পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

* লেজের কুত্তা নাড়ানো এবং হলুদ সাংবাদিকতা

সুপ্রভাত বাংলাদেশ                     উপসম্পাদকীয়              
চট্টগ্রাম | THURSDAY, FEBRUARY 28, 2013 | ১৬ ফাল্গুন ১৪১ বঙ্গাব্দ

• কামরুল হাসান বাদল

তরুণদের মিলিত এই সংগ্রামের নাম গণজাগরণ। এর বাইরে যারা যাবে তারা ভবিষ্যতের পরিক্রমার পথ খুঁজে পাবে না। এই তরুণ কোন দলের প্রতি আনুগত্য দেখানোর চেয়ে দেশ ও জাতির প্রতি আনুগত্য দেখাবে বেশি। অসৎ রাজনীতিকের সিঁড়ি হিসেবে ছাত্র-তরুণদের ব্যবহার করবার দিন বুঝি ফুরিয়ে এলো। এই বাস্তবতা যে রাজনৈতিক দল আগেভাগে অনুধাবন করতে পারবে ততই তার মঙ্গল হবে।
গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাধারণত দেখা যায় যুগপৎ আন্দোলন সংগ্রামে ছোট দলগুলো বড় দলকে অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘদিন থেকে তাদের তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল জামায়াতকে অনুসরণ করে আসছে। বিষয়টি বিস্ময়কর শুধু নয়, এই প্রবণতা বিএনপির রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিলও বটে।
মুক্তিযুদ্ধে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত ও নিন্দনীয় ভূমিকার জন্যে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতসহ সমস্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। কিন্তু ৭৫ এ জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে যে শক্তির উত্থান হয়েছিল সে শক্তির শিখ-ি জেনারেল জিয়া দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ উন্মোচন করে দেন। শুধু তাই নয় জিয়াউর রহমান গোলাম আযমকে দেশে ফেরার অনুমতি দেন এবং পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। জিয়া তাঁর মন্ত্রিসভায় রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে পাকিস্তান এবং এদেশে বসবাসকারী পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন শক্তিকে জানিয়ে দেন যে তিনি আসলেই কাদের লোক।
সে ইতিহাস হিসাব করলেও বিএনপির প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও নির্ভরশীলতা থাকার কথা জামায়াতের। অথচ কী উল্টো, বছরের পর বছর এমন কি গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে বাঙালি জাতি যুদ্ধাপরাধী তথা জামায়াতের শীর্ষ নেতা এবং মানবতাবিরোধী শীর্ষ অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে যখন একাট্টা ও সোচ্চার তখনও বিএনপি জামায়াতের আঁচলের তলায় লুকিয়ে আশ্রয় নিতে চাইছে। বিএনপির এই আচরণকে তাদেরই এক শীর্ষ নেতা বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধে কারাগারে বিচারাধীন সাকা চৌধুরীর ভাষায় বলতে চাই, ‘এতদিন জানতাম কুত্তায় লেজ নাড়ায়, এখন দেখছি লেজে কুত্তা নাড়াচ্ছে।
মূলত গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াতের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা ভয় পেয়ে গেছে। ভয়ার্ত মানুষ স্বাভাবিক আচরণ করে না। যেমন এখন বিএনপি-জামায়াত জোট স্বাভাবিক আচরণ করছে না। বিএনপির এক একজন নেতা শাহবাগ বা গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে একেকবার একেক ধরনের কথা বলছেন। কেউ এটাকে নাটক বলছেন  তো অন্যজন একে স্বাগত জানিয়ে বলছেন তরুণদের এই জাগরণ যেন আওয়ামী লীগ হাইজ্যাক করতে না পারে। একদল বলছেন এটি সরকার বা আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দাবির আন্দোলন বা পদ্মা সেতুর দুর্নীতি থেকে জনগণের দৃষ্টি ও মনোযোগ অন্যত্র ফেরাতে। ঠিক সে সময়ে অন্যদল বলছেন এই মঞ্চকে স্বাগত জানাই তবে—যদি—ইত্যাদি ইত্যাদি।
সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ কিছু তরুণের এই উদ্যোগ আজ সারাদেশে মহা গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে। ২২ দিন নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন ও সমাবেশে একটি ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মারামারি, কাটাকাটি, পাল্টা সেøাগান, মঞ্চ দখল চাঁদাবাজির মতো কোন কিছুই এই সমাবেশে ঘটেনি আজও। তরুণদের মধ্যে কোনরূপ ফাটল ধরাতে না পেরে এবং তাদের কোনরূপ ত্রুটি বা দুর্বলতা আবিষ্কার করতে না পেরে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সমর্থিত একটি পত্রিকার স্বঘোষিত ও স্বনিয়োজিত ভারবাহী সম্পাদক নোংরা, কদর্য, অশালীন, অমানবিক ও বিপজ্জনক এক পন্থা বেছে নিয়েছেন। তাঁরা গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা তথা ব্লগারদের চরিত্র হননের কাজে লিপ্ত হয়েছেন। তাঁরা তাঁদেরই হাতে নিহত ব্লগার রাজিব হায়দার শোভনের নামে মিথ্যা আইডি দিয়ে সৃষ্ট ব্লগে আপত্তিকর কথা লিখে এবং তা ঐ পত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে দেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তারা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাঁয়তারা করছেন। গত শুক্রবার জুমা নামাজের পর সারা বাংলাদেশে একদল উন্মত্ত মানুষ যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তার জন্যেও দায়ী ঐ পত্রিকা এবং তার স্বঘোষিত সম্পাদক।
গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই কথিত সেই পত্রিকা এবং তার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, যিনি নজিরবিহীন ভাবে নিজ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় নিজের ছবিসহ কলাম ও সম্পাদকীয় লেখেন, নিয়মিত এই চত্বর এবং এর উদ্যোক্তাদের বিষয়ে আপত্তিকর সংবাদ ছাপিয়ে তরুণদের উত্তেজিত করতে চেয়েছেন। তিনি  চেয়েছিলেন তাঁর এমন কদর্য কর্মকা-ে তরুণরা খেপে গিয়ে তাঁর বা পত্রিকার কার্যালয় ভাঙচুর করুক তিনি যেন তা তাঁদের পেইড মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে দেশসহ বিশ্ববাসীকে দেখাতে পারেন। কিন্তু তা হয়নি। অহিংস আন্দোলনের প্রতিটি যোদ্ধা নিজ এবং আন্দোলনের প্রতি সৎ থেকে ঐ পত্রিকার পাতানো ফাঁদে পা দেয়নি। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে মিস্টার ভারপ্রাপ্ত তরুণদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ এনে উত্তেজিত করে তুলেছেল মুসলিম সম্প্রদায়কে। এই অপসাংবাদিকতা, এই নষ্ট সাংবাদিকতা, এই হলুদ সাংবাদিকতা যদি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হয় তা হলে সেই স্বাধীনতা দেশের অধিকাংশ জনগণ তাদের দেবে কিনা তা ভাবার বিষয়। বরং আমি মনে করি দুদিনে গজিয়ে ওঠা এই তথাকথিত সম্পাদক বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে বেশি অনৈক্য, অবিশ্বাস, দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে ঐ পত্রিকা ও সম্পাদক সাংবাদিকদের জীবনও বিপদাপন্ন করে তুলেছেন।
গত শুক্রবার প্রায় ৩৫ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার জন্যেও প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে দায়ী ঐ দৈনিকটি। সে সাথে বলতে হয় স্বাধীনতার ৪২ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব আক্রান্ত হওয়ার পেছনেও উস্কানি হিসেবে কাজ করেছে ঐ পত্রিকাটি। ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। তার ২৩ বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অনতিদূরে শাহবাগে শতাব্দির অন্যতম অহিংস ও দলনিরপেক্ষ তরুণদের জাগরণে ছাত্রদল বা তার কর্মীরা অনুপস্থিত। রাজনৈতিক হঠকারিতা বিএনপিকে একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করবে। সে সাথে ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রদলের রাজনীতিরও কবর রচিত হবে।
তরুণদের মিলিত এই সংগ্রামের নাম গণজাগরণ। এর বাইরে যারা যাবে তারা ভবিষ্যতের পরিক্রমার পথ খুঁজে পাবে না। এই তরুণ কোন দলের প্রতি আনুগত্য দেখানোর চেয়ে দেশ ও জাতির প্রতি আনুগত্য দেখাবে বেশি। অসৎ রাজনীতিকের সিঁড়ি হিসেবে ছাত্র-তরুণদের ব্যবহার করবার দিন বুঝি ফুরিয়ে এলো। এই বাস্তবতা যে রাজনৈতিক দল আগে ভাগে অনুধাবন করতে পারবে ততই তার মঙ্গল হবে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ