দৈনিক আজাদী উপসম্পাদকীয় কাল আজ কাল
১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৮ চৈত্র ১৪১৯ সাল ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি
*কামরুল হাসান বাদল
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com
১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৩ খ্রি. ২৮ চৈত্র ১৪১৯ সাল ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরি
*কামরুল হাসান বাদল
মিথ্যা হলো সকল পাপ, দুর্নীতি, অনৈতিকতা
ও অন্যায়ের মূল। সকল ধর্মেই মিথ্যা না বলার কথা বলা হয়েছে। কারণ সত্য বলতে
হলে কোন মানুষ আর পাপ বা অন্যায় করতে পারে না। সকল ধর্মেই বলা হয়েছে
মিথ্যা বলা মহাপাপ। ইংরেজিতে বলা হয় ‘tell a lie এবং Speak truth । অর্থাৎ একটি মিথ্যা ও বলবে না, সত্য বলবে। ইসলাম ধর্মেও মিথ্যা বলা গুণাহ বা পাপ।
নবী করিম (সা.) নবুওত
প্রাপ্তির বহু আগে অর্থাৎ তাঁর বাল্যকাল থেকেই সত্যি বলার জন্য প্রসিদ্ধ
ছিলেন। যে কারণে তৎকালীন আরব সমাজে তিনি আল আমিন উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর
সত্যবাদিতা ও ন্যায়-নীতিবোধের
কারণে কাবাগৃহের পুনর্নির্মাণের সময়ে কুরাইশদের মধ্যে পারস্পরিক দাঙ্গা
প্রশমনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তাঁর ওপর। এবং তিনি তা সবার সম্মান
অক্ষুণ্ন রেখেই সমাধা করেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিও না, আর জেনে শুনে সত্য গোপন করো না”। সুরা বাকারা-৪২
গত ৬ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের
মহাসমাবেশ উপলক্ষে তার আগের দিন ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ
প্রাঙ্গণে সমবেত হয় হেফাজতের কর্মী সমর্থকরা। সেই সমাবেশে জামায়াত-শিবির-বিএনপি ছাত্রদল-জাতীয় পার্টি উপস্থিত থেকে সমর্থন, সংহতি জানিয়েছেন, অনেকে
বক্তৃতাও করেছেন। বিএনপি সমর্থিত চিকিৎকরা অর্থাৎ ড্যাবের কর্মীরা সমাবেশে
চিকিৎসা সেবাও দান করেছেন। সমাবেশে অনেকেই উত্তেজনাকর বক্তৃতা প্রদান
করেছেন। এমন এক পর্যায়ে, “(এই অংশটুকু প্রথম আলো থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তাং ৭ এপ্রিল)” সুন্নি
আলেমদের প্রতিনিধি দাবি করে মাহবুবুল বশর আল কাদেরী নয়া দিগন্ত ছাড়া
অন্যসব গণ মাধ্যমের নেতাদের সমাবেশস্থল থেকে বিতাড়িত করার দাবি জানান। তিনি
ঘোষণা দেন এসব গণমাধ্যমের কার্যালয় ঘেরাও করা হবে।” এ ধরনের উস্কানিমূলক
বক্তব্যের এক পর্যায়ে হেজাফত কর্মীরা বেশ ক’জন সংবাদ মাধ্যমকর্মীর ওপর চড়াও
হয়। এতে আহত হন একাত্তর টিভির বেশ ক’জন সাংবাদিক। লাঞ্ছিত করা হয়
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ব্যুরো প্রধানসহ অন্যদের। এই দৃশ্য ও সংবাদ দেশের
প্রায় সব ক’টি সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। যার প্রতিবাদে ঢাকা
চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। এই
ঘটনার পরপরই যখন সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে তখন এক সাংবাদিক
সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে হেফাজতের নেতারা বলেন। “এ কাজ
তাদের কর্মীদের নয়, ছাত্রলীগের
ছেলেরাই সমাবেশে ঢুকে সাংবাদিক আক্রমণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।” ঐ সমাবেশ যারা
সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন কিংবা টেলিভিশনে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা দয়া
করে একবার ভেবে দেখুন হেফাজতের ঐ মারমুখী সমাবেশে ছাত্রলীগের যুবলীগের কোন
কর্মীর পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল কিনা। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই
আক্রমণকারীরা ছাত্রলীগেরই কর্মী, তাহলে হেফাজতের হাজার হাজার নেতা-কর্মীরা তাদের ধরে গণধোলাই দিল না কেন, অথবা পুলিশের কাছে সোপর্দ করল না কেন?
এখন প্রশ্ন হলো যারা ইসলামের প্রকৃত দাবিদার
বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন সেই হেফাজতে ইসলামের নেতারা যারা নামের আগে পরে
অনেক বিশেষণ সংযোজন করেন তারা প্রকাশ্যে মিথ্যা বললেন কী করে? তাঁদের
সেই মিথ্যা বয়ান বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের দর্শকরা দেখেছেন। যে নেতা
বা মৌলানা প্রমাণিত একটি সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করেছেন তিনি কি
তবে কোরআনের শিক্ষাকে অমান্য করলেন না? আর
কোরআন অমান্যকারী একজন ব্যক্তি কী করে মৌলানা শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন।
তিনি কীভাবে ইসলামের হেফাজত করতে পারেন। আর এখনো যে সব মুসলিম ঐ মৌলানার(?) নেতৃত্ব মানছেন তাদেরকে কী বলা যায়!
মূলত বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সুফি-সাধক-পীর-আওলিয়াদের কল্যাণে। যাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক। তাঁদের মহত্ব, সততা
উদারতা ও মানবতাবোধে মুগ্ধ হয়ে উপমহাদেশের অন্যধর্মের নিপীড়িত বঞ্চিত
লোকেরাই দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এখনো তাঁদের মাজারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ নর-নারীর সমাবেশ ঘটে। এই ধারা ইসলামের সুফিধারারই একটি অংশ।
বৃটিশ আমলেই এক সময়ে ওয়াহাবী ও শেষের দিকে
মওদুদীবাদের জন্ম হয়। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন ব্রিটিশদের আনুকূল্যেই
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এই দুই ধারা অত্যন্ত কট্টর ও উগ্র।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ, ওলেমা-মাশায়েখ
এই দুই মতবাদকে ইসলামের বাতিল মতবাদ বলে আখ্যা দিয়ে তাদের বর্জনের আহবান
জানিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো ওয়াহাবী মতবাদেই বিশ্বাসী। এই
দুই মতবাদের বাইরে ইসলামের মূলধারা সুন্নী বা আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত
ও আরো দু’একটি নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এখনো এই ধারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
বর্তমানে সৌদি রাজপরিবারও ওয়াহাবী মতাদর্শের। যারা মূলত ইয়ামেনি বংশোদ্ভুত।
আরবের এই অংশ দখল করে ইঙ্গ-মার্কিন সহযোগিতায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার নামে দেশের নামকরণ করেছে সৌদী আরব। যা ইসলামসিদ্ধ নয়, শুধু
তাই নয় এই রাজবংশের রাজকীয় জীবন যাপনও ইসলাম সম্মত নয়। কারণ ইসলামে
বিলাসিতা বা জাঁকজমকের কোন স্থানই নেই। এদের প্রভাবেই বাংলাদেশে ওয়াহাবী
মতবাদ প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় হচ্ছে। এবং এদের মতই কওমী মাদ্রাসার অনেক
শিক্ষক যারা বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে আছেন তাদের জীবনযাপনও
বিলাসীতাময়। যাঁদের আয়ের সাথে জীবনযাপন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মোটেও। এরা যদি
সত্যি সত্যি রাসুল (সা.) এর সুন্নত পালন করতে বদ্ধপরিকর হন তবে তাদের বর্তমানের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার প্রায় সবকিছুই বর্জন করতে হবে। এত আয়েশী জীবন ইসলাম ধর্ম কোনভাবেই সমর্থন করে না।
এঁরা শতকরা নব্বইভাগ মুসলিমের দেশে ইসলাম
রক্ষা বা হেফাজতের আন্দোলন করেন মানুষ রক্ষা বা হেফাজতের কোন কাজ করেন না।
কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংকটে দুই বস্তা চাল নিয়ে কখনো কোন দুর্গত মানুষের
পাশে তাঁদের দাঁড়াতে দেখা গেল না। দুর্নীতি নিয়ে, অনিয়ম নিয়ে তাঁদের কোথাও দাঁড়াতে দেখলাম না। কোন ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ
এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিপক্ষে কিছু বলতে শুনলাম না। যে সব
মানুষের বেতন বা প্রকাশ্য আয়ের সাথে জীবনযাপনের মিল নেই তাদের বিরুদ্ধে
কিছু করতে দেখলাম না। আজ থেকে ৪২ বছর আগে যারা ইসলামের নাম দিয়ে এদেশের
ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল, প্রায় তিন লক্ষ মা-বোনের
সম্ভ্রমহানী ঘটিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনলাম না। যারা চাঁদে
সাঈদীকে দেখা গেছে ব লে এমন ডাহা মিথ্যা রটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধ্বংস
লীলা চালালো তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে দেখা গেল না। যারা এখনো সংখ্যালঘুদের
বাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করছে তাদের বিরুদ্ধে একটু নিন্দাও জানালো
না। ভেবে বিস্মিত হই এঁরা কোন ইসলামের কথা বলেন। আমার চৌদ্দ পুরুষতো এমন
ইসলামের নামও শোনেননি।
মূলত হেফাজতে ইসলাম এখন জামায়াত-বিএনপির বি-টিম হিসেবেই মাঠে নেমেছে। জামায়াতের অর্থ- আর
বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় হেফাজতে ইসলাম দুর্বিনীত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের
প্রায় ১৫ কোটি মুসলমানের মুখপাত্রতো হেফাজতে ইসলাম নয়। সেই ম্যান্ডেটও
এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হেফাজতকে দেয়নি। হেফাজত যে ১৩ দফা দাবি পেশ
করেছে তা পূরণে সরকার বদ্ধপরিকর বা বাধ্য নয়। কারণ বর্তমান সরকার তাদের
ভোটে ও তাদের এজেণ্ডা বাস্তবায়নের জন্যে ক্ষমতায় আসে নি। বর্তমান সরকার
ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। যার সহযোগী আরো ১৩টি দল যারা আওয়ামী
লীগের মতো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র
ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। এই জোটকে এদেশের মানুষ ভোট দিয়েছে এই তিন
আদর্শসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রত্যাশায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী
প্রতিশ্রুতির অন্যতম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা এবং দেশকে জঙ্গিমুক্ত করা।
ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ
নির্বিশেষে সকলের সম মর্যাদা নিশ্চিত করা। প্রগতির চাকাকে সামনে এগিয়ে
নেয়া। আওয়ামী লীগ বাধ্য নয় হেফাজতের দাবি মেনে নিতে। হেফাজত যদি তাদের দাবি
পূরণ করতে চায় তবে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসুক।
মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি উস্কে দিয়ে, হরতাল-নৈরাজ্য করে দাবি প্রতিষ্ঠিত করা যায় না এবং তা গণতান্ত্রিক আচরণও নয়।
মুশকিল হলো জামায়াত ও হেফাজতের মতো শক্তিগুলো
গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে সরকার পতন ঘটাতে চায় কিন্তু
নিজেরা কখনো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। এরা কোন যুক্তিতর্কের ধার ধারে না।
এদের পরমত ও পরধর্ম সহিষ্ণুতা নেই। এরা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলতে শুধু
তাদের অনুভূতিই ও প্রতিক্রিয়া বোঝায় কিন্তু অন্যধর্মের লোকদের ওপর অত্যাচার, তাদের উপাসনালয় ভাঙচুর, লুণ্ঠন নিয়ে একটি কথাও বলে না। অন্য ধর্মের অনুসারীদেরও যে ধর্মীয় অনুভূতি আছে তারা তা বিশ্বাসই করতে চায় না।
আজ থেকে আট-নয়’শ বছর আগে এই উপমহাদেশে সুফি-সাধকদের পরিবর্তে যদি এই জামায়াত-হেফাজত
ইসলামের স্টাইলে ধর্ম প্রচারে আসতো তাহলে সারা উপমহাদেশে বর্তমানে ২০০ জন
মুসলমান খুঁজে পাওয়া যেতো কি না সন্দেহ। তাঁদের হিংস্র আচরণে আমরা
মুসলমানরাই ভীত-সন্ত্রস্ত, অন্য ধর্মের মানুষকে আকর্ষণ করবে কী ভাবে?
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
email: qbadal@yahoo.com