ভবিষ্যত গবেষক ও ইতিহাসবিদের জন্য আছে অনন্য উপাদান।

চট্টগ্রামের পুরনো কালচারকে সওদাগরী কালচার বলে ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের অনেক কিছুকে গ্রাম্য ও সেকেলে বলে ভাবতে ভালোবাসে অনেকে। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের অন্য যে কোনো জেলা থেকে চট্টগ্রাম (বৃহত্তর) জেলার মানুষের জীবনযাপন , কৃষ্টি সংস্কৃতি অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদ, খাবার-দাবার, আনন্দ উৎসব, রাগ-অভিমান, ভাষা ও সঙ্গীত সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলা সংস্কৃতি বলতে আমরা যা বোঝতে চেষ্টা করি তা থেকে একটু ভিন্নতর। এর ঐতিহাসিক কারণও আছে। সে প্রসঙ্গে আজ আলোচনা করা যাবে না। তবে চট্টগ্রাম ও চাটগাঁইয়াদের বিষয়ে বলতে চাই এই জেলার স্বকীয়তাই এখানকার ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার মধ্যে কোনো অপমানতো নেই-ই বরং এতে আছে আত্মপরিচয় উন্মোচনের অনির্বাণ গৌরব।

সময়ের সাথে সাথে আমাদের অনেক কিছুই পালটে যাচ্ছে। সামাজিক প্রথা, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। আত্মীয়তার সূত্রে দুপরিবারে যে বন্ধনের সৃষ্টি হতো আজ তা অনেকটা কৃত্রিম ও মেকি হয়ে উঠছে। ক্লাবে বা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়েই আমরা এখন দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করি। অনেক সময় বিয়ের কনে বা বর দেখার সময়ও থাকে না। ক্ষণিকের উপস্থিতির মধ্যে দুচার জনের মধ্যে যা দেখা হওয়ার তা হলো হয়তো। নতুন আত্মীয়ের অনেকের সাথে দেখা বা পরিচিত হওয়ার সুযোগেও হয় না অনেকের। বর্তমানের ড্রয়িং রুম কেন্দ্রিক আতিথেয়তায় আগের সেই আন্তরিকতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। রোমান্টিকতার বাইরেও দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা ও সৌভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন হতো তা-ও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। দেখা গেল ঘনিষ্ঠ তালতোভাই তালতোবোনদের আবার দেখা হলো হয়তো দম্পতির বিয়ে বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। কথা, সুর ও গায়কী সব কিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। ভবিষ্যতে এসব গান নিয়ে আরও আলোচনার আশা রইল।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

পোস্টসমূহ