পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

'অতি রাজনীতি প্রবণতা ও ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ'

২২ আগষ্ট বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৭ ভাদ্র ১৪২০ সাল ১৪ শাওয়াল ১৪৩৪ হিজরী

- কামরুল হাসান বাদল
বেশ কয়েক বছর ধরে রাজনীতিটাই আমাদের সকল আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হয়ে উঠেছে। শুধু আলোচনার বিষয় বললে ভুল হবে, বিনোদনেরও বুঝি বিষয় হয়ে উঠেছে। তা না হলে টেলিভিশনগুলোয় রাতদিন রাজনীতি নিয়ে এত এত অনুষ্ঠান, টকশো প্রচারিত হচ্ছে কীভাবে। এ অনুষ্ঠানগুলো যদি জনপ্রিয় না হয় তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে খ্যাতনামা কোম্পানিগুলো তা স্পন্সর করছে কীভাবে। নিউজ চ্যানেল বলুন আর বিনোদন বা স্পোর্টস চ্যানেল বলুন সন্ধ্যা থেকেই মধ্যরাত অবধি চলতে থাকে তর্কাতর্কির অনুষ্ঠান তথা টক শো যার বিষয়বস্তু ঘুরে ফিরে রাজনীতি।

সেই কবে থেকে আওয়ামী লীগ- বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক নির্দলীয় সরকার করতে করতেই আমাদের সময় কেটে গেল। দেখে শুনে মনে হয় বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোনো সমস্যা নেই। একমাত্র সমস্যা তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর তার অধীনে তথাকথিত একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। সেই ’৯১ সাল থেকে অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি নির্বাচন তো দেখলাম। কোনোটাইতো বিতর্কহীন হয়নি। প্রতিবারই পরাজিত দল ফলাফল মেনে নেয় নি এবং কোনো সংসদই পূর্ণ মাত্রায় কার্যকরও হয়নি। প্রতিটি সংসদেই বিরোধী দল কোনো কোনো অজুহাতে অনুপস্থিত থেকেছে। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি রাজপথেই পালিত হয়েছে। দিনের পর দিন হরতাল ধর্মঘটে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বর্তমানেও একই পরিস্থিতি চলছে। জনগণের কী লাভ হচ্ছে তা পরিষ্কার না হলেও প্রতি পাঁচ বছরে দেশে কয়েক হাজার করে নব্য কোটিপতি তৈরি হচ্ছে। যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সে দলের চাটুকাররাই (নিবেদিত কর্মীরা নয়) ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়ে উঠছে। তারপরেও দেশের মানুষের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ দেখে আমি বিস্মিত না হয়ে পারি না।

পানের দোকানদার থেকে রিকশাওয়ালা একটু সুযোগ পেলেই আপনাকে জিজ্ঞেস করে বসবে, ‘দেশের অবস্থা কী বুঝতেছেন বাই’। আপনি ইচ্ছুক হোন বা না হোন এরপরে সে এমন একটি মন্তব্য করে বসবে তখন আর আপনার জড়িত না হয়ে উপায় থাকে না। এই পরিস্থিতি সবখানেই। বিয়ে বাড়ি থেকে মেজবান, এমন কি জানাযার নামাজ পড়তে গিয়েও দেখা যায় অনেকের আলোচনার বিষয় মৃত ব্যক্তি বা তার পরিবার পরিজন নয়, সেখানেও হাসিনা-খালেদা, বিএনপি-আওয়ামী লীগ আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যে কোনো লোক দু’একটি কুশল বিনিময়ের পরই অবধারিতভাবে জানতে চাইবে, ‘দেশের পরিস্থিতি কী বুঝছেন।’

এভাবে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে নিজেদের পরিবার, সমাজ আর শত বছরের মূল্যবোধ যে হারিয়ে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে তার দিকে আমাদের কারোর খেয়াল নেই। ঘুণে খাওয়া আসবাবের মতো কাঠামোটি দেখা যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু কাছে গিয়ে একটু নাড়া দিলেই সবকিছু ভেঙে পড়বে।

রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এই সমাজটিকে যে কতটা ভঙ্গুর, এর ভেতরটা যে শূন্য হয়ে গেছে তা এক ঝটকায় উঠে এলো ঐশী নামের মেয়েটির দ্বারা তার বাবা-মা’র খুন হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা ও মোটিভ আমাদের বলে দিচ্ছে এই সমাজটা কতটা পঙ্কিল আবর্তে পড়েছে।

রাতারাতি বিত্তবান হয়ে ওঠা এবং তাদের অপরিমিত জীবনযাপন সমাজে কী যে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করছে এই ঘটনাটি তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আসলে এখানে ঐশীকে ঘাতক হয়ে ওঠার প্ররোচনা দিয়েছে নীতিহীন, আদর্শহীন, মূল্যবোধহীন একটি পারিবারিক পরিবেশ- পক্ষান্তরে বহমান সমাজ।

বছর দুয়েক আগে, ঈদের তোহফা হিসেবে পরিবারের মেঝো ও সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ সন্তানকে প্রায় তিন কোটি টাকা দামের গাড়ি কিনে দিলেন চট্টগ্রামের এক নব্য শিল্পপতি। ঈদের দিন বিকেলে আলিশান সে গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বের হওয়ার মুহূর্তে গাড়ির গতি সামলাতে না পেরে সম্মুখের কন্টেইনার মুভারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ফলাফল দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে কোনো প্রকারে প্রাণে বেঁচে আসা ছেলেকে নিয়ে হাসপাতাল ক্লিনিক টানা হেঁচড়া। সে বছর ঈদের আনন্দ মাটি হয়েছিল সে শিল্পপতি পরিবারের। যদিও বর্তমানে এই শিল্পপতির দেনা আর সম্পদ নিয়ে মহা ফাঁপড়ে আছে কয়েকটি ব্যাংক।

এই হচ্ছে সমাজের বিত্তশালী পরিবারগুলোর চিত্র। এসব পরিবারে বাবা-মা সন্তানদের সাথে আদর্শ বা মানবতাবোধের কথা বলবে কি। তার নিজেরই তো আদর্শ মূল্যবোধ নেই। এই বিষয়গুলো কাকে বলে তা তো তারা জানেই না। এরা ভোগ করতে জানে; সন্তানদেরও ভোগী করে তোলে। যার বৈধ উপার্জনের সাথে জীবন যাপনের মিল নেই। সে ব্যক্তি কী করে তার সন্তানদের মানুষ হওয়ার তাগিদ দিতে পারেন। আর তা তাদের সন্তানরা শুনবেই বা কেনো। তাই তারাও এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করে মা-বাবাকে।

ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় বড় নগরে এতো এতো দামি হোটেলগুলোতে কারা যায়? সড়কে এত এত দামি গাড়ি তা কারা চালায়? এই অর্থের উৎস কী? তারা কত টাকা আয়কর দেন? যার বেতন ১৮ হাজার টাকা কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হয় কী করে তার? অভিজাত এলাকার দামি দামি আলিশান বাড়িগুলোর মালিক কারা? এত টাকার উৎস কোথায়? বাংলাদেশের বাস্তবতায় কত বছর চাকরি করলে খেয়ে দেয়ে কিছু পয়সা জমানো সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। যদি ব্যাংকের টাকা মারা যায়। যদি ভুয়া এলসি খুলে টাকা লুটপাট করা যায়। যদি এক পণ্যের আমদানি দেখিয়ে অন্য পণ্য আনা যায়। যদি জবর দখল করা যায়। যদি চাঁদাবাজি মাস্তানি করা যায়। যদি নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করা যায়। যদি পুলিশ, কাস্টম, আয়কর বা যে বিভাগে ঘুষ খাওয়ার সুবিধা আছে সেখানে চাকরি করা যায়। যদি ভেজাল মিশিয়ে রাতারাতি লাখ থেকে কোটিপতি হওয়া যায়। যদি মাদকের ব্যবসা করা যায়।

আজ সারাদেশে তরুণ সমাজে মাদকের অবাধ ব্যবহার। মাঝে মধ্যে দু’একটি লোক দেখানো ধরা পড়ার দৃশ্য দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কয়েক হাজার চালান পার হওয়ার পর একটি ধরিয়ে দেওয়া হয়। না হলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাজ কী তবে! প্রশাসনের ভূমিকাই বা কী? কারা মাদক ব্যবসা করে, কারা এর নিয়ন্ত্রক তা কি পুলিশ বিভাগ বা নারকোটিকস বিভাগ জানে না? এসব না চললে, সমাজে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়ম অন্যায় বন্ধ হলে একজন সামান্য পুলিশ অফিসার কোটি কোটি টাকার মালিক হবেন কী ভাবে?

ঐশীর বাবা মা হত্যার তদন্তে খুব গভীরে যাওয়া হবে না। কারণ তাতে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে। অনেক অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যা ভদ্রলোকদের বিব্রত করবে। দু’দিন পরে আরেকটি ঘটনা ঘটবে তারপর আড়ালে হারিয়ে যাবে ঐশীদের ঐশী হয়ে ওঠার কাহিনী। এই কাহিনীকে আর প্রকাশ ও প্রচার করতে দেওয়া হবে না। আবার জনগণ ফিরে যাবে নিত্যদিনের ব্যস্ততায়। সেই টকশো, সেই পুরানো মুখ, পুরানো কথা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক না নির্দলীয়।

ইয়াবা, হেরোইন ইত্যাদির আগমন বন্ধ হবে না, আবার ঐশীরা নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ঐশী বা কালো টাকা আর অসৎ উপার্জন ও আদর্শহীন পরিবারে বড় হতে থাকবে। ওরা নেশা করতে থাকবে। নেশার বাজারের হাজার কোটি লাভের টাকার ভাগ যাবে হয়ত আরেক ঐশীর বাবাদের কাছে। এর মধ্যে কোনো কোনো বাবারা ঐশীদের হাতে প্রাণ হারাবে।

এভাবে পাপ আর প্রায়শ্চিত্ত হতে থাকবে। আর আমরা নতুন করে নব্য কিছু কোটিপতি তৈরির জন্যে ভোট যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

দ্য সার্কেল, দ্য সার্কেল।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ