পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৩

' বেকায়দায় বিএনপি, অস্থিরতায় সরকার '

দৈনিক আজাদী                              উপসম্পাদকীয়                            কাল আজ কাল
-কামরুল হাসান বাদল

গত ১১ মে প্রকাশিত আমার একটি লেখার প্রতিক্রিয়া ছাপা হয়েছে দৈনিক আজাদীর চিঠিপত্র বিভাগে। জনৈক পত্রলেখক বেশ ক্ষুব্ধ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় আমাকে ব্যক্তিগতভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছেন। একজন নবীন লেখক হিসেবে হয়তো এরচেয়ে বেশি শালীনভাবে লিখতে তিনি অভ্যস্ত নন। তা যাক তারপরেও আমি ক্ষুব্ধ নইকারণ ‘আমাদের এলাকায় একটি গভীর নলকূপ চাই’ বা ‘আমাদের এলাকায় ব্যাংকের শাখা চাই’ এ ধরনের লেখার বাইরে তিনি অন্যকিছু লেখার চেষ্টা করেছেন। আমি পত্রলেখকের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। লেগে থাকলে তিনি লেখক হয়েও উঠতে পারেন। সীমিত লেখার পরিসর নষ্ট না করে মূল কথায় যাই।

গত সোমবার দেশের উচ্চ আদালতের একটি রায় বিএনপি’র জন্যে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্নেল তাহেরের পরিবারের পক্ষ থেকে করা উক্ত মামলার রায়ে মহামান্য আদালত বলেছেনজিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা বা ইচ্ছায় কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। আদালত কর্নেল তাহেরকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন সেই ট্রাইব্যুনালের সাথে জড়িতদের মধ্যে যে বা যারা জীবিত আছেন তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করতে। সে সাথে মহামান্য আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জিয়ার সম্পৃক্ততা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখতে বলেছেন।
৫ম সংশোধনী বাতিল রায়ের পর এই রায়টি বিএনপির জন্যে বড় একটি ধাক্কা। ঐ রায়ে জিয়াসহ সকল সামরিক শাসকের শাসনকে অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের গত সাড়ে চার বছরের শাসনামলে বিএনপি অনেক ইস্যু পেয়েছিল আন্দোলনের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যেতার কোনটিই বিএনপি কাজে লাগাতে পারেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে সামনের সারিতে সিট বাড়ানোর দাবিতে সেই যে বিএনপি সংসদ বর্জন শুরু করেছিল তা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বরং সংসদ বর্জনের কারণ বা সংসদে যোগ দেয়ার শর্তে নতুন নতুন দফা ও দাবি যোগ হয়েছে শুধু। গত চার বছরে সরকার বিরোধী আন্দোলনের অনেক ইস্যু পেয়েও বিএনপি কার্যত ফলপ্রসূ সরকার বিরোধী কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। শেয়ার বাজারডেসটিনিইউনি পে টু ইউহল মার্কস ইত্যাদি তার মধ্যে অন্যতম। দল হিসেবে বিএনপি’র এমন দুর্ভাগ্য যে তাদের প্রথম প্রথম বেশ কটি হরতাল আহ্বান করতে হয়েছিল শুধু নেত্রীর পরিবারের স্বার্থে। যার সাথে জনস্বার্থের কোনরূপ সংযোগই ছিল না।

অধিকন্তু একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিরোধীতা করে এবং এক পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের লাগাতার হরতালনৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে শর্তহীন সমর্থন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়াদল পরিচয়দানকারী বিএনপি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং একটি সময়ে বিএনপি পুরোপুরি জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে থাকে। গত ৪২ বছরের ইতিহাসে গণজাগরণ মঞ্চ এক অবাক বিস্ময়। দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ এদেশের বুকে আবার একাত্তরকে প্রতিষ্ঠিত করে পরম গৌরবে। প্রথম প্রথম বিএনপি’র পক্ষ থেকে কিছুটা নমনীয়ভাব দেখানো হলেও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার পুন:পুন মিথ্যাচার ও আক্রমণের প্রভাবে বিএনপি গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যদিও গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিলবর্তমান সরকারের ওপর সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকে। শাহবাগের তরুণরা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেখে ধরে নিয়েছিল জামায়াতের সাথে সরকারের কোন গোপন সমঝোতা হয়েছে।

এই গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিহত করতেই মাঠে নামানো হয় হেফাজতে ইসলাম নামক একটি ধর্মীয় সংগঠনকে। মূলত-জামায়াতের অর্থ আর বিএনপির পরামর্শই এই সংগঠনটি অতিদ্রুত সারাদেশে সংগঠিত হতে থাকে এবং অকস্মাৎ ’১৩ দফা’ বলে একটি দাবিনামা পেশ করে বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলে। তাদের এই ১৩ দফা দাবি মেনে নেয়ার সময়সীমা শেষ হলে হেফাজতে ইসলাম গত ৫ মে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়। ২ মে সংসদে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আলোচনার আহ্বান জানান বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে উল্টো সরকারকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বেঁধে দেন বেগম খালেদা জিয়া। মূলত হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধশাপলা চত্বরে গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে বিএনপি যে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছিল তা ৫ মে মধ্যরাতে যৌথবাহিনীর অপারেশনের কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। এই ঘটনায় এবং এই ঘটনার পরে রাজনৈতিক ভুল চালের জন্য দারুণ সমালোচিত হচ্ছে বিএনপি। হেফাজতের কাঁধে ভর করে সরকার পতনের পরিকল্পনা করা এবং শাপলা চত্বরের সমাবেশে যৌথবাহিনীর অপারেশনে কয়েক হাজার কর্মীর মৃত্যু ও নিখোঁজের দাবি এবং ঘটনার পর নিহতদের গায়েবানা জানাজার ঘোষণায় বিএনপি’র রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ছিল বলে অনেকে মনে করেন। সবশেষে বিএনপি সংসদের বাজেট অধিবেশনে যোগ দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে বিএনপি’র সংসদেই যাওয়া উচিত। সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত সংসদ। এমনকি আগামী নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে গঠিত হতে পারে এবং এই সরকার প্রধান কে হবেন তা সংসদে বসেই নিষ্পত্তি হোক এবং প্রয়োজনে এই আলোচনা পর্বটি সরাসরি ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় সম্প্রচারিত হোক। বেকায়দা অবস্থা কাটিয়ে এবার অন্তত বিএনপি যথার্থ সিদ্ধান্ত নেবে এমন ধারণা অনেকের।

অন্যদিকে বিএনপি বেকায়দায় থাকলেও অস্থিরতা পেয়ে বসেছে সরকারকে। যার সর্বশেষ নিদর্শন একমাস সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নির্ষিদ্ধ ঘোষণা করা। এর আগে এই মাসেই ঢাকায় পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপিকে দুই দুইবার সমাবেশ করতে না দিয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে সরকার। এবং সর্বশেষ এক মাসের জন্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করে একটি ন্যক্কারজনক ঘটনার অবতারণা করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভা-সমাবেশ করা যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার স্থগিত থাকতে পারে শুধুমাত্র জরুরি অবস্থাকালীন। কিন্তু বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কোন কারণে সরকার এমন একটি স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো তা কারুর বোধগম্য নয়। বিষয়টি আওয়ামী লীগের অন্য মিত্রদলগুলোকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এমন কি আওয়ামী লীগ বা সরকারেরই অনেকে বিব্রত হয়েছেন। রাজনীতির খবরাখবর যারা এক আধটু রাখেন তাঁরা ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজধানী ঢাকা থেকে অনেক দূর চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ের একটি থানা উদ্বোধন শেষে কিছু সাংবাদিকদের বললেন কীভাবে। সরকারি একটি সিদ্ধান্ত যার সাথে জনগণের মৌলিক অধিকার জড়িত এবং যার সাথে সরকারের ভাবমূর্তিও জড়িত তেমন একটি সিদ্ধান্ত কি অকস্মাৎ নেয়া হয়েছিল। না হলে প্রায় মধ্যরাতে সরকারি যে ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো তা সকালেই কেন দেয়া হলো না। সম্ভবত পুরো বিষয়টি গুবলেট করে ফেলেছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেশে এমন কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে যার জন্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে তা বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে শেষের দিকে এসে সরকারকে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতায় পেয়ে বসেছে। গত ২ মে সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলকে যেভাবে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের সেই অবস্থানে থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর সেই আহ্বানের বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বেঁধে দিয়েছিলেন। এরপরে পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। এক সময় জাতিসংঘের মহাসচিবের দূত ও ইইউ’র রাষ্ট্রদূতদের উদ্যোগের কারণে বিএনপি শর্তহীন আলোচনায় সম্মত হয়। সে সময় অন্যদিকে বন ও পরিবেশমন্ত্রী ডহাছান মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান শেখ হাসিনা হবেন বলে শর্ত জুড়ে দেন। শুধু তাই নয় আওয়ামী লীগের যে কোন স্থানে হতে পারে আলোচনা’র অবস্থান থেকে সরে এসে একমাত্র সংসদেই আলোচনা হতে পারে বলে পুনঃশর্ত আরোপ করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কে হবেন তা যদি আওয়ামী লীগ আগে থেকে নির্ধারণ করে দেয় তা হলে তো আর আলোচনায় বসার দরকার নেই।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতরেই বুঝি একটি শক্তি আছে যারা দলের অভ্যন্তরে থেকে দলকে দুর্বল ও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন। ঠিক সেরূপ শক্তিটি সরকারেও বিরাজ করে যাদের কাজই হলো উল্টা-পাল্টা কিছু একটা করে সরকারের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিয়ে সরকারকে বিতর্কিত ও বেকায়দায় ফেলা।

জনগণ মনে করেছিল গত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে যে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছিল তা সফলভাবে প্রতিহত করে সরকার একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড়াবে। বাস্তবতা দেখছি তার সম্পূর্ণ উল্টো। সংলাপে শর্ত জুড়ে দিয়ে বিরোধী দলের সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে এবং সর্বশেষে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার তার দুর্বলতাকেই ঢাকবার চেষ্টা করছে। এই ধরণের অস্থিরতা থেকে সরকারকে দ্রুত বেরিয়ে আসা উচিত।

মহিউদ্দিন খান আলমগীর একজন শিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষ। একটি সম্ভান্ত পরিবারেই তাঁর জন্ম। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক একজন মন্ত্রী হিসেবে মন্তব্য প্রদানের সময় তিনি সতর্ক থাকছেন না বলে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে সরকারের সাথে সাথে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও বিব্রত হচ্ছেন। সাবেক এই আমলা আওয়ামী লীগের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা জানি না কিন্তু তার কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের প্রকৃত ত্যাগী নেতা-কর্মীদের আহত করছে প্রতিনিয়ত। বিব্রত হচ্ছেন অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতৃবৃন্দ। এতে দল গতিশীলতা হারায়। যা একটি প্রাচীন ও গণতান্ত্রিক দলের জন্যে শুভ লক্ষণ নয়।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ