পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই, ২০১২

* 'অসমাপ্ত ‘আত্মজীবনী’ এক পবিত্র গ্রন্থ' - ১

দৈনিক আজাদী                                  উপসম্পাদকীয়                      কাল, আজ, কাল

১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার ২০১২ খ্রি ৪ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ২৮ শাবান ১৪৩৩ হিজরি


“বন্ধুবান্ধবরা বলে তোমার জীবনী লেখ”। সহকর্মীরা বলে, “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলী লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে”। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, “বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনকাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না, আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”....

“হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভাল না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কি? সময় তো কিছু কাটবে। বই ও কাগজ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে চোখ দুইটাও ব্যথা হয়ে যায়। তাই খাতাটা নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আমার অনেক কিছুই মনে আছে। স্মরণ শক্তিও কিছুটা আছে। দিন তারিখ সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক হবে বলে আশা করি। আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেনু আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেনু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।”

এ যাবতকালের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ’ অসমাপ্ত আত্মীজীবনী’র শুরুর অংশ বিশেষ এটি। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর চিঠিগুলো যখন ইতিহাসের অংশ হতে দেখতাম, কিংবা বিশ্বের অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী পড়ার, দেখার অথবা শোনার সুযোগ হতো তখন আমি এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু কি কোনদিন কিছু লিখেননি?তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে কারো কাছে কি একটি চিঠিও লিখেননি। এমন কি তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের কাছেও? তিনি লিখলে কেমন লিখতেন। ’৭৫ এ তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপরে দীর্ঘকাল তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁকে নিয়ে এতসব অপপ্রচার,নিন্দা আর কুৎসা রটিয়েছিল যে, তা একটি সময় প্রায় সত্যে পরিণত হয়ে উঠছিল। জার্মানির হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বলতেন, ‘একটি মিথ্যাকে দশবার প্রচার কর এক সময় তা সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে।’ একটি সময়ে এই দেশের অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী (!) বঙ্গবন্ধুকে অর্ধশিক্ষিত বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম,জনগণের প্রতি ভালবাসা আর শুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ শুনে আমার হীনম্মন্যতা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না আমার জন্যে কিংবা বাঙালি জাতির জন্য কিংবা বিশ্বের সকল ত্যাগী, সৎ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের জন্যে একটি চরম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শেখ মুজিবুর রহমান। হাতে আসা এবং পাঠের আগ পর্যন্ত। বাঙালির আরেক শ্রেষ্ঠতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। অথচ বঙ্গবন্ধু কত সহজেই না তাঁর জীবনের কথা, দেশের কথা, মানুষ আর রাজনীতির কথা লিখলেন। বাংলা ভাষার যে কোন শক্তিমান লেখকের জন্যে তা এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বর্ণনা চরিত্র চিত্রন, ঘটনার সূক্ষ্ম বর্ণনা ভাষা শৈলী সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি একদিকে ইতিহাসের আকর হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসের মতো গতিশীল ও সুখপাঠ্য। সততা হচ্ছে একজন লেখকের প্রধান শক্তি। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু যেমন, তার কয়েকটি বর্ণনা তুলে দিচ্ছি। ‘তখন পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট চলছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি হুকুম দিলেন কলকাতার বড় বাজার ঘেরাও করতে। সেখানে গুদামের পর গুদাম চাউলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কাপড় গুদামজাত করে রেখেছিল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। শহীদ সাহেব এসব উদ্ধার করলেন বটে তবে মাড়োয়ারিরা তার বদলা নিতে কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে কয়েকজন এমএলএকে কিনে নেয়। এরপরে লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটে প্রবর্তিত হয় গভর্নর এর শাসন। এমন পরিস্থিতির পরে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রীত্ব নাই, তখন দেখি টুপি ও পাগড়ি পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈ চৈ করতে আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে, আরও অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম, ওরা ভাগতে শুরু করলো।” আরেক জায়গায় লিখেছেন, “আমি ও আজিজ সাহেব পরামর্শ করছি শাহ সাহেবের কাছ থেকে খাতাগুলো কেড়ে নিতে হবে। আমাদের ছাত্রলীগের কাজে সাহায্য হবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, শাহ সাহেবও রওয়ানা হলেন, আজিজ তাঁকে ধরে ফেলল। আমি খাতাগুলি কেড়ে নিয়ে বললাম, কথা বলবেন না চলে যাবেন। আজকাল যখন শাহ সাহেবের সাথে কথা হয় ও দেখা হয় তখন সেই কথা মনে করে হাসাহাসি করি। শাহ সাহেব (শাহ আজিজুর রহমান) ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলিতে আওয়ামী লীগ পার্টির নেতা এবং বিরোধী দলের লিডার হন। তাঁর সাথে আমার মতবিরোধ ১৯৫৮ সালের মার্শাল ল জারি হওয়া পর্যন্ত চলে।” সাধারণত আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের দুর্বলতার কথাগুলো প্রকাশ করেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তিনি অত্যন্ত সততার সাথে তাঁর জীবনের এই অংশগুলোও প্রকাশে দ্বিধা করেন নি। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব। আবুল হাশিম সাহেব মিল্লাত পত্রিকার প্রেস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলে বললো “তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।” বললাম, ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।” এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু হাশিম সাহেবের সাথে রেগে কথা বলেছিলেন। এরপর তিনি লিখেছেন, “পরের দিন ঐ সমস্ত বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বললো, “হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, মুজিব আমাকে অপমান করলো।” “আমি হাশিম সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম,আপনি মনে কিছু করবেন না। আমার এভাবে কথা বলা অন্যায় হয়েছে, আপনি যা ভাল বোঝেন তাই করুন। আমার কিছুই বলার নাই।” হাশিম সাহেব হিন্দুস্থানে থাকবেন, আমি চলে আসবো পাকিস্তান। আমার বাড়িও পাকিস্তানে। আমি যাওয়াতে তিনি খুশী হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ভিন্নমত হতে পারি কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যে রাজনীতির শিক্ষা পেয়েছি, সেটাতো ভোলা কষ্টকর। আমার যদি কোন ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোন দিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেবো, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকতো না।” “আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করবো ঠিক করি তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”

৪৭ এর দেশভাগ ভারতবর্ষের এক রক্তাক্ত ইতিহাসও বটে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শুধু মানচিত্রই ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিও। যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর অসীম সাহসী ভূমিকার কথা জানা যায় এই বইতে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন অনেক হিন্দু ও মুসলিমের। ’৪৭ এর পরে তিনি লিখেছেন, “আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে আর চিন্তা কি? এখন ঢাকায় যেয়ে ল’ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করবো, সমস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়। যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে পূর্ব বাঙলার ঘরে ঘরে তিনি আন্দোলন ও জনমত তৈরি করেছিলেন সে পাকিস্তানে মাত্র কয়েক মাসেই তার মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি লিখেছেন, “আমি বললাম” এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব (শামসুল হক)।” হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, “এই তো দুনিয়া।”

কলকাতা থাকাকালীন তিনি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছেন। হিন্দুদের হাতে মুসলিম নারী-শিশুদের হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের একসেট ফটোগ্রাফও তিনি মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই মুজিব লিখছেন, “আমরা যখন জেলে তখন এক রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হল কলকাতা ও ঢাকায়। কলকাতায় নিরপরাধ মুসলমান এবং ঢাকা ও বরিশালে নিরপরাধ হিন্দু মারা গেল।” এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করে অনেককে জেলে পাঠানো হয়। এদের সাথে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন, “তাদের কাছে বসে বলি, দাঙ্গা করা উচিৎ না, যে কোন দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ। মুসলমানরা কোন নিরপরাধীকে অত্যাচার করতে পারে না। আল্লাহ ও রসুল নিষেধ করেছেন। হিন্দুদেরও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তারাও মানুষ। হিন্দুস্থানের হিন্দুরা অন্যায় করবে বলে আমরাও অন্যায় করবো-এটা হতে পারে না। ঢাকায় অনেক নামকরা গুণ্ডা প্রকৃতির লোকদের সাথে আলাপ হলো, তারা অনেকেই আমাকে কথা দিল, আর কোনদিন দাঙ্গা করবে না।”

একটি ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম এবং সে সাথে একটি চরিত্র চিত্রণে তাঁর অসাধারণ মুন্সীয়ানা ধরা পড়ে। “সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটা চলা করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম এমন সময় একজন আধুবুড়া কয়েদি, সেও হাসপাতালে ভর্তি আছে আমার কাছে এল এবং মাটিতে বসে পড়ল। আমি জিজ্ঞাস করলাম আপনার বাড়ি কোথায়? বললেন বাড়ি গোপালগঞ্জ থানায় ভেন্না বাড়ি গ্রামে নাম রহিম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম রহিম মিঞা আপনি না আমাদের বাড়িতে চুরি করে সর্বস্ব নিয়ে এসেছিলেন। রহিম মিঞা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। এই ডাকাতের সাথেও পরম আন্তরিকতায় আলাপ চালিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁকে দুর্ব্যবহার না করে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শেষে রহিম ডাকাতই বলছে, “জানেন জীবনে ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়ে আমি ধরা পড়ি নাই। কিন্তু আপনাদের বাড়ি চুরি করার পর যেখানেই গেছি ধরা পড়েছি। জেলে বসে চিন্তা করে দেখলাম, আপনাদের বাড়ি আমাদের পুণ্যস্থান ছিল। সেখানে হাত দিয়ে হাত জ্বলে গেছে। আপনার মা’র কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে বোধহয় পাপমোচন হতো।”

আমি বলছি না, ইতিহাস সাক্ষী দেয় বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাঁকে যারা হত্যা করেছিলেন এবং এসব হত্যাকারীদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও পুনর্বাসন করেছিলেন দেশে বা বিদেশে তাদের কারুরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিচারের মাধ্যমে (দেশে) এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে (ভূট্টো ও গাদ্দাফী) তাঁদের নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। পুনশ্চঃ অনুমতি ব্যতিত বইটির কোন অংশ বিশেষ পুনর্মুদ্রণে নিষেধাজ্ঞা আছে। তবুও লিখেছি। এর মধ্যে মামলায় না জড়ালে আগামী সপ্তাহে আরেক প্রস্থ লেখার ইচ্ছে রইল।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক।
Email: qbadal@yahoo.com

পোস্টসমূহ