দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৪ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১২ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৪ আশ্বিন ১৪২০ সাল ১২ জিলক্বদ ১৪৩৪ হিজরী
বছর দুয়েক আগে সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করলেও গত সপ্তাহ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। অবশ্য এর আগে দু’তিনটি জনসভায় মায়ের সাথে জনসম্মুখে এসেছিলেন তিনি। কার্যত সেসব সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পুত্র জয়কে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘রূপকল্প ২০২১ গত পাঁচ বছরের অর্জন, আগামী পাঁচ বছরের অঙ্গীকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি একক ও স্বাধীনভাবে জনগণের মুখোমুখি এলেন। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তর বিশেষ করে তরুণদের সাথে মতবিনিময় করেন। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। এর পরের দিন অর্থাৎ গত শনিবার চট্টগ্রাম ক্লাবেও এমন একটি আয়োজনে তিনি মুখোমুখি হন চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এ অনুষ্ঠানে তিনি তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে।
রাজনীতিতে জয়ের সক্রিয় হওয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান বিরোধীদল স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দলের যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী জয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য প্রদানের অভিযোগ এনেছেন। এছাড়া নামে সুশীল কার্যত রাজনীতিক, কিছু অতি বাম ও ‘কনফিউজড’ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়া আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন জয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
উত্তরাধিকারের রাজনীতি যারা পছন্দ করেন না তাঁরাই মূলত জয়ের রাজনীতিতে আসা সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। আমি নিজেও উত্তরাধিকারের রাজনীতি বা রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র পছন্দ না করলেও ঘোরতর বিরোধী নই। কারণ রাজনীতি পরিচালিতই হয় ভাবাবেগ দিয়ে। প্রিয় নেতা বা দলের জন্য অধিকাংশ কর্মী সমর্থকরা যুক্তি-তর্কের ধার ধারে না। নেতা যা বলে বা দল যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় তারা তা-ই করে। এক্ষেত্রে অনেকটা রেজিমেন্টালটা আগে এই ভাবাবেগ বা ধারা শুধু বাংলাদেশই নয়। এর উদাহরণ আছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা বা মায়ানমার, কাশ্মির, উত্তর কোরিয়া, এমনকি আমেরিকায়ও। জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তার তোড়ে তার পরিবারও সম্মানীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শাসনকার্যে জড়িত না থাকলেও বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, বেলজিয়াম, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে রাজা-রানিরা পূজনীয় হচ্ছেন স্রেফ ভালোবাসা ও আবেগের টানে।
তবে পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে যদি অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ অর্ধশিক্ষিত আর সন্ত্রাসের গডফাদার কেউ রাজনীতিতে আসেন সেখানেই আপত্তি থাকার কথা। একজন আধুনিক, শিক্ষিত, মার্জিত ও সৎ তরুণ যদি রাজনীতিতে আসেন এবং তা যদি পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমেও হয় তাতে আপত্তি থাকবে কেন?
রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নিয়ে বলতে গেলে একটু পূর্ব থেকে শুরু করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড স্রেফ ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়। এই হত্যাকাণ্ড একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে একটি জাতির মৌলিক পরিচয়সহ রাষ্ট্রের মূল স্বপ্নকেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। যে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন ও মুক্ত করা হয়েছিল ’৭৫ এর পরে বাংলাদেশ সে রাষ্ট্রের দিকেই ধাবিত করা হচ্ছিল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো মৌলিক চেতনাগুলো মুছে ফেলা হয়েছিল এবং এই কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করার সব ধরনের কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বলা বাহুল্য কার্যত তাই ঘটতো দেশে, যদি ৮০’এর দশকের শুরুতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ন্যস্ত করা না হতো। আজ বাংলাদেশ বলতে (একাত্তরের চেতনায়)যতটুকু আছে তা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের পুনর্জীবনের কারণেও এবং আওয়ামী লীগ যে এখনো বৃহৎ রাজনৈতিক দল তা শেখ হাসিনার কারণে। ৭৫ থেকে ৮১ পর্যন্ত বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা অবলোকন করেছেন তারা আমার সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই মনে করি। যদি সে কাল রাতে (১৫ আগষ্ট ১৯৭৫) বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যদের সাথে শেখ হাসিনা ও রেহানাকেও হত্যা করা হতো তাহলে আজ ‘আমার সোনার বাংলা’ বদলে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ গাইতে হতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো এক একটি ওয়াজিরিস্তানে পরিণত হতো। এছাড়া শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আগমন আকস্মিক হলেও অসম্ভব ছিল না। কারণ তিনি দেশের একটি অন্যতম রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। নিজে অল্পসময়ের জন্য হলে ও ছাত্র রাজনীতি করেছেন। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতো অবিস্মরণীয় ও অনন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তির কন্যা হিসেবে কিছুটা দীক্ষা হলেও পেয়েছিলেন।
সে হিসেবে শেখ হাসিনার রাজনীতিকে উত্তরাধিকারের রাজনীতি বলে একেবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা সঙ্গত হবে না। বরং কিছু ভুল-ভ্রান্তি ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন ও চারদশকের কলঙ্ক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে শেখ হাসিনা একজন দক্ষ রাষ্ট্র নায়কের পরিচয়ই দিয়েছেন। যারা এতকাল বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আওয়ামী লীগ করতে পারবে না বা করবে না, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে না বা তার সবটাই শেখ হাসিনার সরকার করে দেখিয়েছেন। এবং এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অবস্থান ও আন্তরিকতাই ছিল প্রধান। যারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন না, বিএনপি ও জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগকেই বেশি গালাগাল করেন, তারাই কিন্তু আবার আওয়ামী লীগকে দিয়েই সকল জঞ্জাল পরিষ্কার করিয়ে নিতে চান।
আওয়ামী লীগে অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। অনেক গডফাদার, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, দুর্নীতিবাজ আছে। আওয়ামী লীগে যুবলীগ-ছাত্রলীগের মতো রাজনৈতিক টিউমার আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার অন্যদিকে জামায়াত-হেফাজত ও জঙ্গিদের ঠেকানোর মতো রাজনৈতিক সামাজিক শক্তিও আছে তাতেও সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এই মুহূর্তে দেশে তৃতীয় কোনো শক্তির উদ্ভব হয়নি যারা বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মোকাবেলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমার অনেক বন্ধুরা অভিযোগ করেন তৃতীয় ধারা আওয়ামী লীগই তৈরি হতে দেয়নি। কী বালখিল্য কথা! গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান কি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে পেরেছিল? আর যদি আওয়ামী লীগ গণজাগরণ মঞ্চকে শেষ পর্যন্ত গ্রাসই করে থাকে তবে তৎপরবর্তী সময়ে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন করে চাঙ্গা হলো না কেন? সমস্যাটি আওয়ামী লীগের না কি বামপন্থি সংগঠন বা তৃতীয় ধারা তৈরির কারিগরদের। আওয়ামী লীগের প্রতি বিরক্ত হয়ে জনমত বিএনপি’র দিকে ঝুঁকবে কেন? তৃতীয় ধারা তা কাজে লাগাতে পারলো না কেন? আওয়ামী লীগ-বিএনপিতো নিজেরা তাদের অবস্থান ছেড়ে দেবে না। অন্যদের তা দখলে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য দলগুলোর দুর্বলতার জন্যও কি আওয়ামী লীগ দায়ী!
আওয়ামী লীগ পুরনো ও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এই দল জাতিকে অনেক কিছু অর্জন করে দিয়েছে। আর বৃহৎ ও পুরনো হওয়ার কারণে এই দলে অনেক সুবিধাবাদী, লুটেরা উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীর সমাহার ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে যদি জয়ের মতো একজন তরুণ, সৎ ও শিক্ষিত রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর নেতৃত্বে যদি দল গতি পায়, দিক নির্দেশনা ও সঠিক পথের সন্ধান পায় তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না। বরং নতুন যুগের সাথে, সময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজাতে অর্থাৎ যুগোপযোগী করে তুলতে সজীব ওয়াজেদ জয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি যাদের আবেগ এখনো অটুট তাঁদের কাছে জয়ের নেতৃত্ব অধিকতর গ্রহণীয়ই হবে-পরিত্যাজ্য নয়।
দুভাগে বিভক্ত জাতির সামনে দু’শিবিরের নেতৃত্বের চিত্রটি তুলে ধরতে চাই পাঠকদের সামনে। এর একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- শেখ হাসিনা- সজীব ওয়াজেদ জয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান- বেগম খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া। গত বিএনপি জামায়াত জোটের পাঁচ বছরে তারেক জিয়ার রাজনীতির চিত্র আমরা দেখেছি। এখন সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতি দেখার পালা। পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক সততার কথা আজ নাইবা তুললাম। জয়ের আগমনে বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতির নব উত্থান ঘটুক। তা-ই প্রত্যাশা করি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন