২৯ আগষ্ট বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ১৪ ভাদ্র ১৪২০ সাল ২১ শাওয়াল ১৪৩৪ হিজরী
- কামরুল হাসান বাদল
রাজনীতি যে আমার জন্যে নয় সেটি আমি ছাত্রজীবনেই বুঝে ফেলেছিলাম। রাজনীতি করতে হলে আর যাই হোক একশ ভাগ যে আনুগত্যের প্রয়োজন তা যেদিন বুঝতে পেরেছি সেদিন আমি রাজনীতি থেকে ১০০ হাত দূরে। আমার ভেতর এ নিয়ে এমন ভীতি জন্মেছে যে, পারতপক্ষে আমি রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বেশি মেলামেশা করি না। এমনকি যে রাজনৈতিক দলটির প্রতি আমার এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব আছে সে দলেরও না। আমি ভয় পাই বেশি মিশতে গিয়ে শেষে না আবার সে দলটির প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠি।
এদের চিৎকার চেঁচামেচি, অগোছালো জীবনযাপন ও অতিমাত্রার কর্মী পরিবেষ্টিত থাকা সর্বক্ষণ আমার মেজাজ মর্জির সাথে যায় না। এত কথা বলা এবং অনেক সময় অসত্য বলা আমার পছন্দ নয়। এটি আমার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। মনে হয় অধিকাংশের নয়। সবাই আমার মতো হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলে লক্ষ লক্ষ কর্মী সমর্থক গিজ গিজ করে কীভাবে।
তবে আমি রাজনীতি সচেতন। রাজনীতির খবর রাখি বটে। আমার লেখা এতদিন ধরে যাঁরা পড়ে এসেছেন তাঁরাও খেয়াল করে থাকবেন আমার অধিকাংশ লেখাতেই রাজনীতি উঠে এসেছে যে কোনোভাবে। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে রাজনীতি ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। আমরা কেউই রাজনীতির বাইরে নই। রাজনীতি ব্যতিরেকে কোনো অর্জন বা পরিবর্তনও সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা শুধু স্থানীয় বা দেশীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নই। আমরা বিশ্ব রাজনীতিরও অংশ হয়ে গেছি।
তবে রাজনীতিবিদদের কিছু কিছু গুণ আছে যা আমাকে অবাক করে। এঁদের কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই। পরিবার পরিজনের চেয়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরই সময় দেয় বেশি। সর্বক্ষণ মানুষ পরিবেষ্টিত থাকা এবং শত ব্যস্ততার মধ্যেও অধিকাংশ সময় মেজাজ ঠিক রাখা আর মোবাইলের মতো বিরক্তিকর যন্ত্রটির আহবানে সাড়া দেওয়া। এ কাজগুলো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মোবাইলে পরপর কয়েকটি কল এলে আমার তো মোবাইলটিই ফেলে দিতে ইচ্ছে করে।
বলেছিলাম রাজনীতি ছাড়া কিছু অর্জন সম্ভব নয়। খুব সংক্ষিপ্তভাবে বললেও বলতে হবে ’৪৭-এর দেশভাগ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সকল সুফল তো রাজনীতিরই অবদান। আওয়ামী লীগের জন্ম না হলে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাঙালি তার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা অর্জন করতো কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে যায়। হয়ত বাঙালি একদিন স্বাধীন হতোই তবে তা ১৯৭১’র নয়, কোনো এক একাত্তরে হয়ত। দেশের আজ যে অগ্রগতি তার পেছনে রাজনীতিবিদদের অবদানও কম নয়। আজ যে একটি ব্যাংক নিয়ে অনেক কথা বলা হয় তার অনুমোদনও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
কাজেই বর্তমান যুগে রাজনীতি বিবর্জিত কিছু নেই। ধর্মের নামে, জিহাদের নামে এত যে হত্যা,সন্ত্রাস, ধ্বংস তার মূলেও রাজনীতি। গোপনে জঙ্গিদের অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে প্রকাশ্যে জঙ্গি দমনের নামে কোনো রাষ্ট্রে ঢুকে পড়া তা-ও রাজনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে অধিকাংশ বড় বড় অফিসে চাকরি করে ভারতীয়রা আর বাংলাদেশের মুসলিমরা মিসকিন হিসেবে সুইপারের চাকরি করে তা-ও রাজনীতি।
তবে বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে। দেশ বা পুরো জাতিটাই বর্তমানে দু’শিবিরে বিভক্ত। এর জন্যে সবাই রাজনীতিকেই দায়ী করেন। রাজনীতিবিদদের তুলোধুনো করেন।
রাজনীতিবিদদের প্রথম দুর্নাম তারা দুর্নীতিবাজ। এ বিষয়ে সম্ভবত বাংলাদেশের কোনো মানুষের দ্বিমত নেই। আসলে বাস্তবতাটা কী তা নিয়ে কি একটু ভাবা যেতে পারে? ধরুন আপনার শহরের অভিজাত এলাকার আলিশান বাড়িগুলোর একটু খবরাখবর নিন। সুপার মার্কেট, মার্কেটের দোকান,হোটেল রেস্তোরাঁ। বড় বড় স্থাপনার বিষয়ে একটু খবর নিন। তারপর দেখুন এসবের মধ্যে কয়টির মালিক রাজনীতিবিদরা আর কয়টির মালিক পুলিশ, কাস্টম, আয়কর, বিআরটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গ্যাস, বিদ্যুৎ অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানে দু’নম্বরি করার সুযোগ আছে তার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি করে ঠিক তবে তার বিশাল একটি অংশ খরচ হয় দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকদের জন্যে। আর দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত প্রজাতন্ত্রের বেশিরভাগ কর্মকর্তা কর্মচারীদের টাকায় আয়েশি জীবন চালায় তাদের সন্তান পরিবার-পরিজনরাই শুধু। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদদের খরচ একটু বেশিই। কারণে অকারণে বছরে বেশ কটি বাড়তি মেজবানও খাওয়াতে হয় তাদের। আসলে আমাদের রাজনীতিবিদরা একটু মাথা মোটাওয়ালা। এরা এক টাকা খেলে এদের মন্ত্রণালয়ের সাহেবরা বাড়তি ৯ টাকা খেয়ে বসে থাকে মন্ত্রী, এমপির দোহাই দিয়ে। থানার পুলিশ বলে অমুককে ধরা যাবে না উপরের নির্দেশ আছে। অমুককে ধরতে বাধ্য হয়েছি ওপরের প্রেসার আছে। বেকুব টাইপের রাজনীতিবিদ দুর্নীতি করে একটা আর বাকি ৯টি দুর্নীতি হয় তার নাম ভাঙিয়ে। রাজনীতিবিদ যেহেতু একবার দুর্নীতির ফাঁদে পা দিয়েছে সেহেতু বাধা দেওয়ার নৈতিক শক্তিটিও তার তখন থাকে না। আমি বলি কি ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় বড় নগরীর অভিজাত বাড়ি, মার্কেট আর বিশাল বিশাল শো রুম ও হোটেল রেস্তোরাঁর মালিক কারা তার একটি পরিসংখ্যান হওয়া উচিত। এসএসসি, ইন্টার বা সামান্য ডিগ্রি পাস রাজনীতিক যখন মন্ত্রী হন তখন তিনি কাবু হয়ে থাকেন স্যুটেও বুটেও বিসিএস ক্যাডারের কাছে। এরা প্রকল্প সৃষ্টি করেন। এরাই মন্ত্রীকে দিয়ে তা পাস করিয়ে নেন। প্রকৃত ক্ষমতা এরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। দীর্ঘদিন এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে এখন রাজনীতি আর রাজনীতিকদের হাতে নেই।
তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অন্য কোনো জায়গা থেকে। জাতীয় সংসদ বা রাজনীতি এখন কালো টাকার মালিক, দুর্বৃত্ত, চোরাচালানি, মাদক পাচারকারী ও অবসরপ্রাপ্তদের দখলে। এরা প্রকৃত রাজনীতিক নন। এরা রাজনীতিতে আশ্রয় নেওয়া দুর্বৃত্ত। এ কারণেই রাজনীতিবিদরা আজ জনগণের সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। এখনও আমাদের রাজনীতিতে অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা প্রকৃত জনগণের বন্ধু তবে তারা সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য। সমাজে কালো টাকার মালিকরা নিজের জানমাল বাঁচাতেই রাজনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এবং এই প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার তো মনে হয় এই প্রবণতা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আর রাজনীতিকরা থাকবেন না। গডফাদাররাই হয়ে উঠবেন রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক। বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে খুঁজলে বেশ কিছু সৎ মেধাবী, শিক্ষিত ও নিবেদিত নেতা পাওয়া যাবে। কিন্তু আগামী কয়েক বছর পরে এই পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরে এরশাদের পতন হলে ’৯০-এর সেসব ছাত্রনেতাদের যেভাবে অর্থ দিয়ে দুর্নীতির প্রথম পাঠ শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল তা আর বন্ধ হয় নি। বর্তমানের যুব ও ছাত্রনেতারা যেদিন মূলধারার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে তখনকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ভাবতে গেলে আমার হাত-পা শীতল হয়ে পড়ে।
আমি আমার লেখায় রাজনীতিবিদ বলতে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের বুঝিয়েছি। কোনো সন্ত্রাসী,চাঁদাবাজ, গডফাদার ফার্মের বা হাইব্রিড রাজনীতিবিদদের কথা বোঝাইনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তি সৎ না হলে একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে সততা আশা করা যায় না। আমাদের সমাজ বর্তমানে দুর্নীতি ও অসততায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। আমরা অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে অসৎ। কেউ কেউ সুযোগের অভাবে সৎ। সুযোগ ও প্রকৃত মূল্যের জন্যে আমরা অনেকেই (OFFER)অফার হয়ে বসে আছি।
ডাকাতের সর্দার ডাকাতই হবে। আউলিয়ার সর্দার আউলিয়া। প্রায় পুরো জাতিই যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত তার নেতারা কীভাবে সৎ হবে। আগে নিজে সৎ হলে নেতা নির্বাচনেও সৎ মানুষের খোঁজ করব আমরা। রাজনীতির ঘাড়ে বন্দুক রেখে দেশকে ছোবড়া বানাচ্ছে সরকারি- আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজনীতিকের ছদ্মবেশে মাস্তান, সন্ত্রাসী ও কালো টাকার মালিকেরা জনদরদি হয়ে পোস্টার লাগায়।
এদের ঠেকাতে প্রকৃত ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের (যদি অবশিষ্ট থাকে) বোধোদয় কবে হবে জানি না। জানি না জনগণ তাদের নেতা হিসেবে ভালো মানুষদের কখন বেছে নেবে। মানুষ জানে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ব্যক্তিদের কাহিনী। কিন্তু তাতে ওই ব্যক্তির কোনো অসুবিধা নেই। তার পেছনে ছোটার লোকের অভাব নেই।
দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে আগে আমাদের রাজনীতিকেই পরিশুদ্ধ করে তুলতে হবে। প্রকৃত, মেধাবী ও সৎ রাজনীতিকের হাতে (সে যে দলেরই হোক) যেন রাজনীতি থাকে- সে চেষ্টাই করতে হবে। নেতা ও জনতা ঠিক থাকলে রাজনীতি সঠিক পথে চলতে বাধ্য।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন