দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১০ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৬ আষাড় ১৪২১ সাল ১১ রমজান ১৪৩৫ হিজরি
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
Google+
১০ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রিঃ ২৬ আষাড় ১৪২১ সাল ১১ রমজান ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল
‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রাম বাংলার এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন-
‘অবারিত মাঠ, গগনললাট চুষে তব পদধূলি
ছায়াসুনিবিড় শান্তির-নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ ।
স্তব্ধ অতল দীঘি কালোজল-নিশীথ শীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বাংলার বধূ জল লয়ে যায় ঘরে,
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে...’।
এ চিত্র গ্রাম বাংলার চিরন্তন এক চিত্র। নদী পুকুর দীঘি ছাড়া গ্রামবাংলাকে কল্পনাও করা যায় না। কৃষি প্রধান দেশে দৈনন্দিন প্রয়োজন ছাড়াও পানীয় জলের একমাত্র উৎস ছিল তখন পুকুর দীঘি ও নদ-নদী। শুধু গ্রাম বাংলার নয় শহরে যখন পানি সরবরাহের জন্যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। চালু হয়নি নলকূপের প্রচলন তখন পুকুর দীঘি ও কূয়ার পানিই ছিল শহর এলাকার মানুষের একমাত্র জলের উৎস।
গ্রাম বাংলায় বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রতিটি বাড়িতে থাকতো একাধিক পুকুর। এর মধ্যে অন্তত দুটি পুকুর ছিল অপরিহার্য। একটি পুরুষদের ব্যবহারের জন্যে বাড়ির সামনে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় “ঘাঁডার পইর।’ বাড়ির সম্মুখভাগ বা প্রবেশ পথের প্রশস্ত আঙিনাকে চট্টগ্রামে ‘ঘাডা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাড়ির সম্মুখের পুকুর। আরেকটি পুকুর থাকতো বাড়ির পেছনে যাকে বলা হয় ‘বাড়িচের পইর।’ ‘বাড়িচ’ মানে বাড়ির পেছনের অংশ। এই পুকুরে বাড়ির নারীরাই স্নান ও কাপড় চোপর ও অন্যান্য ধোয়ার কাজ সারতো। এ ছাড়াও বড় বড় বাড়িতে আরও দু একটি পুকুর থাকতো। এর মধ্যে ‘ভিতুর পইর’ বা ভিতরের পুকুর নামেও পুকুর থাকতো। এছাড়া কয়েকটি বাড়ি মিলে বা পাড়ার মাঝখানে আরেকটি বড় ধরনের পুকুর থাকতো যে পুকুরগুলোকে ‘বড় পইর’ ‘বড়ঢি’ বড় পুকুর বা বড় দীঘি বলা হতো। সাধারণত মুসলিম পাড়াগুলোয় এমন বড় পুকুর বা বড় দীঘির পাড়ে নির্মাণ করা হতো মসজিদ এবং মসজিদের পাশে দীঘি বা পুকুরের পাড়েই থাকতো ওই পাড়ার কবরস্থান। সাংসারিক-কাজ-কর্ম ছাড়াও এই দীঘি ও পুকুর থেকে গ্রামবাসীরা তাদের পানীয় জল সংগ্রহ করতো, টিউবওয়েল প্রচলনের আগে। হিন্দু বাড়ি চিত্রও ছিল অনেকটা একই ধরনের। শ্মশানের জন্য নদীর পাড় দূরবর্তী হলে অনেক সময় বড় বড় পুকুর বা দীঘির পাড়ে চিতার ব্যবস্থা হতো। কারণ শ্মশান থেকে ফেরার সময় হিন্দুদের স্নান করা ধর্মীয় আচার। এছাড়া তৎকালীন জমিদার ও অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে পথের পাশে পুকুর ও দীঘি খনন করতেন। কোনো কোনো দানশীল ব্যক্তি পথে পথে বিশ্রামের জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়া ছাড়াও সেখানে মাটির কলসিতে পানি রাখার ব্যবস্থা করতেন পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। বলা বাহুল্য এখনকার অধিকাংশ বিত্তবানরা এসব পুকুর দখল করে ভরাট করেন আর আলীশান দালান তৈরি করেন নিজেদের ভোগের জন্য। পুকুর দীঘির অস্তিত্ব শুধু গ্রামে নয় শহরেও ছিল। শহরেও প্রতিটি বাড়ির সাথে এমন কয়েকটি পুকুর থাকতো এখনও খোঁজ নিলে শহরের কিছু কিছু এলাকায় পুরনো বাড়িগুলোর পাশে পুকুর বা এর অস্তিত্ব বোঝা যায় । একটি বেসরকারি তথ্যসূত্রে জানা যায় শুধু চট্টগ্রাম শহরেই এমন পুকর দীঘির সংখ্যা ছিল চার হাজারেরও অধিক। এখন এই শহরে পুকুর দীঘির সংখ্যা ৪০টিও হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে গত শতাব্দির আশির দশক থেকে মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হতে থাকে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও আরাম-আয়েসের লোভে দলে দলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় জমিয়েছে। এই চট্টগ্রাম শহরেই মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে জনসংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে গেছে। এত বিপুল সংখ্যক লোকের আবাসন চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে জায়গা-জমির দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে আর সে লোভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে হাজার হাজার পুকুর জলাশয় দীঘি। রাতারাতি পুকুর-জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন, মার্কেট ও কল-কারখানা। আর বর্তমানে আবাসন ব্যবসার লোভনীয় প্রস্তাবে পুকুর ভরাট করে প্লট তৈরি অনেক লাভজনক হওয়ায় যে পথেই ধাবিত হয়েছে অনেকে।
এভাবে পুকুর জলাশয় ভরাট করে পুরো শহর ইট সিমেন্টের জঞ্জালে পরিণত করায় কমে গেছে পানির উৎস, কমে গেছে বর্ষায় পানি ধারণের ক্ষমতা। ফলে একটু বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে শহর অন্যদিকে একটু রোদেই অসহনীয় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিবেশ। প্রায় পুরো শহর ইট-কংক্রিটের জঞ্জাল করতে গিয়ে কোথাও খালি জায়গা না রাখায় বৃষ্টি বা বর্ষা মৌসুমে মাটি পানি শোষণ করতে পারে না। অন্যদিকে অর্ধকোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যথেচ্ছারভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নামতে নামতে প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। শহরে শুধু নয় একই পরিস্থিতি গ্রামেও বিদ্যমান হওয়ায় সেখানেও অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানির নাগাল পাওয়া যায় না। শীতকাল শুরু হতেই শুকিয়ে যায় পুকুর দীঘিগুলো। এক্ষেত্রে আরেকটি আত্মঘাতী কাজ চলছে কয়েক দশক ধরে। তা হলো কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভূগর্ভস্থ পানির উৎস যেভাবে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পানীয় জলের সংকট মোকাবেলায় এখন থেকেই সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প সেচের ব্যবস্থা করা জরুরি।
বলছিলাম শহরের পুকুর-দীঘির কথা। গত শুক্রবারে আমার এক আত্মীয়ের জানাজার জন্যে গিয়েছিলাম বলুয়ার দীঘির পাড়ে কোরবানীগঞ্জ জামে মসজিদে। জুমার নামাজের পরে জানাজার নামাজ শেষে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে বলুয়ারদীঘির বর্তমান অবস্থা দেখে আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছি, বাকরুদ্ধ হয়েছি, ক্ষুব্ধ হয়েছি। কোরবানীগঞ্জ মসজিদটি বলুয়ার দীঘির দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত, শুধু এ কারণে দক্ষিণ পাড়ের মসজিদের অংশটি ছাড়া দীঘির চতুর্পার্শ্ব অনেকটাই দখল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দীঘির ভেতরে ১০ থেকে ২০ হাত দখল করে বহুতল ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে অবৈধ দখলে দীঘির অন্তত ৩০ ভাগ অংশই “নেই” হয়ে গেছে। এখন দীঘির পাড় বলতে কিছু নেই, পানির উপরের বিভিন্ন স্থাপনা দেখে যে কারও মনে হতে পারে এটি নিতান্তই একটি পরিত্যক্ত জলাশয়। দখলের এই প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ করা না হলে শহরের মানচিত্র থেকে হাজারো পুকুর-দীঘির মতো প্রাচীন বলুয়ার দীঘিও হারিয়ে যাবে। অথচ একটি সময়ে এই দীঘি ছিল কোরবানীগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ,ঘাটফরহাদবেগসহ ব্যাপক এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের অন্যতম প্রধান জলের আধার। ওই এলাকার অনেক পুকুর-দীঘি ভরাট করে ফেলা হলেও এখনও কোনোমতে থাকায় এর আগে পাশে বিস্তীর্ণ এলাকার অগ্নি নির্বাপণের জলের প্রধান উৎসও এখন শুধুমাত্র বলুয়ারদীঘি। এখনও প্রতিদিন কয়েক’শ মানুষ এই দীঘির পানি ব্যবহার করে গোসলসহ অন্যান্য কাজে।
এই শহরে এই দীঘির মতো আর মাত্র কয়েকটি দীঘি-পুকুর বিদ্যমান আছে তার মধ্যে আশকার দীঘি, রানির দীঘি, আগ্রাবাদের ঢেবা দীঘি, রেলওয়ের জোড়া দীঘি, চকবাজারের মুন্সী পুকুর ইত্যাদি। অনেক লেখালেখির কারণে আশকার দীঘি সংস্কার করা হয়েছে। স্থানীয় কিছু পরিবেশ সচেতন নাগরিকের আন্দোলনের কারণে ভরাট হওয়ার হাত থেকে বেঁচেছে চকবাজারের মুন্সী পুকুর। তবে পরিস্থিতি দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না কর্তৃপক্ষ এখন থেকে আরও বেশি কঠোর না হলে এগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হবে না। উল্লেখিত পুকুর ও দীঘি ছাড়া শহরে এখনও যা টিকে আছে তা রক্ষা করতে হলে কালবিলম্ব না করে খুব দ্রুত এসব দীঘি ও পুকুরকে ‘ন্যাশনাল হ্যারিটেজ’ বা ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ ঘোষণা করতে হবে। তবে তার আগে এসব দীঘি ও পুকুরগুলো সরকারকে অধিগ্রহণ করতে হবে এবং তা করতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। কথায় বলে ‘মানুষ পিতৃশোক ভোলে সম্পত্তির শোক ভোলে না’, তাই অধিগ্রহণ করার আগে সম্পদের মালিকদের প্রাপ্যমূল্য তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে অধিগ্রহণ করার আগে এসব পুকুর ও দীঘির সঠিক খতিয়ান অনুযায়ী অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে জলাধারগুলোকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।
আমরা জানি কাজটি কঠিন তবে অসাধ্য নয়। শুধু একজন সৎ, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তির প্রয়োজন। মনে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রেষণে থাকাকালীন দেশখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট (এ নামেই তিনি বিখ্যাত) মুনীর চৌধুরী অভিযান চালিয়ে বন্দরের বেদখল হওয়া কয়েক’শ কোটি টাকার সম্পদ বন্দরের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছিলেন। মনে পড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ম্যাজিস্ট্রেট-ইনফোর্সমেন্ট থাকা অবস্থায় অনেক রাঘব-বোয়ালের শিল্প-কারখানাকে পরিবেশ বিনষ্টের দায়ে জরিমানা করে ইটিটি স্থাপনে বাধ্য করেছিলেন। এখনও তিনি মিল্ক ভিটার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। চট্টগ্রাম নগরীর হারিয়ে যেতে বসা জলাধারগুলো রক্ষার জন্যে একজন মুনীর চৌধুরীর বড্ড প্রয়োজন। কয়েকদিন আগে সার্কিট হাউসে ম্যাজিস্ট্রেটদের একটি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেনণ্ড বন্দরের সম্পত্তি রক্ষার অভিযানের সময় তাঁকে দু’কোটি টাকা উৎকোচ প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কাজেই একবার অন্তত তাঁকে এ দায়িত্বটি দিলে অনেক বিপর্যয়ের হাত থেকে চট্টগ্রামবাসী রক্ষা পাবে।
তারুণ্যের প্রথম লগ্নে আমি এই বলুয়ারদীঘির পাড়ে এসেছিলাম। আমার জীবনের একটি সোনালী সময় আমি এখানে অতিবাহিত করেছি। এই দীঘির বিশুদ্ধ বাতাসে নিজের ফুসফুসকে সতেজ করেছি। অনেকবার স্নান ও সাঁতার কেটেছি এর স্বচ্ছ জলে। কাজেই আমার স্মৃতিবাহী এই দীঘির অপমৃত্যু আমি দেখতে চাই না। এই লেখাটি প্রকাশের পরে ওই এলাকার আসার অনেক স্বজন ও বন্ধু আমার ওপর বিরূপ হবেন, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যে ভ্রু কোঁচকাবেন আমায় দেখে। আমি আমার সে স্বজন-বন্ধুদের জানাতে চাই আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভালাভের বিষয় নেই এখানে। যারা অবৈধ দখলে দূষণে এই দীঘিকে হত্যা করে তার বিনিময়ে ইমারত নির্মাণ করতে চান, সন্তান-সন্ততির জন্যে নিরাপদ ভবিষ্যত নির্মাণ করতে চান তারা যে পক্ষান্তরে তাদের উত্তরসূরির জন্য একটি দোযকের দরজা খুলে দিচ্ছেন আমি শুধু সে দোযকের যন্ত্রণা থেকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিলাম।
দখলে দূষণে আর পরিবেশ বিপর্যয়ে এ দেশ যে দোযকের দিকেই যাচ্ছে।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন