পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১২

নৈতিক সমর্থন, খালেদার ভাষণ ও বউ তালাকের গল্প

দৈনিক আজাদী                       উপসম্পাদকীয়                               কাল আজ কাল      

৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি. ২২ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ সাল ‌২১ মহররম ১৪৩৪ হিজরি
* কামরুল হাসান বাদল

বিএনপির নৈতিক সমর্থনে জামাত-শিবিরের আরেকটি অনৈতিক হরতাল পালিত হল দেশে। বাংলাদেশে হরতাল মানে জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর আর সরকারি তথা জনগণের যানমালের ক্ষয়ক্ষতি। এই হরতালও তার বাইরে নয় বরং তা কয়েক মাত্রায়, রূপে ও দাবিতে ব্যতিক্রম। এই হরতাল নিয়ে লেখার আগে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অতি সাম্প্রতিক একটি ভাষণ নিয়ে কিঞ্চিত আলোকপাত করি।
নারায়ণগঞ্জ শহরের মণ্ডলপাড়ায় গতকাল ঝটিকা মিছিল থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা পুলিশের চার সদস্যকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে এবং ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। ছবিতে আহত এক পুলিশ সদস্যকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে




কয়েকদিন আগে বরিশালের জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন আগামী নির্বাচনে তাকে ও তার দলকে জয়যুক্ত করতে। অন্তত একবার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন ক্ষমতায় গিয়ে যদি ব্যর্থ হন তাহলে ভবিষ্যতে আর কোন দিন ভোট চাইবেন না। জনতার মুখোমুখী দাঁড়াবেন না। শুনে খুব ভাল লাগার সাথে সাথে গ্রাম বাংলায় প্রচলিত একটি গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটি এমন,- একলোক- কথায় কথায় তার বন্ধুর সাথে বাজি ধরে বললো, যদি তুই ব্যাপারটা আমাকে বোঝাতে পারিস তাহলে আমি বউ তালাক দেবো। বন্ধুও বাজিতে রাজি। বাজির কথা চারদিকে খুব সহসা চাউর হয়ে গেল। লোকটি বাড়িতে ফেরার আগেই সে কথা গিয়ে পৌঁছলো তার বউয়ের কাছে। লোকটি ঘরে এসে দেখে তার বউ কান্নাকাটি করে একসা। ছোট ছোট বাচ্চা দুটির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। স্বামী ফিরতেই বললো এই রইল তোমার সংসার, আমি চললাম বাপের বাড়ি। যে লোক সামান্য বাজিতে হারলে বউ তালাক দেয়ার কথা বলে তার সাথে আর সংসার কীসের। আমারতো কোন দাম নাই। তুমি থাকো তোমার সংসার নিয়ে আমি আমার ছেলেদের নিয়ে বাপের বাড়ি চললাম। শুনে স্বামী হাসতে হাসতে বললো দূর বোকা। তুমি যাবে কোন দুঃখে। বাজিতে আমি হারবো না কি। সে দুই বছর ধরে আমাকে বুঝাক না তাতে কী, আমি বুঝলে তো!

বেগম জিয়া বলেছেন ‘যদি ব্যর্থ হই’। পাঁচ বছর পরে সারা দেশের মানুষ ‘আপনি ব্যর্থ: আপনি ব্যর্থ’ বলে চিৎকার করলে তো হবে না। তাকে স্বয়ং বুঝতে হবে তিনি ব্যর্থ। আর তা না হলে--? বাংলাদেশে কে কখন ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছে? এমন কি ব্যর্থতার স্বীকার করেছে? তিনি তার ভাষণে ভবিষ্যতে ব্যর্থ হলে কী করবেন তা বলেছেন কিন্তু অতীতের কোন ব্যর্থতার কথা তো স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন নি। তা হলে কি অতীতে তাঁর বা তাঁর সরকারের কোনরূপ ব্যর্থতা, দুর্বলতা বা অপরাধ ছিল না? ভুল ছিল না? তিনি অতীতের কোন কিছুর জন্য ক্ষমা চান নি। বরং ভবিষ্যতে ব্যর্থ হলে তাঁর বিচারের ভার দিয়েছেন জনগণের ওপর। তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াল যে তাঁর গত পাঁচ বছরের শাসনামলে যা যা ঘটেছে তার সবকিছুই সঠিক ছিল এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে? তার মানে আবার সারাদেশে জঙ্গি উত্থান। ৬৩ জেলায় একযোগে বোমাবাজি, বোমা ফাটিয়ে বিচারক হত্যা, গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে ২৬ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটানো। সাবেক অর্থমন্ত্রী হত্যা, আহসানউল্লা মাস্টার হত্যা। গির্জা, সিনেমা হল, রমনার বটমূলে, উদীচী ও সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলা। বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ওপর গ্রেনেড হামলা। দশ ট্রাক অস্ত্র খালাস মামলা, বাংলা ভাইয়ের উত্থান, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার। হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক দুঃশাসন ইত্যাদি কোন ভুল বা খারাপ কাজ নয় বরং ভবিষ্যতে আবার ক্ষমতায় গেলে এ সমস্ত চালু হওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু সংযোচিত হওয়া? যেহেতু তিনি অতীতের কোন কৃতকর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চান নি, নিদেন ভুল স্বীকার পর্যন্ত করেন নি তার মানে আমরা ধরে নেবো বিএনপির গত পাঁচ বছরের শাসনামলের তাদের কৃত আচরণের কোন পরিবর্তন হবে না। যদি তাই-ই হয় তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের দোষ কোথায়। তাদের ব্যথতাই বা কী? বিএনপি আমলের দুর্নীতির সাথে যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি কাটাকাটি হয়ে সমানও হয় অন্যসব ক্ষেত্রেতো বর্তমান ক্ষমতাসীনরাই এগিয়ে। কৃষি, শিক্ষা, মানব উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, অবকাঠামো, আইনশৃংখলা, পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি তো ঈর্ষণীয়, যা তুলনামূলকভাবে গত চল্লিশ বছরে হয়নি। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বোমাবাজী থেকে দেশতো এখনো মুক্ত। মতিউর রহমান নিজামী বা সাকার গাড়িতে তো আর জাতীয় পতাকা উড়ছে না। রাষ্ট্রীয়ভাবেতো সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানী দেয়া হচ্ছে না। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি চর্চাতো সদা বহমান। দলিত তো হচ্ছে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বিকৃত হচ্ছে না ইতিহাস। কীভাবে এবং কোন উপায়ে খালেদা জিয়ার বা তার দল দেশে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন? তার ব্যাখ্যা পেলে খুশী হতাম। কারণ তিনি (খালেদা জিয়া) নিজেই বলেছেন তার ছেলে তারেক রহমান অত্যন্ত সৎভাবে জীবন যাপন করতেন। তারেক রহমানের জীবন যাপন ও তার কর্মকাণ্ড যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের কি বিশ্বাস করতে হবে বেগম জিয়ার এই কথাকে? এদেশের মানুষ কি এত সহজে হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অনাচারের কথা ভুলে যেতে পারবে? গত মঙ্গলবারে জামাতের আহুত হরতালে নৈতিক সমর্থন দিয়ে বিএনপি আবার প্রমাণ করেছে তারা অতীতের রাজনীতি থেকে একচুলও সরে আসে নি। বরং ’৭৫ এর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে জেনারেল জিয়া-জামাতের প্রতি যে নৈতিক সমর্থন দিয়ে, অর্থ দিয়ে, প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে এদেশে ওদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন ভবিষ্যতেও সে ধারা অব্যাহত থাকবে। এবং বর্তমানে জামাতের শীর্ষ নেতা যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে বর্তমানে বিচারের সম্মুখীন তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে। এই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে।

আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে বাধ্য। কারণ তারা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছ থেকে সেই ম্যান্ডেট নিয়েছে। অর্থাৎ এই বিচার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ একটি পক্ষ। স্বাভাবিকভাবে তারা প্রতিপক্ষকে দুর্বল ও ঘায়েল করার চেষ্টা করবে। জামাত-শিবির যদি এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের মুক্তির দাবিতে অযৌক্তিক আন্দোলন করে দল বা প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগ তা প্রতিরোধের চেষ্টা করতেই পারে। বরং অন্যপক্ষ হিসেবে জামাত পর্যবেক্ষণ করতে পারে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কিনা। তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হচ্ছে কি না। যে আইনে বর্তমান ট্রাইব্যুনাল বিচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্বের অন্য যে কোন এ ধরনের আদালতের চেয়ে অনেক উদার। কারণ একমাত্র বাংলাদেশে এই অপরাধীদের আপিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। যা বিশ্বে অন্য কোন ট্রাইব্যুনালে ছিল না। এবং যে আদালত বলতে পারে রায় ঘোষিত হওয়ার আগে এদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সম্বোধন না করতে সে আদালতের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে যুদ্ধাপরাধীদের যারা বাঁচাতে চায় তারা হয়ত জানে না যে, এই দেশে দানা বেধে ওঠা কোন আন্দোলন বা জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের কোন আন্দোলন অতীতে বিফল হয় নি, অতএব ভবিষ্যতেও বিফল হবে না।
দেশের মানুষ কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয় নি।


লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

1 টি মন্তব্য:

  1. বিএনপি স্বাধীনতার বিপক্কের দল, তারা কখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই নি - চাইবেও না, তারা আগেও এই বিচার বন্দ করে দিয়ে সব যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দিয়েছিল আর আজও তারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় ব্যাস্ত।

    উত্তরমুছুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ