পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ, ২০১৪

'জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানো যাবে কি? ' ২য় পর্ব


৬ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২২ ফাল্গুন ১৪২০ সাল ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
গত ১ মার্চ রাজধানীর বাইরে নির্বাচনোত্তর প্রথম সমাবেশ রাজবাড়িতে বেগম জিয়ার বক্তৃতায় জামায়াতের নাম না নেওয়ায় রুষ্ট হয়েছে জামায়াত নেতৃত্ব-এমন দাবি করেছে একটি জাতীয় দৈনিক। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের
রাজনৈতিক শক্তির সন্তোষ প্রকাশ করার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। জামায়াতকে পরিত্যাগ করার আন্তর্জাতিক ও দেশিয় চাপ আছে বিএনপির ওপর। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন জামায়াতের সাথে তাঁদের নির্বাচনী জোট আছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেল উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে। এ পর্যন্ত দু’পর্যায়ের নির্মাণ শেষে দেখা যাচ্ছে এককভাবে বিএনপি চেয়ারম্যান পদে এগিয়ে আছে এবং সে সাথে জামায়াতে ইসলামীও অভাবিত সাফল্য পেয়েছে। চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের ২০ ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৬৬ জন জয়লাভ করেছে। অথচ ২০০৯ সালের নির্বাচনে জামায়াত পেয়েছিল ৬ চেয়ারম্যান ও ১০ জন ভাইস চেয়ারম্যান। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক গত দু’বছর ধরে দেশে এত এত নেতিবাচক রাজনীতি করার পরেও এই দলের জনপ্রিয়তা বাড়ল কি তবে। আসলে ঘটনাটি জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির নয়, এটি মির্জা ফখরুলের ভাষায় নির্বাচনী জোট অন্যদের ভাষায় আঁতাত। অর্থাৎ প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি নেত্রী জামায়াতের নাম উচ্চারণ না করলেও ভেতরে ভেতরে তাদের যোগাযোগ ও আঁতাত ঠিকই বহাল আছে। উপজেলা নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোট ও বিজয়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় খোলাশা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে পাঠকদের কাছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দল, দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকায় বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে না দেওয়ার প্রবণতা এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

আল-কায়দা প্রধান জাওয়াহিরির অডিও বার্তা, তারপরে পুলিশ হত্যা করে প্রিজনভ্যান থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতাদের মুক্ত করাও উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের জয়লাভের নতুনভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থান ঠেকানো যাবে কি?

এই প্রশ্নের সোজাসাপটা একটি উত্তর হতে পারে-বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রেখে দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের উত্থানরোধ সম্ভব নয়। কারণ দেশে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি ও তার পথ ধরে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আছে। ভূমিকা আছে বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কমবেশি দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপকৌশলের।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালিরা ফুঁসে উঠেছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠা বা ন্যায্যতার দাবিতে। বাঙালির মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়া, শিক্ষা-দীক্ষা, স্বাস্থ্য-জীবন মান, চাকরি-ব্যবসা ইত্যাদিতে বাঙালিদের বঞ্চিত করে পাকিস্তানিরা যে অন্যায় করে আসছিল তার বিরুদ্ধেই বাঙালিরা সোচ্চার হয়েছে এবং সবশেষে ১৯৭০ সালের নিবার্চনে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে ভোট দিয়েছে। আবার বাঙালির ওই ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ না দেওয়ার মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বাঙালি বিদ্রোহ করেছে, সর্বশেষ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছে। শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের সাথে ন্যায় আচরণ করলে এবং তাদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান প্রদান করলে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ হতো না।

বর্তমান বাংলাদেশেও জঙ্গি উত্থান রোধে প্রথমে জরুরি-সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম দূর করা। এছাড়া ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পর সমাজ ও রাষ্ট্রে যেভাবে ধর্মান্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে লালন ও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে তা বন্ধ করা। বিশ্বের সমস্ত সামরিক শাসকদের মতো বাংলাদেশেও সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ অন্যায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জেনারেল জিয়া মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি তথা ধর্ম ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় রাজনীতিকদের রাজনীতি করার পথ সুগম করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করেছেন আরেক জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ। জেনারেল জিয়ার হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক শক্তির নব অভ্যুদয় ঘটেছিল তা বিরাট মহীরূহ হয়ে দেখা দিয়েছিল তারই স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০১-২০০৬।

এ সময় দেশে জঙ্গিবাদের চরম উত্থান ঘটে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান ঘটে। দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। শায়খ আবদুর রহমানদের উদয় হয় এই আমলে। গণতান্ত্রিক বিশ্বকে হতচকিত করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা ও শত শত মানুষকে আহত পঙ্গু করা হয়েছিল। পুরানো এসব কথা বিএনপির সমালোচনার জন্য লিখিনি, লিখেছি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ঠেকাতে হলে এই অন্যতম বৃহৎ দলটিকেও আন্তরিক হতে হবে। তাদেরও সমর্থন থাকতে হবে এই প্রক্রিয়ায়। নতুবা তা একা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী ও জোটভুক্ত দলগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে দেশের জনগণের মধ্যে বিশাল একটি অংশ বিএনপির সমর্থক। কাজেই বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম প্রধানদেশে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী ও সন্ত্রাসবাদকে ঠেকাতে হলে এই দলের সমর্থনও জরুরি। এখন কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন বিএনপি কেন এ কাজে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে? এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে দেশকে জঙ্গিমুক্ত করা আওয়ামী লীগের একক কোনো এজেন্ডা নয়। এবং তাদের একার পক্ষে তা সম্ভবও নয়। ইসলামী উগ্রপন্থীদের ঠেকাবে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের স্বার্থে। কারণ আজ বিএনপি যে অপশক্তির ওপর ভর করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত ওই শক্তিই একদিন বিএনপিকে বিনাশ করবে।

পুঁজিবাদের সমান্তরালে বিশ্বে ফ্যাসিবাদেরও উত্থান ঘটছে। এসময় ফ্যাসিবাদ ভর করেছে বাংলাদেশের জামায়াত ও অন্যান্য উগ্র ইসলামী দলগুলোর মতো বিশ্বের কট্টর ইসলামী দলগুলোর ওপর। এই শক্তি পরগাছার মতো বর্তমানে বিএনপির জনপ্রিয়তাকে ভর করে বিস্তৃত হচ্ছে-অদূর ভবিষ্যতে আগাছাই মূল গাছকে গিলে খাবে। এসব উগ্র ইসলামী দলগুলো যে শাসন পদ্ধতি কায়েম করতে চায় বিএনপি শেষ পর্যন্ত ততদূর অগ্রসর হতে পারবে না। কারণ বিএনপি একটি মাল্টি ক্লাস ও সুবিধাবাদীদের দ্বারা গড়া দল। এক সময় হয়ত বিএনপিতে নারী নেতৃত্ব থাকবে না তবে এই দল কট্টর উগ্রবাদী দলেও পরিণত হবে না। আখেরে যা হবে এই দল বিলীন হবে উগ্রবাদীদের উদরে। সেক্ষেত্রে দেশে প্রধানতঃ দুটি রাজনৈতিক শক্তিই টিকে থাকবে একটি আওয়ামী লীগ বা অন্যদলের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে আরেকটি তার বিপক্ষে কট্টর মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি। মাঝখানে বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে জঙ্গি দমনে বিএনপির মতো অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও আগ্রহ থাকতে হবে।

নির্বাচন করে বাংলাদেশে মৌলবাদীরা কখনো ক্ষমতায় আসবে না। সেটি তারাও ভালোভাবে জানে। আর জানে বলেই তারা সশস্ত্র বিপ্লব ও জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চায়। আর জিহাদের জন্য তারা ব্যবহার করবে দেশের উঠতি বয়সি কিশোর ও তরুণদের। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যেন তারা বিভ্রান্ত করতে না পারে তার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন সাধন করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধের কথা আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। উল্লেখ করেছি এক্ষেত্রে (প্রথম কিস্তিতে) আন্তর্জাতিক রাজনীতি তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভুল ও আগ্রাসননীতির ভূমিকা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক ও উদার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো।

এর বাইরে দেশে উদার গণতন্ত্রচর্চার পাশাপাশি সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানুষকে মানবিক ও সংস্কৃতিসম্পন্ন করে তুলতে হবে। জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে, শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসাকে সরকারি তত্ত্বাবধানে আনতে হবে। তাদের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন এনে অধিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় নিয়মিত করে তুলতে হবে। সম্ভব হলে একধারার শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলন করতে হবে। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ ধর্ম বিষয়ে পড়তে চাইলে তাকে যেভাবে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ রেখে জাতীয় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সংবিধান থেকে বিশেষ কোনো ধর্মের পক্ষপাতমূলক সংযোজন বাদ দিতে হবে।

রাষ্ট্রক্ষে সবধর্মের সব মানুষের করে তুলতে হবে। সবধর্মের মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করলেই তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে না। বরং সে শক্তিকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে এবং তার জন্য সমাজের তৃণমূল থেকে মানুষের চেতনাকে শাণিত করে তুলতে হবে।

বিএনপি-জামাত-জাতীয় পার্টি অনুসৃত নীতির সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বর্তমান রেখে এই পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। কাজেই এই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তা একা আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই এ কাজে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব প্রগতিশীল দল ও প্রতিষ্ঠানের ঐক্য প্রয়োজন।

দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের অর্থায়নের পথ বন্ধ করা। এবিষয়ে ড. আবুল বারাকাত বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তাদের অর্থের উৎস বন্ধ করতে না পারলে তাদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে না। জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ