পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১ আগস্ট, ২০১৩

'অভিজাত! যুবলীগ'

দৈনিক আজাদী                 উপসম্পাদকীয়              কাল আজ কাল
১ আগষ্ট বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৭ শ্রাবণ ১৪২০ সাল ২২ রমজান ১৪৩৪ হিজরী

আমার কাছে বর্তমান যুবলীগের রাজনীতিকে বেশ অভিজাত অভিজাত বলে মনে হয়। কমিটির লোকবল থেকে শুরু করে কর্মসূচি ও বিভিন্ন প্রকাশনা দেখে মনে হয় এটি দেশের শিল্পপতিদের সন্তান বা ভবিষ্যতের শিল্পপতিদের একটি সংগঠন। বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে না ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কাদের হাতে যাচ্ছে।

বলা নেইকওয়া নেই নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে হুট করে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কমিটি ঘোষণা করা হল কেন্দ্র থেকে। আর এরপর থেকে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে ঘুরে ফিরে আসছে যুবলীগের নতুন কমিটির কথা। এই সংগঠনেরই অনেকে অভিযোগ করেছেন নতুন এই কমিটিতে অনেক সন্ত্রাসীচাঁদাবাজ ও পুলিশের তালিকাভুক্ত আসামিও আছেন। তবে অন্য একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে এই কমিটি ঘোষণা ও তা অনুমোদনের জন্য প্রায় কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ টাকা দিয়ে কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ যদি সত্যি হয় তবে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ঘটনার সুষ্ঠু ও পক্ষপাতহীন তদন্ত হওয়া জরুরি।

জাহাঙ্গির কবির নানক ও মির্জা আজমের পর যুবলীগের নেতৃত্বে আসেন আলহাজ্ব ওমর ফারুক চৌধুরী ও মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ। যুবলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার আগে দেশের ছাত্র ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এ দু’জনের নাম খুব একটা শুনেছি বলে মনে হয় না। তবে ওমর ফারুক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ায় এবং আমাদের একই নির্বাচনী এলাকায় বাড়ি হওয়ায় নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম শুনেছি।

জাহাঙ্গীর কবির নানকের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষিত আছে। ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি বেশ সক্রিয়। তাঁকে নিয়ে কোনো বিতর্ক বা দুর্নাম শুনিনি এখনও।

মির্জা আজমও ছাত্র রাজনীতি করেছিলেনযুবলীগের সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার আগে। তবে তিনি বেশ আলোড়ন তুলেছিলেন ঘাতক গোলাম আজমের সাথে তাঁর নামের মিল থাকায় অ্যাফিডেভিট করে তাঁর নাম থেকে গোলাম শব্দটি বাদ দিয়ে।

আমার কাছে বর্তমান যুবলীগের রাজনীতিকে বেশ অভিজাত অভিজাত বলে মনে হয়। কমিটির লোকবল থেকে শুরু করে কর্মসূচি ও বিভিন্ন প্রকাশনা দেখে মনে হয় এটি দেশের শিল্পপতিদের সন্তান বা ভবিষ্যতের শিল্পপতিদের একটি সংগঠন। বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে না ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কাদের হাতে যাচ্ছে।

টাকা লেনদেন ও সন্ত্রাসীদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যুবলীগ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেছেন যুবলীগ কমিটি গঠনের ব্যাপারে তিনি আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীডাআফসারুল আমিন ও আজম নাছিরের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। কী আশ্চর্যকমিটি হবে যুবলীগের। কথা বলতে হলে বলতে হবে আগের কমিটি ও স্থানীয় যুব ও ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে। এবং অবশ্যই কমিটি গঠন করা উচিত ছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে সবার মতামতের ভিত্তিতে। যুবলীগের বিষয়ে তিন আওয়ামী লীগ নেতার মতামত নেওয়ার অর্থ হচ্ছে তাঁদের পছন্দের লোকদের কমিটিতে রাখা। যোগ্যসৎ ও প্রকৃত কর্মীদের কোণঠাসা করে রাখা। অবশ্য টাকা লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। বর্তমান কমিটিতে সবাই অযোগ্য তা নয়। বরং এভাবে একটি কমিটি চাপিয়ে দিয়ে কমিটির যোগ্যদেরই বিতর্কিত করা হয়েছে।

এবার বলি যুবলীগের আভিজাত্যের কথা। গত ২৭ জুলাই শনিবার। চট্টগ্রামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা লেখক রমা চৌধুরীর সাথে বঙ্গভবনে দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় চল্লিশ মিনিটব্যাপী এই সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী গভীর মমতার সাথে রমা চৌধুরীর জীবনের কথা শুনেছেন এবং যে কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। ব্যক্তিত্ববাননির্লোভ রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো সহযোগিতা চান নি। ব্যক্তিগত সহায়তা নয় শুধু তাঁর অনাথ আশ্রমের কথা বলেছেন। চট্টগ্রাম শহরে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যতাবোধ ও রমা চৌধুরীর নির্লিপ্ততার কথা বেশ আলোচিত হচ্ছিল সে সময় আমাদের পত্রিকা অফিসে ক’জন সহকর্মী এলেন ইফতার সেরে। তাদের আলাপে জানতে পারলাম মহানগর যুবলীগের আয়োজিত হোটেল আগ্রাবাদের ইফতার পার্টিতে গিয়েছিলেন তাঁরা। একজন সাংবাদিক বন্ধুর হাতে একটি চমৎকার ও ঢাউস সাইজের বই দেখে আগ্রহ ভরে হাতে নিয়ে দেখলাম সেটি যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি হতে প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দর্শন’ নামক আধা অ্যালবাম আধা প্রচার গ্রন্থটি। চাররঙে ছাপা বইটিতে প্রতিটি পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনার হাস্যোজ্জ্বল রঙিন ছবি এবং কয়েকজন লেখকের লেখা। বলাবাহুল্য সবক’টিই শেখ হাসিনার জীবন ও রাজনীতি নিয়ে। বইয়ের নাম শেখ হাসিনার দর্শন বলা হলেও তা পরিষ্কারভাবে উঠে আসেনি। বইটি দেখে যে কারো মনে হতে পারে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে যেন শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য। এতে রাজনৈতিকভাবে,বিস্তারিতভাবে বললে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে কী বা কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা আমার কাছে বোধগম্য হল না। ব্যয়বহুল বইটির দাম রাখা হয়েছে এক হাজার টাকাযদিও খরচের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি পড়েছে। দামের কথা চিন্তা করলে এই অ্যালবাম সবার পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। যাঁরা কিনতে পারবেন তাঁদের কাছে শেখ হাসিনাকে নতুন করে তুলে ধরার কী আছে বুঝতে পারলাম না। বরং দেশের সাধারণ মানুষখেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে দেশের নারী সমাজের কাছে তাঁর কর্ম দর্শন ও রাজনীতি তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। কম দামে ও সহজ লভ্য করে শেখ হাসিনার অবদানতাঁর রাজনৈতিক ভাবনা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। এ ধরনের কোনো কিছু যুবলীগ কখনও করেছে কি না আমার জানা নেই। অথচ শেখ ফজলুল হক মনি এই যুবলীগকে নিয়ে অত্যন্ত আধুনিক ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে এবং আগামী নির্বাচনে এই প্রকাশনার ভূমিকা কী বুঝতে পারলাম না বলে দুঃখিত।

যেদিন অর্থাৎ গত শনিবার সাংবাদিকদের সৌজন্যে যুবলীগ ইফতার পার্টির আয়োজন করে চার তারকা মানের হোটেল আগ্রাবাদে। শুনেছি মাথাপিছু নয়শত টাকা বাজেটের ইফতার মাহফিলে দুইশত জনের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল ইছামতি হলে। সাংবাদিকদের জন্য ইফতার মাহফিল তাও আবার হোটেল আগ্রাবাদের মত অভিজাত ও ব্যয়বহুল হোটেলে কেন তার কোনো অর্থ খুঁজে পেলাম না। সাংবাদিকরা তাঁদের কাছে এমন কোনো আবদার করেছেন বলেও তো শুনিনি। এই ইফতারের দু’দিন পর পত্রিকায় পড়লাম এবার ঈদের তোহফা হিসেবে যুবলীগের নগর সভাপতির পক্ষ থেকে নয় লাখ টাকার এক হাজার নয়শতটি পাঞ্জাবি বিতরণ করা হবে। ঈদে পাঞ্জাবি বিতরণ খারাপ নয় বেশ সওয়াবের কাজ। সামনে যে দুর্দিন অপেক্ষা করছে আওয়ামী রাজনীতির জন্য তাতে এভাবে সওয়াব হাসিল করে রক্ষা পাওয়া যায় কি না চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে আমি এক গুনাহগার বান্দা হিসেবে খুশি হতাম যুবলীগ এই অভিজাত মার্কা বড় লোকি আচরণ ছেড়ে আমাদের মতো ছোট লোকদের কথা যদি একটু চিন্তা করতেন। চারতারা হোটেলে মাথাপিছু (নাকি প্লেট পিছুনয়শত টাকা খরচ না করে সে পরিমাণ টাকার ইফতার যদি গরিব অসহায় লোকদের বিতরণ করতেন। খুশি হতে পারতাম নয় লাখ টাকার পাঞ্জাবি সামর্থবানদের মধ্যে বিতরণ না করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিপতিত অসহায় মানুষের মধ্যে যদি ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হতো। খুশি হতাম ব্যয়বহুল ঝলমলে অ্যালবামের পরিবর্তে যদি শেখ হাসিনা সরকারের গত সাড়ে চার বছরের সাফল্যকে জনগণের মাঝে তুলে ধরতে ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো। খুশি হতাম যদি তারা বড়লোকি আচরণ থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করতে উদ্যোগী হতেন। জানি তার কিচ্ছুই হবে না। রাজনীতিক সংস্কৃতি বদলাবে না। টাকার কাছে সব নীতি আদর্শ বানের জলের মতো ভেসে যাবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলও একদিন গণমানুষের নয় ধনী মানুষের দলে পরিণত হবে। উত্তর প্রজন্মের সন্তানেরা কোনো এক সময় পাঠ্যপুস্তকে পড়বে হয়ত। শোষণহীনবন্ধনহীনক্ষুধাহীন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান।

বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছেযে যুদ্ধ চলছে তা অনুধাবনে যে যুবলীগ নেতৃত্ব ব্যর্থ তার জন্যে বোধ হয় কোনো গবেষণা করতে হবে না।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ