২৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১১ বৈশাখ ১৪২১ সাল ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৫ হিজরি
-কামরুল হাসান বাদল
চট্টগ্রামের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পীঠস্থান এখন ডিসি হিল বা নজরুল স্কয়ার। প্রায় বছরব্যাপী এখানে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ভোরে,বিকেলে ও সন্ধ্যায় নানান বয়েসি মানুষ এখানে হাঁটতে বা অবসর নিতে আসেন।
একটি সময় ছিল যখন এই পাহাড় বিভিন্ন বড় বড় বৃক্ষ রাজীতে পরিপূর্ণ ছিল। বিশাল বিশাল শিশু গাছের শেকড়ে বসে মানুষ আড্ডা দিতো। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া নববর্ষের অনুষ্ঠান হতো এসব গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে, ছায়ায় ছায়ায়। এই পাহাড়ের পাশ দিয়ে আসতে যেতে হঠাৎ কখনো পলাশ বা শিমুল গাছের ফুল দেখে বোধ হয়েছে এখনতো বসন্তকাল। আমাদের কৈশোর-তারুণ্যে এত এত মিডিয়া টিভি বা পত্রিকা ছিল না। অনেক ঘটা করে আড়ম্বর করে বসন্ত উৎসবও পালিত হতো না। ডিসি হিলের পলাশ ফুল দেখে আর তার ডালে বসা কোকিলের কুহুতান শুনে বুঝতে পারতাম ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আপনি, মাননীয় পূর্তমন্ত্রী তথা দু’দুটো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার সময়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। আর সে সাথে ডিসি হিলের সংস্কার করে ছিলেন বর্তমান মঞ্চ স্থায়ী গ্যালারি ইত্যাদি। সে সময় ডিসি হিলের গাছ কাটা হচ্ছে বলে আমাদের মধ্যে অনেকেই সে উন্নয়ন কর্মসূচির বিরোধীতা করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আপনার সংস্কার কাজ দেখে অনেকে সন্তুষ্টি ও স্বস্তি বোধ করেছেন। তবে সে সময় যতটুকু সংস্কার ও নির্মাণ কাজ করেছিলেন পরবর্তীতে তা পুনঃসংস্কারের অভাবে বর্তমানে জীর্ণ হতে চলেছে। এরই মধ্যে অনেকে ডিসি হিল সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন প্রকার প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। শুনেছি আপনার নিজস্ব কিছু পরিকল্পনাও আছে যা অছিরেই বাস্তবায়ন করবেন।
মাননীয় মন্ত্রী, আপনি চট্টগ্রামেরই সন্তান। একটি রাজনৈতিক পরিবারে আপনার জন্ম। দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিক আপনি। ছিলেন মেধাবী ছাত্র সে হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুরও প্রিয়ভাজন ছিলেন। অত্যন্ত অল্প বয়সে আপনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন দ্বিতীয়বারের মতো মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার শহরের বাড়িটি ডিসি হিল থেকে অনতি দূরে। সে কারণে ডিসি হিলের স্মৃতি ও এই পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা আমার চেয়ে আপনার বহুগুণ বেশি। তাই সে সাহসে ডিসি হিল নিয়ে আমার ভাবনাটি আপনার নিকট উপস্থাপন করতে চাই।
এক সময় চট্টগ্রাম শহরেই অনেক পাহাড় ছিল। বর্তমান ডিসি হিলটি এই এলাকার কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যে একটি। আন্দরকিল্লা নজির আহমদ সড়কের পশ্চিমে, মোমিন রোডের দক্ষিণ-পূর্ব,বৌদ্ধ মন্দিরের পূর্ব ও সিনেমা প্যালেসের উত্তর অংশ জুড়ে কয়েকটি পাহাড়। ১) ফরেস্ট হিল, ২)তুলসী ধাম, যা কাটার পর একদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও টেলিগ্রাফের টাওয়ার, ৩)কমিশনারের পাহাড় ও ৪) জাফর আলী হিল বা বর্তমানের ডিসি হিল। ইতিহাস বিবৃত করলে পাঠকদের সুবিধা হবে বুঝতে তাই একটু পেছনে ফিরে যেতে চাই। ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে ইংরেজ শাসকরা পার্বত্যবাসীদের খুশি করতে তৎকালীন চাকমা রাজাকে এই চারটি পাহাড়ের মালিকানা প্রদান করে। পরবর্তীতে আঠারো শতকের শেষ দশকে ইংরেজ সরকার চাকমা রাজাদের কাছ থেকে ওর বেশির ভাগ অংশ পওনি হিসেবে নেয়। দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার বর্তমান এই পাহাড়গুলো হুকুম দখল করে। তবে ডিসি হিলের পূর্ব দিকে চাকমা রাজাদের সম্পত্তি এখনও আছে। তাদের একটি দীঘি ছিল যার নাম ছিল রাজাপুকুর। এখন পুকুর নেই রাস্তার নাম রয়ে গেছে রাজাপুকুর লেইন। বর্তমান ডিসি হিল এক সময় জাফর আলী হিল নামে খ্যাত ছিল। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে এটি তৎকালীন সরকারি উকিল বাঁশখালীর জাফর আলী খানের বাস ভবন ছিল। পরবর্তীকালে সাব জজ এবং জাফর আলী খানের সন্তান আনোয়ার আলী সেখানে বসবাস করতেন। এখানেই আনোয়ার সাহেবের পুত্র দার্শনিক ও চিন্তাবিদ শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো স্থাপিত হয়। ওই পদ বিলুপ্ত হলে ডিসি বা জেলা প্রশাসকরা বর্তমানে এই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বাংলোতে বসবাস করে আসছেন।
বর্তমানে ডিসি হিলে একটি মুক্ত মঞ্চ ও দর্শক গ্যালারি আছে। আছে কিছু নার্সারি ও ফুলের দোকান। কিছু অবৈধ দখলদার, সন্ধ্যার পর কিছু বখাটে ও মাস্তান। আর সে সাথে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু গাছপালা যা শতবর্ষী শিশু গাছগুলোসহ প্রকৃতির ক্ষতি সাধন করছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবার আমি আমার প্রস্তাবনাটুকু উপস্থাপন করছি।
১। এই পাহাড়ের সকল নার্সারি ও ফুলের দোকান এবং সে সাথে সকল অবৈধ দখলদারিদের উচ্ছেদ করতে হবে প্রথমে।
২। সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর গাছ কেটে পুরো পাহাড়জুড়ে দেশীয় ফলের গাছ রোপণ করা হোক। আমাদের সন্তানরা বেশিরভাগ দেশীয় ফল চেনে না, গাছ দেখা তো দূরের কথা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে সারা পাহাড় জুড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিলে সবাই ঘুরে ঘুরে গাছ চিনবে, ফল চিনবে। এর মধ্যে কয়েকটি অ্যাপ্রোচ নির্মাণ করে দিলে রোদ ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নেবে তারা। ফলের বাগান হলে সেখানে আপনা থেকেই পাখি আসবে। গড়ে উঠবে পাখিদের অভয়াশ্রম। এর মধ্যে কিছু মনুষ্যবান্ধব পশু যেমন খরগোস, বানর ইত্যাদি ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।
এই ফলের বাগান থেকে হয়ত আর্থিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গাছ, ফুল, ফল চেনাতে ও মৃত্তিকা সংলগ্ন করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এই পাহাড়ে আর একটিও স্থাপনা চাই না। আর এক ইঞ্চিও ইট-চুন-সুরকীর প্রলেপ চাই না। এই পাহাড় তার সবুজ নিয়ে অক্ষত থাকুক। এই পাহাড়ের কয়েকশ গজের মধ্যে বেশ কিছু মিলনায়তন আছে কাজেই এখানে কোনো অডিটোরিয়াম নির্মাণের প্রয়োজন নেই মুসলিম হল, স্টুডিও থিয়েটার ও চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট ছাড়াও চেরাগি পাহাড়ে আছে দুতিনটি ছোট ছোট মিলনায়তন। কাজেই এখানে সে ধরনের কোনো কিছু নির্মাণ করার কোনো যুক্তি নেই। এই পাহাড় থেকে কয়েকশ গজের মধ্যে আছে কয়েকটি মসজিদ। চট্টগ্রামের পাহাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর বলে এখানে ক্যাবলকার করাও নিরাপদ নয়। এখানে কোনো কৃত্রিম হ্রদ না করে পাহাড়ের পূর্ব পাশে আগে যেখানে একটি পুকুর ছিল বর্তমানে যা ভরাট করে নার্সারি ব্যবসায়ীদের লিজ দেওয়া হয়েছে,সেখানে শিশুদের সাঁতার শেখার জন্য একটি সুইমিং পুল নির্মাণ করা যেতে পারে।
মাননীয় মন্ত্রী, এই বিরাট নগরীজুড়ে শুধু ইট-সিমেন্টের অট্টালিকা। কোথাও একটু খোলা ময়দান নেই। আমাদের চট্টগ্রামে কোনো ‘রমনা পার্ক’ নেই, ‘সোহরাওয়ার্দী’ ও ‘ওসমানী উদ্যান’ নেই,আমাদের জাতীয় উদ্যান নেই। তেমন কোনো খোলা মাঠ নেই, সরোবর নেই, লেক নেই, নয়ন জুড়ানো একটু সবুজ নেই। এই বিস্তৃত-বিস্তীর্ণ শহরে একটু খোলা মাটি নেই যে মাটি একটু বৃষ্টির জল শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের সন্তানদের জন্য অন্তত এই ডিসি হিলকে উন্মুক্ত রাখুন- যেখানে জল-কাদা মাখামাখি করতে পারে তারা। হাজারো ভেজালের ভিড়ে এখনও এখানে ভোরে ও সন্ধ্যায় শত শত স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ আসে একটু খোলা নিশ্বাস নিতে এই ব্যবস্থাটি রুদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করবেন না দয়া করে। এই নগরীর হৃদপিণ্ড এই ডিসি হিলকে সবুজে সবুজময় করুন। এর জন্য খুব বেশি ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়েক লাখ টাকায় পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব। মাননীয় মন্ত্রী, দখলে-দূষণে চট্টগ্রাম দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। এই শহরের হাজার হাজার দীঘি-পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পাহাড় কেটে কেটে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বিশেষত্ব খর্ব করা হয়েছে। নদী-খাল দখলে-দুষণে-তার গতিপথ হারিয়েছে। আমরা আমাদের সন্তানদের কী বীভিষীকাময় ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এর দায় থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাব না। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ৫৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষে। উন্নত বিশ্বের পাপের দায় নিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে। এই অবস্থায় আমাদের সকল উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার দিকে নজর দিতে হবে প্রথমে। মাননীয় মন্ত্রী, আপনি দেশের অন্যতম একজন প্রবীণ রাজনীতিক। চট্টগ্রামের রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। আপনার পক্ষে এ কাজটুকু বাস্তবায়ন করে দেওয়া সম্ভব। এই নগরীর হৃদপিণ্ড ডিসি হিলকে দেশীয় ফলের বাগানে পরিণত করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। চট্টগ্রামবাসী আপনার এই বদান্যতাকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন