দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
৭ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৩ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
৭ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৩ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরি
কামরুল হাসান বাদল
হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) এর একটি বিখ্যাত হাদিস, ‘যে তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে (নিজে) খায়, সে আমার উম্মত নহে।’ মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করেন রাসূল (সা.) এর উম্মত হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া সম্ভব নয়, বেহেস্তও তাদের জন্যে নয়।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিন মুসলমান হওয়ার একটি শর্ত বেঁধে দিয়েছেন। শর্তটি হচ্ছে প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া। তার সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া এবং তাকে দারিদ্র্যে অভুক্ত রেখে নিজে না খাওয়া। এই হাদিসের দুটো অসাধারণ রূপ আছে। যার মাধ্যমে নবীয়ে করিম (সা.) এর দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি আদর্শের সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়।
একটি হচ্ছে সাম্য। সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন। একেবারে আমাদের দেশীয় স্লোগানের ভাষায় বলতে হয় ‘কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না’।
অর্থাৎ সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যেন তেন প্রকারে অঢেল সম্পদের মালিক হবে আর অন্য শ্রেণির মানুষগুলো অভাব দারিদ্র্যে মানবেতর জীবন পার করবে তা প্রকৃত ইসলাম, মৌলিক ইসলাম অনুমোদন করে না। সাম্যবাদী এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইসলাম ধর্মে যাকাত ফরজ করা হয়েছে। দান খয়রাতকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এমন নীতিগত কারণে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পক্ষপাত থাকার কথা ছিল সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের সাথে কিন্তু দুঃখজনকভাবে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলো বরাবরই তাবেদারি করেছে সাম্রাজ্যবাদের। এমনকি অধুনা ইসলামের নামে শহীদ হতে রাজি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পর্যন্ত।
এই হাদিসের দ্বিতীয় দিকটি হলো অসাম্প্রদায়িকতা। এই হাদিসটি যখন প্রথম বিবৃত হলো তখন আরবে মুসলিমরা ছিল সংখ্যালঘু। অর্থাৎ দুটি মুসলিম পরিবারের আশেপাশে বেশ কিছু অমুসলিমদের বসত। এই পরিস্থিতিতে যখন মুসলিম প্রতিবেশী না বলে শুধু প্রতিবেশী বলা হয় তখন তা ভুল করে বলা হয় নি। সঠিক অর্থে, দায়িত্ব নিয়ে বলা হয়েছে যে প্রতিবেশী এখন যাই-ই হোক,মুসলিম বা অন্য কিছু। তাকেও অভুক্ত রাখা যাবে না। আর যে প্রতিবেশীকে অভুক্ত না রাখার শর্ত আছে তার ঘরে আগুন দেয়া,তার উপাসনালয় ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়া, তার বাড়ি ও সম্পদ লুট করা এবং সেই প্রতিবেশীর নারীদের সম্ভ্রমহানি করা কতটা মুসলমানিত্বের মধ্যে পড়ে তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
অথচ পরধর্ম সহিষ্ণুতা বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ . . . তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমার ধর্ম আমার’। - ১০৯ সূরা কাফিরুন: ৬
‘তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বিশ্বাস করতো। তাহলে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?- ১০ সূরা ইউনুস-৯৯
‘হে মানুষ। আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো’। - ৪৯,সূরা হুজুরাত : ১৩।
অতএব বাংলাদেশে কেউ যদি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে, যার যার ধর্ম পালনের স্বাধীনতার কথা বলে, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে সে তখন ইসলাম বিরোধী কিছু বলে না। বরঞ্চ ইসলামের মূল স্পিরিটের কথা বলে। মওদুদ বা জামায়াত শিবিরের ইসলাম প্রকৃত ইসলাম নয়। প্রকৃত ইসলামের সাথে এই দল বা এই দলের অনুসারীদের দূরতম সম্পর্কও নেই।
ইসলাম প্রচারের জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কখনো কোন ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন নি। বরং স্বীয় মেধা, শ্রম,সততা, মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে ধর্ম প্রচার করেছেন। বাধ্য হয়ে যুদ্ধে রত হয়েছিলেন। কিন্তু আজকে জামায়াত শিবির ইসলামের যুদ্ধংদেহী রূপটিকে বেশি প্রচার করে এর মানবীয় সমস্ত গুণাবলীকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে। তাদের আদর্শিক সংগঠন আল কায়েদা বা বিশ্বব্যাপী ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোর মতো। যে ধর্মের প্রচারক ধর্ম প্রচারের জন্যে নিজে কোনদিন কোন ধরনের কুদরতির আশ্রয় নেননি, সেই ধর্মের একজন নগণ্য অনুসারি বলে দাবিদার, যিনি প্রকৃত মুসলমান কিনা তা নিয়েই আলেমদের মধ্যে সন্দেহ আছে তাঁকে চাঁদে দেখা যাওয়ার মতো মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে যারা মানুষ হত্যার পথ প্রশস্ত করেন তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। তিনি এবং তাঁর অনুসারি দলটি প্রকৃত ইসলামি দল নয় বলেই ইতোমধ্যে অনেক আলেম বুজুর্গরা মতবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা বাস-ট্রাক বা যানবাহনের মতো। আন্দোলনকারীরা যেমন কারণে অকারণে এদেশে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে গাড়িতে, তেমনিভাবে ইদানিং যে কোন আন্দোলন বা নির্বাচনী সহিংসতার বলি হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে সামষ্টিক বা বিক্ষিপ্তভাবে এ পর্যন্ত অনেকবার সংখ্যালঘুরা যে কোন অজুহাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে আজ পর্যন্ত এমন হামলাকারী বা এমন দুষ্কৃতকারীদের কারো বিচার হয় নি। এমন কি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে চিহ্নিত পর্যন্ত করা হয় নি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি এমন কোন সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই স্বাধীন দেশেই গত ৪২ বছরে হিন্দুরা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে। কখনো রাষ্ট্রীয় মদদে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়।
বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংখ্যালঘুদের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই। দেশের কোটি কোটি মুসলিমদের সাথে তারাও হয়ত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার দাবি করেছিল।
বিচার দাবি করাটাও অযৌক্তিক নয়। কারণ তাদের চেয়ে নিগৃহীত আর কারা হয়েছিল বেশি। অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর আন্দোলনকারীদের প্রথম আক্রোশের শিকার হয়েছে সংখ্যালঘুরা। এর দায় জামায়াত শিবির ও তাদের সহযোগী বিএনপির যেমন তেমন ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। কারণ রাষ্ট্র এবারও সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় কিছুটা আওয়ামী লীগকেও নিতে হবে কারণ সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অন্যতম কারণ তারা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। দুর্যোগে সংকটে মিত্রদের পাশে দাঁড়াতে না পারার ব্যর্থতার দায় থেকে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী শক্তিগুলোও মুক্ত নয়।
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে একজন মানুষ হিসেবে শুধু ধর্মের কারণে এক শ্রেণির মানুষকে সংখ্যালঘুুতে বিভাজন করে তাদের নির্যাতনে আমি বিপন্ন বোধ করছি। অপমানিত বোধ করছি। আমার ধারণা যে কোন বিবেকবান মানুষকে এই ঘটনা অপমানিত না করে পারে না।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা পাহাড়সম উচ্চতায় উঠেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ’৭৫-এ তাঁকে হত্যার মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে জামায়াতসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে। সৃষ্টি করা হয়েছে বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার ধারক বৃহত্তর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে হজম করতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে নতুন প্রজন্মের তরুণদের দ্বারা গড়ে উঠা সম্পূর্ণ অহিংস ও ধর্ম নিরপেক্ষ আন্দোলনকেও গলা টিপে হত্যা করতে উদ্যত দেশের সেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং তাদের ‘নৈতিক’ ‘অনৈতিক’ ও সার্বিক সহযোগিতা দানকারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার রাজনৈতিক দলটি।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন