দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৫ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ২০ রমজান ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২৫ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ২০ রমজান ১৪৩৩ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
১৯৬৯ সাল। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে তাদের আন্দোলন গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে অনেক হতাহত হলে গণ অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব সরকার ১ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের আহবান জানায় এবং বঙ্গবন্ধুকে আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আন্দোলনের চাপে অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়া হয় (তাঁকে)। তারপর দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে(তৎকালীন রেসকোর্স) প্রায় দশ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এবং সে সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই বছরের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, একসময় এদেশের বুক হইতে মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।’ জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’। এখানে উল্লেখ করতে চাই, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে বঙ্গবন্ধু অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন সে পাকিস্তানে তাঁর আশাভঙ্গ হয়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু কোনদিন পূর্ব পাকিস্তান বলেননি। তিনি বরাবরই তাঁর মাতৃভূমিকে সম্বোধন করেছেন পূর্ব বাংলা বলে। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে স্পিকারকেও উদ্দেশ্যে করে এই অনুরোধ করেছিলেন পাকিস্তানের এই অংশকে পূর্ব পাকিস্তান না বলে পূর্ব বাংলা বলার জন্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার পূর্ব বাংলা বলুন কারণ এদেশের মানুষের রয়েছে হাজার বছরের গৌরবময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।”
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করে, বাঙালি বা বাংলাদেশি জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব পরিচয় নিয়ে, নিজেদের দলের নামের আগে বা পরে বাংলাদেশ শব্দটি লাগান তারা অনেকে হয়ত জানে না ‘বাংলাদেশ’ নামকরণটিও কে করেছিলেন। অথবা জেনেও ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলগুলোতো নয়ই এমনকি তথাকথিত নিরপেক্ষদের অনেকেও শেখ মুজিব নামটি বলার আগে বঙ্গবন্ধু বলতে কুক্তিত হন। এসব অর্বাচনীদের জেনে রাখা প্রয়োজন শেখ মুজিবের নামের আগে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করতে গেলে আওয়ামী লীগার হতে হয় না। শুধুমাত্র একটু মার্জিত, ভদ্র আর কৃতজ্ঞ হতে হয়। বিএনপির বিষয়ে মেনে নিতে বাধ্য হই কারণ দলটি মুসলিম লীগের বাংলাদেশি সংস্করণ। আর জামাতে ইসলামিতো একটি স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গি একটি সংগঠন। তারা বঙ্গবন্ধুর অবদান না হয় স্বীকার করলো না। কিন্তু আমাদের বামপন্থি প্রগতিবাদীরা তাদের আপত্তি কীসের। তাদের চোখে বঙ্গবন্ধুর অপরাধ কী। দেশের কতিপয় বাম রাজনৈতিক দলের কাছে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অনেক পছন্দের। সে পছন্দ কীসের বিচারে? আজ বিভিন্ন সভা সেমিনারে, মধ্যরাতের টক শো গুলোতে কিছু কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন পরিচয়ে জাতির উদ্দেশ্যে নসিহত করেন। এদের মধ্যে অনেকে এতই প্রগতিবাদী বলে নিজেদের জাহির করার চেষ্টা করেন যে, তাদের এ রূপ দেখে বঙ্গবন্ধুরই একটি কথা মনে পড়ে যায়। তিনি লিখেছেন “অতি প্রগতিবাদীদের কথা আলাদা। তারা মুখে চায় ঐক্য। কিন্তু দেশের জাতীয় নেতাদের জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে, চেষ্টা করে সেজন্য। তাহলেই ভবিষ্যতে জনগণকে বলতে পারে যে, এ নেতাদের ও তাদের দলগুলো দ্বারা কোন কাজ হবে না। এরা ঘোলা পানিতে মাছ ধরবার চেষ্টা করতে চায়।” আজ বাংলাদেশের অনেক লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও কলামিষ্টদের ভূমিকা দেখে আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগে লেখা বঙ্গবন্ধুর কথাগুলি খুবই আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
বিএনপির জন্ম সেনানিবাসে আর জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীও এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্মদাতা। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘খাজা সাহেবের (খাজা নাজিমুদ্দিন) আমলে পাঞ্জাবে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। তাতে হাজার হাজার লোক মারা যায়। লাহোরে মার্শাল ল জারি করা হয়। আহমদিয়া বা কাদিয়ানি বিরোধী আন্দোলন থেকে এই দাঙ্গা শুরু হয়। কয়েকজন বিখ্যাত আলেম (!) এতে উস্কানি দিয়েছিলেন। কাদিয়ানিরা মুসলিম না এটাই হল এই সকল আলেমদের প্রচার। আমার এ সম্বন্ধে বিশেষ কোন ধারণা নাই। তবে একমত না হওয়ার জন্য যে অন্যকে হত্যা করা হবে। এটা যে ইসলাম পছন্দ করে না এবং একে অন্যায় মনে করা হয়-এটুকু ধারণা আমার আছে। কাদিয়ানিরা তো আল্লাহ ও রসুলকে মানে। তাই তাদের তো কথাই নাই এমনকি বিধর্মীর উপরও অন্যায়ভাবে অত্যাচার করা ইসলামে কড়াভাবে নিষেধ করা আছে। লাহোরে ও অন্যান্য জায়গায় জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়েদেরকে একসাথে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। যারা এই সমস্ত জঘন্য দাঙ্গার উসকানি দিয়েছিল তারা আজও পাকিস্তানের রাজনীতিতে সশরীরে অধিষ্ঠিত আছে।” প্রিয় পাঠক আপনারা হয়ত ভুলে যাননি গত বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলেও বাংলাদেশে এমন আহমদিয়া বিরোধী আন্দোলন তথা দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। যার পিছনেও কলকাঠি নেড়েছিল জামাত ও তাদের অনুসারী ধর্মান্ধ দলগুলো। বঙ্গবন্ধু সঙ্গত কারণেই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। যে নিষেধাজ্ঞা পরবর্তীতে জেনারেল জিয়া প্রত্যাহার করে নিয়ে বাংলাদেশে জামাতে ইসলামীর মতো চরম সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন এটা সবারই জানা। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে চীন সফরে গিয়েও তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলায়। শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে আরও অনেকের সাথে ছিলেন বঙ্গবন্ধুও। তিনি লিখেছেন, “আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীন, রুশ ও স্পেনিস ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করবো না? পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর প্রিয় কবি। তাঁর সঙ্গীতকেই নির্বাচন করেছিলেন আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধারণা কেমন ছিল তাঁরভাষায় পড়া যাক, “এখানে(চীনে) রুশ লেখক আসিমভের সাথে আলাপ হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এই সম্মেলনেই আমি মোলাকাত করি তুরস্কের বিখ্যাত কবি নাজিম হিকমতের সাথে। বহুদিন দেশের জেলে ছিলেন। এখন তিনি দেশত্যাগ করে রাশিয়ায় আছেন। তাঁর একমাত্র দোষ তিনি কমিউনিস্ট। দেশে তাঁর স্থান নাই, যদিও বিশ্ববিখ্যাত কবি তিনি।” ১৯৪৮ সালের কথা। একদিকে ছাত্র সংগঠন অন্যদিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জন্য দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। এই সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবী নগর থানার কৃষ্ণনগরে রফিকুল হোসেন এক সভার আয়োজন করেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে বর্ণনা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম, ... নদীতে বসে আব্বাস উদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল নদীর ঢেউগুলোও যেন তাঁর গান গাইছে। আমি আব্বাস উদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।
তিন কিস্তিতে বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনী নিয়ে আলোচনা করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এই বইয়ের ব্যাপারে পাঠকদের আগ্রহী করে তোলা। রাজনীতির মাঠে যে নোংরামী চলছে। কালো টাকার মালিকরা যখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনীতি যখন ক্ষমতা আর অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম ও লক্ষ্য হয়ে উঠছে তখন এই দেশের স্থপতি, জাতির জনকের চিন্তা, চেতনা, ত্যাগ, বিসর্জন ও দেশপ্রেম কি ধরনের ছিল তা তুলে ধরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতির পিতার কোন ধারণা নেই। রাষ্ট্র বিজ্ঞান তা স্বীকার করে না। কিন্তু ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ ভালবাসা তা শুধু স্বীকারই করে না বুকে ধারণও করে। জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, তুরস্কের কামাল, পাকিস্তানের জিন্নাহ এমন অনেকের নাম বলা যাবে। অনেক দেশের নাম উল্লেখ করা যাবে যাদের কাছে তাদের জাতির পিতার সম্মান দেবতুল্য। আমি পূর্বেও বলেছি একটি জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি,ভাষাকে রক্ষার মাধ্যমে তার ভেতর জাতীয়তাবাদী চেতনা বীজ রোপণ করে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছেন। একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। যা বাঙালিদের ছিল না কখনই। মোট কথা আত্মপরিচয়হীনতার পথে অগ্রসরমান একটি জাতিকে যিনি পুনর্জীবিত করতে পারেন তিনিই তো হবেন সে জাতির পিতা বা জনক। তাতে কোন দ্বিধা নেই। আর এ সত্য যারা অস্বীকার করবেন তাঁরা জাতির কুপুত্র হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।
পুনশ্চ :গতকাল ৮ আগস্ট ছিল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব রেনুর জন্মদিন। ১৯৩০ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে নবীজির পাশে থেকে বিবি খোদেজা (রা:) যে রূপ ভূমিকা রেখেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে ফজিলাতুন্নেছা সেরূপ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর ভূমিকার কারণেই মুজিব জাতির জনক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রতি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে আমার সশ্রদ্ধ সালাম।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন