পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৩

' ভাল মানুষও যখন মন্দ কাজ করেন '

কামরুল হাসান বাদল

গত ২০ এপ্রিল শনিবার ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সমাবেশ বা আয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নাগরিক সমাজের জাতীয় সম্মেলন। জাতীয় ঐক্যের সমাবেশ ও নির্মূল কমিটির আলোচনা সভা অন্যতম। আমি তার মধ্যে দুটি সমাবেশ এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করব আজ।
বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ আহবান ভিত্তিক নাগরিক সমাজের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে শনিবার সকালে রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ মিলনায়তনে। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ। পাঁচ দফা দাবি সংবলিত ঘোষণা পাঠ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডাসারওয়ার আলি । এই সমাবেশের দাবিগুলো হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাযুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করাসাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোমুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেয়া ও মুক্তচিন্তার পথ খোলা রাখাতালেবানি রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা প্রতিহত করা ও নারীর অধিকার সমুন্নত রাখা। গণজাগরণ মঞ্চসহ ঢাকা ও বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংগঠনের প্রতিনিধিবেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাবামপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সুলতানা কামাল অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসানজীদা খাতুনসৈয়দ শামসুল হককামাল লোহানী,অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালরামেন্দু মজুমদারনাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুস আরেফিনআবেদ খানরানা দাশ গুপ্তখুশি কাবরসহ অনেকে। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে অতীতের মতো মূল্য দিতেও আমরা প্রস্তুত।’
প্রিয় পাঠক একই দিন রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে ‘জাতীয় ঐক্যের’ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ড.কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে। ‘জাতীয় স্বার্থে জাতীয় ঐক্য’র আহবান সম্বলিত এই সমাবেশের মঞ্চের পেছনে ব্যানারে মাত্র দুটো দাবি লেখা ছিল। একটি হলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচারের দাবি। এই সমাবেশটির সভাপতির নামটি আগে উল্লেখ না করলে মনে হতে পারতো এটি বিএনপি-জামাত সমর্থিতকোন পেশাজীবী সংগঠনের সমাবেশ। যাক আমরা এক নজরে দেখে নিই এই সমাবেশে আর কারা কারা উপস্থিত ছিলেন। গণফোরামের মহাসচিব মোস্তফা মহসীন মন্টুর পরিচালনায় বক্তৃতা করেন আকবর আলি খানমাহমুদুর রহমান মান্নাশাহদীন মালিক বদিউল আলম মজুমদারএকে আজাদসৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ। (তথ্য প্রথম আলো)
প্রথম সমাবেশ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ রুখে দাড়াও’ নিয়ে বিশদ বলবার প্রয়োজন নেই। তাদের দাবিগুলো লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি এবং সভাপতি হিসেবে ডআনিসুজ্জামানের বক্তব্যের সারাংশটুকু উদ্ধৃত করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরে সারাদেশে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সাথে বিএনপি হেফাজতের লাগাতার ধ্বংসনৈরাজ্যখুনখারাবী বিপরীতে দেশের মুক্তচিন্তার কিছু ব্যক্তি ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে মৌলবাদীসাম্প্রদায়িক জামায়াত-শিবির হেফাজতের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বাঙালিকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন গত ১ মাসেরও অধিক সময় আগে। সাম্প্রদায়িক এই অপশক্তি দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার লক্ষ্যে লাগাতার হরতাল অবরোধভাঙচুরঅগ্নিসংযোগলুটপাটপুলিশের ওপর আক্রমণ ও হত্যা,বাঁশখালীবামনডাঙ্গাবগুড়াসাতক্ষীরাচাপাইনবাবগঞ্জমিঠাপুকুর সাতকানিয়া এবং সর্বশেষ চট্টগ্রামে ফটিকছড়িতে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম হত্যাকাণ্ড পরিচালিত করেছে। দেশের অপার সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ভেঙে দিয়েছে দেশের সুশৃঙ্খল শিক্ষা-ব্যবস্থাকে। শুধু তাই নয় সাদেক হোসেন খোকা থেকে শুরু করে বিএনপির প্রায় সব নেতারাই প্রকাশ্যে বলছেন দেশের প্রতিটি উপজেলায় ফটিকছড়ির মতো ঘটনা ঘটাতে হবে। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টস কারখানাগুলো। পরিবহন সংকটের কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে নির্মমভাবে। গত দু’মাসে জামায়াত-শিবির-বিএনপি-হেফাজতের হরতাল অবরোধ আর তাণ্ডবে দেশের লক্ষ কোটি টাকার ওপর ক্ষতি হয়েছে। জিডিপি প্রত্যাশিত মাত্রা ৬-৭ থেকে নেমে ৫ এসে ঠেকেছে। জাপানসহ কয়েকটি দেশ বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। দেশের স্মরণকালের এই মহা দুর্যোগকালে দেশের বরেণ্য সন্তানরা মিলিত হয়েছেন পরম উৎকক্তায়। তাঁরা এই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে যোগ্য আইনজীবী ব্যর্থ রাজনীতিক ডকামাল হোসেনমাহমুদুর রহমান মান্নারা মিলিত হয়েছেন ঐক্যের ডাক দিয়ে। তাদের ব্যানার দেখেআমি পূর্বেও বলেছি যে কারও ভুল হতে পারে যে,এটি বিএনপি জামাত সমর্থিত কোন সংগঠনের সমাবেশ। যে দাবি দুটো নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রায়ই দেখা যায় জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন সংগঠনকে মানববন্ধন করতে। ডকামালমান্না মকসুদ সাহেবরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বা সংকটের মূল কারণ হিসেবে খুঁজে পেয়েছে একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ইস্যু। যেন এটিই হলেই দেশের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জামায়াত-শিবিরের এত নৈরাজ্য
তাতে বিএনপি’র খোলাখুলি সমর্থন দানহেফাজতে ইসলাম নামক জামায়াত-বিএনপি’র বি টিম বলে খ্যাত এই নব্য ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর সংবিধান বিরোধী ১৩ দফা দাবি যেন কোন সমস্যাই নয়। বিগত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণমন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর,অগ্নিসংযোগ কিছুই তাদের বিচলিত করে না। ফটিকছড়ির নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাদের বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না এবং এ বিষয়ে এদের দৃঢ় কোন বক্তব্য বা অবস্থানও নেই। এদের চোখে দু’দলই সমান। এদের চোখে সব সমস্যার মূলে বর্তমান সরকার যারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মেনে নিলেই দেশে শান্তি নেমে আসবে। সে সাথে তাঁরা আরেকটি দাবিও করেছেন নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করা।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে আমাদের কারো কোন দ্বিমত নেই। আওয়ামী লীগও তা অনুধাবন করে। কিন্তু কথা হলো তার জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেনআজ যেই নেত্রী এবং তার সহযোগী ১৮ দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন দাবি করছেন সেই চলমান সংসদে তো গত চার বছরে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী ৪ ঘণ্টাও অবস্থান করেননি সব মিলিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হলেই কি বিএনপি ক্ষমতায় যাবেতত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও কি অনন্তকাল ধরে চলবেনা কি ডকামালমান্নার মতো সুশীলরা যাওয়ার মতো কোন ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কারণ আবার যদি বিএনপি জিততে না পারে তখনও কি বিভিন্ন অজুহাতে বর্তমানের মতো বছরের পর বছর সংসদ বর্জন করবেন তারাহেরে গেলেও বিএনপি সংসদ বর্জন করবে না সে নিশ্চয়তা নাগরিক ঐক্য কীভাবে পেলোদ্বিতীয়ত বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় মরহুম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে একটি সার্চ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই কমিটিতে তখন বিএনপি সহযোগিতা করেনি কেনকামালমকসুদ সাহেবরাও তখন নীরবতা পালন করেছিলেন কার স্বার্থে?
নিজেদের নেতা যারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত তাদের বাঁচাতে দেশকে অচল করে দিতে চায়যারা ১৩ দফার নামে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও চেতনাকে নস্যাৎ করে দেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে চায় তাদের বিষয়ে রহস্যময় নীরবতা পালন করে নাগরিক ঐক্য কী ধরনের ঐক্য গড়তে চায় দেশে?
রাজাকারের সাথে মুক্তিযোদ্ধারকট্টরউগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি হেফাজতের সাথে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল শক্তিরতবে সে আশায় গুড়ে বালি। বাংলাদেশে কখনো তা ঘটবে না। গণজাগরণের মাধ্যমে দেশের লক্ষ কোটি তরুণের যে জাগরণ তৈরি হয়েছে দেশে শত মিথ্যা অপপ্রচারে বিভক্ত হবে না এই শক্তি। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সংগ্রাম মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যেরধ্বংসের বিরুদ্ধে নির্মাণেরঅমঙ্গলের বিরুদ্ধে কল্যাণেরপশুত্বের বিরুদ্ধে মানবতারহিংসার বিরুদ্ধে অহিংসার। বিশ্বের কোথাও কখনো মিথ্যার চিরস্থায়ী জয়লাভ ঘটেনি। বাংলাদেশেও ঘটবে না। নাগরিক ঐক্যের মাধ্যমে যতই বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হোক না কেন। কথায় বলে, ‘টাকা যখন কথা বলে ঈশ্বর তখন চুপ করে থাকে’। জামায়াতের হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে কথা বলা শুরু করেছে। এখন কী দেখছি। সামনে আরো বহু কিছু দেখার বাকি আছে।
নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘সমাজের যে সব সময় মন্দ লোকেরা ক্ষতি করে তা কিন্তু নয়,ভাল লোকেরাও ক্ষতি করে যখন তারা জাতির ক্রান্তিকালে চুপ করে থাকেন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য এখানে যাদের ভাল লোক বলে এতকাল জেনে এসেছি তাঁরা নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বলছেন বটে তবে তা মন্দ লোকদের পক্ষেই বলছেন। এই পরিস্থিতিকে বোনাপার্ট কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন বুঝতে পারছি না।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

পোস্টসমূহ