পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১২ জুন, ২০১৪

'বিশ্বকাপ জ্বর, বিদেশি পতাকা এবং দেশের ভাবমূর্তি'

দৈনিক আজাদী                          উপসম্পাদকীয়                              কাল আজ কাল
১২ জুন বৃহস্পতিবার ২০১৪ খ্রি: ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১ সাল ১৩ শাবান ১৪৩৫ হিজরি

-কামরুল হাসান বাদল

বিশ্বকাপ জ্বরে ভুগছে বিশ্ব। খেলাধুলার জগতে সবচেয়ে বড় আয়োজন বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। বরঞ্চ তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশিই। সারা দেশের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাড়িগুলোর ছাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় এই জ্বরে কতটা আক্রান্ত বাংলাদেশ।

এ লেখাটি পাঠকদের কাছে যেদিন যাবে তার আগের রাতেই শুরু হয়ে যাবে উত্তেজনাকর ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার খেলা দিয়ে বিশ্বকাপ ২০১৪ পর্ব। অনেকে রাতজাগা ক্লান্তি নিয়ে বা দেরিতে ঘুম থেকে উঠে ঘুম ঘুম চোখে পত্রিকা খুলে বসবেন।

প্রতিবার বিশ্বকাপের আগে (ফুটবল বা ক্রিকেট) একটি বিতর্ক তৈরি হয় দেশে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। যেহেতু ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং এর আয়োজন ও অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যাও অনেক সেহেতু যার যার সমর্থিত দেশ নিয়ে তার তার আবেগ, উত্তেজনা ও বাড়াবাড়িও থাকে বেশ এবং এর বহি:প্রকাশ ঘটে প্রায় ঘরে ঘরে প্রিয় দেশের (বাস্তবে ও দেশের ফুটবলের) পতাকা ওড়ানোর মধ্য দিয়ে। বিতর্কটি হয় তা নিয়েই, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। খেলা যতই কাছে আসতে থাকে ততই বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, উত্তেজনা বাড়তে থাকে সে সাথে বাড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের রকমারি পতাকার সংখ্যাও। আর এটাতেই অনেকের আপত্তি। পতাকা উত্তোলনকারীদের দেশ প্রেম, সাধারণ জ্ঞান এবং ঔচিত্যবোধ নিয়ে শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশিষ্টজনদের বিরূপ মন্তব্য। পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল লড়াই, তবে এবারের লড়াইয়ের ক্ষেত্র আরেকটু প্রশস্ত হয়েছে। বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ লড়াই এখন তুঙ্গে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষে-বিপক্ষের তুমুল বাড়াবাড়িকে অপছন্দ করছি। এটি বাঙালির হুজুগেপনা অস্থিরতা ও আদিখ্যেতার একটি প্রকাশ বলে মনে করি। আমার ছেলের যখন কিশোর বয়স তখন সেও একদিন এমন একটি বিশ্বকাপে কিনে নিয়ে এলো তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের পতাকা। টাঙ্গিয়ে রাখলো তার রুমে খেলা শেষ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিন পরেও। ও এখনও ওর প্রিয় দলের, (ফুটবল ও ক্রিকেট) জার্সি কেনে এবং ক্যাজুয়েলি তা পরিধানও করে। এখন তাকে কেউ জোর করলেও পতাকা কিনবে না, টাঙ্গাবে না। এমনকি রাত জেগে হয়ত খেলাও এবার দেখবে না কারণ পেশাগত ব্যস্ততায় সকাল ৯টার মধ্যেই তাকে তার কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। নিজের সন্তানের উদাহরণ দিলাম এজন্যে যে, প্রত্যক্ষ করেছি জীবন যাপন ও কর্মব্যস্ততা অর্থাৎ জীবনের বাস্তবতা মানুষকে কিভাবে বদলে দেয়। আমি আজ রাত প্রায় ১১টায় অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথে দেখলাম জামালখানের মোড়ে ব্রাজিলের বিশাল পতাকা নিয়ে কিছু কিশোর-তরুণ-আনন্দ প্রকাশ করছে। আমি নিশ্চিত এদের অধিকাংশই বলতে পারবে না ব্রাজিল কোন মহাদেশে অবস্থিত, তার আয়তন, লোকসংখ্যা, সে দেশের রাষ্ট্রপতি কে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে ওরা ব্রাজিলের সমর্থক, অর্থাৎ ব্রাজিলের ফুটবল দলের সমর্থক। ব্রাজিলের প্রতি ওদের ভালোবাসা ফুটবলের জন্যে। ওরা ভালোবাসে ব্রাজিলের ফুটবলকে, ব্রাজিলকে নয় এবং ওদের এই ভালোবাসা নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ছাপিয়েও নয়। আর্জেন্টিনা বা অন্য দেশের বেলায়ও তেমন। ওরা আর্জেন্টিনাকে চেনে ম্যারাডোনা বা মেসির জন্যে। অথচ চেনার কথা ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা বিপ্লবী চে গুবারার জন্যে। আসলে এদের এই সমবর্তের পেছনে কোনো রাজনীতি নেই আছে নির্ভেজাল আবেগ আর ভালোবাসা।

ওদের এই আবেগ ও ভালোবাসার ভুল ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি। এই দুর্নীতি, মিথ্যা, ভণ্ড, দুরাচার আর অপশাসন ভরা সমাজ ও রাষ্ট্রে এই তরুণরা একটি মাস অন্তত একটু আনন্দ বেদনায় আর উত্তেজনায় কাটাক না তাতে এমন ক্ষতি কি। ওরা তো দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে না, ওষুধে ভেজাল দিচ্ছে না, ফলে ফরমালিন আর কার্বাইড দিচ্ছে না। বিষাক্ত পানীয় বিক্রি করছে না, শিশু খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে না। দেশপ্রেম কি এতই ঠুনকো জিনিস কয়েকটি দেশের পতাকা ওড়ালেই তা খানখান হয়ে যাবে ! দেশপ্রেম কি এমন জিনিস যে কোনো পতাকা না উড়িয়ে তার প্রমাণ দিতে হবে?যে তরুণরা আজ ভিনদেশি পতাকা ওড়াচ্ছে বলে নিন্দিত হচ্ছে বয়স্কদের কাছে-বলতে দ্বিধা হয় সত্যিকার দেশপ্রেমের পরীক্ষা নিতে গেলে ওই বয়স্ক নিন্দুকেরাই হেরে যাবেন নবীনদের কাছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান একাত্তর এমনকি গণ জাগরণের বিশাল উদ্দীপনাতো এ তরুণরাই তৈরি করেছে, সফল করেছে। এ লেখাটি লিখতে বসার আগে আগেই খবরে শুনলাম যশোর ও সুনামগঞ্জ জেলার ডিসি সাহেবরা স্ব স্ব জেলার সমস্ত জায়গা থেকে ভিনদেশি পতাকা নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরে সাক্ষাত একজন মন্ত্রীও এমন একটি কথা বলেছেন। প্রিয় পাঠক এবার আপনারাই দেশপ্রেমের পরীক্ষায় ওসব তরুণ আর ডিসি মন্ত্রীকে ভাগ করুন। আমি কোনো মন্তব্য করলাম না।

আমাদের জাতীয় পতাকার নির্দিষ্ট মাপ আছে। পতাকার নির্দিষ্ট রং আছে এবং পতাকা আইনে তার ব্যবহারের নিয়মও উল্লেখ আছে। কিন্তু সারা বছর এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে ডিসি, মন্ত্রী এবং আমাদের সমালোচনাকারীরাতো প্রতিবাদ করেন না। আমাদের জাতীয় দিবসসমূহে এবং সরকারি ভবনে কোথাও তো পতাকা আইন যথাযথভাবে গণ্য করা হয় না। প্রায় সরকারি ভবনে বিবর্ণ ও ছেঁড়া-ফাটা পতাকা এবং কোথাও কোথাও সূর্যাস্তের পরেও পতাকা উড়তে দেখা যায়-সে বিষয়ে কারওতো কোনও মাথা ব্যথা নেই। জাতীয় দিবসে সরু কাঠির আগায় কোনো বোঁচকা পেটি থেকে প্রত্ন সামগ্রীর মতো উদ্ধার করা ‘দলামোচা’ মার্কা জাতীয় পতাকা ওড়ানোর দীনতা দেখেও যাদের মাথা লজ্জায় হেট হয় না তাঁরা কী করে অন্য দেশের পতাকা ওড়ানোর মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব দেখতে পান তা আমার বোধগম্য নয়। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন সব দেশের পতাকা ওড়াতে বাধা নেই শুধু পাকিস্তানি পতাকা ওড়ালে অনেকের গাত্রদাহ হয়। এটিও একুট মুর্খতা এবং গোঁয়ার্তুমী। যে দেশটি এদেশে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছে, যে দেশটি আমার প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে। যে দেশ থেকে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জিত হয়েছে যে দেশের সাথে, সে দেশের পতাকার সাথে অন্য দেশের তুলনা হয় না। ওদেশের পতাকা ওড়ালে যে ত্রিশ লাখ শহীদেরই অবমাননা হয় এ কথা যারা বোঝেন না তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যে ভিন্ন তা আমাদের বুঝতে বেগ পেতে হয় না।

যে রাষ্ট্র লক্ষ কোটি তরুণের জন্য একটু সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে পারে না, একটা খেলার মাঠের জায়গা দিতে পারে না, একটু খোলা আকাশ দিতে পাবে না। একটু নির্মল আনন্দ দিতে পাবে না সে রাষ্ট্র বা সমাজের কী অধিকার আছে তরুণদের সাময়িক আনন্দে বাধাদান করার। ওরা বাড়ির ছাদে বা গাছের ডালে অন্যদেশের পতাকা ওড়ালেও ওদের বুকের মাঝে প্রিয় বাংলাদেশ সতত সমুজ্জ্বল ও বহমান। খেলাকে সমর্থন করা আর দেশকে সমর্থন করা এক করে ফেলা উচিত নয়। ওসব দেশের সাথে তো আমাদের যুদ্ধাবস্থা নেই কাজেই সমর্থন করা না করার প্রশ্নটাও এত জরুরি কেন।

এই লেখাটি লিখতে বসার সময় (মঙ্গলবার মধ্যরাত) আরেকটি সংবাদে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান ও সহযোগিতার জন্যে কিছু বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্র ও ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল গত স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে। পরে জানা গেছে যে পদকে যে পরিমাণ স্বর্ণ দেওয়ার কথা তার মধ্যে পঁচিশ ভাগ আনা স্বর্ণও ছিল না। এ খবরটি নতুন নয়। কয়েক মাস ধরে এই কেলেংকারি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। আজ(মঙ্গলবার) রাতে শুনলাম সব ক্রেস্ট নতুন করে বানিয়ে দেওয়া হবে অতিথিদের। হায় লজ্জা! রাষ্ট্রীয় সম্মান যা আগে দেওয়া হয়েছে বিদেশি অতিথিদের তা নিয়েও এমন ন্যক্কারজনক চুরি। এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এই কেলেংকারির সাথে জড়িত স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ও।

দেশের সবচেয়ে কলংকময় এই জোচ্চুরির যথার্থ বিচার হোক আগে। এই অপকর্মের সাথে যারা জড়িত আমার ধারণা (তাদের পেশা, বয়স, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে) তাদের কেউ তাদের বাড়ির উপরে ভিনদেশি পতাকা লাগান না। কাজেই আমাদের আবেগ ও ভালোবাসায় অবুঝ তরুণদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না তুলে আগে দেশের সুনাম ও সম্পদ লুক্তনকারীদের বিচার হোক। ওদের মধ্যে সততা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা হোক আগে-তারপরে নেওয়া যাবে বাড়ির ছাদে অন্যদেশের পতাকা ওড়ানো কিশোর তরুণদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ