পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১২

* তবে কে যাবে লংকায়?

দৈনিক আজাদী                                  উপসম্পাদকীয়                                 কাল, আজ, কাল

১৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি.৬ বৈশাখ ১৪১৯ সাল ২৬ জমাদিউল আওয়াল ১৪৩৩ হিজরি

কামরুল হাসান বাদল

গত বছরের ১ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদীর এই পাতায় একটি কলাম লিখেছিলাম। তার ক’দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করে দু’জন রাজনীতিককে মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন সে সাথে ড. হাছান মাহমুদকে প্রতিমন্ত্রী হতে পূর্ণ মন্ত্রীর পদোন্নতি দিয়েছিলেন। আমি সে লেখায় বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভায় আরো অভিজ্ঞ, পুরোনো, ত্যাগী নেতার স্থান পাওয়া উচিত ছিল, বাংলার মানুষ যারা দেশ ও আওয়ামী লীগের শুভার্থী তাদের প্রত্যাশাও তাই। লেখার শিরোনাম ছিল “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানুষ হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল”। মানুষকে বিভিন্ন কারণে যেমন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে গিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় অধিকতর দক্ষতার পরিচয় দিতে মন্ত্রীসভার রদবদল ও বর্ষীয়ান ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্তি চায় আমি সে কথাটিই তুলে ধরবার চেষ্টা করেছিলাম। যদিও জানি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় আমার মত এক নগণ্য ব্যক্তির কোনরূপ আবেদন নিবেদনই কোনদিন প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে না। এক সময়ের বামপন্থী রাজনীতিক, সাতবারের নির্বাচিত সাংসদ, (৭০ ও ৭৩ এর আওয়ামী লীগের প্রবল গণজোয়ারের সময়েও) অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান গত শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করায় আমি প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম, বলেছিলাম আরও যে ক’জন অভিজ্ঞ নেতা আছেন তাদের মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে জাতির সেবায় কাজে লাগানোর। মন্ত্রী হওয়ার আগে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বিভিন্ন মঞ্চে বা ফোরামে যুদ্ধাপরাধ, বিরোধীদল ও খোদ নিজ দলের মন্ত্রীসভা নিয়ে জোরালো ও তীর্যক বক্তব্য রেখে প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়ে থাকতেন। গত ২৮ নভেম্বর মন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, তিনি সততার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর সততা নিয়ে গত ৯ এপ্রিল পর্যন্ত কারো কোন প্রশ্ন ছিল না। তিনি রেলে দুর্নীতির ‘কালো বিড়াল’ এর কথা বলেছিলেন মানুষ তা বিশ্বাস করেছিল, রেলের দুর্নীতি কমবে বলে আশা করেছিল এবং কিছু কিছু ইতিবাচক ধারা লক্ষ্যও করা যাচ্ছিল। কিন্তু গত ৯ এপ্রিল মধ্যরাতের কাছাকাছি সময় তাঁর গাড়িতে বস্তাবন্দি ৭০ লক্ষ টাকাসহ তাঁর এপিএস আটক হওয়ার পর থেকে দ্রুত সবকিছু পাল্টাতে থাকে। এ ঘটনার পরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যতবারই সাংবাদিক বা মিডিয়ার সামনে এসেছেন ততবারই তাঁকে বিব্রত, পর্যুদস্ত ও ভেঙে পড়া মানুষ বলে মনে হয়েছে। তাঁর সাহসদীপ্ত দৃঢ়তা আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মত মোক্ষম শব্দের বাক্যবান আর তাঁর কাছ থেকে শোনা যায়নি। এক সময় তিনি নিজেই বলে ফেলেছিলেন, ‘আমি অন্যরে তীর ছুড়তাম আর অহন আমারে ছোড়ে।’ সততার সাহস নিয়ে এতদিন যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কথা বলতেন এ ক’দিন তাঁর মধ্যি তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। যাক গত সোমবার তিনি পদত্যাগ করেছেন, তবে তার আগের রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়ে তাদের মধ্যে কী ধরনের আলাপ হয়েছে তা আমরা কেউই জানি না। তাঁর পদত্যাগ একটি ভালো সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টান্ত। এখন অন্তত তদন্তকে প্রভাবিত করার মত অভিযোগ সহজে কেউ করতে পারবেন না। বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রায় অর্ধ শতকাল তিল তিল করে যে ব্যক্তিটি তাঁর একটি রাজনৈতিক ইমেজ তৈরি করেছিলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ও তাদের অনুসারী লেখক বুদ্ধিজীবীরাও যাঁর সম্পর্কে বলার আগে দু’দণ্ড ভেবে নিতেন, এমন এক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক মৃত্যু আমরা চাই না। আমরা চাই না রাজনীতির এই দুঃসময়ে প্রকৃত রাজনীতিকরা যখন ক্রমশ কোণঠাসা, অবহেলিত, নিগৃহিত ও অপমানিত হচ্ছেন এখন তাঁর মত এক বর্ণাঢ্য রাজনীতিকের বিদায়। এই ঘটনা কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করছে, তা দূর করা প্রয়োজন। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? এতদিনের বিশ্বস্ত গাড়ি চালক কেন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? এতরাতে বিজিবি হেড কোয়ার্টারে আগে থেকে অবহিত না করে একটি পাবলিক মাইক্রোবাস ঢুকে গেল কীভাবে? মন্ত্রীর এপিএস ফারুক তালুকদারের নিয়োগ হয়েছিল কীভাবে? দুর্নীতির মাধ্যমে বা আয় বহির্ভূত এত সম্পদের মালিক তো সে মাত্র গত সাড়ে চার মাসে হয়নি? রেলের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক একজন দুর্নীতিবাজ ও কট্টর বিএনপি সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এত দাপট ও মন্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্ক গভীর হলো কীভাবে? কার বা কাদের স্বার্থে ও প্ররোচনায় বর্তমান ডিজি আবু তাহেরকে সরিয়ে তাঁকে ডিজি পদে পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া চলছিল? তবে কি কালো বিড়াল তাড়াতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়ে সুরঞ্জিত বাবু নিজেই কালো বিড়ালে পরিণত হলেন? তবে কি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এতদিনের চলে আসা দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন আর লুটপাটের হোতাদের ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন? পূর্বাঞ্চলীয় রেলের মহাব্যবস্থাপকরা চট্টগ্রামের সিআরবিতেই অফিস করেন তবে তাঁদের পরিবার ঢাকায় থেকে বিলাসী জীবন যাপন করেন যা রেলের সবাই ছাড়াও রেলের সাথে সংশ্লিষ্টরা ভালই জানেন। মাঝে মধ্যে রেলের জি.এমের বাংলোয় ডাকাতির ঘটনা স্থানীয় পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়ে থাকে। বছর দুয়েক আগে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ডাকাতি হওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়লে জি.এমের পক্ষ থেকে পুলিশকে ডাকাতি হওয়া অর্থের পরিমাণ বলা হয়েছিল তিন লাখ, আর পুলিশের কাছে ধরা পড়া ডাকাতরা স্বীকারোক্তি দিয়েছিল ১২ লাখ টাকা ডাকাতি করেছিল বলে। প্রচলিত আছে কোন্‌দিন রেলভবনে টাকা জমা হয় তার সংবাদ প্রায়ই ডাকতরা পেয়ে থাকে আর অনেক সময় এসব ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় অর্থের উৎস গোপন করার স্বার্থে। রেলে কী পরিমাণ দুর্নীতি হয় তা লিখতে গেলে কয়েক খণ্ড মহাভারত হয়ে যাবে। যুগ যুগ ধরে গেড়ে বসা দুর্নীতিবাজ এ চক্রকে সুরঞ্জিত বাবু কি একটু নাড়া দিতে পেরেছিলেন? ফলে এই দুষ্টু চক্রের প্রলোভনে পড়ে এ ধরনের দুর্নীতিতে অনভ্যস্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পুরো ব্যাপারটিকে ঠিকমতো ‘হ্যান্ডল’ করতে না পেরে গুবলেট করে ফেলেছেন? যাক সত্য একদিন বেরিয়ে আসবে এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হবে বলে বিশ্বাস করি। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দুর্নামের দায় কেন হাজার হাজার নিরাপরাধ কর্মকর্তা কর্মচারীরা বহন করবে? এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভূমিকাটি একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ঘটনার পরদিন থেকে বিএনপির নেতানেত্রীগণ মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন, বিশেষ করে ব্যারিস্টার মওদুদ ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নিয়ে মওদুদ সাহেব যখন ব্যঙ্গ করছিলেন তখন হয়ত তিনি ও তাঁর দলের অনুসারীরা ভুলে গিয়েছিলেন মওদুদ সাহেবের নামে কয়টি দুর্নীতির মামলা হয়েছিল আর মামলাগুলো কীভাবে প্রত্যাহার হয়েছিল। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তাঁর বক্তব্যে একবার বলেছেন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিৎ, আবার পদত্যাগ করার পরে বলেছেন তিনি (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) ভেবেছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তা হয়নি। মির্জার আরেকটি বক্তব্য ‘‘এই মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো এই মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সরকার দুর্নীতিবাজ অতএব এই সরকারের পদত্যাগ করা উচিত।’’ মন্ত্রীর পদত্যাগের পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশিষ্ট জনেরা যখন মন্তব্য করলেন এই পদত্যাগ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত, কেউ কেউ লিখলেন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই-ই প্রথম এখন তার প্রতিক্রিয়ায় মির্জা সাহেব বললেন, তাঁদের দলের শামসুল ইসলাম, এরশাদের বান্ধবী জিনাত মোশাররফের স্বামী তৎকালীন জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন (যিনি নাইকো থেকে কোটি টাকা দামের গাড়ি নিয়েছিলেন ঘুষ হিসেবে) এরাও পদত্যাগ করেছিলেন। এখন এই বক্তব্যগুলো খণ্ডনের জন্যে’ বলতে হয়, প্রধানমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রক্ষা করার চেষ্টা না করে যদি পদত্যাগ করতে বলে থাকেন তাতে শেখ হাসিনার দৃঢ়তা বাড়লো না কমলো? দুর্নীতিকে কি তিনি প্রশ্রয় দিলেন? যদিও বিষয়টি তদন্তাধীন। আর দুর্নীতির অভিযোগে কোন মন্ত্রী পদত্যাগ করলে যদি পুরো সরকারকেই পদত্যাগ করতে হয় তবেতো যুক্তরাজ্য সরকারকে অনেক আগে পদত্যাগ করে বাড়ি ফিরতে হতো, সেভাবে জাপান ও পার্শ্ববর্তী ভারতের মনমোহন সরকারকে বর্তমানে রাজপথে থাকতে হতো। মির্জা সাহেবদের মন্ত্রিসভা থেকে যখন শামসুল ইসলাম বা মোশাররফ হোসেন পদত্যাগ করেছিলেন তখন কি খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগ করেছিল? এককালের সমাজতন্ত্রী, গণমানুষের রাজনীতি করা মির্জা ফখরুলদের মুখে এমন বালখিল্য বক্তব্য শুনে তাদের এই পতন ও পচনের জন্যে শুধু করুণা করতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক হাওয়া ভবনের দুর্নীতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা দীর্ঘকাল লজ্জার অধ্যায় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনীতি, ক্ষমতা আর প্রশাসনে এমন কি ‘সিস্টেম’ প্রচলিত আছে যার সংস্পর্শে এলে যে কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন? এমনকি অর্ধশতকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন যার, এটি কি এমন একটি বৃত্ত যা ভাঙা যায় না বরং জড়িয়ে যেতে হয়। ওখানে গেলেই যদি রাবণ হতে হয় তবে ভবিষ্যতে ভালো মানুষদের সৎ মানুষদের মধ্যে কে যাবে লংকায় ? 

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক 
Email-qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ