দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১১ মাঘ ১৪১৯ সাল ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
২৪ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ১১ মাঘ ১৪১৯ সাল ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী
কামরুল হাসান বাদল
১ জানুয়ারি, ১৯৭৩ সাল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকায় মিছিল বের করেছিল। বিনা কারণে ও বিনা উস্কানিতে সেদিন সে মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। মৃত্যুবরণ করে দুজন নিরপরাধ-তরুণ ছাত্র। এখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। চারিদিকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং তৎপরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশের পাশে আছে বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তখন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। পাকিস্তানিদের পরাজয় ঠেকাতে যুদ্ধের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সপ্তম নৌবহর প্রেরণ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের ষড়যন্ত্রের কারণে দেশের মানুষও তখন চরমভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিলে বিনা কারণে সেদিন পুলিশ কেন গুলিবর্ষণ করেছিল তা এক রহস্যময় ঘটনা।
এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধুকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। সিপিবি ও ন্যাপের তৎকালীন নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে অপ্রীতিকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেদিন কার নির্দেশে পুলিশ গুলি বর্ষণ করেছিল তা আজো জানা সম্ভব হয়নি। তবে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রথম পুলিশের গুলিতে নিহত দুই নিরীহ ছাত্রের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে আজো বের হতে পারেনি তা আরেকবার অনুধাবন করলাম গত ২২ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রদত্ত পুলিশ ও প্রেসিডেন্ট পদক প্রদান অনুষ্ঠান দেখে।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোট ৬৭ জনকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক প্রদান করেন। পুলিশ বিভাগে ভাল ও বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য এই পদক প্রদান করা হয়ে থাকে। এবার পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ঢাকার লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন উর রশিদকে । তাঁকে পদক দেয়ার কারণ হিসেবে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁর এলাকায় ঈদ ও পূজার সময়ে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান হিসেবে। সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিছু প্রশংসযোগ্য কথা বলেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, পুলিশের কাজ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনভঙ্গকারী যত শক্তিশালী হোক তাদের আইনের আওতায় আনাই হচ্ছে পুলিশের কাজ। তিনি বলেছেন, তাঁর সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান না। একটি স্টেটম্যান সুলভ বক্তৃতা স্বীকার করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই।
ঘটনাটি সম্ভবত ওখানে শেষ হয়ে যেতো পারতো। কিংবা দু’একটি গণমাধ্যমে হয়ত ডিসি হারুনের প্রসঙ্গটি তুলে সামান্য সমালোচনা হতে পারতো। তাঁকে পদক দেয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল তাঁর এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু অভিশপ্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী,এক সময়ের চৌকষ সিএসপি অফিসার, সাবেক আমলা জনাব মহিউদ্দিন খান আলমগীর প্রসঙ্গটিকে টক অব দি কান্ট্রিতে পরিণত করেছেন। শুধু তাই নয় বলা যায় আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন। ডিসি হারুনের মতো একজন বিতর্কিত পুলিশ অফিসারকে কেন পদক দেয়া হল,সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুককে পেটানো তার পদক প্রাপ্তিতে বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে। পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে উল্লেখ করা প্রয়োজন ২০১১ সালে বিএনপির ডাকা দু’দিনের হরতালে পিকেটিং রত অবস্থায় জয়নাল আবেদীন ফারুকের সাথে কথা কাটাকাটির জের হিসেবে এই পুলিশ অফিসার তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে দেশে-বিদেশে নিজে নিন্দিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারকেও বিব্রতকর (?) পরিস্থিতিতে ফেলেছিলেন। যতই উত্ত্যক্তকারী হোক একজন সংসদ সদস্য এবং বিরোধী দলীয় হুইপের গায়ে হাত তোলা যদি পদক প্রাপ্তির যোগ্যতা হিসেবে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিবেচ্য হতে পারে তা হলে আমাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। অথচ এই পদক প্রদান অনুষ্ঠানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমরা কিসের সাথে তুলনা করতে পারি।
মনে পড়ছে কোহিনুরের কথা। ডিসি কোহিনুর বিএনপি জামাত সরকারের সময়ে বিরোধীদলের কাছে সাক্ষাৎ যমের অপর নাম কোহিনুরের সখ্যতা ছিল তারেক ও তার হাওয়া ভবনের সাথে। কোহিনুরকেও বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আস্কারা দিয়ে এমন জায়গায় তুলেছিলেন যে, তার ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো তার অধিনস্থতো বটে কমিশনার আইজি পর্যন্ত। তার কারণে বিএনপির লাভ হয়নি বরং পতন তরান্বিত হয়েছে। পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছিল,ভেঙে পড়েছিল তাদের চেইন অব কমান্ড। পুলিশ বিভাগে অসন্তোষ ঘনীভূত হয়েছিল। যার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পেয়েছিলাম ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে পল্টন এলাকায়। পুলিশ দিয়ে যদি ক্ষমতায় টিকে থাকা যেতো তাহলে আজও বোধ হয় এরশাদের শাসনকাল দেখতে পেতাম। আজ এই লেখাটি যখন চট্টগ্রামের পাঠকরা পড়ছেন তখন তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি এই দিনেই চট্টগ্রামের লালদিঘির মাঠে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসমাবেশ পণ্ড করার জন্যে এরশাদের পুলিশ বাহিনী পাখির মতো গুলি করে মানুষ মেরেছিল। যা চট্টগ্রাম গণহত্যা বলে বিবেচিত। সেদিনও সৌভাগ্যক্রমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়। লাশ গুম করার অভিপ্রায়ে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষ অনেককে বলুয়ারদিঘির পাড়ের শ্মশানে পুড়ে ফেলা হয়েছিল। তারপরেও এরশাদের শেষ রক্ষা হয় নি। দু’বছর পরে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। স্বাধীনতার পর যে ক’জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন তার মধ্যে দু’একজন ছাড়া সবাই ক্ষমতা ছাড়ার পরে পুলিশের পিটুনি খেয়েছেন। অথচ ক্ষমতায় থাকতে তাঁরাই ‘আমার পুলিশ’, ‘আমার পুলিশ’ বলে মুখে খই ফুটিয়েছেন। এঁরা কেউই পুলিশের উপকারের জন্যে সংস্কার করতে উদ্যোগী হন নি অথচ পুলিশকে নিজ ও নিজ দলের জন্য যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন। এঁদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ অন্যান্য পুলিশরাই পরে তাঁদের ধোলাই করার চেষ্টা করেছে।
পাকিস্তান আমলের পাবলিক সার্ভেন্ট মহিউদ্দিন খান আলমগীর ’৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আশু পতন বুঝতে পেরে সদলবলে জনতার মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের জন্যে তাঁর ত্যাগ কতটুকু আমার জানা নেই। কিন্তু আমার জানা আছে এদেশের হাজার হাজার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর কথা; যাঁরা বিশেষ করে ’৭৫ পরবর্তী বৈরি সময়ে আওয়ামী লীগের পতাকা বহন করেছে। জিয়া, এরশাদ আর জামাত শিবিরের পেটুয়া ও গুণ্ডা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। জামাত শিবিরের বর্বরতার কাছে অসহায়ের মতো প্রাণ দিয়েছে। অঙ্গহানি হয়েছে। সে সময় জনাব আলমগীর সে সমস্ত সরকারের সেবায় করে যাচ্ছিলেন। আজ তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রণালয়ের ভুলের কারণে যে খেসারত আওয়ামী লীগকে ভবিষ্যতে দিতে হবে তার দায় নেবে কে? তাঁর অনবরত বিতর্কিত কথাবার্তা প্রতিদিন লক্ষ কোটি আওয়ামী সমর্থকদের বিব্রত করছে। এই সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে। এই মন্ত্রণালয় চালাতে তাঁর লাগাতার ব্যর্থতা চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ভেতরে। তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সাহারা খাতুনের ব্যর্থতাকেও ম্লান করে দিচ্ছে।
যে আচরণ বিএনপি জামাত জোট করেছে সে আচরণ অন্তত আওয়ামী লীগের কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে না। মতিয়া, নাহিদ, ওবায়দুল কাদেরদের অনেক সাফল্য নিচে পড়ে যাচ্ছে একটি মাত্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে। এখন না বুঝলে তবে কবে বুঝবে সরকার কোহিনুর হারুনরা কখনোই কোন সরকারের অ্যাসেট নয় বরং লায়ব্লিটিস। যে পুলিশ অফিসার একজন সাংসদের গায়ে হাত তুলতে পারে, যে পুলিশ অফিসার একজন তরুণকে (বিশ্বজিৎ) কুপিয়ে মারার দৃশ্য উপভোগ করতে পারে তাকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এড়িয়ে মন্ত্রীকে বরং নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের দিকে নজর বেশি দেয়া উচিত। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন অপকর্ম দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষ ক্ষেপে উঠছে। যার সমস্ত দায় বর্তাবে আওয়ামী লীগের ওপর। ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ডে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় লাভের পেছনে যে সোয়া এক কোটি নতুন ভোটার ছিল তারা তো বিগড়ে গেছেই সে সাথে এবারের সমসংখ্যক নতুন ভোটারও বিগড়ে যাবে। মাঝখানে দেশকে রসাতলে ফেলে আজকের ছাত্রলীগের বীর সেনানীরা দলে দলে যোগদান করবে শহীদ জিয়ার আদর্শের দলে। তখন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান কী হবে..... বুঝতে পারছি না।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন