দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল, আজ, কাল
২৪ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২ রজব ১৪৩৩ হিজরি
২৪ মে বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯ সাল ২ রজব ১৪৩৩ হিজরি
অনেক আগে লেখা আমার একটি ছড়া, এই আসে বাতি এই চলে যায়/ চলে যায় বুঝি শরমে,/ আমরা ক’জন থাকি খালি গায়/ চালভাজা হই গরমে।/... বিদ্যুৎহীন থাকি নিশিদিন/ দুঃখ বোঝেনা পিডিবি,/ শুনে বলে তোরা পাবি ঠিক তবে/ বেশি বেশি করে ফি দিবি।/ ছড়ার শেষের পংক্তিটা ঈষৎ পরিবর্তন করেছি, কারণ সরকার এখন বিশেষ দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় বেশি দামে লোডশেডিংহীন বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ওপর লোডশেডিং এর ভার আরও কত বাড়বে তার হিসাব কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ কিংবা সরকার এখনো দেয়নি। যদিও পুরোদেশ লোডশেডিংএর নামে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহীন। আসলে বিদ্যুৎ সমস্যা কতটা প্রকট তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম ক’দিন আগে গ্রামে গিয়ে। আমাদের গ্রামের বাড়ি রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে ছিলাম গত বৃহস্পতিবার হতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা গ্রামে অবস্থান করে দেখলাম গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকে প্রকৃত পক্ষে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মতো। শহরের প্রায় উল্টো। শহরে লোডশেডিং হয় ৪ থেকে পাঁচ ঘণ্টা আর গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকেনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা। গ্রামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে অনেকে অভিযোগ করেছেন, নামাজের সময়ে লোডশেডিং নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে বলে তাদের অনেকের অভিযোগ রমজান মাসে সেহরীর ও ইফতারের সময় লোডশেডিং অবধারিত। অভিযোগকারীদের মধ্যে অনেকে এমনও প্রসঙ্গ তুলেছেন যে, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, বা হিন্দু সমর্থিত দল বলে প্রমাণ করার জন্যে পল্লী বিদ্যুতের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সময়ে লোডশেডিং এর নামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তাদের অভিযোগ বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করে তুলবার অপচেষ্টায় সরকারের ভিতরের কিছু লোক এমন দুষ্কর্ম করে চলেছে। বিষয়টি কতটা সত্যি আমি জানিনা তবে বোরো মৌসুমের ধানকাটা হয়ে যাওয়ার পরেও এই দুঃসহ গরমে এমন লোডশেডিং গ্রামের মানুষের জীবনকে সত্যিই যে দুর্বিষহ করে তুলছে তা সচক্ষে দেখলাম। বিদ্যুৎ নিয়ে গত বিএনপি-জামাত জোটের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধান। মহাজোট ক্ষমতা গ্রহণের পর পর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সে ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর কারণ হিসেবে অনেকেই সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। দায়ী করছেন সরকারের ভুল নীতিকে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরার আগে বর্তমানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বা উৎপাদন, বণ্টন এবং এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করি। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত মেটানোর লক্ষে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে যেমন কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট, রেন্টাল প্ল্যান্ট ও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সহসা বিদ্যুৎ সরবরাহের আশায় এবং সে সময়ে দেশে গ্যাস সংকটের কথা বিবেচনা করে সবকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয় তেল চালিত পদ্ধতির। যে সময় তেল চালিত এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল সে সময়ের তুলনায় বর্তমানে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। অন্যদিকে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরকার একবার ভর্তুকী দিয়ে তেল সরবরাহ করছে আবার সে কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি দামে কিনে কম দামে সরবরাহ করতে গিয়ে আরেকবার ভর্তুকী দিচ্ছে। এভাবে ভর্তুকীর পর ভর্তুকী দিতে দিতে এবং এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে তেল আমদানি করতে করতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েছে, অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে সরকার ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ নিয়েছে ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মোট কথা দ্রুত বিদ্যুতের সংস্থান করতে গিয়ে অন্যভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর বর্তমানে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে না পারায় বন্ধ রয়েছে অথবা পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক কেন্দ্র। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে সরকারের এমন চুক্তি রয়েছে যে, তেলের অভাবে কেন্দ্র বন্ধ থাকলে তার দায়ভার সরকারের অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও তাতে মালিকপক্ষের কোন ক্ষতি নেই। আমরা দ্রুত বিদ্যুৎ চেয়েছিলাম বটে তবে এমন রাষ্ট্রীয় ক্ষতি করে নয়। পিডিবি চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুসারে এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে নতুন করে তিন হাজার তিনশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর গত তিনবছরে ২২ লাখ গ্রাহককে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। মে মাসে তিনি তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের ট্যারিফ বৃদ্ধি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। সে সাথে তিনি আগামী ২০১৩ সালের মধ্যে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যদিও আমি বুঝতে পারছিনা বর্তমান বছরের প্রায় পাঁচ মাস গত হতে চললো বাকী আছে আর সাত মাস। এই অল্প সময়ের মধ্যে কী এমন আলাদিনের চেরাগ আছে যা দিয়ে পরিস্থিতি এমন রাতারাতি পাল্টে দেয়া যাবে। আমরা বরং জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন করতে পারি শুধু তেল নির্ভর কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতো আপদকালীন এই দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরে স্থায়ীভাবে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা আপনি করতে পেরেছেন। বরং বিদ্যুৎ উপদেষ্টার বিভিন্ন পদক্ষেপে তাকে অপরিনামদর্শী কিংবা অযোগ্য বলেই জনগণের মনে হতে পারে। নতুন সংযোগের ফলেই শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে তা কিন্তু নয়। পুরোনো বিদ্যুৎ সংযোগেই তো প্রতি দিন, প্রতি ঘণ্টা এমন কি প্রতি মিনিটে বেড়ে চলেছে বিদ্যুৎ চাহিদা। সরকার বা সচেতন একজন নাগরিক মাত্রই হিসেব করে দেখতে পারেন নতুন ফ্লাট, নতুন মার্কেট বা নতুন কোন কল-কারখানা বা ফ্যাক্টরি ছাড়াও প্রতিদিন যে হাজার হাজার টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ইস্ত্রি বা এমন ধরনের বিদ্যুৎ চালিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে তার বিদ্যুৎ খরচতো পুরনো সংযোগেই ঘটছে বেশি। তার মানে প্রতিদিন বা প্রতিঘণ্টায় মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আগামী ২০ বছরেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারের শেষের দিকে এসে বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর চাপে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আরও বাড়বে সন্দেহ নেই। তার ফলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার নতুন যে নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে তাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে কিনা তা নিয়ে আশংকা আছে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম যদি বাড়াতেই হয় সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু পরামর্শ আছে। যা সরকার চাইলে বিবেচনা করতে পারে। এক্ষেত্রে গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কিছুটা রেহাই দেয়ার কৌশল হিসেবে কয়েকটি ধাপে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন, ৫০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্যে সর্বনিম্ন দাম নিধারণ, এরপর ৫০ থেকে ১০০ পর্যন্ত, ১০০ থেকে ২০০ পর্যন্ত ২০০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত ৪০০ থেকে ৬০০ এমন করে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ওপর বেশিদাম বসিয়ে গরীব ও নিম্ন বিত্ত মানুষদের কিছুটা রেহাই দেয়া যেতে পারে। যে সব পরিবার শুধুমাত্র বেঁচে থাকার মত করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তার সাথে এসি, মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন ও লিফ্ট ব্যবহারকারীদের এক কাতারে ফেলা বা একই দামে বিদ্যুৎ বিল আদায় করা সমীচিন হবে বলে মনে হয় না। যেহেতু বড় লোকরাই মাথাপিছু বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করে সেহেতু সবচেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা উচিৎ তাদের। বড়লোকদের আরাম আয়েশের জন্যে বিদ্যুতের ভর্তুকীর টাকা কেন বহন করতে হবে গরীবদের যারা বড়লোকদের একটি বাথরুমের বিদ্যুৎ খরচ করে মোটে। এক্ষেত্রে একাধিক সংযোগ বা একাধিক মিটারে বিদ্যুৎ বিল যেন ভাগ হতে না পারে সেদিকেও কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারী প্রয়োজন। তবে যাই বলিনা কেন, ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণ দিন দিন হতাশই হচ্ছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম মহাজোটের সংসদ সদস্যগণ তাদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ তথা তাদের ভোটারদের জবাব দেয়ার মত কোন অজুহাত তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। পরিস্থিতিটি ভীষণ তাৎপর্যময়। নির্বাচনের অন্যতম প্রতিশ্রুতি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সামান্যতম উন্নতি না ঘটিয়ে ভোটারদের প্রশ্নের জবাব দেয়াও আসলে সম্ভব নয়। তবে এক্ষেত্রে ভাল অবস্থানে আছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা। কারণ যেহেতু তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধি নন সেহেতু জনগণের কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজনও তার নেই। নির্বাচন এলে এই সাংসদ বা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের যেতে হবে জনগণের কাছে তখন এসব উপদেষ্টাদের ভূমিকা কী হবে তা আগাম কল্পনা করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিই বিএনপি-জামাত জোটের পতনের অন্যতম কারণ ছিল আগামী নির্বাচনে সেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মহাজোট তথা আওয়ামী লীগকে ডোবাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই গেলো।
লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন