দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৫ বৈশাখ ১৪২০ সাল ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৫ বৈশাখ ১৪২০ সাল ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী
১১ এপ্রিল। গ্রাম বাংলার আর দশটি দিনের মতো ফটিকছড়ি, ভূজপুরের সাধারণ মানুষও শুরু করেছে তাদের স্বাভাবিক কর্মজীবন। গত কয়েকমাসে সারা বাংলায় ঘটে-যাওয়া জামায়াত-শিবিরের নৈরাজ্য-তাণ্ডব-ফটিকছড়িতে
এখন পর্যন্ত তেমন ঘটেনি। মোট কথা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান অন্য উপজেলার
তুলনায় কিছুটা শান্ত। যদিও একসময়ে ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ ‘বাংলার লেবানন
ইত্যাদি বলে-ফটিকছড়ির
এক প্রকার প্রচার ছিল দেশজুড়ে। সে বদনাম কিছুটা ঘুচে গেছে। বিশেষ করে বিগত
চার বছরে ফটিকছড়িতে তেমন কোন সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটেনি। একটি উজ্জ্বল
সূর্যোদয়ের সাথে ফটিকছড়ি-ভূজপুরের
মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে জীবনের পথে। কিন্তু সেই আলোকিত দিনেও কিছু
মৃত্যু দূত শান দিয়েছে অস্ত্রে গোপন অন্ধকারে। সেদিন ফটিকছড়ি উপজেলা
আওয়ামীলীগ আয়োজন করে হরতাল বিরোধী মিছিলের। এই মিছিল ভূজপুর থানা ঘুরে
দুপুরে ফটিকছড়িতে ফিরে আসার কথা। সে অনুযায়ী প্রায় দু’হাজার মানুষের খাওয়ার
ব্যবস্থাও করে রাখা হয়েছিল। এক সময়ের ছাত্রনেতা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, এ টি এম পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি মিছিল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কাজীরহাটে পৌঁছালে-“আওয়ামী লীগের কর্মীরা মসজিদে হামলা করেছে, তারা মাদ্রাসার হুজুরকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে’ বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে থাকা জামায়াত-শিবির ও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র আওয়ামী, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ওপর। মিছিলকারীরা কিছু বুঝে উঠবার আগেই শত শত মানুষ রাম দা, বটি, কুড়াল, লাঠি
ও অস্ত্র নিয়ে মৃত্যুর উল্লাসে মেতে ওঠে। ছাত্রলীগ কর্মীদের টেনে হিঁচড়ে
মাদ্রাসার শ্রেণীকক্ষে নিয়ে রাস্তায় বা যেখানে যে অবস্থায় পেয়েছে
পৈশাচিকভাবে খুন করেছে। সেদিন তারা মিছিলে অংশ নেয়া ২ শতাধিক মোটর সাইকেল, ১১টি জিপ ও পিকআপ, তিনটি
কার ও একটি নোয়া মাইক্রোবাস জ্বালিয়ে দেয়। প্রিয় পাঠক সেদিনের সেই পৈশাচিক
হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখানো হচ্ছে।
অনেকের ফেশবুকে ও মোবাইলেও ডাউনলোড করা আছে। এমন নির্মম নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক
হত্যার দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি। শুধু আমি নই কোন জঘন্য খুনি ছাড়া তা
দেখার সুযোগও কারো হয়নি। আমি বগুড়া, গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা, চট্টগ্রামের
বাঁশখালীর তাণ্ডব দেখিনি স্বচক্ষে। বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে ঘটনা ঘটে
যাওয়ার পরের দৃশ্য দেখেছি শুধু। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে।
হত্যার পরে উল্লাস করতে পারে সে সাথে নারায়ে তাকবির শ্লোগান দিতে পারে তা
বড় কষ্টকল্পিত। এ কোন মৃত্যু কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন?
সেদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেয়া ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের অপরাধ কি ছিল? মিছিলের
আগে তো যে কোন সংঘাত এড়ানোর উদ্দেশ্যে পেয়ারুল ইসলাম স্থানীয় মাদ্রাসার
হুজুরের সাথে আলাপও করে নিয়েছিলেন। ইবাদতের স্থান এবং আল্লাহর ঘর বলে মান্য
মসজিদের মাইকে এমন মিথ্যা ঘোষণা কে দিয়েছিল, কার নির্দেশে দিয়েছিল, আজ যারা ইসলামের ধ্বজাধারী ও সোল এজেন্ট সেজে ব্লগ কাকে বলে তা না জেনে শুনে যাকে তাকে নাস্তিক-মুরতাদ ঘোষণা দিচ্ছেন সে সব স্বঘোষিত আলেম-ওলেমারা
তো এই মিথ্যাচার নিয়ে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিন্দা জানানোতো দূরের
কথা একটু সমবেদনা বা দুঃখও তো প্রকাশ করলেন না। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে
তারা সবাইতো মুসলিম পরিবারেরই সন্তান। যাঁরা ধর্মের নামে মসজিদে দাঁড়িয়ে
মিথ্যা প্রচার চালিয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তাদের তুলনায় নাস্তিকরা খারাপ
কী সে। পৃথিবীর ইতিহাসে একজন নাস্তিক কোন মানুষ হত্যা করেছে তার মতবাদ
চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তেমন নজির কোথাও নেই। পবিত্র ধর্মকে পুঁজি করে যারা
ক্ষমতায় যেতে চায় তাদের মতো জঘন্য মানুষতো আর কেউ হতে পারে না। এই কারণে
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বা রাজনীতিতে ধর্মকে
ব্যবহার করা বেআইনি ঘোষণার দাবি উঠছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের
ব্যাপার। রাষ্ট্রের কিংবা রাজনীতির সাথে তাকে গুলিয়ে ফেললে দুর্বৃত্তরা এমন
সুযোগই কাজে লাগাবে। এখনো দেশের কোথাও না কোথাও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে তাতে
আহত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে পুলিশ বাহিনী।
এগুলোতো কোন সভ্য বা গণতান্ত্রিক দেশের চিত্র হতে পারে না। এরা কী চায়? কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশে। যে দেশ স্বাধীন হয়েছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা
ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মূল স্তম্ভ করে। এরা কথায় কথায় সংখ্যালঘুদের ওপর
হামলা চালায়। তারা তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে চায়। তাদের পরিকল্পনা মাফিক
এদেশ একদিন সত্যি সত্যি সংখ্যালঘু শূন্য হলে তখন তারা কাদের আক্রমণের
লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করবে? তখন কি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো প্রতি শুক্রবার দেশের কোন না কোন মসজিদে আক্রমণ বা বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের জিঘাংসাকে চরিতার্থ করবে? ওরা কি দেশকে সে পথেই নিয়ে যেতে চায়। কোন যুক্তি নয়, আলোচনা নয় হত্যা আর ধ্বংসই হবে ভিন্নমতকে মোকাবেলা করার উপায়?
মডারেট ইসলামি দল বলে পরিচয় দানকারী বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগরের আহবায়ক, রাজনীতিতে যার ক্লিন ইমেজ আছে বলে প্রচার আছে এই ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ২০০/ ৩০০
লোক অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসার সামনে দিয়ে গালি গালাজ করতে করতে যাচ্ছিল। তখন
গ্রামবাসী এসে তাদের আক্রমণ করেছে এটাই সত্যি ঘটনা। কী সুনিপুণ মিথ্যাচার।
তাঁর এই বক্তব্যে ফটিকছড়ির খোদ বিএনপি নেতারাই লজ্জা পেয়েছেন। এমন কি ঘটনার
পরে যে হুজুরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তাঁর
ছেলে মাওলানা জুনায়েদ বিন জালাল ঘটনার পরদিন সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, আমার বাবা মাওলানা জালালকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বলে মাইকে গুজব রটিয়ে একটি পক্ষ স্বার্থ হাসিল করতে এই কাজ করেছে।’ (সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১৪ এপ্রিল)
হেরোইনের মত কিছু নেশা আছে যা প্রথম প্রথম
খাওয়ার পরে এক প্রকার বিভ্রম তৈরি করে। প্রথম প্রথম তরুণরা যখন এই নেশায়
আসক্ত হতে থাকে তখন তাদের এই বিভ্রমকালকে রঙিন স্বপ্নের জগত বলে মনে হয়।
তারপর এক সময় এই নেশাই তার জীবনঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। এই নেশার বৃত্ত থেকে আর সে
বেরুতে পারে না। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদলসহ দেশের কিছু সাংবাদিক
বুদ্ধিজীবী এখন এই নেশার প্রাথমিক বিভ্রমে ভুগছেন। এই নেশাকে অবলম্বন করে
ক্ষমতায় যাওয়ার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে আবোল তাবোল বকছেন। কিন্তু এ নেশা বড়
ভয়ঙ্কর। একবার আসক্ত হয়ে পড়লে আফগানিস্তান হয়ে যেতে হবে। আর এই নেশা যারা
বিক্রি করেন তারাও আসক্ত হন আর তাদেরও পরিণতি হবে পাকিস্তানের মতো।
তাই বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সাবধান করতে গিয়ে বলি এখনো সময় আছে এই ভয়ঙ্কর নেশা, এই
ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবকে এখনই থামাতে হবে। নতুবা রঙিন স্বপ্ন একদিন বিভ্রম
থেকে বিপত্তি ও সর্বনাশ ডেকে আনবে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়।
যারা গণতন্ত্র মানে না, মানবতা
মানে না। যারা একটু ভিন্নমত পোষণ করলেই হত্যার মচ্ছবে মেতে ওঠে তারা কখনোই
মানুষ বা মানবতার বন্ধু হতে পারে না। হিংস্র এই দানবদের বিশ্বাস করে দেশ ও
জাতির সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। প্রিয় রাজনীতিকগণ অপার সম্ভাবনার এই
বাংলাদেশকে রক্ত পিপাসুদের হাতে তুলে দেবেন না। আপনি বা আপনারা হয়ত পালিয়ে
অন্য দেশে যাওয়ার আর্থিক ব্যবস্থা করে রেখেছেন কিন্তু কোটি কোটি সাধারণ ও
নিরীহ মানুষকে কিছু হিংস্র প্রাণির সামনে ছেড়ে দিয়ে যাবেন না। দয়া করুন
জাতিকে। আফগানিস্তানে তালেবানিদের কাছে মার্কিনীদের দেয়া অস্ত্র ও অর্থ
সরবরাহ করতে করতে পাকিস্তান নিজেই আক্রান্ত হয়েছে তীব্র নেশায়। অনেক দাম
দেওয়ার পরে এখন পাকিস্তানের বোধোদয় হয়েছে। একটু পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।
এবার প্রথমবারের মতো মেয়াদ পূর্ণ করেছে জাতীয় পরিষদ। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্তটি
হলো পাকিস্তানে নির্বাচনী প্রচারে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না বলে নির্দেশ
দিয়েছে সে দেশের নির্বাচন কমিশন।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকেও শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ।
email: qbadal@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন