২১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২০ সাল ১৬ মহররম ১৪৩৫ হিজরী
- কামরুল হাসান বাদল
প্রিয় পাঠক, জনগণ হিসেবে যখন আমাদের করার কিছুই নেই তখন এক কাজ করা যায়। বসে বসে ভাবা যায়। ‘কী হইলে কী হইত’ ধরনের। নিকট অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়েই শুরু করি। ধরুন সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়ে যদি মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা বলতেন, যাক দেরিতে হলেও যখন আপনি নিজেই ফোন করেছেন, আপনার কথাই রাখলাম। হরতাল প্রত্যাহার করে নিলাম। আমি আপনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আলোচনার জন্য আসছি। মাননীয় বিরোধীদল নেতা গণভবনে গেলেন এবং আলোচনার সূত্রপাত করলেন। বিরোধী দলীয় নেতা বললেন, যেহেতু আমি গেস্ট, আপনি হোস্ট। আপনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছেন সেহেতু আমার কথাই আপনাকে আগে শুনতে হবে। বেগম জিয়া বললেন, আমার দাবি ছিল নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। আপনি তা চান না। আপনি চান সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। ঠিক আছে, আমি এক পা পেছনে গেলাম। বাদ দিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি। আপনার ফর্মূলাতেই নির্বাচনে যাব তবে এবার মাত্র দুটো দাবি মেনে নিন। প্রথম দাবি সংসদে আসন হিসেবে নয়, ভোটের হিসেবে নির্বাচনকালীন সরকারের ১০ জন মন্ত্রীর মধ্যে আমাদের পাঁচ, আপনাদের পাঁচ। এই সরকার প্রধান হিসেবে আপনাকে (শেখ হাসিনাকে) মেনে নেব না। অন্য কাউকে নির্বাচিত করতে হবে যার প্রতি আমাদেরও আস্থা আছে। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেছিলেন, যেসব মন্ত্রণালয়চান আপনাদের তা দেওয়া হবে। সে সুযোগও খালেদা জিয়া কাজে লাগাতে পারতেন। বলতে পারতেন, স্বরাস্ট্র, তথ্যও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের মতো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন কয়েকটি মন্ত্রণালয় আমাদের দিতে হবে। এরপরের ঘটনা কী হতো? আওয়ামী লীগের দফা রফা হতো। তখন আওয়ামী লীগেরই দায়িত্ব হতো বিরোধী দলের দাবি মেনে নেওয়া নতুবা পাল্টা কোনো অজুহাত তৈরি করা। কিন্তু তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোনে সরাসরি ধমকিয়ে গেছেন পুরো ৩৭ মিনিট। পরে অবশ্য দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। টেলিফোনের বিষয়টি নিয়ে ছোট্ট করে একটু বলতে চাই। এই টেলিফোন সংলাপের পরে আওয়ামী লীগ (বিরোধী) শিবিরে দুটো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এক পক্ষ বলেছেন, আমাদের নেত্রী আচ্ছা ধোলাই দিয়েছেন হাসিনাকে। ৩৭ মিনিটতো কোনো কথাই বলতে দেন নাই। দুই পয়সারও পাত্তা দেন নাই আমাদের নেত্রী হাসিনাকে। অন্যপক্ষ বলছে এটি সরকারের একটি পাতানো ফাঁদ। শেখ হাসিনা জানতেন যে এই কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে, অতএব তিনি সংযত হয়ে কথা বলছেন। এর উত্তরে আমি পূর্বেই লিখেছি। টেলিফোনে আড়িপাতা হবে না বা রেকর্ড হয়ে তা জনসম্মুখে আসবে না এমন ভাবনা যাদের তারা অদূরদর্শী ও অনাধুনিক। এটিও আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয়। আর একজন প্রধানমন্ত্রী নয়, সাধারণ একজন আমন্ত্রণকারীর কথাও যে ধৈর্য ধরে শুনতে হয়, ভদ্রভাবে জবাব দিতে হয় তা শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন। অসৌজন্যতা, অভব্যতা বিজয়ী হওয়ার পন্থা নয়। এভাবে যারা জিততে চান তারা মূলত গণতন্ত্রের বন্ধু নন। যাক আমরা জনগণ ভাবলেতো আর হবে না। নেতানেত্রীকে ভাবতে হবে। তাঁরা যে সবসময় আমাদের কথা মাথায় রেখে কাজ করেন তা তো নয়। তাঁরা চলবেন তাঁদের মতো আমরা শুধু পেছন থেকে জিন্দাবাদ োগান দিয়ে যাব। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ ভাবতেই পারেন সেদিন বেগম খালেদা জিয়া সামান্য একটু নমনীয় হলে আজকের দিনগুলো অন্য ধরনের হতো। কিন্তু তা তিনি হননি। হননি কারণ তিনি পরাজিত (!) হতে চান না। অর্থাৎ নির্বাচনের আগেই তিনি জিততে চান। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে ও পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া সরকারের পছন্দের বিচারপতি এম আর হাসানের অধীনে নির্বাচনে যাননি শেখ হাসিনা। কাজেই তিনিও শেখ হাসিনাকে দিয়ে এসব কাজ করিয়ে নিতে চান। এক-তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন। দুই. হাসিনার পদত্যাগ ও এই সরকারের মনোনীত বা পছন্দের কারও অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া। নিজদলীয় সংসদ সদস্যদের দ্বারা গঠিত সরকারের চেয়ে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ওপর বেগম জিয়ার আস্থা বেশি কেন বুঝতে পারছি না। আর বর্তমানে যেভাবে দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ হতে যাচ্ছে তার ভবিষ্যত কী হবে তা-ও আমি বুঝতে পারছি না।
তবে এতকিছু পরেও আমি বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বড় একটা দোষ দিই না। কারণ জনগণ চায় বলেই এমন নেতৃত্ব দেশে টিকে আছে। এমন সব ব্যক্তি নেতৃত্ব দিচ্ছেন বা নেতারা সম্মান পাচ্ছেন তা দেখলে শিহরিত হতে হয়। একটি আপ্তবাক্য মনে পড়ে আমার। চোরের সর্দার চোর হয়,ডাকাতের সর্দার ডাকাত। আউলিয়ার সর্দার হয় আউলিয়া। দেশের জনগণ যদি সৎ নেতৃত্ব, যোগ্য নেতৃত্ব চাইতো তবে রাজনীতিতে সৎ মানুষদের কদর বাড়তো।
রাজনীতি পরিশুদ্ধ হতো। রাজনীতি থাকতো সৎ মানুষের হাতে। পেশি শক্তি, কালো টাকার মালিক আর ফার্মের রাজনীতিকদের আখড়ায় পরিণত হত না রাজনৈতিক দলগুলো। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি ব্যক্তি সৎ হলে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সৎ হতে বাধ্য। আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, পেশাজীবী সংগঠন থেকে শুরু করে প্রতি স্তরেই নোংরা রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত আজ দলদাসে পরিণত হয়েছেন। জাতির এই সংকটকালে একটি অভিভাবক শ্রেণি নেই দেশে যাঁদের কথা বা পরামর্শে জাতি একটি দিক নির্দেশনা পেতে পারেন। অনেকেতো ভয়ে আমাদের গৌরবের,অহংকারের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, ত্রিশ লক্ষ শহীদ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। পাছে তিনি আওয়ামী বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। স্বাধীনতার সমস্ত সুফল ভোগ করেও যারা স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আশ্চর্য নীরবতা পালন করেন তাদের সততা ও পৌরুষ নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থেকে যায়। এখন প্রতিদিন আমাদের নিত্য নতুন চমকের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এখনই বলা যাচ্ছে না আগামী দুঘণ্টা পরে দেশে কী ঘটতে পারে। এমন একটি অনিশ্চিত পরিবেশে দেশে যে কোনো কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব। সেটি রাষ্ট্রীয় হোক অথবা সামাজিক হোক। সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন অনেক দুষ্টচক্র থাকে যারা এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নিতে বলে বেগম খালেদা জিয়া নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে পারেন নি। তারা বঙ্গভবনে গিয়ে তাঁদের পুরনো দাবি-দাওয়াগুলোই তুলে ধরেছেন শুধু। বাস্তবে যা সম্ভব হবে না বলেই মনে হয়। এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার আগেই যদি সংসদ ভেঙে যায় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু সুরাহা না করে, তবে বর্তমান পদ্ধতি ও নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে। সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও হবে। অর্থাৎ নির্বাচন একটি হতে যাচ্ছে দেশে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি যদি মনে করে তাদের ছাড়া নির্বাচন করে সরকারকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ফলভোগ করতে হবে সেটিও হয়ত ভুল চিন্তা বিএনপির। কারণ ১৯৯৬ সালের বাস্তবতা আর ২০১৩ সালের বাস্তবতা এক নয়, বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিও অনেক পাল্টে গেছে ইতোমধ্যে আর সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপিযে আওয়ামী লীগের মত সমর্থ নয় তা পরীক্ষিত। আর জামায়াতের অর্থ নিয়ে ভাড়াটে লোকদের দিয়ে সারাদেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টাও বেশিদিন চালানো যাবে বলে মনে হয় না। কারণ এই হত্যা-ধ্বংস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই জনমত তৈরি হতে শুরু করেছে। সে সাথে সাধারণ মানুষ মনে করছে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য তাকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত। এটি শুধু দেশের জনগণের ভাষ্য নয়, বিএনপির প্রতি সমর্থন আছে এমন বন্ধুরাষ্ট্রগুলোও চায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করুক। যারা বিএনপি নেতৃত্বকে বোঝাতে চায় বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করলে ভোট ব্যাংকে ঘাটতি পড়বে তারা দলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। বাস্তবে জামায়াতের ৩ শতাংশ ভোট বিএনপি না পেলেও অন্যভাবে এরচেয়ে কয়েক শতাংশ ভোট বরং বেশিই পাবে।
খই ভাজতে ভাজতে রাজনীতি নিয়ে অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, বাংলাদেশ সামাজিক,অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ভাবে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে তার সাথে যদি রাজনীতিকরা নিজেদের সামিল করতে না পারেন তবে দেশের সৎ, পরিশ্রমী ও ভালো মানুষরা দ্রুত রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বেন। কারণ মানুষ তাদের শ্রমে-ঘামে গড়া এই বিশাল অর্থনৈতিক ভিত দুর্নীতিবাজ ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবে না।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন