পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১২

* নিখোঁজ ইলিয়াস, তিন দিনের হরতাল আর জাতির সাথে বজ্জাতি

দৈনিক আজাদী                             উপসম্পাদকীয়                      কাল, আজ, কাল

২৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ১৩ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৩ হিজরি


কামরুল হাসান বাদল

তিন দিনের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। এর মধ্যে ইলিয়াস আলীকে ছেড়ে না দিলে বৃহস্পতি ও শনিবার জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ সমাবেশ রবিবার পূনরায় ঘোষিত হবে আবার কঠোর কর্মসূচি। বেশ ভাল কথা, ভাল দাবি, যৌক্তিক দাবি এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন কর্মসূচি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু গত তিন দিন কী হলো দেশে, প্রাথমিক কোন আন্দোলন, কর্মসূচি বা নিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন না করে প্রস্তুতিবিহীন জাতিকে হত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, আতংক আর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে পর পর তিনদিন হরতালে অবরুদ্ধ করে কী অর্জিত হলো বিএনপির। তারাতো ইলিয়াস মুক্তি আন্দোলন আবার প্রথম থেকে শুরু করতে যাচ্ছে। আসলে ইলিয়াসের মুক্তির (!) বিষয়ে বিএনপির আন্দোলন এভাবেই শুরু হওয়া উচিৎ ছিল। রাত ১২টায় নিখোঁজ সংবাদের পরপর সিলেট-ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিএনপি যেভাবে অতি দ্রুততার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যেভাবে জ্বালাও পোড়াও ভাংচুরে নেমেছে তা কিছুটা সন্দেহজনক, রহস্যময়। তাদের প্রস্তুতি ও আচরণ দেখে যে কারোর মনে হতে পারে এসব পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া সম্ভব নয়। আর গত তিনদিন ধরে সারাদেশে বিএনপি-ছাত্রদল কর্মী সমর্থকদের তাণ্ডব দেখে মনে হলো ইলিয়াস আলী যে ঘরানার রাজনীতিবিদ তাঁর জন্যে বুঝি এমন মারদাঙ্গা প্রতিবাদ না হলে খেলা জমলো না। খেলার প্রসঙ্গ যখন উঠলো তখন আগেভাগেই বলে দিতে চাই ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যে পক্ষই খেলুক, সে খেলা বড় নোংরা খেলা, এ খেলা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্যে কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না, বরং এ ডার্টি গেম এর খেসারত দিতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। ইলিয়াস আলী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি, যার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে অস্ত্র ও মাস্তানীর মাধ্যমে। সিলেটের বিএনপি রাজনীতিতে ইলিয়াস আলী এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ের নাম। বিএনপি স্থায়ী পরিষদ সদস্য এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও মরহুম সাইফুর রহমান অসহায়ের মতো খালেদা জিয়ার কাছে অনেকবার নালিশ করেছেন। ইলিয়াসের বিরুদ্ধে। সাইফুর রহমান মারা গেলেও এই বিরোধ প্রশমিত হয়নি, (এখন) সাইফুর রহমানের পুত্র (এই) গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শমসের মবিন চৌধুরীর সাথেও ইলিয়াসের সুসম্পর্ক নেই বলে শোনা যায়। ইলিয়াস আলী নিষ্কলুশ রাজনীতিবিদ নন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সিলেটে তাঁর হাতে এমন গুম, খুন ও সন্ত্রাসের অভিযোগ ছিল বিস্তর এবং তিনি জাতীয় রাজনীতিতে এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও নন। তবু তাকে কেন, কারা উঠিয়ে নিয়ে গেল, লুকিয়ে রাখা হলো, এবং সে কারণে তড়ি ঘড়ি করে তিন দিনের হরতাল পালিত হলো তা নিয়ে দেশের জনগণ মস্ত ধাঁধায় পড়েছে আর এই ধাঁধা ও কৌতূহলকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম আর উড়ো গুজব। প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে চলা এ ঘটনা নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। মধ্যরাতে ইলিয়াস শুধু ড্রাইভার নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন। ঘটনার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার মোবাইলে কার কার সাথে কথা হয়েছিল তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পুলিশ দিচ্ছে না কেন? সর্বশেষ কার সাথে কথা হয়েছিল? মধ্যরাতে নিখোঁজ হওয়ার পর সকালেই তাঁর স্ত্রী বলে বসলেন তাঁর স্বামীর লাশ হলেও ফেরত চাই। বিএনপি কীভাবে নিশ্চিত হলো ইলিয়াসকে সরকার বা র‌্যাব উঠিয়ে নিয়ে গেছে, এবং সে সাথে তারা কীভাবে নিশ্চিত হলো ইলিয়াস বেঁচে আছেন আন্দোলন কঠোর হলে কিংবা পর পর হরতাল দিলে সরকার তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। খালেদা জিয়াতো স্পষ্ট করে বলেছেন ইলিয়াসকে নিয়ে গেছে র‌্যাব। তবে তার অর্থ এই যে, বিএনপি জানে ইলিয়াস বেঁচে আছে আর বেঁচে আছে জানলে কোথায় বা কাদের হেফাজতে আছে তা-ও জানার কথা। বারবার ছেড়ে দেয়ার দাবির মধ্য দিয়ে তাই প্রমাণিত হয়। দু’দিন পরে ইলিয়াসের স্ত্রী র‌্যাবকে খবর দিয়ে নিজে সহ পুবাইলে ইলিয়াসের খোঁজে গিয়েছিলেন। রাতে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করার পর তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেন এবং শয্যাশায়ী হয়ে থাকলেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক মিডিয়াকে বলেছেন ইলিয়াস বেঁচে আছে, তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, মিডিয়ার কর্ম তৎপরতা কমলে তাকে ছেড়ে দেয়া সহজ হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন খালেদা জিয়াই তাকে লুকিয়ে রেখে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে কিছু শর্ত মানলে ইলিয়াসকে ছেড়ে দেয়া হবে। বিএনপি কিছু মেনেছে কিছু মানতে নারাজ। ইলিয়াস ইস্যু নিয়ে বিএনপিকে অতিমাত্রায় সক্রিয় হতে দেখা গেলো অতীতে যা কখনো হয়নি। বিভিন্ন দূতাবাসে, দেশে নালিশ করা, বিদেশে তাদের দলের তাৎক্ষণিক কড়া প্রতিবাদ ইত্যাদি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের অর্থ কেলেংকারী ঘটনায় গাড়ির ড্রাইভারের সাথে ইলিয়াস বা তার গাড়ির ড্রাইভারের যোগাযোগ সূত্র। ইলিয়াসের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতাকে আটক করে সরকার বিএনপিকে কোন কোন শর্ত মানাতে চায় এবং কী সেই শর্ত? গায়ে পরে কেন সরকার দেশকে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের দিকে ঠেলে দেবে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কি জানা যাবে? জানা যাবে যদি ইলিয়াস কখনো ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইলিয়াস কি আদৌ ফিরে আসবে? বর্ষিয়ান সাংবাদিক এ বি এম মুসা একটি টক শো’তে বলেছেন, তা সম্ভব নয়। কারণ ইলিয়াস ফিরে এলে বাংলাদেশের দু’শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার যে কোন একজন মিথ্যা বলেছেন বলে প্রমানিত হবেন। এ বাস্তবতা কি বাংলাদেশে সম্ভব? গুম, গুপ্তহত্যা কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশের সংস্কৃতি হতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে এই মানবতাবিরোধী কাজ ভবিষ্যতের জন্যে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা জানি আওয়ামী লীগের অধিকাংশ মন্ত্রী, এমপি ও নেতৃবৃন্দ বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একথা উল্লেখও করেছেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কেন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যে গণতন্ত্রের জন্যে এ ঘটনা যে ভীষণ উদ্বেগজনক তা যে কোন রাজনীতিবিদ হতে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষও মনে করে। ব্যক্তিগতভাবে ইলিয়াসকে পছন্দ করার আমার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তাই বলে তাঁর এমন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারি না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে জনগণকে দেয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখনও পূর্ণ করতে পারেনি। দূর হয়নি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা। কমেনি দ্রব্যমূল্য দমন করা যায়নি দুর্নীতি। যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের বিষয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সংশয় এমন অবস্থায় এবং নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর খানেক আগে এসব ঘটনা চরম অদূরদর্শীতা ও বোকামীর পরিচায়ক। সম্ভবত আওয়ামী লীগ বাস্তবতা বুঝতে ক্রমশ অক্ষম হয়ে উঠছে, নতুবা সরকারের ভিতর দ্বিতীয় আরেকটি সরকার সক্রিয় হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি সম্পন্ন করার জন্যে। বলা হয়ে থাকে যে কোন সরকারের শেষের বছরে পুলিশ ও জন প্রশাসন মূলত বিরোধী দলের জন্যেই কাজ করে থাকে, এ সরকারের আমলে বুঝি এ তৎপরতা অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। যদি ইলিয়াসের এই ঘটনা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কোন ধরনের দরকষাকষির বিষয় হয়ে থাকে এবং গত তিন দিনের হরতাল, হত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর আর রাষ্ট্রের ও জাতির অর্থনীতির বিপুল ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে তবে তা কারুর জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না। এ নোংরা খেলার জন্যে জাতির সাথে বজ্জাতির জন্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জনতার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। একদিন অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। শ্রীজাতের একটি কবিতা দিয়ে শেষ করবো লেখাটি, 

লেখক: কবি, সাংবাদিক,কলামলেখক।
Email:qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ