পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১২

* মিনার মাহমুদ, আত্মহত্যা কিংবা একটি হত্যাকাণ্ড

দৈনিক আজাদী                           উপসম্পাদকীয়                       কাল, আজ, কাল

৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২২ চৈত্র ১৪১৮ সাল ১২ জাদিউল আওয়াল ১৪৩৩ হিজরি



১। প্রাকলিখন -  দেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে খুলনা-মংলা তখন চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য। দেশের বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিকের কনিষ্ঠতম রিপোর্টারের ওপর এর এসাইনমেন্ট। বন্ধু এবং পরিচিত জনদের সহযোগিতায় মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি এখন শুধু একটি ছবি, চোরাচালান পণ্যের অবাধ বিপণনের। কিন্তু মুশকিল হলো ক্যামেরা কাঁধে ওসব এলাকায় প্রবেশ তো দূরের কথা সাংবাদিক পরিচয় ফাঁস হলেই অক্ষত ফিরে আসা দুষ্কর। পকেটে ক্যামেরা নিয়ে প্রতিবেদক ঢুকে গেলেন সবচেয়ে সুসজ্জ্বিত একটি দোকানে। হাবাগোবা তরুণের মত দোকানির কাছে ক্যামেরা চালানোর ব্যাটারি কিনতে চাইলে বিক্রেতার সম্মতি, আর বোকাসোকা ক্রেতা ক্যামেরায় ব্যাটারি লাগিয়ে নিষ্পাপ প্রশ্ন করে “দেখতো ফ্লাশ জ্বলে কি না? দোকানির সম্মতিতে দুতিনবার ফ্লাশ জ্বলার সাথে সাথে মূল্য পরিশোধের পরে বোকা ক্রেতার ঝটিকা স্থান ত্যাগ। এরপরে সোজা ঢাকার বাস, দুদিন পরে বিচিত্রায় সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হলে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সে এলাকা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদক তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ণ্ডয়া সাপ্তাহিক বিচিত্রার তরুণ তুর্কী, দুর্বিনীত প্রতিবেদক মিনার মাহমুদ। ২। ১৯৮৭ সাল, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ক্রমেই পরিণতির দিকে এগুচ্ছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে যায় যায় দিন। সে বছরে ১০ জুন মিনার মাহমুদের সম্পাদনায় বেরুলো সাপ্তাহিক বিচিন্তা। যায় যায় দিনের মত নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপানো ছাড়া এ যাবৎ কালের আর কোন পত্রিকার চরিত্রের সাথে মিল থাকলো না এই পত্রিকার। প্রতিবেদনের বিষয়, ভাষা, শব্দচয়ন, সম্পাদকীয় আর তারুণ্যের অপার সাহস আর সততা দিয়ে প্রতি সপ্তাহে এই পত্রিকা ভাঙ্গতে থাকলো তার নিজের সার্কুলেশনের রেকর্ড। বিচিন্তা, তার সম্পাদক আর প্রতিবেদনগুলো হয়ে উঠলো সামাজিক ঘটনা, তরুণদের আড্ডার প্রধান আলোচ্য বিষয়। ১৯৮৮ সাল, চট্টগ্রাম লালদীঘির মাঠে শেখ হাসিনার সমাবেশ। এরশাদের নির্দেশে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদার লেলিয়ে দেয়া বর্বর পুলিশ বাহিনী গণহত্যা চালায়। বিচিন্তার পরবর্তী সংখ্যায় প্রধান কভার স্টোরি, ‘নিরোর বাঁশি’ প্রতিবেদক শহীদুল ইসলাম বাচ্চু, তৎকালীন পূর্বকোণের সাংবাদিক, বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী। নিষিদ্ধ হলো বিচিন্তা, গ্রেফতার হলেন এর সম্পাদক মিনার মাহমুদ। ৩। নব্বই সালে এরশাদের পতন। বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদের অন্তর্বর্তী সরকার। দ্বিতীয়বার বের হলো বিচিন্তা, ১৯৯১ এর ১০ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ বছর স্বৈর শাসনের পর একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বপ্নবান তারুণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠলো বিচিন্তা। স্ট্যাচু অব লিবার্টির চোখে কাপড় বাধা, তার নিচে লেখা ‘আমাকে দেখতে দাও, আমাকে বলতে দাও’, কিংবা ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ তার সাথে প্রতি সপ্তাহে উদ্বেলিত করা, উদ্দীপ্ত আর উজ্জ্বীবিত করা মোহময় সম্পাদকীয়। মিনার মাহমুদের সম্পাদকীয় অভিধানে লেখা যাবে না, বলা যাবে না-ধরনের কোন বাক্য বা শব্দবন্ধ ছিল না। প্রতিবেদকরা ছিলেন স্বাধীন। এ সময় প্রতিবেদক অম্লান দেওয়ান লিখলেন, শ্রীকৃষ্ণ এক লম্পট অবতারের প্রতিকৃতি’ বলা বাহুল্য অম্লানের বাড়িও চট্টগ্রামে। এ প্রতিবেদন প্রকাশের সাথে সাথে সারাদেশে একশ্রেণীর মানুষের প্রতিবাদ। ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর চট্টগ্রামে শ্রীকৃষ্ণ সেবক সংঘের একব্যক্তির দায়ের করা মামলা। ব্যাস, এক সপ্তাহে ঢাকায় হাজিরা পরের সপ্তাহে চট্টগ্রাম। আমি তখন জড়িয়ে আছি বিচিন্তায় সে সাথে বিচিন্তা পাঠক ফোরামের চট্টগ্রাম বিভাগীয় আহ্বায়ক। আমাদের পাঠক ফোরামের এক সদস্য ছিলেন আইনজীবী। এম আর হাসান। তাঁর সহযোগিতায় চট্টগ্রামে মামলা চালাই। আর ঘন ঘন মিনার মাহমুদের সান্নিধ্যে সময় কাটাই। ওনি তসলিমার সাথে তাঁর ভেঙ্গে যেতে বসা সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টাও চলতে থাকে। সে কারণে তসলিমা নাসরিনও দুদিন থাকলেন চট্টগ্রামে। মামলা নিয়ে ঝামেলা চালালেও হাসান ভাই শহীদুল ইসলাম বাচ্চু, এজাজ মাহমুদ, শোয়েব ফারুকীসহ অন্য বেশ কজন মানুষের উপস্থিতি, আড্ডা আর আলোচনায় সময়গুলো ভালই কাটছিল। এক সময় আপস মিমাংসায় চট্টগ্রামের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়, কিন্তু বিএনপি সরকার মিনারকে এত সহজে ছেড়ে দেয়ার মত বোকা নয় বলে মিনারের নিয়মিত হাজিরা চলতে থাকলো আদালত পাড়ায়। তসলিমা নাসরিন বিষয়ক জটিলতা, মামলা আর পত্রিকা চালিয়ে নেয়ার মত আর্থিক সচ্ছলতার অভাব ক্লান্ত করে পর্যটক ডানা। হাফিয়ে ওঠেন হয়ত এক সময়, ফলে স্বদেশ ত্যাগ-আমেরিকার প্রবাস জীবন। একটি ভিসা ম্যানেজ করার বিনিময়ে বিচিন্তা নিয়ে নিলেন কসমস এর এনায়েতুল্লাহ খান। এবং একটি সময় আপনা হতে বন্ধ হলো বিচিন্তা। ৪। ২০০৯, একটি রোদ ঝলমল সকালে মোবাইলের স্ক্রিনে একটি অপরিচিত নম্বর, হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, বাদল ক্যামন আছেন, আমি মিনার, এখন টেকনাফে আছি। সন্ধ্যায় মেরিডিয়ানে থাকবেন বাচ্চুকে নিয়ে। দীর্ঘ আঠার বছর পর দেখা, সঙ্গে এক নতুন মুখ। পরিচিত হতে গিয়ে জানলাম ডা. লুবনা, লাজুক। বর্তমানে মিসেস মিনার মাহমুদ। আমি ও বাচ্চু কিঞ্চিৎ বিস্মিত। পরের দিন আমার বাসায়, দীর্ঘদিন পর আড্ডা, আগের সেই স্বপ্নদীপ্ত, আশাবাদী আর উদ্যমী মিনার মাহমুদ। ২০১০ সালের প্রথম দিকে জানালেন আবার বের হবে বিচিন্তা, বললেন এনায়েত সাহেব আমাকে বিচিন্তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ১৮ বছরে অনেক বদলে যাওয়া বাংলাদেশে তৃতীয় বারের মত প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক বিচিন্তা। প্রকাশের প্রস্তুতিকালে হোটেলের রুমে বসে অনেক কথা বলেছিলেন একদিন, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল, দীর্ঘ চার দশক পরে দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ, দিন বদলের োগান আর প্রযুক্তি সচেতন তরুণদের নিয়ে ভীষণ আশাবাদী হয়ে আমেরিকার গ্রীনকার্ড উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রকাশের সময় পুরোনো তেমন ও যোগ্য কাওকে না পাওয়া, পত্রিকার কাটতি না হওয়ায় দিন দিন হতাশ হচ্ছিলেন তিনি। বিশেষ করে তাঁর হাতে গড়া সাংবাদিক আজ যারা বিভিন্ন মিডিয়ায় খুব ভালো অবস্থানে আছেন তাদের আচরণেও দারুণ ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি। গত বছর মার্চের দিকে অফিসে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন গুরুতর, সে চিকিৎসা ব্যয় ও ছিল প্রচুর। শারীরিক ও আর্থিক কারণে আবার বন্ধ হয় বিচিন্তা। যদিও বলেছিলেন তিনি এটিকে অনলাইন করার কথা। শেষ পর্যন্ত হয়নি। কতেক মাস আগে ফোনে বলেছিলেন, কেউ আমাকে চাকরি দিতে রাজি নয়, ঢাকার সাংবাদিকরা বোধহয় আমাকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাসখানেক আগে জানালেন আজকের প্রত্যাশায় অফার পেয়েছি, আপনি নিয়মিত লিখবেন, বললাম লিখবো, তবে আপনি দু এক মাস দেখুন কাজ করতে পারেন কিনা। দুর্ভাগ্য এক মাসের মধ্যে সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তারপর গত বৃহস্পতিবার, মিনারের ক্লান্ত ডানা ভেঙ্গে পড়েছে, শুক্রবার থেকে মিনার মাহমুদ দেশের সবকটি সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন, যার যে কোন একটিতেও তাঁর যোগ্য পদটি তিনি পাননি। সংবাদপত্রের এই তুর্কী তরুণ দেশকে পরিবর্তন করার আশায় স্বদেশে ফিরে মাত্র তিন বছরের মধ্যে মানুষ থেকে নামে পরিবর্তিত হয়ে গেলেন। সমাপ্তির পূর্বে: মিনার মাহমুদের আত্মহত্যায় আমি দু:খিত নই। নষ্ট রাষ্ট্রে, নষ্ট সমাজে, সংবাদ মাধ্যমের নষ্ট মানুষদের ক্রীতদাশ হয়ে প্রতিদিন বিবেকের সাথে আপস করে, মেনে নিতে নিতে একটু একটু মৃত্যুবরণ করার চেয়ে এ মৃত্যুও কম গৌরবের নয়। একজন সামান্য তিব্বতী তার শরীরে আগুন লাগিয়ে তার স্বাধীনতার কথা বলে যায়। একদিন তিব্বত যখন স্বাধীন হবে এই সামান্য আত্মাহুতিটাও বড় উজ্জ্বল ও প্রেরণা হয়ে উঠবে প্রতিটি তিব্বতবাসীর জন্যে। রাষ্ট্র সমাজ আর সংবাদপত্রের সুস্থ দিন যেদিন ফিরে আসবে। সংবাদ মাধ্যমগুলো যেদিন প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকদের হয়ে উঠবে সেদিন এই আত্মহত্যা আত্মত্যাগ হিসেবে লিখিত হবে বাংলাদেশের সুস্থ সংবাদ মাধ্যমের ইতিহাসে। সক্রেটিসদের আগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো, তাকে বাধ্য করা হতো হেমলকের বিষপাত্র মুখে তুলে নিতে। আজকাল সক্রেটিসদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না কিংবা বিষপাত্র মুখে নিতে বাধ্য করতে হয়না। রাষ্ট্র এবং সমাজ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যাতে সক্রেটিসরা নিজেরাই নিজেদের বিষ খুঁজে নিয়ে মরবে। যুগের সাথে, পরিস্থিতির সাথে, ভণ্ডামী আর হিপোক্রেসির সাথে মানিয়ে না নেয়া দৃঢ়, ঋজু মিনার মাহমুদ আপনাকে আমার লাল সালাম। 

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলামলেখক 
Email : qbadal@yahoo.com


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ