দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
৪ জুলাই ২০১৩
-কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
৪ জুলাই ২০১৩
-কামরুল হাসান বাদল
এদেশের মানুষের কতোভাবে মৃত্যু হয় তার ইয়ত্তা নেই। আর কতো ধরনের দুর্ঘটনায় পতিত হতে হয় তারও কোন শেষ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য লিমনের। তার সাথে দুর্ঘটনা ঘটলো রাষ্ট্রের। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিই এখন লিমনের চরম প্রতিপক্ষ।
হতভাগ্য তরুণ এই লিমনকে ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে গুলি করেছিল রাষ্ট্রের এলিট ফোর্স নামে খ্যাত র্যাব। ওই দিনই ঘটনার নেতৃত্বে থাকা র্যাবের উপসহকারী পরিচালক লুৎফর রহমান বাদী হয়ে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। একটি অস্ত্র আইনে অপরটি বন্দুকযুদ্ধ করে সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে। অপরদিকে লিমনকে অন্যায়ভাবে গুলি করা হয়েছে দাবি করে তার মা ছেনোয়ারা বেগম ডিএডি লুৎফর রহমানসহ র্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল একটি মামলা করেন।
লিমনের এই ঘটনা দেশে বেশ আলোচিত সমালোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়। কারণ বিভিন্ন গণমাধ্যম তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, লিমন ছিল প্রকৃতই একজন নিরপরাধ। আর র্যাবও তাকে গুলি করেছিল ভুল করে, না চিনে। তবে সেদিন যে মোর্শেদ জমাদ্দার নামক যে ব্যক্তিকে ধরতে গিয়ে লিমনদের গ্রামে র্যাব অভিযান চালিয়েছিল সে মোর্শেদ বা তার সহযোগীদের এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি র্যাব।
লিমনের ঘটনায় বিব্রত র্যাব ও প্রশাসন সে সময় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। জনগণের কাছে তার কোনটিই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। বরং মানুষ মনে করে লিমনকে ভুল করে হোক আর যে ভাবেই হোক গুলি করেছে র্যাব। আর লিমন যেহেতু অপরাধী নয় সেহেতু এই ঘটনার সাথে জড়িত র্যাব সদস্যদের বিচারের সম্মুখীন করা হোক।
অন্যদিকে র্যাব কোন ভুল করেনি এবং লিমন প্রকৃতই একজন অপরাধী তা প্রমাণ করতে গিয়ে এখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই লিমন নামক পঙ্গু এক তরুণের বিপক্ষে চলে গেছে। লিমনকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে রাষ্ট্রের একটি ভুল কাজের বিরুদ্ধে।
চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের রুখতে পুলিশবাহিনী যখন ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছিল তখন র্যাব গঠন ও এর অভিযানে দেশের অধিকাংশ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারের মতো মানবাধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল শ্রেণী কর্তৃক সমালোচিত হলেও দেশের সাধারণ মানুষের ব্যাপক আস্থা আছে র্যাবের প্রতি। এই বাহিনী গঠনের পর দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির যে কিছুটা উন্নতি ঘটেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এখন যে পরিস্থিতি তার আরও অবনতি হতে পারতো এই বাহিনী গঠিত না হলে। সেদিন লিমনকে গুলি করার ঘটনাটিও এমন এক অভিযান পরিচালনা করতে গিয়েই ঘটেছিল। এবং অধিকাংশ প্রতিবেদক ও বিশ্লেষকদের মতে লিমনকে ভুল করেই গুলি করা হয়েছিল। কথা হচ্ছে মানুষের একশটি কাজের মধ্যে সবকটিই নির্ভুল হবে তাতো নয়। দুএকটি ভুলও হতে পারে। তবে বিচক্ষণতা হচ্ছে দ্রুতই সে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু লিমনের ক্ষেত্রে বরং হয়েছে উল্টো। র্যাব ভুল করতে পারে না তা প্রমাণ করতে গিয়ে লিমন এবং তার পরিবারের ওপর ক্রমাগত অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত কয়েকদিন আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান লিমনের পরিবারের কাছে একটি আপস ফর্মুলা দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন লিমনের পরিবার র্যাবের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিলে র্যাবও লিমনের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে নেবে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পন্থা বটে। কারণ তাঁর উদ্যোগের স্বপক্ষে বলতে গিয়ে ড. মিজান বলেছেন রাষ্ট্রের বিপক্ষে লড়াই করা কঠিন। আমার মনে হয় দুর্গতি থেকে লিমনকে বাঁচাতে এটি তার সীমিত ক্ষমতার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। মীমাংসা হতে পারে কিংবা হলো বটে কিন্তু গুলি করায় লিমনের যে পা’টি কেটে ফেলা হয়েছে তা ফেরত পাওয়া যাবে কি?
গত ২৩ জুন লিমন ও তার পরিবারকে ডেকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
প্রস্তাবটি ভেস্তে যাওয়ায় লিমনের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠছে। বোঝা যাচ্ছে লিমনের জন্যে আরও দুর্গতি অপেক্ষা করছে। অথচ ঘটনা অনেক আগেই শেষ হতে পারতো। কারও ভুলের জন্যে যদি তা ঘটে থাকে তা স্বীকার করে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই ঘটনার নিষ্পত্তি হয়ে যেতো। অনেক ভালো কাজ করার অধিকারী ও প্রশংসার দাবিদার র্যাব ও বিতর্কিত হতো না জনগণের কাছে।
গত ২৪ জুন রেলের দেড় কোটি টাকার একটি কাজের টেন্ডার নিয়ে চট্টগ্রামের সি আর বিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ বছরের একটি শিশুও রয়েছে। ঘটনার সাথে অভিযুক্তদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অন্যতম একজন নাম লিমন দেখে অনেকে প্রশ্ন করেছেন এবার এই লিমনের পায়ে কি গুলি চালাবে পুলিশ বা র্যাব?
আসলে পুলিশ বা র্যাব নিরপরাধ লিমনদের পিছে না লেগে এমন শত শত টেন্ডারবাজ লিমনদের পিছে লাগতো তা আখেরে বর্তমান সরকারেরই লাভ হতো। ঝালকাঠির পঙ্গু লিমন বর্তমান সরকারের জন্যে হুমকি নয়। হুমকি হচ্ছে ছাত্রলীগ-যুবলীগে ঘাপটি মেরে থাকা চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ-সন্ত্রাসী লিমন যারা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে প্রতিদিন একটি একটি করে পেরেক ঠুকছে কফিনে। যারা বিএনপি-জামাত-হেফাজতের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সরকারের সমস্ত অর্জনকে কালিমালিপ্ত করতে। অথচ বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পেছনে যাদের সামান্যতম অবদানই ছিল না।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন