কামরুল হাসান বাদল
ওসামা
বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আপাতত একটি নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র
বদলের পরিস্থিতি তৈরি হলো মাত্র। এ নাটক আরও চলবে তবে দেখতে হবে কেন্দ্রীয়
চরিত্র পরিবর্তনের ফলে নাটকটি ফ্লপ করে কিনা, না কি আরও জনপ্রিয়তা অর্জন
করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
পাকিস্তানের
সার্বিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযোজনা ও
পরিচালনায় নাটকটির মহড়া শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান আফগানিস্তানের
সীমান্তবর্তী এলাকায় ৭০ দশকে আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত সৈন্য অবস্থান
করছিলো। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান লাদেন আমেরিকান বন্ধুদের ব্যবসায়িক
সহযোগিতায় অঢেল অর্থের মালিক কিন্তু ভিতরে তার উগ্র ইসলামীইজম।
আফগানিস্তানে তখন সোভিয়েত সৈন্য যা আমেরিকা ও তার বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর জন্য
সার্বক্ষণিক মাথাব্যথার কারণ। এখন আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য হঠানোর
জন্য ইসলামী ইজমের চেয়ে আর বড় অস্ত্র কিছু হতে পারে না, আর পাশের দেশতো
পাকিস্তান আছেই ব্যস দুয়ে দুয়ে চার। লাদেনের আমেরিকান কানেকশন আর ভিতরে
ইসলামীইজম, আফগানিস্তান মুসলিম প্রধান দেশ, আর দুশমন হলো ইসলামের শত্রু (!)
বলে কথিত কমিউনিস্ট। লাদেনের নেতৃত্বে সারা মুসলিম জাহান থেকে মুজাহিদ
সংগ্রহ করে আমেরিকার টাকা আর পাকিস্তানের আশ্রয় প্রশ্রয় ও সহযোগিতায়
তৈরি হতে থাকলে মুজাহিদ বাহিনী যাদের একমাত্র লক্ষ্য কমিউনিস্টদের আগ্রাসন
থেকে মুসলিম আফগান জাতিকে রক্ষা করা। প্রথম প্রকল্প সফল, আফগানিস্তান থেকে
সোভিয়েত সৈন্য চলে যেতে বাধ্য হয় আর আফগানিস্তানের বুকে নেমে আসে আইয়ামে
জাহেলিয়াতের প্রাথমিক যুগ। এবার ‘‘কুইনিন জ্বর সাড়াবে বটে কিন্তু কুইনিন
সাড়াবে কে?” পরিস্থিতিতে। বিশ্বের মুসলিম দেশে আমেরিকার ভূমিকা, আমেরিকার
ইসরাইলপ্রীতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার নগ্ন আচরণ,
বিত্ত বৈভবে মত্ত মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের প্রতি অন্ধ সমর্থন ইত্যাদি কারণে
ফ্রাঙ্কানস্টাইন দানব এবার তার স্রষ্টার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। লাদেনের সাথে
আমেরিকার সুসম্পর্কের বদলে জন্ম নেয় প্রতিহিংসার। তারপরের ইতিহাস পাঠকের
ভালই জানা আছে।
এখন
প্রশ্ন উঠতে পারে যে আমেরিকা লাদেনকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলো তাকে হত্যা
করলো কেন? লাদেনকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলো কারণ লাদেন বেঁচে থাকলে
আমেরিকার সন্ত্রাস বিরোধী নামক অন্যায়, অযৌক্তিক ও এক পেশে যুদ্ধ
দীর্ঘস্থায়ী করা যেতো অথবা যে কোন দেশে বিস্তৃত করা যেতো। আর এখন কেন
হত্যা করা হলো তার কারণগুলো ব্যাখ্যা করছি একে একে।
লাদেনের
মৃত্যুঘণ্টায় প্রথম সংকেত বেজেছে যেদিন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রকামী
মানুষের জাগরণ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সাহায্যপুষ্ট এসব স্বৈরাচারদের
পতন কিংবা পতন সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থ ও উপস্থিতি
উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে লিবিয়া পরিস্থিতি যেখানে
আমেরিকা ইতিমধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। প্রিয় পাঠকরা হয়ত জেনে থাকবেন
ওয়ান ইলেভেনের পর আমেরিকার কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে ১২৮
লাখ কোটি ডলার যা বর্তমান আমেরিকার উগ্র পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থায়
সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সঙ্গতকারণে মার্কিন সরকার
আফগান-পাকিস্তান ফ্রন্টে যুদ্ধ ব্যয় কমিয়ে আনতে চায়। লিবিয়ায় যুদ্ধ
চলছে, আর বাদবাকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেখানে
ভবিষ্যতে আমেরিকার ভূমিকা কী হবে বা কীভাবে সেখানে আমেরিকা জড়িয়ে পড়তে
পারে একারণগুলোই বড় ভূমিকা রেখেছে আমেরিকার পাকিস্তান-আফগাননীতি
পরিবর্তনে। লিবিয়ায় আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়া লাদেনের মৃত্যু ঘণ্টায়
দ্বিতীয় সংকেত।
তৃতীয়
সংকেতটি বাজলো যেদিন ওবামা ঘোষণা দিলেন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো
প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চান। ওবামার ধসে পড়া জনপ্রিয়তাকে চাঙা করে তাকে
পুনর্বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্যে প্রয়োজন একটি হিরোইজমের। আর
আমেরিকার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের শিখন্ডি বারাক ওবামার আরেক টার্মের
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া আমেরিকার জন্য জরুরি। অতএব শেষ বা চূড়ান্ত
ঘণ্টা বাজাও ওবামার মৃত্যুর।
যে
আইএসআই ভারতের গোয়েন্দাকেও নাকানি চুবানি খাওয়ায়, শোনা যায় বাংলাদেশের
গোয়েন্দা সংস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করে জোট শাসনামলে সে আইএস আই জানে না
সবচেয়ে নিরাপদ ও সংরক্ষিত এলাকা মিলিটারি একাডেমির নাকের ডগায় পৃথিবীর
টপমোস্ট ওয়ান্টেড লাদেন নির্বিঘ্নে বাস করছে? একটি পাগলেও বিশ্বাস করবে
একথা? আর যে পাকিস্তানের নাড়ি নক্ষত্রের খবর রাখে মার্কিন গোয়েন্দা
সংস্থা তারাও এতদিন জানতে পারলো না লাদেনের হদিস? আমি কি ইঙ্গিত করতে
চেয়েছি পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আগামীতে এ বিষয়ে (পাকিস্তানে
লাদেনের অবস্থান) আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ততটুকু অবনতি
হবেনা, সেটাই হবে আমার ইঙ্গিতের পক্ষে বড় যুক্তি বা প্রমাণ। বলেছিলাম নতুন
চরিত্রের আগমনে নাটকটির ভবিষ্যতের কথা। বিশ্বে মার্কিন আগ্রাসী নীতি বিশেষ
করে মধ্যপ্রাচ্যে নীতির বিরোধীতা করতে গিয়ে ওসামা বা তার সহযোগিরা যে
হিংসা ও হানাহানির পথ বেছে নিয়ে সারা বিশ্বে মুসলিমদের বিব্রতকর ও
লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলেছে তা থেকে উত্তরণ চায় শান্তিকামী মুসলিম
সম্প্রদায়। মুসলিম বিশ্বে একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ ছাড়া অন্যসব
দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ আজ যে গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের
সূচনা হয়েছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক বলেই ধরে নিতে হবে।
এসব
দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের অবৈধ শাসন দীর্ঘতম করার পিছনে আমেরিকার যে
ভূমিকা তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। এখন এসব দেশে যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে
পারে তাতে করে ওসব দেশের জনগণের মার্কিন বিরোধী মনোভাবের কারণে
মধ্যপ্রাচ্যে ঝাঁকিয়ে বসা মার্কিন আধিপত্য খর্ব হতে বাধ্য। তবে কথা থেকে
যায় ঐ আন্দোলনের নেতৃত্ব কাদের হাতে যাবে। সত্যিকার গণতান্ত্রিক শক্তির
উদার মানবতাবাদীদের হাতে নাকি কট্টর ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে। আর
এসব উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ও নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকে তা আমরা
লাদেনের উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে তা উপলব্ধি করতে পারি।
জিহাদের
নামে বিশ্বে অনেক নিরপরাধ মানুষ হত্যার নির্দেশদাতা ওসামা বিন লাদেন একটি
জায়গায় মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন সেটি হলো মৃত্যুর বেশ কিছুকাল আগে তিনি
একটি উইল করেছিলেন। করেছিলেন কারণ তিনি জানতেন যে কোন মুহূর্তে তাঁর
মৃত্যু হতে পারে। উইলে তিনি তাঁর সন্তানদের তাঁর পথ অনুসরণ করতে বলেননি।
তিনি চাননি তাঁর সন্তানরা এ পথে আসুক। বরং তিনি জিহাদের পথ অনুসরণ করতে
গিয়ে পরিবার তথা সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে না পারার জন্য দু:খ প্রকাশ
করেছেন।
তবে কি লাদেন অনুধাবন করেছিলেন তিনি একটি ভুল পথে অনেকদূর অগ্রসর হয়ে গেছেন, যেখান থেকে ফেরার পথটিও বিপদসঙ্কুল?
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক
ইমেইলঃ qbadal@yahoo.com
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক
ইমেইলঃ qbadal@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন