পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৪

'অর্বাচিনের আগুন-বাংলাদেশ থেকে মিশর এবং ফ্যাসিবাদ'

২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ১৯ পৌষ ১৪২০ সাল ২৯ সফর ১৪৩৫ হিজরি

- কামরুল হাসান বাদল
মিশরের রাজধানী কায়রোয় বিশ্ববিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ভবনে আগুন দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকরা। ইসলামি জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের কাছে স্বীকৃত এই বিশ্ববিদ্যালয়। গত শনিবার পরীক্ষা না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে মুসলিম ব্রাদারহুড কর্মীরা। তাদের বাধা দিলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় তারা। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য ও কৃষি অনুষদ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এ ঘটনার পরে মনে পড়ছে ১২৫৮ সালে তৎকালীন সভ্যতার পাদপীঠ বাগদাদের বিখ্যাত লাইব্রেরি দারুল হিকমা ভস্মীভূত করেছিল হালাকু খান। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আফগানিস্তানে তালেবানরা এমন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার ধ্বংস করেছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানেও তালেবানরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার ধ্বংস করে দিয়েছে। বাধা দিয়েছে শিক্ষা গ্রহণে বিশেষ করে নারীদের। পাকিস্তানের মালালা ইউসুফ জাই এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। যা বিশ্ববাসীর সাথে বাংলাদেশের জনগণও জানে। শুধু আফগানিস্তান বা পাকিস্তান নয় বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি এমন ঘটনা ও এর চেয়েও বড় ঘটনা ঘটার আলামত। অন্তত গত এক বছর ধরে বাংলাদেশে এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যেগুলোর সাথে হালাকু খানের আগুন দেওয়ার ঘটনার সাজুয্য আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে এরা কারা? যারা মানুষের জ্ঞান চর্চার পথ রুদ্ধ করতে চায়। মানুষকে অন্ধকারে রাখতে চায়। মানুষের প্রগতির চাকাকে থামিয়ে দিতে চায়। বিশ্বে যুগে যুগে, কালে কালে এমন কিছু অপশক্তি আসে যারা মানুষের উত্থানকে ভয় পায়, মানুষের জাগরণকে ভয় পায়। এরা কখনো বিদেশি শাসকের নামে, ধর্মের নামে, কখনো বা গণতান্ত্রিক শক্তির ছদ্মাবরণে ফ্যাসিবাদি আচরণ করে দেশে সমাজে ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। এক এক দেশে এক একটি বিষয়কে তারা অবলম্বন করে। কখনো (কট্টর) জাতীয়তাবাদ, কখনো ধর্ম, কখনো ভাষা বা বর্ণও হয়ে উঠতে পারে তাদের ফ্যাসিবাদ চরিতার্থের অস্ত্র। গত শতকের মধ্যভাগে জার্মানি-ইতালিতে এমন ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল। হিটলার জার্মানিদের বুঝিয়েছিলেন পৃথিবীকে শাসন করবে জার্মানরাই। অস্ত্র হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী বা জাতিগত অহংবোধকে। তিনি জার্মানদের উসকে দিয়েছিলেন। যুদ্ধংদেহি করে তুলেছিলেন আর তার এসব কাজে প্রচারণার জন্যে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছিলেন তার প্রচার মাধ্যমকে। গোয়েবলস ছিলেন তাঁর তথ্য উপদেষ্টা। গোয়েবলসের একটি উক্তি কুখ্যাত হয়ে আছে এখনো। তিনি বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে সত্য বলে দশবার প্রচার করো, একদিন তা-ই সত্যে পরিণত হবে’। ফ্যাসিবাদের চরিত্রই হচ্ছে জবরদস্তিমূলকভাবে তার মতামত ও শাসন চাপিয়ে দেওয়া, অন্যের মতামত বা অধিকারকে স্বীকার না করা। হিটলার মুসোলিনি একটি ফ্যাসিবাদি বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করে তা পদানত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বমানবতাবাদীদের কাছে, গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে তাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন।

ফ্যাসিবাদী আচরণ একদা ভারতে হিন্দুরাও করেছে। এক সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নির্মম,নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে ধর্মের উৎপত্তি ভারতে সে ভারত থেকেই তাদের বিতাড়িত করা হয়েছিল। মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও ফ্যাসিবাদি আচরণ করেছে। জ্ঞান বিজ্ঞান ও মানুষের জাগরণকে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে স্তিমিত করার চেষ্টা করেছে। গির্জার বিরুদ্ধে, রাজা-রাজন্যের বিরুদ্ধে বলাকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। কিন্তু এক সময় তাদের থামতে হয়েছে। মেনে নিতে হয়েছে সত্যকে। মানবাধিকারকে।

বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্ব চলছে। এবার এখানে তারা ভর করেছে জামায়াতে ইসলামির ওপর। আর জামাতি তার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ধর্মকে। জামায়াতে ইসলামি একটি রাজনৈতিক দল বলে দাবি করলেও রাজনৈতিক ময়দানে তার ওপর হামলা বা তার সাথে সংঘর্ষের ঘটনাকে ধর্মের বিরুদ্ধে আঘাত বলে প্রচার করে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের দলের নেতারা সাজাপ্রাপ্ত হলে তারা প্রচার করছে ইসলাম প্রতিষ্ঠা বা ইসলামি আন্দোলনের কারণে তাদের নেতাদের সাজা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রচারের জন্য তারা দেশে বিদেশে প্রচুর লবিস্ট ও প্রচারকর্মী নিয়োজিত করেছে কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে। বিদেশে তারা প্রয়োজনে ইহুদি লবিস্ট বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এরা প্রায়ই ইহুদি নাসারা বলে গালাগালি করে থাকলেও তাদের স্বার্থের কারণে এদের সাথে সখ্য গড়তে কার্পণ্য করে না। জামায়াত যে একটি ইসলামি দল নয় তা দেশের অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিখ্যাত আলেমরা মতামত দিয়েছেন। এমনকি জামায়াত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর পুত্রও জামায়াতকে একটি ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে জামায়াতকে আফিংয়ের সাথে তুলনা করেছেন।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী আবার নতুন করে ফ্যাসিবাদের উত্থান শুরু হয়েছে সেখানেও ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে তার মাধ্যম হিসেবে। মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও অমুসলিম দেশেও এদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মের সর্বজনীন ও চিরকালীন শান্তির পথ পরিহার করে সহিংস পথে এরা ধর্মের নামে মূলত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। ধর্মকে ভালোবেসে নয়। তাই কথায় কথায় এরা ধর্মের অপব্যাখ্যা দেয়। যা ধর্মকে অসম্মান করার সামিল। প্রয়োজনে ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটাতে পারে। পাকিস্তানে এরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্বাস্থ্য কর্মীদের কাজে বাধা দেয়। ফলে সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের টিকা খাওয়ানো বা দেওয়ার মতো জরুরি কাজ করতে পারে না। গত বছর বাংলাদেশে শিশুদের টিকা খাওয়ানো নিয়ে তারা গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ শিশুদের জীবন নিয়েও এরা মিথ্যাচার করতে পারে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদির ফাঁসির রায় ঘোষিত হলে, চাঁদে সাঈদিকে দেখা গেছে গুজব রটিয়ে সারাদেশে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। জ্বালিয়ে দেয় অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান, পুলিশ স্টেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের প্রধান কৌশল মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করার প্রক্রিয়ায় এরা সিদ্ধহস্ত।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের সবক’টি মুসলিম প্রধান দেশকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে মূলত ফ্যাসিবাদই তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে ধর্মের ওপর ভর করে। এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, অথচ গণতান্ত্রিক সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করার দাবি জানায় তারা। তারা প্রকাশ্যে কখনো গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আচরণ করে না। মিসরের ব্রাদারহুড ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামিও একই আচরণ করছে। বাংলাদেশে জামায়াত তাদের নেতাদের বাঁচাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সকল সুবিধা গ্রহণ করেছে, মামলা পরিচালনা করেছে, শক্ত আইনজীবী ও সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে। সেখানে হেরে গেলে এ বিচার মানি না বলে সারাদেশে রক্তক্ষয়ী হাঙামা করেছে। দেশকে অচল করে দিয়েছে, পেট্রোল বোমা মেরে নারী-শিশুসহ নিরপরাধ মানুষ জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

তাই বলছিলাম বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ভর করেছে জামায়াতের ওপর। আর জামায়াত ভর করেছে বিএনপির ওপর। বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিএনপি দেশের একটি অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। প্রশ্ন উঠতে পারে এত বড় একটি রাজনৈতিক দল যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে দু’বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেছে তাদের আমি ফ্যাসিস্ট বলি কী করে। আমরা যদি জার্মানে ফ্যাসিবাদের উত্থান বা হিটলারের উত্থানের পেছনে তাদের দেশের রাজনৈতিক দল ও সুশীল শ্রেণির ভূমিকা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব বাংলাদেশেও বর্তমানে তেমন পরিস্থিতি বিদ্যমান। পত্রিকার কলামের একটি নির্দিষ্ট আয়তন থাকে সে কারণে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া আজ সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি আগামী সংখ্যায় তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবো পাঠকদের।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 
email: qbadal@yahoo.com
Google+

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ