৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি: ২৩ কার্তিক ১৪২০ সাল ২ মহররম ১৪৩৫ হিজরী
-কামরুল হাসান বাদল
এক। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সারা বিশ্বের মুরুব্বি। বলতে গেলে তার ইচ্ছেতেই পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ব। অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করেই ক্ষান্ত নয় দেশটি, বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সেসব দেশের নেতারা কার সাথে কী আলাপ করছেন তা-ও আড়ি পেতে শোনার ব্যবস্থা করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন। দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে তাদের এমন শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে আর বিশ্বের বিবেকবান মানুষগুলো স্তম্ভিত হচ্ছে। যাক সে কথা- যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যখন কালো মানুষদের কোনো ভোটাধিকার এমন কি নাগরিক অধিকারও ছিল না সে সময়েও আমাদের ভূখণ্ডে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং সে নির্বাচনে নারী পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভোটার ভোট দিয়েছে। তাছাড়া মার্কিনীরা যখন জাহাজে করে আফ্রিকার সহজ-সরল কালো মানুষদের তাদের মুল্লুকে এনে ক্রীতদাস হিসেবে কেনা-বেচা করতো তারও বহু আগে এই উপমহাদেশের এক প্রখ্যাত কবি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। মার্কিনীদের ইতিহাস হচ্ছে অস্ত্র ও যুদ্ধের ইতিহাস। পররাষ্ট্র দখল ও ভোগ করার ইতিহাস। আর বাংলার ইতিহাস হচ্ছে শান্তি ও সৌহার্দ্যের ইতিহাস। কারণ বাঙালির দ্বারা আজ পর্যন্ত কোনো জাতি ও দেশ আক্রান্ত হয় নি, লুণ্ঠিত হয় নি। কাজেই শান্তিপ্রিয় ও সভ্য জাতি বলতে গেলে মার্কিনীদের আগে বাঙালির নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত।
দুই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৭১’র ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রাক্কালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পর এই দেশের একজন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডিকে যখন ‘রাবিশ’ বলেছিলেন সেদিন গর্বে আমার বুক ভরে গিয়েছিল। কোন সাহসে বাংলাদেশের একজন অর্থমন্ত্রী একথা বলার সাহস রাখেন এবং কিসের জোরে এদেশের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন সে কথাই বলার চেষ্টা করছি এখন।
তিন। কার্তিকের মঙ্গা এখন বাংলাদেশের জন্য শুধুই অতীত। কৃষকের আন্তরিক পরিশ্রম ও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সেসব দুঃসহ কাল আর ফিরে আসবে না বলেই মনে হয়। প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে আমন ধান ঘরে তোলার আগে আগে সারা দেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় দেখা দিত মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষ। লাখ লাখ মানুষ খাদ্যের অভাবে কষ্ট পেতো। শুধু আশ্বিন-কার্তিক নয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো।
গত শতকের ৭০ দশক। আমাদের স্বাধীনতার আগে পরে এদেশের লোকসংখ্যা ছিল ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি। এর ৪২ বছর পরে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অথচ দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশেষ করে গত তিন বছরে এক কেজি চালও আমদানি করতে হয় নি সরকারকে। বরং সুগন্ধি চাল ও ভুট্টা রফতানি করছে বাংলাদেশ। প্রিয় পাঠক এ হিসেব আমার মন গড়া নয়। গত অক্টোবরে বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বিশ্বের ক্ষুধা সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। আর এভাবেই প্রধান খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্যে পথিকৃৎ। বিশ্বের প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম ও মিসরই রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। আর হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদনের হিসেব ধরলে বাংলাদেশের ওপরে আছে মাত্র ভিয়েতনাম ও চীন।
চার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিউবায় চট রফতানি করার অপরাধে ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর থেকে খাদ্যভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছিল। আর সে দুর্ভিক্ষের কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকারকে সবচেয়ে বড় বিব্রতকর ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। ঘরে চাল থাকলে তো শাক পাতা কুড়িয়েও ভাত খাওয়া যায়। এই বাংলাদেশ এখন মার্কিনীদের রাবিশ বলতেই পারে।
পাঁচ। এ-তো গেল শুধু কৃষিখাত। গত ২ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে একটি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ‘জীবনযাপনের জন্য ভারতের চেয়ে ভালো বাংলাদেশ’। এটি নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের উদ্ধৃতি নয়। তিনি তো এ বিষয়ে অনেক আগেই তাঁর মতামত ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান জরিপটি চালিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক লেগাটাম ইনস্টিটিউট। লেগাটাম প্রসপারিটি ইনডেক্স শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদনে বসবাসের উপযোগিতার দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম। ভারতের অবস্থান আরো তিন ধাপ পিছিয়ে ১০৬তম। এই জরিপে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে নিত্য দিনের জীবন উপভোগের জন্য ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ ঢের ভালো এবং ভবিষ্যতে আরো সুন্দর জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে।
ছয়। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কয়েক কোটি মানুষ এখন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশম স্থানে ছিল এশিয়ায় দু’বছর আগে। দারিদ্র্যের সংখ্যা চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। কমেছে শিশু মৃত্যু ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যুহার। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কমেছে নিরক্ষরতার হার। এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর হাতে কয়েক কোটি নতুন বই তুলে দেওয়া হয় বছরের প্রথম দিনেই। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলারেরও বেশি। বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল দশটি নগরীর মধ্যে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম একটি।
মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে গণতন্ত্র বিদ্যমান। (সকল সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই)এখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, স্পিকার নারী। এছাড়া বিচারপতি,ডিসি, এসপি, সশস্ত্র বাহিনীসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
সাত। বাংলাদেশে এত যে অগ্রগতি তার পেছনে এদেশের সাধারণ মানুষের ভূমিকা যেমন তেমনি ভূমিকা আছে রাজনীতিকদেরও। তবে সবচেয়ে বড় অবদান বাংলার কৃষকদের। যারা রাতদিন পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। অবদান আছে শ্রমিক বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত নারী শ্রমিকরা, যারা কম বেতনে মানবেতরভাবে বছরের পর বছর রফতানির চাকা সচল রেখেছেন। অবদান আছে প্রবাসী ভাইদের, যারা বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের যে অবদান একদম নেই তাই বা বলি কী করে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সময়মত সার ও কীটনাশক এবং সেচের জন্যে বিদ্যুতের সরবরাহ না দিলে উৎপাদন তো ব্যাহত হতো। গত তিন বছরে যে, এক কেজি চালও আমদানি করতে হয় নি সেখানে কি বর্তমান সরকার ও তার কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর একটুও অবদান নেই। নিশ্চয়ই আছে। রাজনীতিকদেরও অবদান আছে। তাদের অবদান আরো উজ্জ্বল হবে যদি তারা বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কৃষি, শিল্প, তথা অর্থনৈতিক এই অগ্রযাত্রায় তাদের রাজনীতিকেও জড়িত করেন। তারা যদি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল একটি রাষ্ট্র উপহার দিতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের এই সাধারণ মানুষ তথা অশিক্ষিত কৃষক- শ্রমিকরা একটি উন্নত বাংলাদেশ উপহার দিতে পারত। খুব বেশি নয় আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের দেশে এমন কি ইউরোপের কয়েকটি দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে পারত। আমাদের রাজনীতিকরা কি বাংলাদেশের এমন অগ্রযাত্রায় নিজেদের শামিল করবেন? নাকি হরতাল- অবরোধ, নৈরাজ্য, ধ্বংস, হত্যার উৎসব অব্যাহত রেখে দেশকে চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবেন। দয়া করে শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে মারদাঙা জাতিতে পরিণত করবেন না। আজ যখন বর্তমান বিরোধী জোটের নির্মম-নৃশংস হরতালের বিরুদ্ধে বলি তখন কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরোধী দল থাকাকালীন হরতাল নৈরাজ্যের প্রসঙ্গ তোলেন। আমি বলি এমন পাল্টাপাল্টি জেদ না করে এমন কর্মসূচিকে এখনই ‘না’ বলুন। আর প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করুন এমন নৈরাজ্যমূলক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি কোনো দল ভবিষ্যতেও দেবে না।
এই দাবিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। তথাকথিত সুশীল শ্রেণি যারা রাতদিন শুধু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবি তুলে মুখে ফেনা আনছেন তাদের সবিনয়ে বলি, ’৯১ থেকে এ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ফলাফল তো পরাজিত কোনো দলই মেনে নেয় নি। শুধু তাই নয় তারা সংসদেও উপস্থিত থাকে নি। সংসদ কার্যকর হয় নি। বরং বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে সম্পদ আর জীবনহানি ঘটিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফেরার আগে এই বিষয়গুলোর মীমাংসা হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের যে অগ্রগতির কথা তুলে ধরলাম এর পেছনে যাদের ন্যূনতম ভূমিকা নেই সে শক্তির কোনো দাবির প্রতি সমর্থন জানানোরও কোনো প্রয়োজন নেই। এদেশ পরিশ্রমী ও মুক্তিকামী মানুষের। পরজীবীদের নয়।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
Google+
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন