দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৩ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৯ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+
১৩ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৯ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি
- কামরুল হাসান বাদল
সাম্প্রদায়িকতা থেকে উপমহাদেশের রাজনীতি সহসা মুক্ত হচ্ছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থান দেখে তাই মনে হলো আবার। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে লোকসভা নির্বাচন। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছে। যদিও অতি সাম্প্রতিক একটি জরিপে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রায় দু’বছর আগে থেকেই বিজেপি নরেন্দ্র মোদিকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এ নিয়ে লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে দল ও মোদির সাথে কিছুটা মন কষাকষিরও সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু দলের নেতাদের মনোভাব বুঝতে পেরে শেষে আদভানি মোদির উত্থানকে মেনে নিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণের কাছে মোদিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আদভানির ব্যাপারটিও তাই। বাজপেয়িকে হটিয়ে দলের কর্তৃত্ব নিয়েছিলেন আদভানি - যিনি বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্যে অন্যতম দায়ী ব্যক্তি। বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বাজপেয়ি এক সময় কংগ্রেস করতেন। নেহেরুর সাথেও তাঁর সদ্ভাব ছিল। কবিতা লিখতেন বাজপেয়ি। ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি গঠনেও দল সম্প্রসারণে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বাজপেয়ির এই পরিবর্তনে তখন তাঁর অনেক রাজনৈতিক বন্ধু ও সহকর্মীরা হতবাক হয়েছিলেন। অনেকে বলে থাকেন সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির রাজনীতি করলেও তিনি ততটা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না যতটা ছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানি। বিজেপি, শিবসেনা, রাষ্ট্র স্বয়ং সেবক সংঘ এমন বেশকিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল আছে ভারতে। তবে সব দলকে ছাপিয়ে বিজেপি এখন সর্বভারতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। এই দলের নেতৃত্ব বাজপেয়ি থেকে আদভানি-আদভানি হয়ে নরেন্দ্র মোদির হাতে- যে হাতে- লেগে আছে গুজরাটের অসংখ্য নিরপরাধ মুসলিমের রক্ত।
নরেন্দ্র মোদির জীবন শুরু হয়েছিল রেল স্টেশনে চা বিক্রির মাধ্যমে। রাজনীতিতে এসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন এবং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর শাসনামলে নিজ প্রদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙা তথা মুসলিমদের নিপীড়নের জন্য গোধরা রেল স্টেশনে এক বগি তীর্থ যাত্রীকে পুড়িয়ে মেরে তা মুসলিমদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙায় গুজরাটে নিহত হয়েছিল শত শত নিরপরাধ মুসলিম। বসতবাড়ি ও সম্পদহারা হয়ে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে হাজার হাজার মুসলিম। এই অপরাধে তার নামে মামলা হয়েছে তার দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদিকে সে দেশে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল কয়েক দফা। ভারতের প্রগতিশীল মহল ও বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে নরেন্দ্র মোদি একজন নিন্দিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি। এই ঘৃণিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লতা মঙ্গেশকর, বাপ্পি লাহিরীর মতো বাংলাদেশেও দারুণ জনপ্রিয় সঙ্গীত তারকারা দলে দলে যোগ দিচ্ছেন কট্টর রাজনৈতিক দল বিজেপিতে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগে থেকেই খারাপ। বর্তমান সরকার এক প্রকার তালেবান অনুমোদিত সরকার। মুসলিম লীগ নিজেই একটি সাম্প্রদায়িক দল। সেনাবাহিনী ও তালেবানকে ‘ম্যানেজ’ করেই নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে নির্বাচনী প্রচারাভিযানও চালাতে দেয় নি তালেবানরা। পিপিপির সভাপতি ও বেনজির তনয় বিলওয়াল মৃত্যু হুমকির মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আগে। পাকিস্তানে অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে তালেবানদের হুমকি ও আক্রমণের মুখে। শেষে বেনজির ভুট্টোকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে কার্যত প্রগতিশীল রাজনীতির কবর রচিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ক্লান্ত। পাকিস্তানে এখন মুখ্যত আধা সামরিক আধা তালেবানি প্রভাবে কোনো ভাবে একটি দল ক্ষমতায় টিকে আছে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের অবস্থাও পাকিস্তানের চেয়ে নাজুক। যদিও উপমহাদেশ বলতে আমরা আফগানিস্তানকে হিসেবে ধরি না কিন্তু এতদাঞ্চলের রাজনীতির ব্যাপক বিশ্লেষণের প্রয়োজনে আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ টানতে হচ্ছে। সে দেশের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হামলার মাধ্যমে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। গত সোমবার এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া সরাসরি ভণ্ডুল করতে ভোটার, নিরাপত্তা বাহিনী, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও এই নির্বাচনের সহযোগী হিসেবে যারা জড়িত তাদের আক্রমণ করা থেকে পিছপা হবে না তারা।
বাংলাদেশেও দীর্ঘ দু’বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামার পরও অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি,মানবতাবিরোধী অপরাধে চিহ্নিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম ও অরাজনৈতিক কিন্তু কট্টর মৌলবাদী হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য মৌলবাদী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সহিংস প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পরেও শেখ হাসিনা একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতত সামলে নিয়েছেন মনে হয়। গত দু’বছর ব্যাপী বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে লাগাতার সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। ৪৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেশে। আপাতত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসলে অনেকে সন্দিহান এই পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে।
কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক প্রতিবেদনে লিখেছে বিএনপি আন্দোলনে নামার জন্য ভারতের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। বিষয়টি কারও কাছে গোপনীয় নয় যে, বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার তার গত পাঁচ বছর শাসনকালে ও বর্তমান নির্বাচন সম্পন্ন করতে ভারতের বর্তমান শাসক দল কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিশেষ করে উলফার জন্য দশ ট্রাক অস্ত্র সরবরাহের ঘটনা ও সর্বশেষ হরতালের অজুহাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করায় ভারতের সাথে বিএনপির সম্পর্ক একেবারে বরফের পর্যায়ে নেমে এসেছে। সে হিসেবে দৈনিকটির পর্যবেক্ষণ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যেহেতু কংগ্রেসের সাথে বিএনপির সম্পর্ক খারাপ সেহেতু বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারত সরকারের নীতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে ভেবে বিএনপি তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। মোরারজি দেশাই ও জেনারেল জিয়ার সখ্যের স্মৃতিটা নিশ্চয়ই পাঠকদের অনেকেই ভোলেন নি। (মোরারজি দেশাই বিজেপির নেতা ছিলেন না, তবে কট্টর ও সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন)।
এই উপমহাদেশের সুস্থ ও মানবিক রাজনীতির জন্য এটি একটি অশনি সংকেত। আফগানিস্তান-পাকিস্তানে এক প্রকার তালেবানি শাসন, ভারতে (যদি নির্বাচনে জেতে) বিজেপি আর বিজেপির সহায়তা ও সহযোগিতায় যদি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসে তাহলে সারা উপমহাদেশ জুড়েই ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উন্মত্ততা শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হলে বা বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে ভারতে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে বিজেপির মতো সে দেশের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো।
যদিও এটি নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, ভারতে বিজেপি জিতলে তাদের বৈদেশিক নীতি বিশেষ করে তাদের সেভেন সিস্টার নামে খ্যাত রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে তাদের নীতির পরিবর্তন হবে। ভারত সরকার যেহেতু নিশ্চিত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশে আশ্রয় প্রশ্রয় পায় সেক্ষেত্রে এই দুই দলের ব্যাপারে বিজেপির অবস্থান কী হবে তা আগে থেকে বলা মুশকিল। তবে নরেন্দ্র মোদির ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিয়ে তার সাম্প্রতিক বক্তৃতা বিবৃতি বিএনপি-জামায়াত নেতাদের মতোই শোনায়।
এসব গেলো আঞ্চলিক বা উপমহাদেশের রাজনীতির কথা। বাংলাদেশের রাজনীতির কথা বলি এবার। মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ সংগঠন ওআইসির নতুন মহাসচিব জাইয়াদ আমিন মাদারি এ সপ্তাহে তিনদিনের বাংলাদেশ সফরে এসে বর্তমান সরকারের প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছেন,ওআইসি বর্তমান সরকারের সাথে কাজ করবে। নির্বাচন যা-ই হোক তা টিকে গেল শেখ হাসিনা কর্তৃক জঙ্গিবাদকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করার কারণে। কারণ আগেই বলেছি গত দু’বছর ধরে দেশে যেভাবে লাগাতার সহিংসতা চালানো হয়েছে তার জন্য নিন্দিত হয়েছে জামায়াত-হেফাজত এবং তাদের প্রশ্রয়দাতা বিএনপি।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এবং ভারতে বিজেপির মতো কট্টর মৌলবাদী দল ক্ষমতায় এলেও শেখ হাসিনার সরকার শুধুমাত্র একটি কারণে টিকে যেতে পারে আর তা হলো দুর্নীতি নির্মূল করা। গণতন্ত্রের নামে জ্বালাও- পোড়াও- হত্যা- ধ্বংস আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের সম্পদ লুটপাটের দৃশ্য দেখতে দেখতে মানুষ এখন প্রচণ্ড রাজনীতি বিমুখ। উপজেলা নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল অংশ নেওয়ার পরেও ভোট দানের পরিমাণ তার সপক্ষে প্রমাণ দেবে। নির্বাচনে হানাহানি হত্যা- ধ্বংসে- জ্বালাও পোড়াও মানুষ আর দেখতে চায় না। দেখতে চায় না লুটপাটের অবাধ রাজত্বও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি শেখ হাসিনার হাতে আর একটি ট্র্যাম্প কার্ড আর তাহলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এখানে সফল হলে দু’তিন বছর নয় আগামী পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাবেন শেখ হাসিনা।
এখন প্রশ্ন হলো সে সুযোগের তিনি সদ্ব্যবহার করবেন কি-না।
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন