পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

* বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও


দৈনিক আজাদী                            উপসম্পাদকীয়                           কাল আজ কাল
২৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি . ১৬ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল

কিছু রাজনৈতিক আলামতের কারণে তরুণদের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জেগেছেঘাতক মানবতাবিরোধীদের প্রকৃত ও সর্বোচ্চ সাজা দিতে সরকার আন্তরিক কিনা। ১০ মাস পরের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোন বোঝাপড়া হচ্ছে কিনা। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলই হোক কিংবা আন্তরিকতাই হোক সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতিদ্রুত তরুণদের সব দাবির প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

১৫ আগস্ট১৯৭৫। বিশ্বের সকল রীতি-নীতি ভঙ্গ করে নজিরবিহীনভাবে-ভোর ৬ টার আগে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু করা হয়েছে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে। এর ঘণ্টা দুয়েক আগে বাংলাদেশে ঘটে গেছে বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক হত্যাযজ্ঞ। একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা স্থপতিজনক ও রাষ্ট্রপতিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর সাথে হত্যা করা হয়েছে তাঁর পরিবারের সবাইকে। শিশুপুত্র রাসেলসহ। সংসদকে এই ‘শুভ সংবাদ’ প্রদান করে অধিবেশন শেষ করা হয়। পাকিস্তানের রাজধানীতে যখন এই অধিবেশন চলছিল তখনও বাঙালি জাতির অধিকাংশ ঘুমে। ঢাকায় বসবাসরত বিদেশি দূতাবাসমন্ত্রীসরকারি-কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাড়া তেমন কেউ জানতেও পারেনি এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কথা তখনও। তবে সেই ভোরে আরেক ব্যক্তি বেশ ফুরফুরে মেজাজে দাড়ি কামাচ্ছিলেন। এ সময় টেলিফোনে যখন একজন সামরিক অফিসার তাঁকে খবর দিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড’।’ তিনি প্রায় সাথে সাথে উত্তর দিলেন ‘সো হোয়াট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার।’ তাঁর তাৎক্ষণিক জবাবে মনে হলো এই সংবাদ তিনি আগে থেকেই জানতেনঅথবা এমনও হতে পারে এমন একটি সংবাদের অপেক্ষায় তিনি অস্থির ও নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। ইনি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান। তৎকালীন সেনা-উপ প্রধান।

১৫ ফেব্রুয়ারি২০১৩। রাত নটার কাছাকাছি সময়ে ঘাতকদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তাব্লগারস্থপতি রাজিব হায়দার শোভন। তাঁর মৃত্যুর খবর দেশবাসী জানার আগেই প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পাকিস্তানের একটি ব্লগ থেকে রাজিবের নামে ছাড়া হলো, ‘নূরানি সমগ্র’ নামে একটি লেখা। যে লেখায় ইসলাম ধর্ম এবং তার রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। আর এর জন্যে প্রস্তুত ছিল এদেশে বসবাসকারী মানসিকভাবে পাকিস্তানি তরুণব্লগার তথা জামায়াতশিবির ও তাদের সৃষ্ট বিভিন্ন নামধারী সংগঠনের কর্মীও তাদের নাটের গুরু বলে পরিচিত একটি দৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। এরপরে আর যায় কোথায়। সাংবাদিকতা ও সভ্যতার সকল নিয়ম কানুন তোয়াক্কা না করে দিনের পর দিন এই পত্রিকায় চলতে থাকে রাজিব ও তাঁর সতীর্থ-তরুণ বন্ধু যারা এই শতাব্দীর প্রথম সেকুলার ও অহিংস গণজাগরণের অকুতোভয় যোদ্ধাতাদের চরিত্র হনন।
এই পত্রিকা এবং এর সম্পাদকের নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ডের কারণে গত শুক্রবার সারা বাংলাদেশে ঘটে গেছে স্মরণকালের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা। ‘হেফাজতে ইসলাম’ তৌহিদি জনতা ইত্যাদি ব্যানারে মূলত জামায়াত শিবিরের কর্মী সমর্থকরা নিষ্ঠুরভাবে সাংবাদিকদের পিটিয়েছেন,পুলিশকে মেরেছে। অগ্নিসংযোগ ও তছনছ করেছে দেশের অনেক স্থানের গণজাগরণের মঞ্চ। এমন কি স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে এই প্রথম কোন অপশক্তি ধ্বংস করেছে আমাদের চেতনা ও গৌরবের সুউচ্চ মিনারশহীদ মিনার। তারা পুড়িয়ে দিয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর প্রায় ৪ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন পতাকা। এর সাথে প্রতিষ্ঠার পরে এই প্রথম কোন অপশক্তি হামলা ও ভাঙচুর করেছে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব। দীর্ঘ ও টানা ১৭ দিনের অহিংস আন্দোলনের পরে এমন সহিংস নিষ্ঠুর ও বর্বর আচরণ দেখে বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই ব্যথিতবিস্মিত ও হতবাক হয়েছে।

তরুণদের এই মহা জাগরণ ঘটেছে মূলত সরকার বিরোধী মনোভাব নিয়ে বা সরকারের অবস্থানের বিরোধীতা করতে গিয়ে। প্রথম রায়ে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় রায়ে জামায়াত নেতা ও মিরপুরের কসাই বলে কুখ্যাত কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না দিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জ্বীবন। এই রায়ের আগের দিন মতিঝিলে শিবিরের সমাবেশ থেকে পুলিশকে ফুল দেয়া হয়েছিল। অথচ এই স্লোগান দেয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তারা বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর চড়াও হয়েছেআক্রমন করেছে। এই ঘটনা এবং এর আগের কিছু রাজনৈতিক আলামতের কারণে তরুণদের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জেগেছেঘাতক মানবতাবিরোধীদের প্রকৃত ও সর্বোচ্চ সাজা দিতে সরকার আন্তরিক কিনা। ১০ মাস পরের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোন বোঝাপড়া হচ্ছে কিনা। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলই হোক কিংবা আন্তরিকতাই হোক সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতিদ্রুত তরুণদের সব দাবির প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর অন্যদিকে এই গণজাগরণের মঞ্চ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত ও মন্তব্য প্রকাশ করে বিএনপি এই আন্দোলন ও তরুণদের নিজেদের বিপক্ষে ঠেলে দেয়। অথবা নিজেরাই জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এই আন্দোলনের প্রতিপক্ষে অবস্থান নেন। আজ অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হওয়া সত্বেও বিএনপি জামায়াতের বৃত্ত থেকে বের হতে না পারা দেখে বিএনপিরই স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে-বিচারাধীন সাকা চৌধুরীর ভাষায় বলতে হয়, ‘লেজে কুত্তা নাড়াচ্ছে’।

শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে আজ দেশের সবক’টি ছাত্র-সংগঠনের কর্মীরা স্বতর্স্ফুতভাবে অংশ নিচ্ছে শুধু মাত্র ছাত্রদল ছাড়া। বিএনপির এই রাজনৈতিক আত্মহত্যার দায়-কার ওপর বর্তাবে তা প্রত্যক্ষ করার অপেক্ষায় রইলাম।
দেশের গণজাগরণ দেখে বিএনপি এবং তাদের সমর্থিত কিছু সংবাদ মাধ্যম ও মুখপাত্ররা দেশে গৃহযুদ্ধ হবে বলে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর সাথে অবশ্য সমাজের কিছু সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীও গলা মিলিয়েছেন। আমি বিনয় ও দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যুদ্ধতো এখনোই চলছে,তাতে আর বাকি কিতবে এই যুদ্ধ গৃহযুদ্ধ নয় মুক্তিযুদ্ধ। আর এবার যদি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ শুরুও হয় তাতেও পরাজিত হবে একাত্তরের পরাজিত শক্তিই। এবং সেই যুদ্ধ একাত্তরের মতো দীর্ঘ নয় মাসও স্থায়ী হবে না।

তার আগেই পতন ঘটবে এই অপশক্তির।

বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে এরা বারবার ইসলাম বিরোধী বা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭০ সহ মহান মুক্তিযুদ্ধকেও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে তারা নিজেরাই ষড়যন্ত্র করেছে। হত্যাগণহত্যালুণ্ঠনঅগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মতো অপকর্মগুলো করেছে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেই। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। একাত্তরের মতো এবারও তারা সবচেয়ে স্পর্শকাতর ধর্মানুভূতি নিয়ে নোংরাকদর্য ও অমানবিক খেলায় লিপ্ত হয়েছে। মিথ্যাহিংসাধ্বংসহত্যার মাধ্যমে তারা সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায় এবং এক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে। এই গণজাগরণ ঠেকাতে তারা মসজিদের কার্পোটে আগুন দেয়ামসজিদের টাইলস ভেঙে পুলিশকে আক্রমন করার মতো কদর্য কাজও করেছে। এমনকি তারা নিজেরাই কোরআন পুড়িয়ে তা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ঘাড়ে চাপানোর মতো ষড়যন্ত্রও করেছে। আর এই কাজে তাদের প্রধান সহায়ক শক্তি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের এক শ্রেণির ব্লগার লেখকরা।

যারা আমাদের শহীদ মিনার ভেঙেছেআমাদের পতাকায় আগুন দিয়েছেযারা স্বাধীন বাংলার মাটিতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়েছে তাদের সাথে ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব কি না তা হাজারবার ভেবে দেখতে হবে। যারা বা যে দল মুখে স্বাধীনতার কথা বলেস্বাধীন বাংলাদেশের দুধ-সর খেয়ে যারা আজ ঐ অপশক্তিরই পক্ষে অনড় থাকে তাদের ব্যাপারে স্থির একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ও এখন।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ