পৃষ্ঠাসমূহ

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১২

বাংলাদেশ কি হেরে যাবে? ( প্রথম পর্ব )

দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ                        উপসম্পাদকীয়                             সমসাময়িক
চট্টগ্রাম, বুধবার ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪১৯  
* কামরুল হাসান বাদল

যে লক্ষ্য, আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্থাৎ এদেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্জনের পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হতে পারে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী, অবিনশ্বর ও প্রবহমান।এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারা শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইতি টানতে চান তারা কার্যত ইতিহাস বিকৃত করছেন। আপোস করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এরা বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামকে অস্বীকার করতে চান মূলত হীন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এঁরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার বেনিফিসিয়ারি। এঁদের প্রশ্রয়ে, অভিভাবকত্বে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা এদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে।

‘৭২ এর সংবিধানের প্রস্তাবনা, আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া (জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ও তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টারা সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর সাথে সাথে প্রস্তাবনায় একটি ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেন। ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম, এর স্থলে প্রতিস্থাপিত করেন ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ’। এই বিশাল কারচুপি কিংবা শঠতা সাধারণভাবে খেয়াল করার মতো নয়। অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টির তারতম্য বুঝে ওঠার কথা নয়। কিন্তু একজন সচেতন মানুষ মাত্রই অনুধাবন করতে পারেন কিংবা পেরেছেন যে, এই ছোট্ট একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস, আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও ত্যাগকে কীভাবে অস্বীকার বা বিকৃত করা হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি তখন কিন্তু শুধুমাত্র একাত্তর সালের নয়মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের কথাই শুধু বলি না।

 আমরা তখন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আন্দোলন, সংগ্রাম সবকিছু নিয়ে বলি। দীর্ঘকাল বাঙালি পরাধীন ছিল। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন শাসক ও বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হয়ে শাসিত হয়েছে শুধু।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ অর্জন করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে এই জাতিকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। নেতাজী সুভাষ বসু, বিপ্লবী সূর্যসেন কিংবা ’৪০ এর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব কোনটিই বিচ্ছিন্ন নয়।

 আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে ’৪৭ এর দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের বাঙালির ওপর উর্দুভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এর পেছনে তাদের অভিসন্ধি অত্যন্ত পরিষ্কার। একটি সংস্কৃতির প্রধান বাহন হলো তার ভাষা।

আর এই ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে সে জাতিকে তার মূল সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা। পরজীবী ও সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তু করে তোলা। কাজেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে যারা বুকের রক্ত দিয়েছে তারা শুধু মাতৃভাষার অধিকারই আদায় করেনি সে সাথে তারা বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এককথায় সংস্কৃতিকেই রক্ষা করেছিল। যে কারণে আমি বায়ান্নের সেই আন্দোলনকে শুধু ভাষা আন্দোলন না বলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। বায়ান্নে যদি বাঙালিরা ব্যর্থ হতো তবে এত তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হতো কিনা তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ রয়েছে।

 অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয় বায়ান্নের সাফল্যই বাঙালির বুকের সুপ্ত স্বপ্ন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলেছে। এরপরের ইতিহাস স্বাধীনতা ও মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ৬দফা আন্দোল, ’৬৭ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন, ’৭১ এর অসহযোগ আন্দোলন ও সবশেষে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

 বাঙালির এই সুদীর্ঘ সংগ্রামকেই আমরা মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করি। আমরা বিশ্বাস করি ’৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ, যা সশস্ত্র যুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের সাথে সাথে সমাপ্ত হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। যে লক্ষ্য, আদর্শ ও স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্থাৎ এদেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবে না। অর্জনের পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হতে পারে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী, অবিনশ্বর ও প্রবহমান।

এই মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারা শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইতি টানতে চান তারা কার্যত ইতিহাস বিকৃত করছেন। আপোস করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এঁরা বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামকে অস্বীকার করতে চান মূলত হীন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার বেনিফিসিয়ারি। এঁদের প্রশ্রয়ে, অভিভাবকত্বে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা এদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে।

প্রিয় পাঠক এ কথাগুলো আপনারা বহুবার শুনেছেন, পড়েছেন, জেনেছেন। নতুন করে বলতে হলো এই কারণে যে, আমাদের প্রবহমান মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায় অর্থাৎ একাত্তরের পরাজিত শত্রু, যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।

বর্তমান সরকার এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ না করে তাদের গত্যন্তরও নেই। কিন্তু বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবিক ততটা নয়। কারণ স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছরে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বহুধা-বিভক্ত হয়েছে আর অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পাকাপোক্ত হয়েছে।

পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের আর্থিক সহায়তায় এই শক্তি দেশে বিদেশে প্রভূত সম্পদের মালিক হয়েছে। এদের নেতাকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে বিরাজ করছে। তাছাড়া এ ধরনের অপরাধের বিচার করার অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য যথেষ্ট না থাকা এবং বিষয়টিকে অধিক গুরুত্বের সাথে না নেওয়ার কারণেও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর হয়নি। সে সাথে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি তার দীর্ঘদিনের পুরোনো মিত্র জামায়াত ও তার অভিযুক্ত শীর্ষ নেতাদের রক্ষা করতে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামায় এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে।

গত কয়েক মাস ধরে চলে আসা প্রধান বিরোধীদলের আন্দোলন- সংগ্রাম-বক্তৃতা-বিবৃতি এবং সর্বশেষ গত কয়েকদিন ধরে চলে আসা জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব এবং তাতে বিএনপির নৈতিক সমর্থন দানের পরে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের যুদ্ধে বাংলাদেশ কি হেরে যাবে?  (আগামী সপ্তাহে সমাপ্য)


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ