দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ৩ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২ ফাল্গুন ১৪১৯ সাল ৩ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী
৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত। পত্রিকা অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। মোমিন রোডে দেখা পেলাম চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ রুবেল দাশ প্রিন্সের। সে বলল, দাদা আগামীকাল কাদের মোল্লার বিচারের রায ঘোষিত হবে। আমরা একটি বড় পতাকা বানিয়েছি। রায় ঘোষণার পর শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফীর গায়ে জড়িয়ে দেব পতাকাটি।’ সে আরো বললো, ‘ফোন করব,আপনিও আমাদের সাথে যাবেন।’ আমি সম্মতি জানিয়ে ফিরে এলাম বাসায়।
৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার। রায় ঘোষিত হলো, রাজাকার আর বিএনপি ছাড়া সারা বাঙলার মুক্তিকামী মানুষকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে, হতাশ করে, ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে। দুপুরে রুবেলসহ বেশ ক’জন তরুণ জানালো সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগ মানববন্ধন করবে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে। যাব বলে কথা দিলাম। শুরুর আগে রুবেল ফোন দিল ঠিকই, কিন্তু যাওয়ার আগে আগেই হঠাৎ মনে হলো, কেন যাব? আর কতদিন যাব? কী করতে যাব? এতকিছুর পরে, এত হত্যা, গণহত্যা করেও লোকটির শুধুমাত্র যাবজ্জীবন জেল হলো। খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মানববন্ধনে গেলাম না।
৬ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। সকাল থেকে অনেকে ফোন করছেন কর্মসূচি নিয়ে। প্রেস ক্লাবের সামনে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগ ও চট্টগ্রাম অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামসহ অন্যান্যদের কর্মসূচি এর পাশাপাশি শহীদ মিনার চত্বরে আরেকটি সমাবেশ। রাশেদ হাসান, রুবেল দাশ প্রিন্স,শ্যামল ধর, ইউসুফ সোহেল, প্রীতম দাসসহ বেশ কজন তরুণ কর্মসূচি নিয়ে আলাপ পরামর্শ করছিলো। কথা হচ্ছিল কোন সমাবেশটি কোথায় যাবে তা নিয়ে। প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনার না কি শহীদ মিনার থেকে প্রেস ক্লাব। আমি বললাম শুরু হোক আগে। বিকেলে যখন প্রেস ক্লাব চত্বরে যাই তখন শরীফ চৌহান, হাসান ফেরদৌস ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের সমন্বয়ে ও নেতৃত্বে উদীচীসহ বেশ ক’টি সংগঠনের অংশগ্রহণে শুরু হয়ে গেছে প্রতিবাদী অনুষ্ঠান। এই উদ্যোগের পিছনে প্রেরণা ও মডেল হিসেবে কাজ করছিল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া শাহবাগের জমায়েত যা এখন গণজাগরণ মঞ্চ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে দেশে-বিদেশে। এরপর প্রতিটি মুহূর্তে এই সমাবেশে যুক্ত হচ্ছেন চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণ। গৃহবধূ থেকে কয়েকমাসের শিশু,দোকানদার, শ্রমিক থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা।
আমি যে অংশটুকু প্রত্যক্ষ করেছি শুধু তাই লিখলাম। এই উদ্যোগ শুরু থেকে অনেকেই আছেন যাঁদের নাম আমার এখানে আসে নি। তাঁদের সকলেরই অবদান আছে। এই উদ্যোগে কার্যত আমার তেমন কোন অবদান নেই।
এই প্রথম আমি বুঝতে পালাম আমার বয়স হয়েছে। কারণ রায়ে হতাশ হয়ে, ব্যথিত হয়ে আমি ঘরে বসে রইলাম আর ঢাকার তরুণরা তা না করে সমবেত হলো শাহবাগে, চট্টগ্রামের তরুণরা প্রেস ক্লাব চত্বরে। ইতিহাসটি রচিত হলো তরুণদের হাতেই। আমার মতো বয়স্করা শুধু অবাক চোখে তরুণদের উত্থান দেখলাম, জাগরণ দেখলাম, ইতিহাসের দর্শক হয়ে রইলাম শুধু।
এখন যৌবন যার মিছিল বা যুদ্ধে যাওয়ার তারই তো শ্রেষ্ঠ সময়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সকল আন্দোলন সংগ্রামই তো তরুণদের দ্বারা সংঘঠিত। অর্থাৎ এ দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামই তরুণদের মেধা, শ্রম, রক্ত ঘামেরই ফসল।
তবে এবারের আন্দোলনের চরিত্রটি ভিন্ন। আগেই বলেছি উদ্যোক্তারা সবাই তরুণ যাদের বয়স ২৫-৩০ এর বেশি নয়। এদের কারুর কোন রাজনৈতিক উচ্ছাভিলাষ নেই। তেমন একটি দলীয় পরিচয়ও নেই। কোন দলের প্রতি আনুগত্যও নেই তাদের। বরঞ্চ বর্তমান রাজনীতি ও রাজনীতিকদের নিয়ে আছে চরম অসন্তোষ। এরা কাওকে ক্ষমতায় বসাতে বা ক্ষমতা থেকে নামাতেও সমবেত হয়নি। এদেরকে কেউ জোর করে সমাবেশে আনে নি। টাকা দিয়ে আনে নি। সবাই নিজ নিজ চেতনা থেকে, আদর্শ থেকে, মাতৃভূমিকে মায়ের মতো ভালবাসে বলে এখানে ছুটে এসেছে। তাদের একটাই দাবি, সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা। তাদের জন্মের অনেক আগে সংঘটিত এই জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন, বড় অহংকার মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধীতা করেছিল। যারা হত্যা, ধর্ষণ গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগের মতো মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করা। আইনের যে দুর্বলতায় অপরাধী পার পেতে পারে তা সংশোধন করা। তারা রাজাকার আলবদরদের ফাঁসি দাবি করছে এবং সে সাথে এদের সহযোগীদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করার আহবান জানাচ্ছি। গত মঙ্গলবার থেকে চলা এই আন্দোলন, লেখাটি যখন লিখছি তখন অষ্টম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু কোথাও কোন বিবাদ,মতবিরোধ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, স্লোগান পাল্টা স্লোগান বা কোন নেতা-নেত্রীর নামে স্লোগান দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে নি। এরা দোকানে খাবার খেয়ে পয়সা বা বিল না দিয়ে চলে আসে নি। এরা একটিও গাড়ি ভাঙেনি। ঢিল ছোঁড়েনি। লাঠি নিয়ে কাউকে আঘাত করেনি। পুলিশকে পেটায়নি, জোর করে যানবাহন বন্ধ করেনি। এরা জামাত ও এর সহযোগীদের বয়কট করতে বলেছে। জামাতের আর্থিক ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্জন করতে বলেছে কিন্তু একবারও আক্রমণ করতে বলেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ থেকে একটিও উস্কানীমূলক বাক্য উচ্চারিত হয়নি।
প্রায় দু’শ ঘণ্টা অবিরাম অবস্থান করার পরেও খাদ্যের প্যাকেট নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করেনি। এত লোকের সমাবেশ অথচ পরিবেশ দুঃসহ করে তোলেনি। এদের ভেতর নেতৃত্বের কোন সংকট নেই। কোন্দল নেই, দল উপদল নেই। দু’টি চকলেট কেউ পেলে অপরটি বাড়িয়ে দিচ্ছে পাশের জনকে। এরা অবিরাম স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করছে চতুর্দিক অথচ মাইক নিয়ে কাড়াকাড়ি নেই। এসব গত আটদিন ঘটেনি কাল থেকে যদি ঘটে তবে বুঝতে হবে তা রাজাকার ও তার দোসরদের ষড়যন্ত্রের অংশ। এত নারীর অংশগ্রহণ অথচ কোথাও কোন নারীর প্রতি অসম্মান জানানোর রুচি বা স্পর্ধাও কারো হয়নি। এত পুরুষের ভেতর একজন নারী এতটুকুও অপমানিত হয়নি। যে দেশে ঘরের মধ্যে দরজা আটকেও নারীরা তাদের সম্ভ্রম বাঁচাতে পারে না সেখানে এই চিত্র অভাবিত। এমন কি গত কিছুদিন থেকে চলে আসা নারী ধর্ষণের ঘটনাও কমে গেছে দ্রুত। হিসাব করলে দেখা যাবে গত আট দিনে (যখন লেখাটি লিখছি) সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর পেছনে কোন জাদুমন্ত্র কাজ করেনি। কাজ করেছে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই তরুণরা দেশকে ভালবাসে মায়ের মতো। কাজেই মায়ের বা মায়ের কোন কুসন্তানের অপমান এরা হতে দেবে না। আমার বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের মাধ্যমে তরুণদের যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যায় তবে এরা কোন দিন জাতির সাথে, দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। টাকার বিনিময়ে নিজের বিবেককে বিক্রি করবে না। বর্তমান রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীসহ সকল স্তরের সুবিধাভোগী, আপোষকামীদের জন্যে বিশাল একটি শিক্ষা দিয়ে গেল গণজাগরণমঞ্চের লক্ষ লক্ষ তরুণরা।
আমি আর এখন হতাশ নই। হতবিহ্বল নই। কারণ তাদের হাতেই দিলাম আমার নির্ভরতার চাবি। কারণ বিগত কয়েক মাস ধরে জামাত-শিবিরের তাণ্ডব দেখতে দেখতে একটি সময়ে মনে হয়েছে আমরা কোথায় বাস করছি। এই ধ্বংস আর জিঘাংসা থেকে মুক্তি দেবে কে?
দু’দিন আগেও কে জানতো, যাদেরকে ফেসবুক আক্রান্ত, অসামাজিক, স্বার্থপর ও আদর্শহীন বলে ভেবেছি সে তরুণরাই জাতির মুক্তির দূত হয়ে উঠবে। জামাত-শিবিরের লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র, পেট্রোল,দিয়াশলাই আর ধ্বংস ও মৃত্যুর হুঙ্কারের পরিবর্তে হাতে তুলে নেবে গিটার, ঝাঁঝালো স্লোগান আর জাগরণের গান। কে জানতো জামাত-শিবির-বিএনপির হিংসাত্মক কর্মসূচির বদলে এরা রচনা করবে ঐতিহাসিক এক অহিংস আন্দোলন।
গত শতাব্দিতে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন ব্রিটিশদের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়ে সারাবিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। আজ বাংলাদেশের তরুণরা অনেক অনেক নজির সৃষ্টির সাথে সাথে শতাব্দির প্রথম ও বৃহৎ এক অহিংস আন্দোলনেরও সূচনা করল।
হায়, একই দেশের সন্তান, একই জাতির সন্তান তবুও দু’দল তরুণের মধ্যে কতটা তফাৎ। বিশ্বে অহিংসা ও ভালবাসার বিপরীতে কোন ফ্যাসিবাদ জয়লাভ করেনি। বাংলাদেশেও করবে না। কারণ দেশের ষোলকোটি মানুষের নির্ভরতার চাবি এখন শাহবাগ চত্বর হয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব থেকে দেশের লক্ষ কোটি উদ্দিপ্ত তরুণের হাতে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

অসাধারন।
উত্তরমুছুন