পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৩

' অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেড বনাম বাংলাদেশের ফ্রড '

দৈনিক আজাদী                         উপ-সম্পাদকীয়                                কাল আজ কাল
১৩ জুন বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০ সাল ‌ ৩ শাবান ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
পুরো নাম ফ্রেডরিক হ্যারল্ড হাইড। সংক্ষেপে ফ্রেড। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। একটি জাতীয় দৈনিকের সাপ্তাহিক আয়োজনে তাঁকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তা পড়েই জানতে পারলাম বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটি। যার এখন অবসর জীবন কাটার কথা অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি উন্নত দেশে পরম সুখে বিলাসিতায় ও নিরাপদে। তিনি এখন পড়ে আছেন ভোলার মতো একটি দ্বীপ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মানুষদের সাথে।

সেখানে তাঁর গড়া সংগঠন কো-ইভ (কো অপারেশন ইন ডেপেলপমেন্টএই চর এলাকায় গড়ে তুলেছে ৪০ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে পাঠদান করা হয় বিনামূল্যে। বইপত্র থেকে শিক্ষার সমস্ত উপকরণও সরবরাহ করা হয় একেবারে বিনামূল্যে। ফ্রেডের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বদলে দিয়েছে ভোলার চরফ্যাশনের জীবনমান।

ফ্রেড প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৮০ সালে। শুরুতে চরফ্যাশনের একটি অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব নেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার একটি সাহায্য সংস্থা এই আশ্রমটি পরিচালনা করতো। এখানকার লোকজনের চরম দারিদ্র্য ফ্রেডকে ব্যথিত করে। তিনি চিন্তা করলেন শিক্ষাই পারে এদের ভাগ্য বদলে দিতে। সেই থেকে শুরু।

উন্নত বিশ্বের আধুনিক সমাজে বেড়ে ওঠা এবং জীবন কাটানো সাদা চামড়ার ফ্রেডের এখন ২৪ ঘণ্টাই কাটে কালোপুষ্টিহীন অধিকারবঞ্চিত বাংলাদেশের শিশুদের সাথে। এই ফ্রেড কোন ব্যাংক ঋণ নেন নি। স্কুলের এমপিওভুক্তি বা সরকারিকরণের জন্যে আবেদনও জানাননি। ফ্রেড কখনো উপদেষ্টা চেয়ারম্যান বা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনেও দাঁড়াবেন না। ঈদের আগে নূরানি চেহারা মার্কা রঙিন ছবি ছাপিয়ে সমাজ সেবক হিসেবে জনগণের কাছে দোয়াও চাইবেন না। তবে কীসের আসায় ফ্রেড এসব করছেনকী তার স্বার্থসত্যিই বুঝতে পারছি না। আমি বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে ফ্রেডকে মেলাতে পারছি না। ফ্রেড রাত্রি যাপন করে স্কুলের পাশেই একটি অতি সাধারণ কক্ষে। বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ যখন অস্ট্রেলিয়াআমেরিকাইংল্যান্ড বা এমন উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাতে হেন কাজ নেই করছে না। সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরছে না। দেশের অর্থনীতি লুটপাট করে বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে যেখানে ‘সেটলড’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সে সময় সে দেশের ফ্রেড কেন পড়ে আছে। সে পাগল নাকি আমি বুঝতে পারছি না। না কি ‘সাধু বেশে . . .। এদেশে তো সৎ লোকরা বোকা হিসেবে বিবেচিত। ভদ্রলোকরা হাবলা হিসেবে পরিচিত আর ভালো মানুষ তো সে আহম্মকব্যাক ডেডেটসো কল্‌ড মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট’ তাদের।

পাশাপাশি আমাদের শিক্ষকরা দেখুন কত স্মার্ট। ফ্রেড তো ফকিরনীর বাচ্চাদের পড়ায়। ওর তো কোন স্ট্যাটাসই নেই (ফেসবুক স্ট্যাটাস নয় আবারআমাদের শিক্ষকরা তাদের অবস্থা দেখুন। একটি উদাহরণ দেইফতেয়াবাদ কলেজের প্রিন্সিপাল তথা অধ্যক্ষ মহাশয় কত স্মার্ট দেখুন। অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর কক্ষে পরীক্ষা শুরুর অন্তত ঘণ্টা দেড়েক আগে প্রশ্নপত্র চলে আসে। বৈষয়িক প্রিন্সিপাল সাহেবসঙ্গে সঙ্গে তা খুলে মুঠোফোনে তা জানিয়ে দেন তার পরীক্ষার্থী কন্যাকে। কয়েকদিন আগে এইচএসসির গণিত বিষয়ের পরীক্ষার দিন এই অপকর্ম করতে গিয়ে তিনি ধরা খেয়েছেন উপজেলা কর্মকর্তার হাতে। এখন দু’বছরের জন্যে শ্রীঘরে আছেন। এটি গেলো একটি উদাহরণ আপনার আশেপাশে একটু খবর নিন এর চেয়েও ভয়াবহ সংবাদ পেয়ে যাবেন। ফ্রেডের জীবন কাটে এখন শিক্ষকতায় ও শিক্ষা বিস্তারে। ভাবছি ফ্রেড ও শিক্ষক ফতেয়াবাদ কলেজের প্রিন্সিপালও একজন শিক্ষক।

পূর্বেই বলেছি প্রায় ৪০টি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন ফ্রেড। তাঁর সাথে তাঁর দেশ অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের বেশ ক’জন মহান ব্যক্তি আছেন।

বাংলাদেশেও প্রতি বছর বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও বর্তমান সরকারের কঠোরতায়(এর কারণ ব্যাখ্যা করা হবে পরেএখন কিছুটা কমেছে এই প্রবণতা। একটি সময়ে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের অভিপ্রায়ে স্থানীয় জমিদাররা স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতেন। সে সাথে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের জন্যে কিছু জমি জমাও দান করে যেতেন। এছাড়া বিত্তশালী ও শিক্ষানুরাগীরাও এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। নিঃস্বার্থ এমন ব্যক্তিদের বদান্যতায় এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার চেয়েও বড় কথা হলো এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষুদ্র কোন চিন্তা কাজ করতো বলে জানা যায় নি। কিন্তু একটি সময়ে বিশেষ করে দেশ স্বাধীনের পরে সমাজের কিছু কিছু লোক যখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল এবং সমাজে তাদের কদর বাড়তে থাকলো তখন থেকে শুরু হলো এক ধরনের আত্মপ্রচারের প্রবণতা। নিজের নামেঅখ্যাত বাবার নামেবৌয়ের নামেশ্বশুরের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তেলা শুরু হলো। শিক্ষার মান নাইমানসম্পন্ন শিক্ষক নাইশিক্ষক থাকলে বেতন নাইশিক্ষার্থী থাকলে পাশের সংখ্যা নাইশুধু নাই নাই অবস্থা। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে এমপিওভুক্তিকরণ। অর্থাৎ দায়টিও সরকার তথা জনগণের কাঁধের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। লোক দেখানো এসব সমাজ সেবকদের ঠেলায় দেশের শিক্ষার মানেরও বারোটা বেজেছে। এখন বাধ্য হয়ে সরকার এর ওপর শর্তারোপ করেছে। ইচ্ছে করলেই আর যার তার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়েও চলছে চরম নৈরাজ্য। সরকার দিন দিন কঠোর হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ও আদালতের আদেশের কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না শুধু সার্টিফিকেট বিক্রিকারী উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান তথা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো। প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মারামারি দলাদলি এমনকি একই নামে দুই তিনটি ইউনিভার্সিটি থাকার ইতিহাসও বাংলাদেশে বিদ্যমান। অর্থাৎ শিক্ষাও এখন বাণিজ্যের উপাদানে পরিণত হয়েছে।

দেশের নামকরা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার নামে নগ্নভাবে বাণিজ্যে নেমেছে। সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফি’র বাইরে প্রচুর টাকা নিয়ে প্রতিবছর হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে জড়িত থাকেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সরকার বা শিক্ষামন্ত্রী চাইলেও তাদের বাগে আনা যায় না। সম্প্রতি ঢাকার মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ বাড়তি আদায়কৃত পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা অভিভাবকদের ফেরত দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এমন কি এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীর এমপিও বাতিলের হুমকিতে কাজ হয় নি কিছু।

আমার কাছে ফ্রেডের পাশে এদেরকে এক নম্বরের ফ্রড বলে মনে হয়। এক ব্যক্তি সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে দেশের এক চরাঞ্চলে শিক্ষার মহান আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন আর তার পাশাপাশি দেশের কিছু মুনাফালোভী বিবেকহীন মানুষ শিক্ষা ও শিক্ষকদের মহান পেশাকে দিন দিন কদর্য ও কালিমালিপ্ত করছেন। বাংলাদেশের শিক্ষিতজনেরাই ফ্রড। অশিক্ষিত ও গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা ফ্রড বা অসৎ নয়। দেশে যে আজ দুর্নীতির অবাধ প্রচলনলুটপাটদুর্বৃত্তায়ন সবকিছুই হয়েছে শিক্ষিত শ্রেণীর বিভিন্ন পেশার লোকজনদের দ্বারাই। পোশাক শ্রমিকপ্রবাসী আর গ্রামের কৃষকদের রক্ত ঘামে পরিশ্রমে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছে ওসব তথাকথিত শিক্ষিত ফ্রডরা। এরা হালুয়া রুটির চামচ বদল করে শুধু। পাঁচ বছর এরা যাবে তো পাঁচ বছর ওরা। জনগণের ভাগ্যের চিন্তা করে যে দুই চারজন তাদের অবস্থা হরিজনদের চেয়েও খারাপ।

তার চেয়েও ফ্রেডরা আছে বলে আমরা তাদের কাহিনী পড়ে উদ্দীপ্ত হই। আশায় বুক বাঁধি। হয়ত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। অসংখ্য ফ্রডের দেশে একজন দুইজন করে ফ্রেডের সংখ্যা বাড়বে। গ্রামে গঞ্জে কি প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বলে উঠবে।

তোমাকে নতশির অভিবাদন ফ্রেড।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ