কামরুল হাসান বাদল
একটি সময়
ছিলো যখন গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরের আঙিনায় রোপিত থাকতো দু’একটি
লেবু গাছ। অতিথি আপ্যায়নে কিংবা নিজেদের চাহিদা মেটাতে এর কোন বিকল্পও
ছিলো না। কিছুটা অবস্থাপন্নদের বাড়িতে ডাব গাছও থাকতো, প্রচণ্ড গরমে এই
লেবুর শরবত বা ডাবের পানি শুধু নিজেদের জন্যে নয় বাড়িতে অতিথি এলে
প্রথমেই তাঁকে লেবুর শরবত আর সম্ভব হলে ডাবের পানি দিয়েই আপ্যায়ন বা
অভ্যর্থনা জানানো হতো। শহরে আধুনিক ভাষায় যাকে ঘণফডমবণ ঊরধভপ্র বলা হচ্ছে
আজকাল। লেবু যে সব সময় পাওয়া যেতো তা নয়। যখন লেবু পাওয়া যেতো না তখন
দেখেছি লেবুর কচি পাতাকে কচলিয়ে চিনির শরবত বানিয়ে দেয়া হতো, তাতে লেবুর
অম্ল স্বাদটুকু পাওয়া না গেলেও লেবুর সুগন্ধিটা পাওয়া যেতো। গ্রাম
বাংলায় একটু ক্লান্ত হয়ে কেউ ঘরে ফিরলে তাকে দেয়া হতো এই ধরনের শরবত।
গ্রামের মানুষ বলতো তাকে চিনিপানা। এই চিনিপানা দ্রুত ক্লান্তি নাশক।
বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানও বলছে চিনি হচ্ছে এমন একটি শর্করা যা অতি দ্রুত
রক্তের সাথে দ্রবিভূত হতে পারে যার কারণে শারীরিক ক্লান্তি দূর করে
মুহূর্তেই। এই প্রথা চলে আসছে শত শত বছর ধরে, (চিনির আগে গুড়ের প্রচলন
ছিল) তার মানে তখন থেকেই মানুষ এটি জানতো। শরবতে লেবুর ব্যবহার ছাড়াও
মানুষ ভাতের সাথে লেবু খেতো, যার কারণে তাদের ভিটামিন সি এর অভাব হতো না
কখনো। এখন সময় পাল্টেছে, বাড়ির আঙিনায় আর লেবু গাছ শোভা পায় না।
ফার্মের হাইব্রীড লেবু এখন গ্রামের মানুষও কিনে খাচ্ছে। যাতে লেবুর
অম্লতাটুকুই আছে পাগলকরা সুগন্ধটি নেই। লেবুর শরবতের স্থান দখল করেছে
বহুজাতিক কোম্পানির কোমলপানীয়, শহরেতো অনেক আগেই গ্রাম বাংলায়ও এখন
কোকাকোলা কালচার। গ্রামের বাজারে দোকানে দোকানে ফ্রিজ, প্রায় ঘরে ঘরে
ফ্রিজ তাতে শোভা পায় হরেক নামের, হরেক সাইজের কোমল পানীয় যা নিজেদের
জন্যে বা অতিথিদের জন্যেও অপরিহার্য্য। সেখানে লেবুর শরবত বা চিনিপানা চরম
অপমানের। দরিদ্রের বা ব্রাত্যদের পানীয়তে পরিণত হয়েছে। আমার ধারণা এখন
গ্রামেও বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসা অতিথিদের প্রথমে যদি চিনিপানা বা লেবুর
শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় নির্ঘাত সে সম্বন্ধ ভেঙে যাবে। এই সব পানীয়
ছাড়াও আছে বিভিন্ন নামের, বিভিন্ন কোম্পানির পাউডার। দু চামচে এক গ্লাস
শরবত, তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষায় ভিটামিন এ থেকে জেড পর্যন্ত সবই আছে আর কি।
বস্তুত এ সব পানীয়তে প্রচুর পরিমাণ কার্বোহাইড্রেড মানে শর্করা বা চিনি
কেমিক্যাল রং আর প্রিজারভেটিভ ছাড়া আদৌ কোন খাদ্যগুণ নেই। তার ওপরে আছে
নকল পণ্যের ছড়াছড়ি যা শিশুদের জন্যে সুষ্ঠু নয় বয়স্কদের জন্যেও
প্রাণঘাতি হয়ে উঠতে পারে। শহরে অনেক মায়ের মুখে শুনি, “আমার বাবুতো কোক
না হলে ভাতই খেতে চায় না।” বহুজাতিক কোম্পানির (বর্তমানে দেশিয় কিছু
কোম্পানিও গজিয়েছে) এই সব ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপনে প্রতারিত হয়ে মানুষ নিজেতো
বটে তার সন্তানদেরকেও অভ্যস্ত করে তুলছে এই সব পানীয়তে। মাইকেলের কথা মনে
পড়ছে, মানে কবি মাইকেল মধুসূধন এর আক্ষেপ,
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন
তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি
পরধনে লোভে মত্ত......
নিজের হাতের কাছে প্রকৃতির অফুরন্ত সম্পদ রেখে আধুনিকতার নামে, বড়লোকি দেখানোর নামে কি ছাইপাকা গিলছি আমরা।
ছোটবেলায়
যে এলাকায় থাকতাম সে বাসার পাশে ছিলো একটি মস্ত তেঁতুল গাছ। আমাদের দিনের
একটি প্রধান কাজ ছিলো সে গাছের তেঁতুল কাঁচা হোক কিংবা পাকা তা পেড়ে
খাওয়া। আর সে তেঁতুল খাওয়া দেখলেই মায়ের হাতে মার খেতে হতো কারণ তাঁরা
বলতেন বেশি বেশি তেঁতুল খেলে না কি রক্ত জল হয়ে যায়। কি আশ্চর্য আজকাল
চিকিৎসকরাও বলছেন প্রতিদিন অন্তত এক গ্লাস তেঁতুলের শরবত খেতে, তাতে নাকি
হার্ট ব্লকের জন্য দায়ী যে রক্তের কোলেস্টোরেল তা কমাতে সাহায্য করে। অথচ
গ্রামে-গঞ্জে এখন আর আগের মতো তেঁতুল গাছ দেখা যায় না। শহরের শিশুরা
অধিকাংশই তেঁতুল চেনে না, খাবে কি? তার বদলে বড় বড় কোম্পানির কৃত্রিমভাবে
তৈরি টক মিষ্টি ঝাল চকলেট বা বার্মিজ আচারের নামে অখাদ্য-কুখাদ্য খাচ্ছে।
এখন
গ্রীষ্মকাল, মধুমাসের মধু ফলে ভরে যাচ্ছে দেশ। পাঠকরা একটু লক্ষ্য করুন।
এই গরমকালে আমাদের দেশি যে ফলগুলো পাওয়া যায় তার সবগুলোই বেশ রসালো। এ
প্রকৃতির এক অপার দান। প্রকৃতি তার সন্তানদের লালন করে এভাবেই। গ্রীষ্মের
দাবদাহে আপনার শরীর মন জুড়ানোর জন্যে, প্রচণ্ড ঘামে আপনার দেহে পানি
স্বল্পতা রোধ করে আপনার কিডনীকে সুস্থ রাখার জন্যেই যেনো পরিকল্পনা করে
গ্রীষ্মকালের ফলগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে। আনারস, তরমুজ, আম, জাম, কাঁঠাল
ইত্যাদি ফলমূলগুলো এদেশের আবহাওয়া উপযোগী। এ ফলগুলোর খাদ্যগুণ বের করে
দেখুন, দেখবেন এই মৌসুমে রোগ বালাই এর হাত থেকে বাঁচতে যে খাদ্যগুণ বা
পথ্যের প্রয়োজন তার সবগুলোই আছে এসব দেশিয় ফলে। প্রকৃতি এদেশের মানুষের
উপযোগী করেই উৎপাদন করে এদেশের ফল বা বৃক্ষরাজী। ছোট একটি উদাহরণ দেই।
বৈশাখ থেকে প্রায় শ্রাবণ পর্যন্ত এদেশে কাঁঠাল পাওয়া যায়। এক সময় এদেশে
প্রলম্বিত হতো বর্ষা। এ সময় গ্রামে-গঞ্জে খাদ্যাভাবের সাথে যোগ হতো
প্রায় ১০/১৫ দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে ধান শুকিয়ে তা ঢেঁকিতে ভানতে
না পারার বিড়ম্বনা। যে সময় নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন কৃষকরা পেটপুরে
কাঁঠাল খেয়ে দিনযাপন করতো। আমন ধানের মৌসুমে জমিতে হাল নিয়ে যাওয়ার আগে
গামলা করে কাঁঠাল খেয়ে তারা মাঠে যেতো আর মধ্যাহ্ন পর্যন্ত সে শক্তিতেই
লাঙ্গল ঠেলতো। কাঁঠাল গরিবের অন্ন বলেই হয়ত একটি গাছেই কাঁঠাল ধরতো শত শত।
এছাড়া আরও কত ধরনের যে ফল আছে তার কয়টির নাম জানে আমাদের শহরের শিশুরা,
এমনকি তাদের বাবা-মায়েরা। কয়েক বছর আগে আমি একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম।
আমাদের শহরের শিশুদের কাছে দেশি ফল পরিচয় করিয়ে দেয়ার। লোক সংস্কৃতি
উৎসব নামে তখন একটি সংগঠনের সাথে কিছুদিন জড়িত ছিলাম, তো সেই সংগঠনের
সহযোগিতায় চট্টগ্রাম ডিসি হিলে সম্ভবত পরপর দুবছর এ আয়োজনটি করতে
পেরেছিলাম। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে যা হয়, একটি ভালো উদ্যোগ কেউ একজন
গ্রহণ করলে অনেকেই তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে, দু’পাঁচ বছর পরে আর কারো আগ্রহ
থাকে না। এটির বেলায়ও হয়েছিলো তাই, দুবছর আগে খেলাঘর শেষবারের মতো এটির
আয়োজন করেছিলো। তারপরে আর কারো উদ্যোগ নেই।
আমরা
একবার বলার চেষ্টা করেছিলাম চট্টগ্রাম ডিসি হিলের চারপাশে অহেতুক গাছ না
লাগিয়ে ফলজ বৃক্ষরোপণ করা হোক। আমাদের সবধরনের দেশি-ফলের গাছে ভরে উঠুক এই
অঙ্গন। শহরের শিশুরা একসময় দল বেঁধে এসব ফলবান গাছ দেখতে আসবে ওরা ফল
চিনবে সাথে গাছও চিনবে। কিন্তু কে শুনবে আমাদের কথা। গাছ লাগানোর চেয়ে
দালান তোলার বাজেট বেশি আর যেখানে বাজেট বেশি সেখানে কমিশনের পরিমাণও বেশি।
এ
মুহূর্তে আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়লো। তার ভাগিনার আবদার তাকে লিচু কিনে
দিতে হবে। আমার বন্ধুটি বলছে এখনতো বাজারে লিচু নেই। কিন্তু ভাগিনা নাছোর
বান্দা। বাসা থেকে বেরিয়ে তার ভাগিনা মামাকে নিয়ে চললো ডিপার্টমেন্ট
স্টোরে। মামা যতই বলে লিচু পাওয়া যাবে ফলের দোকানে ভাগিনার তাতে কর্ণপাত
নেই। সে মামাকে দোকানে নিয়ে বয়াম দেখিয়ে বললো এইতো লিচু। প্রিয় পাঠক
মনে আছে সাত/আট বছর আগে এই লিচু নিয়ে বেশ হৈ চৈ হয়েছিলো কারণ এতে
ট্যানারির একটি উপাদান ব্যবহার করা হতো বলে নিষিদ্ধ হয়েছিলো বিপণন। এখন তা
নির্দ্ধিধায় চলছে বাজারে।
অন্যদের
কথা কি বলবো আমার ঘরের কথা বলি। কয়েকদিন আগে সস্ত্রীক হেঁটে আসছিলাম
আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনের রাস্তা দিয়ে। ঐ রাস্তায় বেশ ফলমূলের
বাজার বসে। আতা দেখতে পেয়ে আমার স্ত্রীকে বললাম আতা কিনি? তার তাৎক্ষণিক
প্রতিক্রিয়া আতা! ছি: এইন কে’নে খায়, দুয়ো ফইস্যের ফোয়াদ আছে নি? (আতা!
ছি: এগুলো কিভাবে খায়, দু পয়সার মজা আছে না কি?) প্রিয় পাঠক, আমার ঘরেও
এই অবস্থা, আপনাদের পরিস্থিতি কেমন সুযোগ পেলে জানাবেন।
আমরা
প্রকৃতির প্রতি সুবিচার করি না। কিন্তু প্রকৃতি যে সর্বদাই তাই করে তার
আরেকটি উদাহরণ দিই। মরুভূমির প্রাণী উট অনেকদিন পানি না খেয়ে থাকতে পারে
কারণ তার প্রয়োজনের জন্যে পানি সে তার শরীরেই মজুদ রাখে। শুষ্ক মরুভূমিতে
তেমন কিছু জন্মায় না। একমাত্র ফসল ছিলো খেজুর। দিনে দশটি খেজুর খেয়েই
একটি মানুষের প্রয়োজনীয় ক্যালোরি পাওয়া যেতো বলে আরবরাতো বেঁচে ছিলো
এভাবেই।
এ
কথাগুলো নতুন নয়, প্রায় প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও বলা হচ্ছে, লেখা
হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে। তারপরেও অনেক বেশি খাদ্যগুণ নিয়ে আমার শরীর,
আবহাওয়া উপযোগী দেশি ফলগুলো পড়ে থাকবে পরম অবহেলায়, খড়ের গাদায় আর
উজ্জ্বল আলোর নিচে সুদৃশ্যপাত্রে সাজানো থাকবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ
করে আমদানি করা বিদেশি ফল যা প্রকৃতি আমাদের জন্যে নির্বাচন করেনি।
এরপরেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে ভাগ্যকে দায়ী করবেন?
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক।
ইমেইলঃ qbadal@yahoo.com
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক।
ইমেইলঃ qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন